মঙ্গলবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

প্রতিশোধ

প্রতিশোধ

শঙখ শুভ্র নায়ক




সেই দিনটার কথা আজো বার বার ভয়ংকর স্মৃতির মতো অরিন্দমের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কলতলার পাশে সেই পুরোনো মাদার গাছ আর তার পাশে বাথরুম। বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাইরে বাথরুমে যেতে হত। অরিন্দমের তখন চৌদ্দ বছর বয়স। ওর বোন সাথীর তখন এগারো। একদিন চার পাঁচটা লোক অরিন্দমদের বাড়িতে ভাড়া এল। লোকগুলোকে দেখে বেশ ভদ্র বলেই মনেহয়েছিল। অরিন্দমের বাবার কাছে এসে বলেছিল, "একটা ছোট খাটো কাজে এসেছি। পাঁচদিন ভাড়া থাকব, কী নেবেন বলুন?"
অরিন্দমের বাবা বিভাস বাবু বলেছিলেন, "দেখুন বাড়ি তো আগে কাউকে ভাড়া দিইনি।"
ওদের মধ্যে একটা গোঁফ ওয়ালা লোক যার নাম ছিল নিত্যানন্দ। বলেছিল, "সে জন্যই তো আপনার বাড়িটা চাইছি। ভাড়াবাড়ি তে থাকতে আমাদের পোশাবেনা। আমরা একটু নিরিবিলিতে থাকতে চাই। শুনলাম আপনাদের বাড়ির বাইরে একটা চালার মতো আছে ওখানেই আমরা চার পাঁচজন থেকে যেতে পারব। টাকার ব্যাপারে চিন্তা করবেন না। পাঁচদিনে পাঁচ হাজার পাবেন। যদি রাজি থাকেন তো বলুন।"
বিভাস বাবু অবাক হলেন। বললেন, "ওই চালাটা মোটেই পরিষ্কার নেই, উপরে টালি বসানো ছাদ পর্যন্ত নেই। ওটার জন্য দিনে বড়জোর একশো টাকা ভাড়া হওয়ার কথা।"
নিত্যানন্দ বলেছিল, "আমাদের কথা কথা, এই তিনহাজার রাখুন দু'তিন দিনের মধ্যে বাকি দু'হাজার পেমেন্ট করে দেব।"
টাকার ব্যাপারে কোনো গাফিলতি লোকগুলো করেনি। তিন দিনের মাথায় পুরো পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তার বদলে যে ক্ষতি করে গিয়েছিল তা অপূরণীয়। পঞ্চম দিন রাতে কখন লোক গুলো চলে গিয়েছিল তা অরিন্দম জানেনা। সকাল বেলায় ঘুম থেকে উঠতেই দেখেছিল ওদের বাড়িতে লোকের ভিড় জমে গেছে। কেউ কোনো কথা বলছিল না। ভিড় ঠেলে কল তলায় পৌঁছাতেই দেখেছিল ওর বোনের মৃত রক্তাক্ত নগ্ন শরীরটা কল তলায় পড়ে আছে। সম্ভবত কাল রাতে যখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে বাথরুমে গিয়েছিল তখনই একদল কুকুর যেন তাকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়ে রেখে গেছে। ভয়ে শিউরে উঠেছিল অরিন্দম, তারপর থেকে হ্যালুসিনেশনের মতো ওই ছবিটা মাঝেমাঝেই ওর চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বুকের মধ্যে কাঁপুনি ধরিয়ে দেয়।
থানায় কেস করেছিল বাবা। পুলিশ ওদের জেরা করে লোক গুলোর বর্ননা শুনে বলেছিল, "আপনি তো ঘরে কালসাপ পুষে ছিলেন মশাই। ছোবল খাবেন এটাই তো স্বাভাবিক।"
উত্তেজিত ভাবে বিভাষ বাবু বলেছিলেন, "আমার মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করে গেল আর আপনি আমাকে কাল সাপ পোষার গল্প শোনাচ্ছেন? ওদের ধরতে পারবেন কীনা বলুন?"
পুলিশ অফিসার বলেছিলেন, "আমরা ফোর্স পাঠাচ্ছি। বোর্ডার সিল করে দিতে বলছি, কিন্তু ওদের ধরা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আপনি যাকে নিত্যানন্দ বলছেন সে আসলে হিজাব নামে একটি জঙ্গি সংগঠের মাথা স্পাইডার, ইন্টারপোল লিস্টে মোষ্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল। ঝিটবেড়ির জঙ্গলে ঘাঁটি গেড়ে থাকা একটি ভারতীয় জঙ্গি সংগঠের সঙ্গে কোলাবোরেশনে ওরা কাজ করছে। কেন্দ্রীয় আধাসেনাও ওদের কাবু করতে পারেনি। এখানে ওরা মুখ্যমন্ত্রীর উপরে হামলা চালাতে এসেছিল, কিন্তু আমাদের তৎপরতায় ব্যর্থ হয়, সেই রাগেই হয়তো..."
হতাস ভাবে বিভাস বাবু বলেছিলেন, "সেই রাগে আমার মেয়ের উপরে অত্যাচার করে যাবে, আপনারা কিচ্ছু করতে পারবেন না?"
পুলিশ অফিসার বলেছিলেন, "আমরা চেষ্টা করছি।"
তারপর আট বছর কেটে গেছে। স্পাইডার আজো ধরা পড়েনি। ভাবনায় চিন্তায় বিভাস বাবুও একদিন স্টোকে চলে গেলেন। ওনার স্ত্রী মানষিক ভারসাম্য হারিয়ে এসাইলামে ভর্তি। একটা হাসি খুশি সুন্দর পরিবার কয়েকটা সন্ত্রাসবাদীর জন্য ধ্বংস হয়ে গেল।
কম্পিউটারের সামনে বসে একটা পোগ্রাম রেডি করছিল অরিন্দম। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং এর স্কলার স্টুডেন্ট অরিন্দম নাকি আজকাল বখে গেছে। চার পাঁচটা কোম্পানীর ভালভাল অফার পেয়েছিল সে। বিদেশে যাওয়ারও সুযোগ এসেছিল কিন্তু সব কিছু ফিরিয়ে দিয়ে বাড়িতে বসে কয়েকজন ব্ল্যাক লিস্টেড বিজ্ঞানীর সঙ্গে যোগাযোগ করে খারাপ কিছু তৈরি করার চেষ্টা করছে। ওর যত যা বন্ধু, আত্মীয় স্বজন ছিল সবাই ওর সঙ্গ ছেড়ে দিয়েছে, ছাড়েনি কেবল একজন, অর্ণব। পুলিশে চাকরি করে সে। পড়াশুনা বেশিদূর করতে পারেনি, তবু বিশ্বাস করে অরিন্দম খারাপ কিছু করতে পারেনা। আজ রুমে ঢুকে দেখল অরিন্দমের মুখ বেশ চিন্তিত লাগছে। ওর পাশে একটা পেপার নামানো, যার প্রথম পাতায় বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা রয়েছে-- "আমেরিকাকে পরমানু বিষ্ফোরনের হুমকি দিলেন উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জন উন।"
অর্ণবকে দেখেই অরিন্দম বলল, "পরমানু বোমা কিভাবে তৈরি হয় জানিস?"
অর্ণব বলল, "ইউরেনিয়াম থেকে তৈরি হয় শুনেছি।"
অরিন্দম বলল, "ইউরেনিয়ামের দুটো আইসোটোপ আছে ইউরেনিয়াম ২৩৫ আর ইউরেনিয়াম ২৩৮, এই ২৩৮ আইসোটোপটাকে মুক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় যা থেকে ২৩৫ আইসোটোপ সংগ্রহ করা হয়।"
অর্নব মাথা নাড়ল। বলল, "বুঝলাম।"
অরিন্দম বলল, "ইউরেনিয়াম ২৩৫ আইসোটোপকে একটি স্বল্প গতি সম্পন্ন নিউট্রন কনিকা দ্বারা আঘাত করলে তা ভেঙ্গে অস্থায়ী আইসোটোপ ইউরেনিয়াম ২৩৬ তৈরি করে, যা আবার ভেঙ্গে বেরিয়াম এবং ক্রেপটন পরমানুতে পরিণত হয় এবং শক্তি উৎপন্ন করে। এরা আবার আরো তিনটি নিউট্রন নির্গত করে যা আরো তিনখানা পরমানুর কেন্দ্রক ভেদ করে সেই তিনটি পরমানু আবার ভেঙ্গে গিয়ে আরো ন'টি নিউট্রন উৎপন্ন করে যা আরো ন'খানা পরমানুর কেন্দ্রক ভেদ করে এইভাবে একটি শৃঙখল বিক্রিয়া বা চেন রি একশন তৈরি হয়, এই পদ্ধতিতে উৎপন্ন শক্তির পরিমান আইনস্টাইনের E=mc2 সূত্র থেকে গননা করা যায়, যেখানে একগ্রাম পরিমান পদার্থ সম্পূর্ন রূপে শক্তিতে পরিনত হলে উৎপন্ন শক্তির পরিমান হয় ১ গুনিত আলোর গতিবেগের স্কোয়ার পরিমান ক্যালরি।"
চোখ বড় বড় করে অরিন্দমের দিকে তাকাল অর্ণব। বলল, "এ তো হিউজ পরিমান শক্তি।"
অরিন্দম মাথা নাড়ল। বলল, "হিউজ তো বটেই। হিরোসিমা আর নাগাসাকি তে দুটো ছোট ছোট পরমানু বোমা ফেলা হয়েছিল, হিরোসিমায় লিটল বয় আর নাগাসাকিতে ফ্যাটম্যান। যার জন্য এই দুটো শহর সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।"
অর্ণব বলল, "কিন্তু তুই এসব ব্যাপার নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছিস কেন? তুইও কি কোনো পরমানু বোমা তৈরির ব্যাপারে গবেষণা করছিস নাকি?"
অরিন্দম বলল, "যদি পারতাম তাহলে করে ফেলতাম, কিন্তু আমার একখানা কম্পিউটার সম্বল যা দিয়ে আর যাইহোক পরমানু বোমা বানানো যায়না।"
অর্ণব মাথা নাড়ল। বলল, "হ্যাঁ, তা ঠিক, কিন্তু এত বছর ধরে এত জটিল জটিল পোগ্রাম লিখে তুই বানাচ্ছিস টা কি?"
অরিন্দম বলল, "একটা ভাইরাস। ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস ভাইরাস, যা দিয়ে আমি যেকোনো ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের ভিতরে ঢুকতে পারি, আর..."
