বৃহস্পতিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১৯

হুঙ্গা রহস্য

হুঙ্গা রহস্য

শঙখ শুভ্র নায়ক


পূর্ব কথা-- ব্যাঙ্কের কেসটা সলভ করার পর দিন কয়েক বেশ রিলাক্স ভাবেই কাটাচ্ছিল ডিকে। পঁচিশ লক্ষ টাকা এক সঙ্গে কোনো কেসে পাওয়া তো সহজ ব্যাপার নয়, কত হাই প্রোফাইল কেস হলে সেটা পাওয়া যায়। এই টাকা দিয়ে ডিকে একটা ডিটেকটিভের চেম্বার খুলেছে। চেম্বারের নাম দিয়েছে অনুবিক্ষন ডিটেকটিভ এজেন্সি। আজ সেই চেম্বারের শুভ উদ্বোধন।

(১)
ডিকে বলল, "শুভ সব কিছু ঠিকঠাক সাজানো হয়েছে তো? একবার চেক করে দেখেনে।"
শুভ বলল, "হ্যাঁ সাজানো তো ঠিকঠাকই হয়েছে, তবে আজ উদ্বোধনের মিষ্টি গুলো বোধহয় আমাদেরই খেতে হবে।"
ডিকে বলল, "কি বলিস, এত এনাউন্সম্যান্ট করার পরে একটা কাস্টমারও জুটবেনা? এতবড় শহরে একটা লোকেরও বউ পালাবেনা? কারুর কুকুর বেড়াল হারাবেনা? কোনো মেয়ের স্বামীকে ফলো করার কাজ আসবেনা?"
শুভ বলল, "এসব কাজের জন্য লোকে তোমার কাছে আসবে কেন? অনেক সাকসেসফুল গোয়েন্দা আছে সে জন্য, লোকে গেলে তাদের কাছেই যাবে।"
ডিকে বলল, "আমি কি আনসাকসেস ফুল? এর আগে দুটো কেস সলভ করেছি। জিগালো রহস্য আর ভূতুড়ে কেস। হ্যাঁ, হয়তো আমাকে নিয়ে মাতামাতি হয়নি, কিন্তু তুই তোর ব্লগে গল্প লিখেছিস, দুপাঁচজন সে ব্যাপারটা জানেও। তারপরেও যদি সারাদিনে সবেধন নীলমণি একটা কাস্টমার না আসে, তো আমার কী করার আছে?"
মাথা নেড়ে বাইরে দিকে তাকাতেই শুভ দেখল তিনজন লোক হাঁটতে হাঁটতে এই চেম্বারের দিকেই এগিয়ে আসছে। উৎফুল্ল ভাবে বলল, "ওই দেখ, তোমার লক্ষ্মী আসছে বোধহয়।"
ডিকে বলল, "ভদ্রভাবে বসে পড়, আমাদের এবারে একটু সিরিয়াস হতে হবে। কথায় বলে প্রথমে দেখনদারি, তারপর গুন বিচারী।"
কথা বলতে বলতেই তিন ভদ্রলোক চেম্বারের কাছে এসে দাঁড়ালেন। তিনজনেরই বয়স চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের কোঠায়। তাদের মধ্যে এক ভদ্রলোকের গায়ে ব্লেজার। দেখে মনেহয় উনি কোনো অফিস বা হোটেলে কাজ করেন। বাকি দু'জন ভদ্রলোকের একজনের গায়ে ধুতি পাঞ্জাবি আর অপরজন প্যান্ট শার্ট পরে আছে। ব্লেজার পরা ভদ্রলোক বাইরে থেকে উঁকি মেরে বললেন, "এটা কি ডিটেকটিভ ডিকের চেম্বার?"
ডিকে বলল, "আজ্ঞে, আপনি কি হোটেল হোয়াইট হাউসের ম্যানেজার?"
রুমে ঢুকতে ঢুকতে ভদ্রলোক বললেন, "আপনি আমাকে চেনেন?"