অর্ণব বলল, "আর?"
সুর বদলে অরিন্দম বলল, "গত আটবছর ধরে একটা চিন্তাই আমাকে কুরে কুরে খেয়েছে সেটা হচ্ছে স্পাইডারকে যেভাবে হোক খুঁজে বার করতে হবে, এবং আমার বোনের হত্যার বদলা নিতে হবে। দরকারে পৃথিবীর সব ডিভাইস হ্যাক করব, তবু স্পাইডারকে যেভাবে হোক খুঁজে বার করবই।"
অর্ণব মাথা নাড়ল। বলল, "কিন্তু খুঁজে বার করলেই তো হবেনা, ওর উপরে হামলা চালাতে হলে সেই পরিমান লোকবল দরকার, তাছাড়া আমার মনেহয়না ও আর এই দেশে আছে, ও সম্ভবত পাকিস্থানে, যেখানে গিয়ে হামলা চালানো আমাদের দেশের সেনাদের পক্ষেও সম্ভব নয়।"
হতাস গলায় অরিন্দম বলল, "জানিনা কী হবে? দরকারে নিজের জীবন দেব তবু স্পাইডারকে আমি ছাড়বনা। তুই যদি ওর কোনো খবর পাস আমাকে জানাস।"
মাথা নেড়ে অর্নব চলে গেল। জানালার কাছে এসে দাঁড়াল অরিন্দম। মেঘের ফাঁক দিয়ে দুধেল জ্যোৎস্না ছিটকে এসে বাইরেটাকে ভাসিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, সেদিকে তাকিয়ে দেখতে পেল মাদার গাছের তলায় দাঁড়িয়ে ওর বোন যেন হাত ছানি দিয়ে ওকে ডাকছে।
আজ সকালেই ভাইরাসটা তৈরির কাজ সম্পূর্ণ করল অরিন্দম। এই ভাইরাসই হয়তো পৃথিবীর সব চেয়ে শক্তিশালী ভাইরাস। এবারে সে পারবে, একটা কোনো ক্লু পেলেই স্পাইডারের উপরে হামলা চালাতে পারবে। কেবল আইপি এড্রেস, ইএম আই কোড বা ফোন নাম্বারের মতো এমন একটা কিছু দরকার, যেটা হ্যাক করে সে স্পাইডারের ডিভাইসে ঢুকে পড়তে পারে, কিন্তু ভাইরাসটা কাজ করবে তো? সামান্য কিছু ভুলত্রুটি হলেই কি হবে সেটা চিন্তা করতেই ওর গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। হঠাৎ অর্ণবের ফোন ঢুকল ওর মোবাইলে। অর্ণব বলল, "হ্যালো, অরিন্দম তোকে একটা খবর দেওয়ার আছে।"
অরিন্দম বলল, "হ্যাঁ বল।"
অর্ণব বলল, "স্পাইডারের একটা খোঁজ পাওয়া গেছে। আজ শিশু দিবসে রাষ্ট্রপতির সভায় ওর দলের কয়েকজন হামলা চালাতে এসেছিল, যাদের একজন কে আমরা ধরেছি। তাকে জেরা করে জানা গেছে দক্ষিণ চিন সাগরে একটা পুরো দ্বীপ কে দখল করে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চালাচ্ছে স্পাইডার আর চিন ওকে সাহায্য করছে।"
অরিন্দমের চোখ চক চক করে উঠল। বলল, "আর কিছু পাওয়া যায়নি?"
অর্ণব বলল, "একটা ফোন নাম্বার পাওয়া গেছে, যেটা স্পাইডারের বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।"
উৎফুল্ল ভাবে অরিন্দম বলল, "ফোন নাম্বারটা বল আমাকে," অর্ণব ফোন নাম্বারটা দিতেই বলল, "থ্যাঙ্ক ইউ ভাই। তুই আমার যে উপকার করলি, তা আমি মরার পরেও ভুলবনা।"
অর্ণব জিজ্ঞেস করল, "কি করতে চাইছিস তুই?"
অরিন্দম বলল, "কাল সকাল হলেই দেখতে পাবি।"
সকাল বেলায় ওসির কল ঢুকল অর্ণবের মোবাইলে। আজ ওর ডিউটি ছিলনা। ভেবেছিল একটু বেলা পর্যন্ত ঘুমোবে হঠাৎ এভাবে কল পেতে সে বেশ বিরক্তই হল। ফোন ধরে "হ্যালো" বলতেই ওপাশ থেকে ওসি বললেন, "হ্যালো অর্ণব একটা জরুরি দরকারে তোমাকে ফোন করলাম। তুমি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার অরিন্দম মুখার্জী কে চিনতে তাই না?"
অর্ণব বলল, "হ্যাঁ স্যার ও আমার বন্ধু। কেন কি হয়েছে?"
ওসি বললেন, "কাল রাতে ও মারা গেছে।"
অর্ণব আঁতকে উঠল। বলল, "কিভাবে স্যার?"
ওসি বললেন, "প্রবল বিষ্ফোরণ ঘটেছিল ওর ঘরে। ঘরের ভিতরে যা কিছু ছিল সব ছাই হয়ে গেছে। আশ্চর্যের ব্যাপার ঘরে কোনো বিষ্ফোরক দ্রব্যের সন্ধান পাওয়া যায়নি। ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা অনুমান করছেন সম্ভবত ওর রুমের কম্পিউটার থেকেই এই বিষ্ফোরণ ঘটেছে। কিন্তু কম্পিউটার বাস্ট করলেও এত বড় বিষ্ফোরণ হবে এটা ঠিক বিশ্বাস হয়না। তুমি একবার এসো, তুমি ওর বন্ধু ছিলে যদি কোনো ব্যাপারে আলোকপাত করতে পারো।"
ড্রেস চেঞ্জ করে রেডি হয়ে গেল অর্ণব। বাইরে বেরিয়ে আসার সময় দেখতে পেল ওর বাবা চেয়ারে বসে টিভি দেখছেন। সকালে টিভিতে খবর দেখা অর্নবের বাবার অভ্যেস। রিটায়ার মানুষ উনি। সারাদিনে কাজ নেই, তাই টিভি দেখেই খানিকটা সময় কাটান। অর্ণব কে দেখে বললেন, "কোথাও বেরুচ্ছ?"
অর্ণব বলল, "হ্যাঁ বাবা, ওসি কল করেছেন একবার থানায় যেতে হবে।"
বাবা বললেন, "একটু দাঁড়িয়ে যাও। এই খবরটা একটু দেখে যাও।"
বিরক্ত ভাবে টিভির দিকে তাকাল অর্ণব। হঠাৎ একটা খবরে ওর চোখ আটকে গেল--
"নমষ্কার এই মুহূর্তের বিশেষ খবর হল কাল রাতে দক্ষিণ চিন সাগরের চে ইয়ান নামে একটি দ্বীপ প্রবল ভূমিকম্পে কেঁপে উঠে জলের তলায় ডুবে গেছে। গোপন সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী এই দ্বীপে হিজাব নামে একটি জঙ্গি সংগঠন চিনের মদতে ডেরা বেঁধে ছিল। এই ভূমিকম্পের কারণ স্পষ্ট ভাবে কিছু জানা যায়নি। চিনের দাবি আমেরিকা দ্বীপটার উপরে মিশাইল হানা চালিয়েছে। দ্বীপে থাকা প্রায় সমস্ত লোকই মৃত। কেবল একজনকেই মাত্র জীবিত অবস্থায় পাওয়া গেছে, কিন্তু তার মানষিক ভারসাম্যের অভাব আছে বলে তার বয়ানকে কেউ গুরুত্ব দিচ্ছেনা। আমাদের প্রতিনিধি সরাসরি ওই ব্যক্তির কাছে চলে যাচ্ছেন..."
ক্যামেরাটা এখন এক ছাগুলে দাঁড়ি ওয়ালা ভদ্রলোকের দিকে তাক করা। সংবাদ সংস্থার প্রতিনিধি জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার নাম?"
ভদ্রলোক বললেন, "নাম, নাম আমার নাম ইয়াং চু।"
প্রতিনিধি জিজ্ঞেস করলেন, "কি করেন আপনি?
ইয়াং চু বললেন, "আমি আমি জেলের কাজ করি। কাল রাতে আমার নৌকা নিয়ে আমি পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম তারপর এই দ্বীপে এসে আশ্রয় নিয়েছিলাম।"
প্রতিনিধি জিজ্ঞেস করলেন, "কাল রাতে আপনি কি দেখেছিলেন আমাদের বলুন?"
ইয়াং চু বললেন, "কাল রাতে দেখলাম, কি দেখলাম? ও হ্যাঁ বিকট ভয়ানক জিনিস। দেখলাম এখানে অনেক রাইফেল ধারী লোক কানে ফোন নিয়ে কথা বলতে বলতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, হঠাৎ ফোন গুলো সব একে একে বাস্ট করতে শুরু করল, কাছে থাকা একটা বাড়িও বাস্ট করে উড়ে গেল। আমি ভয়পেয়ে আমার নৌকায় গিয়ে লুকিয়ে পড়েছিলাম তখনই একটা বিরাট বিষ্ফোরণ হল, তারপর দ্বীপটা জলের তলায় ডুবে গেল। আমি কিছু দেখিনি, কিছু দেখিনি।"
ইয়াং চু ছুটে পালিয়ে গেলেন। সংবাদ সংস্থার প্রতিনিধি বললেন, "আপনাদের দেখালাম এক মানষিক ভারসাম্যহীন প্রতক্ষ্যদর্শীর বিবরন অনুযায়ী কিভাবে এই দ্বীপে ধ্বংস হয়, তবে চীনা পুলিশ এসেছে, ফরেন্সিক টেস্ট চালাচ্ছে দেখা যাক ওরা কি রিপোর্ট দেয়। সঙ্গে থাকুন। দেখতে থাকুন।"
ফস করে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল অর্ণব। এই কাজ অরিন্দম ছাড়া আর কারুর নয়, সে ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করছিল, সম্ভবত এমন কোনো ভাইরাস আবিষ্কার করে ফেলেছিল যা যেকোনো  ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইসে চেন রিএকশন শুরু করতে পারে, কাল বিকেলে ওর কাছ থেকে ফোন নাম্বারটা পাওয়ার পরে হ্যাক করে ঢুকে পড়েছিল স্পাইডারের ফোনের নেটওয়ার্কে তারপরেই বুম...!! দরজার দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় অর্ণবের চোখ দুটো জলে ভিজে উঠেল। ফিসফিস করে বলল, "তুই পেরেছিস অরিন্দম। নিজের জীবন দিয়ে শুধু তোর নয় এই দেশের একজন শত্রুকে বিনাশ করতে পেরেছিস..."
(সমাপ্ত)

©All rights reserved to sankha subhra nayak


রবিবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

কো-ইন্সিডেন্ট

কো-ইন্সিডেন্ট

শঙখ শুভ্র নায়ক



গত কয়েকদিন ধরে স্ত্রীর প্রতি আমার অবিশ্বাস ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে। সেদিন অফিস থেকে ফিরে আমি দরজা খুলতে যাব হঠাৎ শুনতে পেলাম সে ভিতরে কারু সঙ্গে কথা বলছে। দরজা খুলতেই দেখলাম সে তাড়াহুড়ো করে কানে ফোনটা নিয়ে বলল, "আচ্ছা সোমা, এখন রাখছি পরে কথা হবে।"

আর একদিন গাড়িতে যেতে যেতে ও ফিসফিস করতে আরম্ভ করল। আমি যাতে শুনতে না পাই তেমনই মৃদু স্বরে। আমার সত্যিই সন্দেহ হচ্ছে। না, আমার স্ত্রী পরকীয়ার জড়িয়ে পড়েছে এমন সন্দেহ আমার নেই। সেটা হলেও আমার খুব দুঃখ ছিলনা। আমার সন্দেহ হচ্ছে ওর ফোনের উল্টো পাশে সত্যিই কেউ থাকে তো? নাকি ও কাল্পনিক কারুর সঙ্গে কথা বলে, যার অস্তিত্ব এই পৃথিবীতে নেই।