ডিকে বলল, "না, কাল সকালে হোটাইট হাউসে একটা লাশ পাওয়া গিয়েছে। যে কথা আমি পেপারে পড়েছি, আপনার ড্রেস দেখে মনেহল হয়তো সেই কেস নিয়েই আপনি এসেছেন।"
ভদ্রলোক বললেন, "আপনি ঠিকই ধরেছেন। আমার নাম সৌমেন্দ্র রায়। আমি হোয়াইট হাউস হোটেলের ম্যানেজার। এই শহরের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে নামি হোটেল গুলোর মধ্যে একটা আমাদের হোটেল। আমাদের হোটেলের বিশেষত্ব হচ্ছে এটাই আমরা আমাদের হোটেলে কোনো রকমের ড্রাগস এলাউ করিনা। আমাদের হোটেল একটা বিশাল সাইজের রিহ্যাব সেন্টার, অনেকে নিজে থেকে এখানে নিজেদের ড্রাগসের নেশা ছাড়ানোর জন্য আসে, আবার অনেকে তাদের আত্মীয়দের আমাদের হোটেলে পাঠায়। সারা ভারতে আমাদের কাস্টমার আছে, এবং বহুলোককে আমরা ড্রাগসের নেশা থেকে মুক্ত করেছি। এজন্য আমরা রাষ্ট্রপতি পুরষ্কারও পেয়েছি। হোটেলে ঢোকার আগে ড্রাগসের জন্য তিনবার চেক হয়, তারপর হোটেলে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়, কিন্তু ওই মৃত্যুটা আমাদের মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে।"
ডিকে বলল, "কেন কি আছে ওই মৃত্যুতে?"
সৌমেন্দ্র বাবু বললেন, "যে ভদ্রলোক মারা গেছেন, তার নাম হর্ষবর্ধন তরফদার। উনি আমাদের হোটেলে প্রায় একমাস ছিলেন। ফরেন্সিক টেস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী অতিরিক্ত ড্রাগ সেবনের ফলে ওনার মৃত্যু হয়েছে। বুঝতে পারছিনা ওনার শরীরে ড্রাগস কিভাবে এল। মনেহচ্ছে কেউ আমাদের হোটেলের বদনাম করার জন্য ইচ্ছাকৃত ভাবে ওনাকে ড্রাগস সাপ্লাই করেছে।"
ডিকে বলল, "আচ্ছা, কি ধরনের ড্রাগসে উনি মারা গেছেন কিছু জানা গেছে?"
সৌমেন্দ্র বাবু বললেন, "পুলিশ বলছে ড্রাগসের নাম হুঙ্গা। এই ড্রাগ মূলত দক্ষিণ আফ্রিকার এইচ আই ভি পেসেন্টদের চিকিৎসা করার জন্য ব্যবহার করা হয়।"
ডিকে বলল, "মাইগড! মেদিনীপুর শহরে হুঙ্গার স্টক এসে গিয়েছে বলে মনেহচ্ছে। এর আগে একটা কেসে এই ড্রাগসের সাহায্যে একজনকে অজ্ঞান করা হয়েছিল।"
শুভ বলল, "কোন কেসে?"
ডিকে বলল, "ব্যাঙ্কের কেসে দারোয়ান রাম সিং কে যে নিষিদ্ধ ড্রাগ দেওয়া হয়েছিল তার নামও হুঙ্গা, একথা পুলিশ অফিসার সমীর বাবু আমাকে জানিয়েছেন।"
শুভ বলল, "তাহলে তো ওই কেসের আসামি ছটু এক্সপার্ট কে জেরা করলে এই ড্রাগ ও কোথা থেকে পেল তা জানা যাবে।"
হঠাৎ সামনের ধুতি পাঞ্জাবি পরা ভদ্রলোক বললেন, "এই কেসে, এই ড্রাগ ও কোথা থেকে পেল, তারচেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ এই ড্রাগ হোটেলে পৌঁছাল কিভাবে?"
ডিকে বলল, "আপনি?"
ভদ্রলোক বললেন, "আমার নাম অমিয় মাইতি। আমি এই হোটেলের একজন বোর্ডার।"
সৌমেন্দ্র বাবু বললেন, "ইনি ওইদিন রাতে কিছু দেখেছিলেন, সেটা বলতেই আমার সঙ্গে এলেন।"
ডিকে বলল, "কি দেখেছিলেন?"
অমিয় বাবু বললেন, "তখন রাত দেড়টা দুটো বাজে। আমার রাতে ঘুম হয়না ঠিক ঠাক। মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে যেতে আমি হোটেলের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়েছিলাম। হঠাৎ দেখলাম একটা লোক দেওয়ালের উপর দিয়ে ছুটতে ছুটতে একুশ তলায় চলে গেল।"
ডিকে বলল, "একুশ তলায় গেল কিভাবে বুঝলেন?"
অমিয় বাবু বললেন, "তখনও তিন চারটা রুমে আলো জ্বলছিল। আমি থাকি সতেরো তালায়। আলোর দূরত্ব থেকে মনেহল, ওটা তেইশ তলা হবে।"
ডিকে বলল, "আচ্ছা, তারপর কি দেখলেন বলুন?"