আমি অভিক, অভিক বসু। বর্তমানে ইন্ডিয়ার মোস্ট ফেমাস অনলাইন ফিকশন রাইটারদের একজন। আমার লেখা প্রতিটা বই অন লাইনে যথেষ্ট বিজনেস করে। সেই হিসেবে আমার ফ্যান সংখ্যাও অজস্র। মেয়ে ফ্যানও আমার কম নেই। অনেকেই আমাকে ফোন করে কথা বলে। ফেসবুকে হোক কিম্বা হোয়াটস আপে অনেক মেয়েই আমাকে মেসেজ করে। মেসেজ ফেলে রাখার হ্যাবিট আমার নেই বলে মেসেজ রিপ্লাই করি। সেসব দেখলে ওর খারাপ লাগে বুঝতে পারি, কিন্তু ফ্যান ফলোয়িং ধরে রাখার স্বার্থে খারাপ ব্যবহার করা আমার চলেনা। যাইহোক রিসেন্ট তন্দ্রিমা নামে একটা মেয়ের সঙ্গে আমার একটু বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। এমন নয় যে ওর সঙ্গে আমার অন্য কিছু রিলেশন ছিল, কিন্তু ব্যবসায়ীক স্বার্থের কথা ভেবে আমাকে ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখতে হয়েছে। সেটা নিয়ে বেশ কয়েকদিন ধরেই রুমকির সঙ্গে আমার একটু চাপা ঝগড়া চলছিল। হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন রুমকিই আমার স্ত্রী। ওকে বার বার বোঝানোর চেষ্টা করেছি এসব ব্যাপারগুলো স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে, কিন্তু যদি কেউ বুঝবনা বলে গোঁ ধরে বসে থাকে তাকে কিভাবে বোঝানো যাবে আমি জানিনা। সেদিন ওর সঙ্গে গাড়িতে করে একটা সেমিনার এটেন্ড করতে যাচ্ছিলাম। ইদানিং সন্দেহের জন্য রুমকি আমাকে কোথাও একা ছাড়তে চায়না, যেখানেই যাই ওকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হয়। যাওয়ার পথেই তন্দ্রিমার ফোন ঢুকল আমার মোবাইলে, তারপর রুমকি এমন ভাবে আমার সঙ্গে ঝগড়া করতে শুরু করল যে ওকে থামানো গেলনা। মাঝ রাস্তায় আমার গাড়ির হ্যান্ডেল ধরে এমন একটা হ্যাঁচকা টান মারল যে গাড়িটা নিয়ন্ত্রন হারিয়ে সোজা গিয়ে একটা গাছে ধাক্কা মারল, আমার মাথা ফেটে গিয়েছিল কিন্তু চোট বেশি রুমকিই পেয়েছিল, তারপর থেকেই রুমকি কেমন বদলে গিয়েছে। আজ অফিস থেকে ফিরে দরজার সামনে আমি থমকে দাঁড়ালাম। শুনতে পেলাম ভিতরে রুমকি কাউকে বলছে, "নীল প্লিজ, বোঝার চেষ্টা করো আমি বিবাহিত। আমার পক্ষে তোমার সঙ্গে ওই সব সম্পর্ক করা সম্ভব নয়। তুমি আমার শরীর দেখতে চেয়েছিলে দেখিয়েছি, তার বেশি নয়, প্লিজ...!"

দরজায় টোকা দিয়ে আমি রুমে ঢুকলাম। বেশ কয়েকদিন রুমকি আমার উপরে সন্দেহ করে ঝগড়া করেনি, এতে আমি অনেকটাই শান্তিতে ছিলাম, কিন্তু ব্যাপারটা কিছুটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যাচ্ছে দেখে আমি রাশ টানতে বাধ্য হলাম। রুমকিকে ডেকে বললাম, "তোমার কাছে পরিষ্কার ভাবে আমি একটা কথা জানতে চাই।"

রুমকি বলল, "হ্যা বলো?"

বললাম, "তুমি যার সঙ্গে সারাদিন কথা বলো সে কে?"

রুমকি অবাক হল, "আমি সারাদিন কথা বলি তুমি কিভাবে জানলে? তুমি কি আমার পিছনে ডিটেকটিভ লাগিয়েছো নাকি?"

বললাম, "যেভাবেই জানি, তুমি কিন্তু ভুল করছ রুমকি, খুব বড়ো ভুল।"

রুমকি অবাক হল, "তুমি অন্য মেয়ের সঙ্গে কথা বললে সেটা ভুল নয় আমি বললেই ভুল।"

বললাম, "সেটা নয় রুমকি। তুমি যদি ফোনে অন্য ছেলের সঙ্গে টাইম পাস করতে তাতে আমার এতটুকুও দুঃখ ছিলনা, কিন্তু তুমি যে কারো সঙ্গে ফোনে কথা বলছনা, আর এটা আমাকে লুকোবার চেষ্টা করছ, সেটা দেখেই খারাপ লাগছে।"

রুমকি চমকে উঠল, "তুমি কিভাবে জানলে আমি ফোনে কথা বলিনা? তুমি আমার রুমে স্পাইক্যাম লাগিয়েছ?"

বললাম, "হ্যাঁ লাগিয়েছি। লাগাতে বাধ্য হয়েছি, কারন আমার বেশ কয়েকদিন ধরেই সন্দেহ হচ্ছিল তুমি মেন্টাল ইলনেসে ভুগছ, দ্যাটস হোয়াই তোমার উপরে নজর রাখতে আমি বাধ্য হয়েছি।"

রুমকি রেগে গেল, "হোয়াট ডু ইউ মিন? আমি একটা পাগল? হাও দ্যা হেল আর ইউ। তুমি আমার উপরে স্পাই করছ, দেন আমাকেই উপদেশ দিচ্ছ।"

ঠান্ডা মাথায় বললাম, "দেখ রুমকি তুমি যেভাবে সারাদিন নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলো দ্যাট ইজ নট নর্মাল। তোমার এই মুহূর্তে একজন সাইকোলজিস্টের প্রয়োজন।"

রুমকি বলল, "আমি নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলিনা, আমি নীলের সঙ্গে কথা বলি। হি লাভস মি ভেরি মাচ।"

বললাম, "হাউ ইজ ইট পসিবল? কোনো ফোন ছাড়াই কিভাবে তুমি ওর সঙ্গে কথা বলো?"

রুমকি বলল, "আমার এক্সিডেন্ট হওয়ার পর থেকে আমি নীলের ব্রেনের সঙ্গে নিজের ব্রেনটাকে কানেক্ট করতে পারি, ওর কথা শুনতে পাই, ও কি করছে দেখতে পাই, এমনকি ওর কোনো কষ্ট হলে আমি সেটাও অনুভব করতে পারি, তাই ওর সঙ্গে কথা বলার জন্য আমার কোনো ইনস্ট্রুমেন্টেরই দরকার হয়না।"

বললাম, "আচ্ছা, তোমার কথা যদি সত্যি হয় তাহলে তুমি এক্ষুনি ওর ফোন নাম্বার চাও। আমি দেখতে চাই নীল নামে কোনো ছেলের অস্তিত্ব এই পৃথিবীতে আছে।"

রুমকি বলল, "তোমার সামনে বসে ওর সঙ্গে নিজের ব্রেনটাকে কানেক্ট করলে ও তোমাকেও দেখতে পাবে। তখন কথা বলতে চাইবে কীনা সন্দেহ আছে..."

বললাম, "আচ্ছা, আমি তাহলে পাশের রুমে থাকছি।"

আমি রুম থেকে বেরিয়ে পাশের রুমে চলে গেলাম। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শুনতে পেলাম, "ডার্লিং নীল। তোমার ফোন নাম্বারটা দাও তো প্লিজ। আমি একবার ফোনে তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই... কী বলছ? তোমার ফোন নাম্বার নেই?... ইজ ইট পসিবল? তোমার কোনো ফোনই নেই? না ডার্লিং, আমার মনেহচ্ছে তুমি লুকোচ্ছ... ও আচ্ছা, পড়াশুনার ক্ষতি হবে বলে তুমি ফোন রাখোনা... আচ্ছা, ঠিক আছে, তোমার সঙ্গে পরে কথা বলছি, আমার হাজবেন্ড বাথরুম থেকে আসছে..."

পাশের রুম থেকে বেরিয়ে আমি রুমকির কাছে এলাম। ওর পিঠে হাত রেখে বললাম, "প্লিজ সুইটহার্ট বোঝার চেষ্টা করো। ও তোমাকে ফোন নাম্বার দিতে পারলনা কারন তোমার নীল নামে কোনো প্রেমিকের অস্তিত্ব এই পৃথিবীতে নেই, গোটাটাই তোমার অবচেতন মস্তিষ্কের কল্পনা মাত্র। আমার উপরে রাগ করে তুমি অন্য কারো সঙ্গে রিলেশন করলে আমার দুঃখ ছিলনা, কিন্তু তুমি এভাবে নিজের কল্পনার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিজের ক্ষতি করছ দেখে আমার খুব খারাপ লাগছে।"

রুমকি মাথা নাড়ল। এই শকটার পরে ও অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠেছিল। আমিও যতটা সম্ভব ওর খেয়াল রাখার চেষ্টা করতাম, ওকেও দেখতাম আর নিজের সঙ্গে নিজে সেভাবে কথা বলতনা, কেবল মাঝে একবার কলকাতার একটা ঠিকানা দিয়ে বলেছিল এই ঠিকানায় নীল নামে কোনো ছেলে থাকে কীনা খোঁজ নিতে পারবে, কিন্তু রুমকি সুস্থ হয়ে উঠছে দেখে আমার আর ওই ঠিকানায় খোজ নেওয়ার মানষিকতা হয়নি।

সেদিন আমার বার্থ ডে ছিল। আমাদের শহরের বেশ কয়েকজন সম্মানীয় অতিথিকে নিমন্ত্রন করেছিলাম। আমাদের সার্কেলের সুপারিন্টেনডেন্ট অফ পুলিশও তাদের মধ্যে ছিলেন। কথার ফাঁকে হঠাৎ রুমকি উঠে বাথরুমে গেল। তার খানিকক্ষণ পরেই বাথরুমের ভিতর থেকে রুমকির ভীষন চিৎকারের শব্দ শুনতে পেলাম। বাথরুমের দরজা ভেঙ্গে রুমকিকে যখন বার করেছিলাম, তখন ও প্রায় জ্ঞান হারিয়ে বিড়বিড় করছে, ওর কথার একটা শব্দই বুঝতে পেরেছিলাম 'ট্রাক আসছে'। হাস্পাতালে পৌঁছানোর আগেই রুমকি মারা গিয়েছিল। পোষ্ট মর্টেমের পর ডাক্তার বাবু বলেছিলেন, কোনো কিছু দেখে ভীষন আতঙ্কে ওর হার্ট ফেল করেছে। ওর মানষিক অসুস্থতা ছাড়া আতঙ্কের অন্য কোন কারন আমি বাথরুমের ভিতরে খুঁজে পাইনি।

অনেকদিন পরে একটা সেমিনার এটেন্ড করতে আমি কলকাতায় এলাম। আজ আমার সঙ্গে আর রুমকি নেই, তবে ওই দুঃসময়ের পরেও তন্দ্রিমা আমার হাত ছেড়ে দেয়নি, সে সেদিনও যেমন আমার বন্ধু ছিল আজো তাই আছে। সেমিনার শেষ করে হোটেলে ফেরার পথে হঠাৎ রুমকির দেওয়া ঠিকানাটা আমার মনেপড়ে গেল। তন্দ্রিমাকে নিয়ে খুঁজতে খুঁজতে আমি ওই ঠিকানায় গিয়ে পৌঁছালাম। দরজায় কড়া নাড়তেই এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক এসে দরজা খুললেন। আমাদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বললেন, "কাকে চাই?"

বললাম, "আচ্ছা এই ঠিকানায় নীল নামে কোনো ছেলে থাকে কি?"

ভদ্রলোক বেশ খানিকক্ষণ আমাদের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, "আপনারা ওর কে হন?"

বললাম, "কেউ হইনা, আসলে ওর সঙ্গে আমার একবার পরিচয় হয়েছিল, তখনই ওর কাছে এই ঠিকানাটা পেয়েছিলাম। ও কি আছে? ডেকে দিতে পারবেন একবার?"

ধীর গলায় ভদ্রলোক বললেন, "ওকে তো আর আপনারা পাবেন না।"

বললাম, "কেন? ও কি এখন এখান থেকে অন্য কোথাও চলে গেছে?"

মাথা নেড়ে ভদ্রলোক বললেন, "না। গত বছর উনত্রিশে ডিসেম্বর সন্ধ্যে ছ'টার সময় অন্যমনষ্ক ভাবে পথ চলতে গিয়ে ট্রাকের তলায় চাপা পড়ে সে মারা গেছে।"

কথাটা শুনে আমার গোটা শরীর শিউরে উঠল। রুমকির মৃত্যুর সময়টাও আমার স্পষ্ট মনে আছে, উনত্রিশে ডিসেম্বর, সন্ধ্যে ছ'টা।

(সমাপ্ত)


শুক্রবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

আলোয় ফেরা

আলোয় ফেরা

শঙখ শুভ্র নায়ক



ক্যাঁচ করে ব্রেক কষে গাড়িটা থামাল মানালি। গাড়ির সামনে হঠাৎ একটা লোক চলে এসেছিল। সামনের ইঞ্জিনে ধাক্কা লেগে মাটিতে পড়ে গেছে। হেড লাইটের আলোয় লোকটার বিভৎস মুখ খানা এক ঝলক দেখেই সে শিউরে উঠেছিল। যেন এক খানা কঙ্কাল তার বিভৎস মুখ নিয়ে গাড়ির সামনে লাফিয়ে পড়েছে। ওর হাত পা থর থর করে কাঁপছিল। ভাবছিল আজ থেকে কয়েকদিন আগে হয়তো ওকে দেখেও লোকে ঠিক এভাবেই শিউরে উঠত।
মেঘের ফাঁক দিয়ে সেদিন মাটির বুকে ছলকে ছলকে পড়ছিল রোদ। মাথায় ওড়না জড়িয়ে এভারগ্রিন রোডে একুশ নম্বর বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল মানালি। হঠাৎ একটা বাইক এসে দাঁড়িয়েছিল ওর সামনে। বাইক আরোহীর মুখ হেলমেটে ঢাকা ছিল, আর পিছনের ছেলেটার মুখ রুমালে ঢাকা। ওর দিকে হিমশীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে পিছনের ছেলেটা একটা বোতল বার করে ছিল। তারপর একটা তরল পদার্থ ছুঁড়ে মেরেছিল ওর মুখে। চিৎকার করে মাটিতে আছড়ে পড়েছিল মানালি। অসহ্য যন্ত্রনায় ছটপট করতে করতে বুঝেছিল কেউ বা কারা ওকে তুলে হাস্পাতালে নিয়ে যাচ্ছে। প্রায় একমাস হাস্পাতালে পড়েছিল মানালি। এর মাঝখানে পুলিশ এসেছিল। বেশ কয়েকবার জিজ্ঞাসাবাদ করে গ্রেফতার করেছিল বিজয় নামে একটি ছেলেকে। কলেজ ইউনিউনের নেতা ছিল সে। ওর পিছনে লাগত। কয়েকবার ওকে ছোঁয়ার চেষ্টাও করেছে। সেসব সযত্নে এড়িয়ে গিয়েছে মানালি কিন্তু অরিত্রর সঙ্গে ওর সম্বন্ধ হবার পর থেকেই খানিকটা যেন পাগলা কুকুরের মতো হয়ে গিয়েছিল বিজয়, অবশেষে একটা সুযোগ পেতেই আক্রমণ শানিয়ে দেয়। মুখে ছুঁড়ে দেয় মিউরিয়েটিক এসিডের মতো বিষাক্ত কোনো এসিড।
হাস্পাতাল থেকে বেরিয়ে আসার পরে মানালি দেখেছিল ওর জীবনটা পুরো বদলে গেছে। অনেকেই ওকে সান্তনা দিতে আসছিল। ওর কলেজের কয়েকটা বান্ধবী একবার করে ওর সঙ্গে দেখা করেছিল। কিন্তু অরিত্র? যার জন্য সে বার বার বিজয়কে অগ্রাহ্য করেছে, তার কোনো দেখা পাওয়া যায়নি। একবার শুধু ফোন করে অরিত্র বলেছিল, "আমি লণ্ডনে চলে যাচ্ছি মানালি, তুমি আশা হারিওনা। আমি আবার ফিরে আসব।"
ফিরে পাওয়ার মতো কিছুই ছিলনা মানালির কাছে। সে জানত সামনের লড়াইটা বেশ কঠিন, একা একাই ওকে সেই লড়াই লড়তে হবে। অবশেষে থানা কোর্ট করে প্রায় দু'বছর দৌড়াদৌড়ি করার পরে কোর্ট বিজয় কে পাঁচ বছরের জেলের সাজা শোনায়। আর পারছিলনা মানালি। সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। মিশরীয় সভ্যতার পিরামিডের ভিতরের অন্ধকারে শুয়ে থাকা এক খানা মমির মতো লাগত নিজেকে। তাই হায়ার কোর্টে এপ্লাই করার ইচ্ছে হয়নি। দেখতে দেখতে সময় কেটে যাচ্ছিল। সোসাল সাইটে সান্তনা দেওয়ার অনেক লোক পাচ্ছিল সে, তাদের মধ্যেই একজন শুভানুধ্যায়ী ওকে জানিয়েছিল লণ্ডনে গিয়ে অরিত্র নাকি বিয়ে করেছে। ওর চেয়ে বছর পনেরোর বড়ো একজন ডাক্টার কে। খারাপ লেগেছিল একটু, কিন্তু মুখ ফুটে সেকথা কাউকে জানায়নি মানালি। দেখতে দেখতে পাঁচ বছর কেটে গেল। সাড়ে চারবছর জেল খাটার পরে মুক্তি পেয়েছে বিজয়। ওর মুক্তির খবর পেপারে টিভিতে বেরিয়েছিল। বিছানায় শুয়ে শুয়ে মানালি ভাবছিল বিজয় হয়তো সাড়ে চারবছর শাস্তি পেল কিন্তু ওর তো সারা জীবনটাই নষ্ট করে দিয়ে গেল সে। যে যন্ত্রনায় প্রতি মুহূর্তে মানালি দগ্ধে যাচ্ছে সেই যন্ত্রনা কি এক মুহূর্তের জন্যও টের পেয়েছে বিজয়? হঠাতই ওর মোবাইলে একটা আননোন নম্বর থেকে কল এল। একসেপ্ট করবনা করবনা ভেবে ফোনটা একসেপ্ট করেই নিল মানালি। "হ্যালো", বলতেই ওপাশ থেকে একটা পুরুষালি কষ্ঠস্বর বলল, "হ্যালো মানালি, আমি অরিত্র বলছি, আমি কলকাতাতে ফিরেছি, তুমি প্লিজ আমার সঙ্গে একবার দেখা করতে পারবে?"
মানালি থমকে গেল। এতদিন পরে ওর খবর নেওয়ার সময় হল অরিত্রর? তাউ নিজে ওর বাড়িতে আসতে পারছেনা, ওকে যেতে বলছে? ভীষণ রাগ হল মানালির। বলল, "না, আমি যেতে পারবনা।"
অরিত্র বলল, "প্লিজ, কাল একবার লিংকন এপার্টমেন্টে এসে দেখা করো। অনেক কষ্ট করে তোমার প্রবলেমের রিমেডি আমি জোগাড় করে এনেছি।"
মানালি অবাক হল। বলল, "আমার কোন প্রবলেমের রিমেডি তুমি জোগাড় করেছ?"
অরিত্র বলল, "এলেই দেখতে পাবে।"
পরদিন সকালে খানিকটা দোনামনা করে লিংকন এপার্টমেন্টে চলে গেল মানালি। মেনলি বিদেশীদের থাকার জন্যই এই এপার্টমেন্ট টা বানানো হয়েছে। অরিত্র এখানে কেন উঠেছে কে জানে? দরজার কাছে গিয়ে কলিংবেল টিপতেই ভিতর থেকে এক ভদ্রমহিলার কষ্টস্বর শুনতে পেল। স্পষ্ট ইংরেজিতে উনি বললেন, "দরজা খোলা আছে, ভিতরে ঢুকে পড়ুন।"
দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল মানালি। সামনেই এক ভদ্রমহিলা কে দেখে চমকে উঠল। ভদ্রমহিলা বিদেশী। পঁয়তাল্লিশের মতো বয়স। শীর্ণকায় শরীর। একটা চেয়ারের উপরে ভদ্রমহিলা বসে আছেন। এঁর ছবি পেপারে বেশ কয়েকবার দেখেছে মানালি। ভদ্রমহিলা নাম এনা হার্টওয়ে। ইংলন্ডের বিখ্যাত এক প্লাস্টিক সার্জেন। টিসু কালচার নিয়ে ওনার গবেষনা বিশ্ববিখ্যাত। উনি দীর্ঘদিন কিছু একটা গোপন গবেষনায় যুক্ত ছিলেন। বাথরুমের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে অরিত্র বলল, "তুমি এসেছ?"
মানালি বলল, "হ্যাঁ, এসেছি, কেন ডেকেছিলে বলো?"
অরিত্র বলল, "কেন ডেকেছি সেটা ম্যাডাম তোমাকে বলবেন।"
মাথা নেড়ে এনার দিকে তাকাল মানালি। এনা বললেন, "সাত বছর আগে তোমার বন্ধু আমার কাছে এসেছিল এসিডে ৯৯% পোড়া একটা ফেসকে কিভাবে আবার আগের মতো নিঁখুত বানানো যায় সেই আর্জি নিয়ে। আমি ওকে বার বার ফিরিয়ে দিই, কিন্তু শেষে আর পারিনি। তোমার বন্ধুর আর্জি মেনে গত পাঁচ বছর ধরে ডিএনএ চেঞ্জ নিয়ে গবেষণা করেছি, এবং অবশেষে এমন একটা আবিষ্কার করেছি, যার ফলে তোমার ফেসটাকে আবার আগের মতো বানানো যাবে?"
অবাক ভাবে অরিত্রর দিকে তাকাল মানালি। বলল, "আমি আবার আগের মতো দেখতে হয়ে যাব?"
এনা বললেন, "না, পুরোপুরি আগের মতো হবেনা, তবে দেখতে খারাপ লাগবেনা তোমাকে।"
মানালি বলল, "কিন্তু কিভাবে? আমি আজ পর্যন্ত যতজন প্লাস্টিক সার্জেনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি প্রত্যেকে আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে।"
এনা বললেন, "প্রশেষটা একটু জটিল। কিন্তু অসম্ভব নয়। তোমার সেম ব্লাডগ্রুপের কোনো একজন জীবিত মানুষের মুখের চামড়া জোগাড় করতে হবে তোমাকে, যেটা কালচার করে আমি ডিএনএ চেঞ্জ করে তোমার মুখের সঙ্গে সেট করে দিতে পারব।"
হতাস ভাবে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মানালি। বলল, "আমার সেম ব্লাডগ্রুপের কোনো একজন জীবিত মানুষ তার মুখের চামড়া আমাকে দেবে কেন?"
অরিত্র বলল, "দেবেনা, কিন্তু ছিনিয়ে নিতে হবে।"
মানালি ভ্যাবাচ্যাকা খেল। বলল, "মানে?"
ফিসফিস করে অরিত্র বলল, "ওটাই তো সাসপেন্স।"
গত সাতদিন হল অপারেশন হয়েছে মানালির। দেখতে সে অনেকটাই পালটে গেছে। কিন্তু অনেক সুন্দরী হয়েছে দেখতে। ওর মুখের সঙ্গে ম্যাচিং কোনো মেয়ের চামড়া পাওয়া যায়নি, একখানা পুরুষের চামড়াকে কালচার করে মুখে সেট করতে হয়েছে। তাতে অবশ্য মুখের কোমলতা একটুও হ্রাস পায়নি। যেটুকু কাঠিন্য আছে সেটুকু কিছুদিন গেলেই ঠিক হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন এনা। অবশ্য এই চামড়া জোগাড়ের কাজটা সহজ হয়নি, একজন লোককে ইনজেকশন দিয়ে অজ্ঞান করে নিয়ে আসা হয়েছিল এনার কাছে। উনি সযত্নে তার মুখের চামড়াটা তুলে নিয়ে কালচার করে মানালির মুখে সেট করে দিয়েছেন, এবং ফিরে গেছেন ইংলন্ডে। কাজটা করার পরে খানিকটা অপরাধ বোধে ভুগছিলেন উনি, অরিত্র বুঝিয়ে সুঝিয়ে ওনাকে ঠিক করেছে। তবে এনার সঙ্গে আর ইংলন্ডে ফিরে যায়নি অরিত্র, সে থেকে গেছে এদেশেই। মানালি ওকে মেনে নিয়েছে।
বেশ কয়েকটা দিন অরিত্রর সঙ্গে কাটিয়ে আজ আবার বাড়ি ফিরছিল মানালি, ফেরার পথেই এক্সিডেন্টটা হল। এখোনো হাত দুটো থর থর করে কাঁপছে মানালির। এটাই সেই লোক, যার মুখের চামড়া তুলে মানালির মুখে সাঁটা হয়েছিল। লোকটা অন্যকেউ নয়, বিজয়। যে একদিন ওর মুখে এসিড ছুঁড়ে মেরেছিল। মানালি চিৎকার করল, "আপনি ঠিক আছেন তো?"
গাড়ির সামনে থেকে গা ঝাড়তে ঝাড়তে বিজয় উঠে এল। এক্সিডেন্টে ওর কোনো ক্ষতি হয়নি। বলল, "গাড়ি থামালেন কেন ম্যাডাম? চালিয়ে দিয়ে আমাকে মেরে ফেলতে পারলেন না? এই যন্ত্রনা নিয়ে আমি যে আর বেঁচে থাকতে পারছিনা।"
মানালি হাসল। বলল, "মরে গেলে তো তুমি তোমার অপরাধের সঠিক সাজা পেতেনা। তুমি সারা জীবন ধরে দগ্ধাবে, কিন্তু মরতে পারবেনা, এই তোমার অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি।"
বিজয় চিৎকার করে উঠল, "কে? কে আপনি?"
উত্তর না দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দিল মানালি। এক্ষুনি ওকে বাড়ি ফিরতে হবে। অনেকদিন ওর মা বাবা ওর মুখ দেখেনি। এতদিন নিজেকে অন্ধকারের কোনো এক বিভৎস জীব মনেহত মানালির, যার মুখের দিকে তাকালেই মা বাবার মুখে নিরাশা ফুটে উঠতে দেখত, আজ সে আবার আলোয় ফিরতে পেরেছে। এবারে হয়তো এক চিলতে হাসি ফুটে উঠতে দেখবে তাদের মুখে।
(সমাপ্ত)