অমিয় বাবু বললেন, "তার কয়েক মিনিট পরে লোকটাকে আবার দেওয়াল বেয়ে ছুটে নামতে দেখলাম। লোকটা এমন ভাবে দেওয়ালের উপরে ছুটছিল মনেহচ্ছিল সে দেওয়ালে নয় ফাঁকা রাস্তায় ছুটছে।"
ফিসফিস করে শুভ বলল, "স্পাইডার ম্যান।"
প্যান্টশার্ট পরা ভদ্রলোক বললেন, "আমিও দেখেছি। আমি তেরো তলাতে থাকি। মাঝরাতে জানালা বন্ধ করতে গিয়ে দেখলাম আমার রুমের পাশের রুমের জানালার কাছে লোকটা দাঁড়িয়েছিল। আমার সঙ্গে চোখাচুখি হতেই লোকটা দৌড়ে উপরের দিকে চলে গেল।"
ডিকে বলল, "আপনার পরিচয়?"
ভদ্রলোক বললেন, "আমার নাম রতন সরকার। আমি এই সাতদিন হল এই হোটেলে এসেছি।"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "আপনারা এসব কথা পুলিশকে জানিয়েছেন?"
অমিয় বাবু এবং রতন বাবু দু'জনেই মাথা নাড়লেন। অমিয় বাবু বললেন, "পুলিশকে এসব কথা বললে পুলিশ কি বিশ্বাস করত বলে আপনার মনেহয়?"
রতন বাবু বললেন, "আমি ঝামেলায় জড়াতে চাইনি, তাই বলিনি, কিন্তু যখন শুনলাম ম্যানেজার বাবু আপনার কাছে আসছেন তখন আর নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারলাম না, চলে এলাম ওনার সঙ্গে।"
ডিকে বলল, "খুব ভাল করেছেন," সৌমেন্দ্র বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, "আপনার হোটেলে তো সিসি টিভি আছে, তার ফুটেজ দেখতে চাইলে পেতে পারি তো?"
সৌমেন্দ্র বাবু বললেন, "আলবাত পাবেন। আপনি আজ বিকেলে আমার হোটেলে আসুন না।"
ডিকে বলল, "আচ্ছা, নিশ্চই যাব। যদি প্রোয়োজন হয় তাহলে আপনার হোটেলে দু'একরাত কাটাব," শুভর দিকে তাকিয়ে বলল, "আমার ভাই শুভ ও আমার সঙ্গে যাবে। আপনি দু'জনের থাকার ব্যবস্থা করে রাখবেন।"
সৌমেন্দ্র বাবু বললেন, "নিশ্চই। কোনো চিন্তা করবেন না, সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে।"

হোয়াইট হাউস হোটেলটা কিছুটা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হাউস হোয়াইট হাউসের আদলেই বানানো। ওরা যখন হোটেলে গিয়ে পৌঁছাল তখন বিকেল পাঁচটা বাজে। রিসেপশনে গিয়ে ওরা ম্যানেজার বাবুর সঙ্গে দেখা করল। সৌমেন্দ্রবাবু বললেন, "সতেরো তলায় একটা রুমে আপনাদের থাকার ব্যবস্থা করেছি, আমাদের স্টাফ রবি কে বলছি আপনাদের রুম দেখিয়ে দেবে।"
ডিকে বলল, "আপনাকে এত ব্যস্ত হতে হবেনা। আমি আগে হর্ষবর্ধন বাবুর রুমটা দেখতে চাই।"
রিসেপশনে একটি মেয়ে রয়েছে। মেয়েটির নাম লিজা। সম্ভবত গোয়ানিজ খ্রিষ্টান। বলল, "ও তো ফিফত ফ্লোর পে হে। চলিয়ে মে আপকো দিখাতি হু।"
ডিকে বলল, "আচ্ছা, চলুন।"
মেয়েটির পিছনে পিছনে ওরা ফিফত ফ্লোরে এসে পৌঁছাল। ফিফত ফ্লোরে লিফট থেকে বার হবার মুখেই একটা সিসি টিভি ক্যামেরা লাগানো রয়েছে। ডিকে বলল, "এই সিসি টিভি র ফুটেজ পাওয়া যাবে?"
লিজা বলল, "জি হাঁ স্যার। জরুর মিলেগি।"
ডিকে বলল, "আচ্ছা, এখানে ড্রাগ এলাউড নয়। কিন্তু কেউ যদি বাইরে থেকে ড্রাগ নিয়ে আসে, আপনারা কিভাবে বুঝবেন?"