বিষাক্ত শরীর

বিষাক্ত শরীর

শঙখ শুভ্র নায়ক




ঠাকুর্দা ধাঁধা বলতেন,
"আট পা ষোল হাঁটু,
মাছ ধরতে যায় লাটু,
আকাশেতে পেতে জাল,
মাছ ধরে চিরকাল।'-- বলোতো কি?"
ঠাকুর্দার কোলে বসে পারমিতা ভাবত। আকাশ মানে তো শূন্যতা। ওখানে মেঘেদের বাড়ি। অনেক ধুলোবালি ওখানে উড়ে বেড়ায়। পাখিরা উড়ে, পতঙ্গরা ওড়ে। ঠাকুর্দা মারা যাওয়ার পরে মা বলত ঠাকুর্দা নাকি আকাশের তারা হয়ে গিয়েছে। সেই আকাশের বুকে জাল ফেলে মাছ ধরে কে? সে কি ভগবান? ফোকলা দাঁতে ঠাকুর্দা হেসে বলতেন, "না দাদু ভাই, ওরা মাকড়সা।"
"মাকড়সা!" হেসে উঠত পারমিতা, "আটটা পা আর ষোলটা হাঁটু। ইস! আমি ভাবছিলাম ভগবান!"
পারমিতা হাসত। কিন্তু ওর মনের কোনো গোপন কোনে আস্তে আস্তে ভগবানের আরেক প্রতিচ্ছবি রূপে মাকড়সারা জাল বুনছিল। যখন একটু বড় হল ওর শখই হয়ে গিয়েছিল মাকড়সা ধরা। অজস্র মাকড়সাদের ধরে ধরে কৌটোর ভিতরে বন্দী করে রাখত। জুওলজি নিয়ে গ্রেজুয়েশন পাস করার পরে এই হবি আরো বেড়ে গেল। ওদের বাড়ির কোনার দিকে একটা হলঘরকে মাকড়সাদের চিড়িয়াখানা বানিয়ে ফেলল। দেশ বিদেশের অজস্র মাকড়সা কালেকশন করত পারমিতা। কৌটোর ভিতরে রেখে বাইরে মাকড়সার নাম আর সায়েন্টিফিক নাম সহ লেবেল সেঁটে দিত। যে সব প্রজাতির নাম এখোনো জানা যায়নি তাদের নাম রাখত নিজেই। বান্ধবীরা ওকে বলত লিনিয়াসের উত্তরসূরি। দেখতে দেখতে ওর শরীরে যৌবন এল কিন্তু প্রেম কখনো ওর জীবনে এলনা। কলেজে পড়াকালীন ওর প্রিয় বান্ধবী ছিল সায়নী। একমাত্র ওর সঙ্গেই ওর সব চেয়ে ভাল বন্ধুত্ব ছিল। বাকি ছেলে মেয়েরা ওর ধারে কাছেও ঘেঁসতনা।  ছেলেরা বলত এরকম ডেঞ্জারাস মেয়ের সঙ্গে প্রেম করা যায় নাকি? আর মেয়েরা বলত তুই বড় অদ্ভুত। হ্যাঁ, ডেঞ্জারাস আর অদ্ভুত দুটো বিশেষনই ওর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সে যেসব মাকড়সাদের কালেকশন করে রাখত তাদের সবাই মোটেই নীরিহ ছিলনা। কয়েকজন তো ছিল গোখরা সাপের মতোই বিষধর। কিন্তু নিজের পোষ্যদের নিয়ে সে খুব খুশি ছিল। একদিন একটা মাকড়সার কামড়ও খেয়েছিল, সৌভাগ্যক্রমে সেটা খুব বিষাক্ত ছিলনা তাই রক্ষে। সায়নী খুব বকেছিল সেদিন। বলেছিল, "দেখবি, একদিন এই মাকড়সার কামড়েই তুই মরবি।"
ওর জীবনে প্রেম না এলেও শরীর প্রেমীদের লোভিদৃষ্টি এড়াতে পারলনা পারমিতা। ওর স্বভাব ছিল বাউণ্ডুলে টাইপের। পোশাক আশাকের ব্যাপারে কখনোই সচেতন থাকতনা, তাই মাঝেমাঝে রকে বসা ছেলেদের কাছে টোন খেত সে। অবশ্য সে সবে পাত্তা দেওয়ার মতো মেয়ে পারমিতা ছিলনা, কিন্তু যেবারে রোহন দা ওর পথ আটকে ছিল খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল সেদিন। পাড়ার মোড়ে একটা চা দোকানের সামনে বসে ওরা আড্ডা দিত, আর পথ চলতি মেয়ে দেখলেই টোন মারত। এদের কেউই ছোট খাট ফ্যামেলির ছেলে নয়, কারো বাবা বিজনেসম্যান, কারো ডাক্তার আবার কারো পার্টির বড় নেতা। এদের নেতা ছিল রোহন দা। কোনো মেয়েকে এরা দাঁড়াতে বললে জেনারেলি, ভয়ে হোক বা অন্য কোনো কারনে কেউ ওদের এভয়েড করতনা, এরা এদের খুশি মতো মেয়েটাকে নিয়ে ফূর্তি করত, তারপর ছেড়ে দিত। লিমিট ক্রস কখনোই করতনা। কিন্তু পারমিতা কারো হাতের পুতুল হয়ে খেলতে রাজী ছিলনা, তাই সেদিন যখন রোহিত দা ওকে দাঁড়াতে বলেছিল সে গ্রাহ্য করেনি। আজ কি তারই প্রতিশোধ নেবে রোহিত দা? পারমিতার বুক কাঁপতে লাগল। পান চিবোতে চিবোতে রোহিতদা জিজ্ঞেস করল, "কি নাম তোর?"
নিচু গলায় পারমিতা বলল, "আমার নাম পারমিতা। আমার পথ আটকেছ কেন, যেতে দাও।"
রোহিতদা বলল, "তোর পিঠে দুখানা ডানা গজিয়েছে মনেহচ্ছে, আমাকেও গ্রাহ্য করিস না। আজ এখানে তোর কাপড় খুলে আমরা তোর ল্যাঙটো নাচ দেখব।"
পারমিতার মাথায় দপ করে আগুন জ্বলে উঠল। চিৎকার করে বলল, "জানোয়ার তোর বাড়িতে মা বোন নেই?"
রোহিত দা বলল, "ছি!ছি! মা বোনের কাছে এসব দেখা যায় নাকি? এগুলো তো বউ দেখাবে। নাও সোনা আমার আমাকে একটা কিস দাও দেখি।"
গাল টা বাড়িয়ে দিল রোহিতদা। নিজের হাতটাকে আর সামলে রাখতে পারলনা পারমিতা। দুম করে রোহিতদার গালে একটা থাপ্পড় মারল। চোখ লাল করে ওর দিকে তাকাল রোহিত দা। বলল, "তোর এত বড় সাহস তুই আমাকে থাপ্পড় মারলি? এরপর ও তুই আমাদের হাত থেকে বাঁচার আশা করিস।"
ওকে জড়িয়ে ধরল রোহিত দা। বাঁচার শেষ অস্ত্র হিসাবে রোহিত দার তলপেট লক্ষ্য করে একটা ঝেড়ে লাথ চালাল পারমিতা। রোহিতদা ক্যাঁক করে বসে যেতেই সে দৌড় লাগাল।
ছুটতে ছুটতে নিজের বাড়িতে এসে পৌঁছাল পারমিতা। ওকে দেখে ওর বাবা অবাক হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করল, "কি হল রে এভাবে হাঁপাচ্ছিস কেন?"
পারমিতা বলল, "আজকে রোহিতদা আমার পথ আটকে আমার সঙ্গে অসভ্যতা করছিল।"
পারমিতার বাবা বলল, "ইস! ওরা মেয়েগুলোকে একটু শান্তিতে থাকতে দেবেনা, বেশি কিছু করেনি তো রে?"
পারমিতা বলল, "কিচ্ছু করার সুযোগ দিইনি, তার আগেই ওকে লাথ মেরে আমি চলে এসেছি।"
পারমিতার বাবা চমকে উঠল, "এটা কি করলি তুই মা? জানিস তো ওরা কত ডেঞ্জারাস ছেলে, কাল ওদের কাছে গিয়ে তুই ক্ষমা চেয়ে আসবি।"
পারমিতা অবাক হল, "এ কি বলছ বাবা? আমি তো খারাপ কিছু করিনি, তাহলে ক্ষমা চাইব কেন? তাউ ওই নোংরা ছেলেগুলোর কাছে?"
পারমিতার বাবা বললেন, "দ্যাখ মা, এখন পার্টি প্রশাসন সবই ওদের দিকে,  ওদের অত্যাচার মেনে নেওয়া ছাড়া আমাদের অন্য কোনো উপায় নেই, আমি তোকে হারাতে চাইনা মা। প্লিজ কাল গিয়ে ওদের কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিবি।"
উত্তর না দিয়ে রুমের ভিতরে ঢুকে গেল পারমিতা। সবাই এভাবে ওদের মাথায় চড়িয়ে রেখেছে বলেই ওরা এত দূর ওঠার সুযোগ পেয়েছে। নিজের বাবাকেও ওর কাপুরুষ বলে মনেহল। সায়নিকে ফোন করে গোটা ঘটনাটা সে খুলে বলল। সায়নি বলল, "ওদের সঙ্গে লাগতে যাওয়া তোর উচিৎ হয়নি। ওদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করার পরে গত তিনমাসে এই এলাকায় তিনটা মেয়ে নিঁখোজ হয়ে গেছে, এই খবরটা তো নিশ্চই জানিস? ঘটনাগুলোর একটারও তদন্ত হয়নি। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী ঘটনা গুলোকে তুচ্ছ ঘটনা আর সাজানো ঘটনা বলে এড়িয়ে গিয়েছেন। তারপরও তুই কিভাবে ওদের সঙ্গে ঝগড়া লাগার সাহস পেলি, সেটা ভেবেই তো আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি।"
পারমিতা বলল, "যা হয়েছে হয়ে গেছে, এরপর কি করব তুই বল।"
সায়নী বলল, "এককাজ কর, তুই কিছু দিনের জন্য এলাকা ছেড়ে চলে যা। অবস্থা স্বাভাবিক হলে আবার ফিরিস।"
ফোন কেটে সে খানিকক্ষণ গুম হয়ে বসে রইল। না, নিজের এলাকা ছেড়ে সে কোথাও যাবেনা, তাতে ওর যা হওয়ার হবে। দরকারে একবার পুলিশকে ইনফর্ম করে রাখতে হবে। পরদিন বিকেলে সে থানায় গেল। সব শুনে ওসি বললেন, "ছেলেগুলো কি এমনি এমনি তোমার পথ আটকেছিল, নিশ্চই তুমি কিছু করেছিলে।"
পারমিতা বলল, "আপনি আমার দোষ দেখছেন স্যার? ওরা আমাকে একদিন দাঁড়াতে বলেছিল, আমি দাঁড়াইনি, এটা কি আমার দোষ?"
ওসি বললেন, "কেন দাঁড়ালে না? দাঁড়ালে কি খুব ক্ষতি হয়ে যেত?"
পারমিতার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। বলল, "ওরা আমাকে নিয়ে ফূর্তি করবে, আর আমাকে সেটা সহ্য করতে হবে? যদি আমি আপনার মেয়ে হতাম আপনি কি এই কথা আমাকে বলতে পারতেন?"
ওসি বললেন, "এফ আই আর নেওয়ারও কিছু প্রসিডিওর আছে, নিজের মেয়ে হলেও এগুলো আমাকে জিজ্ঞেস করতে হত।"
পারমিতা বলল, "ফালতু কথা ছাড়ুন। আপনি কি আমাকে বাঁচানোর জন্য কোনো হেল্প করতে পারবেন? যদি পারেন তো বলুন, নাহলে আমাকে অন্য ব্যবস্থা দেখতে হবে।"
ওসি মাথা নামালেন, "আমি অপারগ। আমি নিজের মাথাটাকেই বাঁচাতে পারছিনা, গতমাসে ওরা থানায় ঢুকে আমার মাথা ফাটিয়ে দিয়ে চলে গেল, আমি কিচ্ছু করতে পারলাম না, তোমাকে কিভাবে বাঁচাব?"
"আচ্ছা, ধন্যবাদ," বলে থানা থেকে বেরিয়ে এল পারমিতা। নিজেকে ভীষন হতাস লাগল ওর। মনেহল রোহিতদাদের সঙ্গে লেগে সত্যিই সে ভুল করেছে। ওর মতো আরো পাঁচজন মেয়ে যখন এই ব্যাপারগুলোকে এত সহজে মেনে নিচ্ছে, তখন ওরই বা কী দরকার ছিল ওদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে যাওয়ার? কয়েকদিন বাড়ি থেকে বেরুলনা পারমিতা। নিজের পোষ্যদের নিয়ে মেতে রইল। কয়েকদিন আগে ওর এজেন্ট ওকে একটা আননোন স্পিসিজের মাকড়সা এনে দিয়েছে, মাকড়সাটা ব্রাজিলীয় ফোনেটরিয়া মাকড়সার কাছাকাছি, তাই এটার নাম দিয়েছে ফোনেসুরিয়া। সম্ভবত এই মুহূর্তে এটাই পৃথিবীর সব চেয়ে বিষাক্ত মাকড়সা। মাকড়সাটার সে নাম দিয়েছে টাইগার। গত কয়েকদিন ধরে এই মাকড়সাটাকেই বশে আনার চেষ্টা করছিল পারমিতা। ভেবেছিল কিছু দিন বাড়িতেই আত্মগোপন করে থাকবে, যাতে রোহিতদা রা ভাবে সে কোথাও চলে গিয়েছে, কিন্তু পারলনা, আজ ওকে বাড়ি থেকে বেরুতেই হল। আজ সায়নির জন্মদিন, ওকে ইনভাইট করেছে। না গেলে সায়নি বলেছে আর কোনো দিনও ওর সঙ্গে কথা বলবেনা। ড্রেস চেঞ্জ করে সে রেডি হয়ে নিল। একটা কৌটোর ভিতরে টাইগারকেও নিয়ে নিল।
বার্থ ডে পার্টি থেকে ফিরতে ফিরতে রাত দশটা বেজে গেল। সায়নি ওকে বার বার করে ওদের বাড়িতে থেকে যেতে বলেছিল কিন্তু সে শোনেনি। রাস্তায় বেরিয়েই বুঝতে পারল মস্ত হঠকারিতা করে ফেলেছে। শুনশান রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে ওর বুক দুরদুর করে কাঁপতে লাগল। মন্দির পেরিয়ে চকে একটা পোড়ো বাড়ির কাছে এসেই সে থমকে দাঁড়াল। বুঝতে পারল তিনচারটা লোক ওর পিছু নিয়েছে। ভয় পেয়ে ছুটতে লাগল পারমিতা, কিন্তু বেশি দূর যেতে পারলনা, হঠাৎ অন্ধকারে কেউ ওকে সামনে থেকে ধাক্কা মারল, মাটিতে দড়াম করে আছড়ে পড়ল পারমিতা, মাথায় চোট লাগল। চাঁদের আবছা আলোয় বুঝতে পারল ওর সামনে রোহিত দা দাঁড়িয়ে আছে। খিস্তি মেরে রোহিত দা বলল, "খুব বাই উঠে গেছে না তোর মাগি? আমাকে লাথি মারা, আমাদের বিরুদ্ধে থানায় কমপ্লেন করতে যাওয়া। আজ তোকে বোঝাব বাই কিভাবে মেটাতে হয়।"
পারমিতার গলা জড়িয়ে এসেছে। কাঁদোকাঁদো গলায় সে বলল, "প্লিজ রোহিতদা আমাকে ছেড়ে দাও, আমাকে যেতে দাও।"
খিকখিক করে হেসে রোহিতদা বলল, "ছাড়ব তো বটেই, তার আগে আমাকে অপমানের পুরো বদলাটা নিয়ে নেব।"
পারমিতা বলল, "আমাকে স্পর্শ করোনা রোহিতদা, নাহলে এর পরিনাম তোমাকে জীবন দিয়ে শোধ করতে হবে।"
পারমিতার পেটে দড়াম করে একটা লাথ মারল রোহিত। বলল, "আমার জীবন নিবি তুই? তার আগে তো তোকে শেষ করে দেব। আজ পৃথিবীর কোনো শক্তি তোকে আমার কাছ থেকে বাঁচাতে পারবেনা।"
লাথ খেয়ে কঁকিয়ে উঠল পারমিতা। ওর গলার স্বর যেন হারিয়ে যেতে লাগল। ততক্ষনে বাকি চারজন লোক সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। ওরা চারজনে মিলে ওকে পাঁজাকোলা করে ধরে পোড়ো বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেল। ভয়ে তখন নড়াচড়া করার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলেছে পারমিতা। বহুকষ্টে হাত নামিয়ে পকেট হাঁতড়ে সে ছোট্ট কৌটোটা বার করল। ওর মুখে কাপড় গুঁজে দিয়েছে রোহিতদা। চিৎকার করার উপায় আর ওর নেই। স্যাঁতস্যাঁতে মেঝেতে শুয়ে বুঝতে পারল ছুরি দিয়ে ওর জিন্স কেটে ফেলেছে রোহিতদা, ওর নিম্নাঙ্গ এখন উলঙ্গ। হাতের কৌটোটাকে খোলার চেষ্টা করল পারমিতা। পারছেনা, হাত পিছলে যাচ্ছে। ওর যোনিতে নিজের পুরুষাঙ্গ ছোঁয়াচ্ছে রোহিতদা। গা ঘিনঘিন করে উঠল পারমিতার। কৌটো খুলে বহুকষ্টে মাকড়সাটাকে বার করে ফেলল। এই মুহূর্তে মাকড়সাটা ওর তালুবন্দি। এটাকে কি রোহিতদার দিকে ছুঁড়ে মারবে? কিন্তু ছুঁড়ে মারলেই কি মাকড়সাটা ওকে কামড়াবে? আর কামড়ালেই যে বাকি চারজন ওকে ছেড়ে দেবে তার কোনো গ্যারেন্টি নেই। কি করবে সে? ওর যোনি দ্বার দিয়ে ধীরে ধীরে ওর ভিতরে প্রবেশ করছে রোহিত দা। যন্ত্রনায় সে হাত মুঠো করল, আর ঠিক তখনই হাতের তালুতে সে একটা কামড় অনুভব করল। পারমিতার শরীর শিথিল হয়ে এসেছে, বুঝতে পারছে ওর আয়ু আর বেশিক্ষন নেই। পা ফাঁক করে রোহিত দা কে ভিতরে ঢোকার সুযোগ করে দিল পারমিতা। ওর চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। জ্ঞান হারাবার আগে মনের মধ্যে একটা ভীষন শান্তি অনুভব করল সে।
পরদিন সকালে খবরের কাগজে একটা টুকরো সংবাদ বার হল--
"আজ সকালে চকের কাছে একটা পোড়ো বাড়ি থেকে একটা মেয়ের উলঙ্গ লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। দেখে বোঝা যাচ্ছে মেয়েটাকে ধর্ষন করে খুন করা হয়েছে। ধর্ষনকারী হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান শাষক দলের কয়েকজন সদস্যকে চিহ্নিত করা হয়েছে। গোটা রাজ্য জুড়ে আজ ধিক্কার ও মোমবাতি মিছিল শুরু হয়েছে। যদিও মুখ্যমন্ত্রী বিবৃতি দিয়ে বলেছেন সবই বিরোধীদের কাজ, এবং দোষি হিসাবে তিনি বিরোধীদের কয়েকজন কে এরেস্ট করার নির্দেশ দিয়েছেন। বডি পোষ্ট মর্টেমে পাঠানো হয়েছে, আজ বিকেলেই পোষ্ট মর্টেম হওয়ার কথা।"
পোষ্ট মর্টেম রুম থেকে বেরিয়ে মুচকি হাসলেন ডঃসেন। আজ তিনি ভীষন শান্তি পেয়েছেন। এই নিয়ে তিন তিনটা ধর্ষন কেসে তাকে মিথ্যে সুইসাইড রিপোর্ট বানাতে হবে। নিজের সততাকে জলাঞ্জলি দিয়ে বার বার মিথ্যে রিপোর্ট বানাতে তাঁর ভাল লাগত না। কিন্তু নিজের চাকরি বাঁচাতে বাধ্য হয়ে কাজটা তাকে করতে হত। কারন ওনার সিনিয়ার হেলথ মিনিস্টার ডঃপালের চাপ ছিল তার মাথার উপরে। এই কেসেও মিথ্যে রিপোর্ট বানাবেন তিনি, তবু আজ তিনি খুব খুশি। ওনাকে দেখে ডঃপাল বললেন, "পোষ্ট মর্টেম শেষ তো? এই বোকা মেয়ে গুলোর এর চেয়ে ভাল পরিনতি হওয়া সম্ভব নয়, রিপোর্টে কি লিখবেন সেই নিয়ে আপনাকে তো নতুন করে বলার কিছু নেই?"
ডঃসেন মাথা নাড়লেন। ভেবেছিলেন কথাটা গোপন রাখবেন কিন্তু পারলেন না। ডঃপালের দিকে তাকিয়ে বলেই ফেললেন "ভিকটিম কিন্তু বোকা নয় স্যার, মারাত্মক বুদ্ধিমতী। ওর মৃত্যু কিন্তু ধর্ষনের ফলে অতিরিক্ত ব্লিডিং হয়ে হয়নি। ভিকটিম ওর ধর্ষনকারীদের ধর্ষন করতে এলাউ করেছে।"
ডঃপালের চোখ কপালে, "এ আপনি কি বলছেন, তাহলে ভিকটিম মারা গেল কিভাবে?"
ডঃসেন বললেন, "মাকড়সার কামড়ে।"
ডঃপাল চমকে উঠলেন, "আমার কিচ্ছু মাথায় ঢুকছেনা, ভিকটিম মাকড়সা পেল কোথায়?"
ডঃসেন বললেন, "ভিকটিম সঙ্গে করে একটা কৌটো নিয়ে গিয়েছিল, যার ভিতরে মাকড়সাটা ছিল। ও ইচ্ছাকৃত ভাবে নিজের হাতে মাকড়সার কামড় খেয়েছে এবং ধর্ষন কারীদের ধর্ষন করতে এলাউ করেছে। এটা একটা জাল নিজের জীবনটাকে উৎসর্গ করে ভবিষ্যত প্রজন্মকে এদের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেওয়া। সমাজ থেকে জঞ্জাল গুলোকে সাফ করতে এরকম একজনকে দরকার ছিল।"
ডঃপাল ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন, "কি উল্টোপাল্টা কথা বলছেন আপনি, আমাকে গোটাটা বুঝিয়ে বলুন।"
একটা পৈশাচিক হাসি হেসে ডঃসেন বললেন, "আমি রিসেন্ট ফোনেটোরিয়া গোত্রের এক বিশেষ প্রজাতির ব্রাজিলীয়ান মাকড়সার ব্যাপারে গবেষনা পত্র পড়ছিলাম। এই মাকড়সারা শরীরে তেজষ্ক্রিয় যৌগ উৎপন্ন করতে পারে। এরা এতটাই বিষাক্ত যে যার শরীরে কামড় দেয় তাকে শুধুই মেরেই ফেলেনা, তার শরীরের জেনেটিক্যাল চেঞ্জ ঘটিয়ে দেয়, এই বিষাক্ত রুগির সঙ্গে কারো ব্লাড কনটাক্ট হলে বা যৌনসংগম করলে তাদের শরীরেও সেম জেনেটিক্যাল চেঞ্জ ঘটে যায়। যে পাঁচজন ওকে ধর্ষন করেছে তারা কিন্তু জানতেও পারছেনা তাদের শরীরে জেনেটিক্যাল চেঞ্জ ঘটে গিয়েছে আর শরীরের ভিতরে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে বিষাক্ত এক শ্রেনীর ক্যানসার, যার কোনো প্রতিষেধক এই পৃথিবীতে নেই।"
"ও মাই গড", চমকে উঠলেন ডঃপাল। মাটিতে বসে পড়ার আগেই ওনার ফোনে ফোন ঢুকল। ফোনটা একসেপ্ট করতেই শুনতে পেলেন ওপাশ থেকে ওনার স্ত্রী বলছেন, "আজ রোহিতের শরীরটা ভীষন খারাপ, সকাল থেকে ঠিকই ছিল হঠাৎ কী যে হল। ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি, তুমি তাড়াতাড়ি একবার এসো...."
(সমাপ্ত)
©All rights reserved to sankha subhra nayak