লিজা বলল, "ইহা কি সিকুইরিটি বহুত স্ট্রিক্ট হে। যো কাস্টমার ইহাপে আতে হে, অর যাতে হে উসকা পসিনা টেস্ট হোতা হে। আগার শরীর মে ড্রাগ হোগা তো জরুর পাতা চল যায়েগা। উসকি এলাবা ভি, হর রুম কি বাহার এক স্ক্রিন হে, যিসপে অঙ্গুলিয়া ডালকে আপকো কুচ কোড দেনা পড়তা হে, ও ভি এক তরহা কা ড্রাগস ডিটেকটর হে। অঙ্গলিও পর লাগি হুই থোড়া সা ভি পসিনাসে ও ড্রাগস কো ডিটেক্ট কর লেতা হে।"
ডিকে বলল, "বুঝলাম..."
কথা বলতে বলতে ওরা হর্ষবর্ধন বাবুর রুমের দরজার কাছে এসে পৌঁছাল। পুলিশ এখানে তদন্ত করেছে। রুমের দরজা সিল করে গিয়েছে। ভিতরে ঢোকার কোনো উপায় নেই। ডিকে বলল, "আচ্ছা, পাশের রুমটা খোলা যাবে? এখান থেকে তো ওই রুমের জানালাটা দেখা যায়।"
লিজা বলল, "জি হাঁ, কিউ নেহি? মাস্টার কি তো মেরি পাস হে। চলিয়ে দিখাতি হুঁ।"
রুম খুলে দিল লিজা। রুমের ভিতরে ঢুকে ব্যালকনির বাইরে গিয়ে দাঁড়াল ডিকে। শুভর দিকে তাকিয়ে বলল, "হর্ষবর্ধন বাবুর কাছে ড্রাগস এসেছিল হোটেলের বাইরে থেকে। হোটেলের ভিতরের এত কড়া সিকুইরিটি পেরিয়ে কেউ ড্রাগস পৌঁছাতে পারবেনা, যদি না আগে থেকেই কেউ হোটেলের ভিতরে ড্রাগস স্টক করে রাখে।"
শুভ বলল, "তাহলেও, হোটেলের ভিতর দিয়ে কোনো রুমে ড্রাগস পৌঁছানো সম্ভব নয়। যে পৌঁছাবে সে রুম থেকে ঢুকতে বেরুতে, কিম্বা এক ফ্লোর থেকে আর এক ফ্লোরে যাতায়াত করার সময় কোনো না কোনো ডিটেক্টরে ঠিক ধরা পড়ে যাবে।"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল," কিন্তু হর্ষবর্ধন বাবুর জানালার দিকে তাকিয়ে দেখ। জানালার বাইরে কোনো পাইপ লাইনও নেই, যে পাইপ বেয়ে কেউ ওনার কাছে ড্রাগস পৌঁছাবে।"
শুভ বলল, "কিন্তু অমিয় বাবু বা রতন বাবু যাকে দেখেছেন সে কে? আর সে কিভাবে দেওয়াল বেয়ে হাঁটতে পারে?"