বৃহস্পতিবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং

মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং

                        শঙখ শুভ্র নায়ক







রাত প্রায় ন'টা বাজে। পার্কের পিছনে একটা গাছ তলায় বসে অপেক্ষা করছিল হৃদয়। আকাশটা নিকষ কালো অন্ধকারে ঢেকে আছে। গাছে গাছে হুটোপুটি শুরু করেছে কয়েকটা বাদুড়। একটা প্যাঁচা গাছের উপরে বসে আদিম হিংস্রতায় চিৎকার করে চলেছে। মেঠো ইঁদুরের বিষন্ন চ্যাঁচ্যাঁ শব্দ মাঝেমাঝেই বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। আজ এখানেই অঙ্কিতার আসার কথা। টোপটা সে ভালই দিয়েছে। ওয়ান নাইট পাঁচ হাজার টাকা। দু'হাজার টাকা একাউন্টে অনলাইন পেমেন্ট করেছিল, কাজের পর বাকি তিন। পকেট থেকে ছুরিটা বার করল হৃদয়। মোবাইলের আলোয় ছুরিটা একবার ঝলসে উঠল।
ওর মেসমেট জয়ন্তও জানেনা আজ সে কি করতে চলেছে। সে শুধু জয়ন্তকে বলেছিল সে নিজের চোখে সবটা দেখতে চায়। জয়ন্ত বার বার মানা করেছিল। বলেছিল, "দেখলে তুই সহ্য করতে পারবিনা।"
ঘটনাটা তিনদিন আগের। পড়াশুনার সূত্রে শহরের একটা মেসে থাকে হৃদয়। জয়ন্ত ওর মেসের বন্ধু। শিপ্রা নামে একটি মেয়ের সঙ্গে প্রেম করে সে। কিন্তু গত একমাস ধরে শিপ্রা জয়ন্তকে এভয়েড করছিল। আগের মতো আর ওর কাছে আসতে চাইছিলনা। বার বার রিকুয়েস্ট করছিল জয়ন্ত। কিন্তু শিপ্রা নাছোড়। কোনো না কোনো কারন দেখিয়ে জয়ন্তকে এড়িয়ে যাচ্ছিল সে, শেষে রাগ করে জয়ন্ত বলেছিল, "আমি আর এই শারীরিক কষ্ট সহ্য করতে পারছিনা, তুমি না এলে আমি কিন্তু গ্রিন প্লাজাতে চলে যাব।"
শিপ্রা বলেছিল, "যেখানে খুশি যাও, আমি এই মুহূর্তে তোমার লোড নিতে পারবনা।"
রাগ করে গ্রিন প্লাজাতে চলেও গিয়েছিল জয়ন্ত। গ্রিন প্লাজা এই শহরের নামি হোটেল গুলোর মধ্যে একটা। শহরের বড়োবড়ো মেসের গ্ল্যামারাস মেয়েরা ওই হোটেলে আসে। চড়া টাকার বিনিময়ে রাত কাটায়। গ্রিনপ্লাজা খুব পরিচিত নাম, কিন্তু পিছনে পলিটিকাল পাওয়ার থাকায় এই প্রস্টিটিউশন রমরমা ভাবে চলছে।
রাতে থমথমে মুখে ফিরেছিল জয়ন্ত। ওর কাছে এক্সপিরিয়েন্স শোনার জন্য উদগ্রীব হয়েছিল হৃদয়, কিন্তু জয়ন্ত ওকে এড়িয়ে গিয়েছিল। জিজ্ঞেস করলে বলেছিল, "কিছু হয়নি।"
সেদিন থেকে হৃদয়ের মনটা খচখচ করছে। এই 'কিছু হয়নি'র মধ্যে কিছু হওয়া তো আছেই। জয়ন্তকে বার বার চাপ দিয়ে কথাটা আদায় করার চেষ্টা করেছিল হৃদয়। অবশেষে জয়ন্ত বলেছিল, "ওখানে গিয়ে আমি যাকে দেখেছিলাম তার নাম শুনলে তুই সহ্য করতে পারবিনা। প্লিজ, ইগনোর ইট।"
হৃদয় বলেছিল, "কে সে নাম টা বল?"
জয়ন্ত বলেছিল, "প্লিজ জানতে চাসনা, আমি বলতে পারবনা, আমি ওকে কথা দিয়েছি, তোর কাছে ওর নাম কখনোই বলবনা।"
হৃদয়ের বুকের ভিতরটা ধক করে উঠেছিল। বলেছিল, "আমার খুব পরিচিত কি?"
জয়ন্ত বলেছিল, "হ্যাঁ, তোর খুব ক্লোজ কেউ।"
হৃদয়ের বুঝতে বাকি ছিলনা মেয়েটা কে? অঙ্কিতা ওকে এভাবে ধোকা দেবে সে একবারও ভাবেনি। এই জন্য মাঝেমাঝে রাতে অঙ্কিতার ফোন সুইচ অফ পায়। জিজ্ঞেস করলে বলে পড়াশুনা করছি। এই তবে ওর পড়াশুনা? ছি! এতটা নিচে নেমে গেছে সে? গরীব বাড়ির মেয়ে হলেই কি এসব করতে হবে? হৃদয় তো চেয়েছিল ওকে সাহায্য করতে, নিলনা কেন? এরকম ভাবে টাকা ইনকাম করার চেয়ে তো অনেক বেশি সম্মানের হত সেটা?
অঙ্কিতার সঙ্গে ওর পরিচয় ওর খুড়তুতো বোন দীপালির সূত্র ধরে। একদিন অঙ্কিতাকে নিয়ে হৃদয়ের মেসে এসেছিল দীপালি। তখনই ওকে দেখে ওর পছন্দ হয়। তারপর দীপালির সাহায্যে দু'জনের মধ্যে প্রেম। দীপালিও ওকে অঙ্কিতার ব্যাপারে কিছু জানায়নি। ও যে এতটা নিচে নেমে গেছে, সেকথা একবার অন্তত বলতে পারত। হয়তো ভেবেছিল দাদা কষ্ট পাবে, কিম্বা জয়ন্তর মতো ওকেও হয়তো রিকুয়েস্ট করেছে অঙ্কিতা।
অঙ্কিতাকে এর আগে বেশ কয়েকবার সন্দেহ করেছে হৃদয়। ফোনে বেশ কয়েকবার ব্যস্ত পেয়েছে। জিজ্ঞেস করলে কখনো বলেছে বাড়ির ফোন আবার কখনো কোনো বান্ধবীর নাম বলে এড়িয়ে গেছে। কিন্তু সেদিনের ঘটনাটা সবচেয়ে মারাত্মক ছিল। একটা বই কিনতে গ্রিনপ্লাজার কাছের একটা দোকানে গিয়েছিল হৃদয়, ফিরে আসার সময় অঙ্কিতার সঙ্গে মুখোমুখি দেখা। গ্রিনপ্লাজা থেকে বেরিয়ে আসছিল সে। ওকে দেখে ওর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। হৃদয় জিজ্ঞেস করেছিল তুমি ওখানে কি করছিলে? অঙ্কিতা বলতে চায়নি। মারাত্মক ঝগড়া হয়েছিল সেদিন অঙ্কিতার সঙ্গে। অবশেষে আত্মপক্ষ সমর্থনে অঙ্কিতা বলেছিল একটা বান্ধবী ওকে জোর করে ওখানে নিয়ে গিয়েছিল, সে জানতনা ওই জায়গাটা এরকম। অঙ্কিতা যে মিথ্যে বলছে সেকথা বুঝতে পেরেছিল হৃদয় তবু অঙ্কিতাকে সে বিশ্বাস করেছিল। আর সেই বিশ্বাসের এই প্রতিদান দিল অঙ্কিতা?
পায়ের উপর দিয়ে সরসর করে কিছু একটা পেরিয়ে যেতে চিন্তাসূত্র ছিন্ন হল হৃদয়ের। ওর সাইলেন্ট মোডে থাকা মোবাইলের স্ক্রিন লাইটটা জ্বলছে। অঙ্কিতার নাম্বার থেকে ফোন আসছে ওর নতুন নাম্বারে। হয়তো অঙ্কিতা জানতে চাইছে সে পৌঁছেছে কীনা। এই নাম্বারটা অঙ্কিতার পুরানো নাম্বার। হৃদয়ই ওকে নাম্বারটা দিয়েছিল, তারপর একদিন হুট করে নাম্বারটাকে সুইচ অফ করে দিল অঙ্কিতা। জিজ্ঞেস করতে বলল, "নাম্বারটা একজনকে দিয়েছি।"
তারমানে এইসব নোঙরা কাজের জন্য এই নাম্বারটা ব্যবহার করে অঙ্কিতা। ছি! ঘৃনায় গা ঘিনঘিন করে উঠল হৃদয়ের। কাল থেকে অঙ্কিতা ফোন করেনি হৃদয়কে, হয়তো অন্য কাস্টমারের সঙ্গে বিজি ছিল আর আজকের কাস্টমার তো স্বয়ং সে। মদের নেশাটা চাগাড় দিয়ে ধীরেধীরে মাথায় চড়ছে, নাহলে হয়তো রাগে এতক্ষণ ফোন টাকেই ভেঙ্গে ফেলত।
রিং বেজে বেজে ফোনটা কেটে গেল। ফোন ধরবেনা হৃদয়। ওর গলা শুনলে অঙ্কিতা ওকে চিনে ফেলতে পারে। মেসেজ করল, "আমি ওখানেই আছি। শব্দ করতে চাইনা, কে কোথায় সন্দেহ করবে, তাই ফোন ধরলামনা।"
অঙ্কিতা রিপ্লাই দিল, "আমি তোমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।"
গাছ তলায় বসে হৃদয় দেখতে পেল মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বেলে মাঠটার দিকে কেউ একটা এগিয়ে আসছে। মুখ দেখতে পাচ্ছেনা, তবে চলার স্টাইলটা ওর খুব চেনা। মেসেজ করল, "মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বেলে তুমিই কি আসছ?"
অঙ্কিতা রিপ্লাই দিল, "হ্যাঁ।"
এখান থেকে ধীরেধীরে হাঁটলে অঙ্কিতার কাছে পৌঁছে যাবে হৃদয়। ওর ঠিক পিছনে। আকাশে চাঁদ নেই, ঘুটঘুটে অন্ধকার, তাই অঙ্কিতা টের পাবেনা, সে কে। মেসেজ করে বলল, "লাইট বন্ধ করে তুমি ওখানেই দাঁড়াও, আমি তোমার কাছে আসছি।"
"আচ্ছা," রিপ্লাই দিয়ে অঙ্কিতা দাঁড়িয়ে পড়ল। পা টিপেটিপে অনুমান করে ধীরেধীরে অঙ্কিতার পিছনে এসে পৌঁছাল হৃদয়। এই তো বেশ টের পাচ্ছে ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা নারী অবয়ব। গায়ের গন্ধটাও খুব চেনা। আস্তে আস্তে অঙ্কিতার পিছনে গিয়ে দাঁড়াল হৃদয়। মনেমনে বলল, "তোমার খেলা শেষ অঙ্কিতা।" ওকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল হৃদয়। সরল বিশ্বাসে হৃদয়ের গায়ে গা এলিয়ে দিল অঙ্কিতা। হৃদয় ওর বাম হাতটাকে অঙ্কিতার বুকের উপরে রাখল, তারপর ধীরেধীরে হাতটাকে তুলে আনল মুখের কাছে। ডান হাতদিয়ে পকেট থেকে ছুরিটা বার করল সে। বাম হাতে অঙ্কিতার মুখটা চেপে ধরে হঠাৎই ছুরিটা চালিয়ে দিল অঙ্কিতার গলার উপরে। "ওঁক" করে একটা আওয়াজ বেরিয়ে এল অঙ্কিতার মুখ দিয়ে। গলা দিয়ে ফিনকি দিয়ে একটা তরল পদার্থ বেরিয়ে এসে হৃদয়ের হাতটা ভিজিয়ে দিল। বলি হওয়া পাঠার মতো অঙ্কিতার শরীরটা কয়েকবার কেঁপে উঠল, তারপর শিথীল হয়ে গেল।
ধীরেধীরে অঙ্কিতাকে মাঠের উপরে শোয়াল হৃদয়। না ওর মুখ সে দেখতে চায়না। এই মৃত মুখটাকে দেখার কোনো ইচ্ছেই ওর নেই। সে মাঠ থেকে মেসের দিকে হাঁটতে লাগল। কাল সকালে হয়তো ওর কাছে পুলিশ আসবে, জিজ্ঞাসাবাদ করবে, না কোনো কথাই লুকোবেনা হৃদয়। ভরা আদালতে জোর গলায় বলবে কেন সে অঙ্কিতাকে খুন করল। কতটা নোঙরামি সে ওর সঙ্গে করেছিল। তাতে আদালত ওকে যা সাজা দেবে সে মাথা পেতে নেবে। কিন্তু এরপর থেকে কোনো মেয়ে তার বয়ফ্রেন্ডকে এভাবে ধোকা দেওয়ার আগে একবার অন্তত অঙ্কিতার কথা ভাববে, এটা ভেবে একবার অন্তত শিউরে উঠবে যে তারও অঙ্কিতার মতো পরিণতি হতে পারে।
এসব কথা ভাবতে ভাবতেই ফিরছিল হৃদয়। বড়ো রাস্তায় ওঠার আগেই হঠাৎ ওর মোবাইলের স্ক্রিনলাইট টা জ্বলে উঠল। ওর মোবাইলে ফোন ঢুকছে। অঙ্কিতার অরিজিনাল নাম্বার থেকে ফোন ঢুকছে। বুকের ভিতরটা হিম হয়ে গেল হৃদয়ের। ধীরেধীরে ফোনটা একসেপ্ট করে 'হ্যালো' বলতেই ওপাশ থেকে অঙ্কিতা বলল, "হ্যালো, কি করছ?"
ওর হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। অঙ্কিতা এখোনো বেঁচে আছে! সে ভুতে বিশ্বাস করেনা, নাহলে হয়তো ভুতে ফোন করছে বলে ধরে নিত। তবে? সে যাকে খুন করল সে কে? অঙ্কিতা কি ওর জায়গায় অন্যকোনো মেয়েকে পাঠিয়েছিল? ছুটে লাশটার কাছে এগিয়ে গেল হৃদয়। মোবাইলের স্ক্রিন লাইটটা ধীরে ধীরে লাশটার মুখের উপরে ফেলল। আর তার পরেই ভিমরি খেয়ে মাটিতে বসে পড়ল। ছুরিটাকে নিজের গলায় চালিয়ে নিতে ইচ্ছে করল হৃদয়ের। ভুল করে সে এ কি করে ফেলল? অঙ্কিতা আজ পর্যন্ত একটিও মিথ্যে কথা বলেনি, মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং টা হয়েছে ওরই। হয়তো এজন্যই জয়ন্ত মেয়েটার নাম ওর কাছে বলতে চায়নি। মৃত্যু যন্ত্রনায় বিকৃত এই মুখটা ওর ভীষণ চেনা। মেয়েটা ওর ভীষণ পরিচিত একজন। লাশটা আর কারুর নয় ওর খুড়তুতো বোন দীপালির।
(সমাপ্ত)
©All rights reserved to sankha subhra nayak