ডিকে বলল, "কয়েকমাস আগে এমনই একটা ছবি ইন্টারনেটে বেরিয়েছিল। জাপানে এক ভদ্রলোককে দেওয়ালের উপরে হাঁটতে দেখা গিয়েছিল। যদিও ওই একবারই মাত্র দেখা যায়, আর কখনোই দেখা যায়নি, তাই বেশির ভাগ লোক ওই ছবিটাকে ফটোশপ ভেবে ইগনোর করেছিল, কিন্তু আমি খুঁটিয়ে দেখে বুঝেছি, ছবিটার মধ্যে কিছুটা হলেও সত্যতা থাকতে পারে। আর সেটা জানার জন্যই আমি আমার বান্ধবী রুপলেখাকে ইমেল করেছি। ও এখন জাপানে আছে। ও নিজে একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। এরকম বহু কেস ও হ্যান্ডেল করেছে। আমার আশা ও খুব তাড়াতাড়িই আমাদের ইনফরমেশন দিয়ে হেল্প করবে।"
রুম থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে শুভ বলল, "এই কেসে কখনো দক্ষিণ আফ্রিকা, কখনো জাপান, অনেক ফরেন কান্ট্রির নাম পাচ্ছি। কেসটা ছোট খাটো বলে মনেহচ্ছেনা।"
ডিকে বলল, "কেস যত বড়ই হোক, সেটা আমাদের সলভ করতে হবে, আর এটাই আমাদের কাছে চ্যালেঞ্জ।"

(২)
প্রোজেক্টর চালু করে পুলিশ অফিসার সমীর বাবু বললেন, "আমি ছটু এক্সপার্টের সঙ্গে আপনার ভিডিও কলিং এর ব্যবস্থা করে রেখেছি। আপনি যা জানতে চান বলুন।"
শুভ বলল, "ভিডিও কলিং কেন? আমরা তো মুখোমুখিই ওকে জেরা করতে পারতাম।"
সমীর বাবু বললেন, "ও কি রকম হাই প্রোফাইল আসামি তা নিশ্চই আপনাদের অজানা নেই? ওকে স্পেশাল সেলে নিশ্ছিদ্র পাহারায় রাখা হয়েছে। সেখানে গোনাগুনতি তিন চারজন ছাড়া অন্য কারুর যাওয়া নিষিদ্ধ। একটু খুঁত পেলেই ও কিন্তু সেখান থেকে বেরিয়ে যাবে, তাই এই ব্যবস্থা।"
ডিকে বলল, "আচ্ছা, কানেক্ট করুন ওর সঙ্গে, আমার যেটুকু জানার আছে জেনে নিই।"
সমীর বাবু মাথা নাড়লেন। কয়েক সেকেন্ড পরে ছটু এক্সপার্ট কে সেলের ভিতরে একটা চেয়ারে বসে থাকতে দেখা গেল। ডিকের দিকে তাকিয়ে ছটু এক্সপার্ট বলল, "কি ডিটেকটিভ সাহেব, হঠাৎ আমার কথা মনেপড়ল?"
ডিকে বলল, "আমি একটা ইনফর্মেশন জানার জন্য তোমাকে কল করেছি। একদম সত্যি কথা বলবে, কিচ্ছু লুকোবার চেষ্টা করবেনা।"
ছটু এক্সপার্ট বলল, "লুকোলে তো আর আমার সাজা কমবেনা। কি জানতে চান বলুন। আমি বলব।"
ডিকে বলল, "তুমি রাম সিং এর জলের বোতলে যে ড্রাগসটা মিশিয়েছিলে, সেটা কোথায় পেয়েছিলে?"
ছটু এক্সপার্ট বলল, "ও আচ্ছা, হুঙ্গা। সে তো বাজারে এভেলেবল। আপনি নেবেন কি কিছু আমি আপনাকে পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেব।"
ডিকে বলল, "ফালতু বকবক না করে যা জিজ্ঞেস করলাম বলো।"
ছটু এক্সপার্ট বলল, "আমি ওটা মিঁয়াও এর কাছে কিনে ছিলাম। আমাদের যুধিষ্ঠির আমাকে ওর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিল। লাইনের লোক, তাই মিঁয়াও নিজে আমাকে দিতে এসেছিল।"
শুভ বলল, "মিঁয়াও আবার কি? পোকেমনের মিঁয়াও, নাকি হুলো মিঁয়াও?"
ডিকে বলল, "মিঁয়াও টা কে?"
ছটু এক্সপার্ট বলল, "মিঁয়াও আমাদের লাইনের সব চেয়ে বড়ো ড্রাগস সাপ্লায়ার। খড়্গপুরে ওর ডেরা। বিদেশ থেকে ড্রাগস এনে গোটা ইন্ডিয়াতে ড্রাগস সাপ্লাই করে। চিন, জাপান, আমেরিকা, সাউথ আফ্রিকা সমস্ত জায়গা থেকে ড্রাগস আমদানি হয়। কোটি কোটি টাকার বিজনেস ওর।"
ডিকে বলল, "ঢাক পেটানো বন্ধ করো। মিঁয়াও কে কোথায় গেলে পাওয়া যাবে, সেটা বলো।"
ছটু এক্সপার্ট বলল, "মিঁয়াও এর ঠিকানা আমি জানিনা। কেবল শুনেছি, ওর ডেরা খড়্গপুরে। তবে বাড়িতে সে থাকেনা, থাকলে পুলিশ, গোয়েন্দা ওকে খুঁজে বার করে ফেলত। ও মেদিনীপুর খড়্গপুরেই ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ায়।"
ডিকে বলল, "তুমি তো ওর কাছে ড্রাগস নিতে গিয়েছিলে, তখন নিশ্চই ওকে দেখেছ, ও কেমন দেখতে বলো?"
ছটু এক্সপার্ট বলল, "না, আমি দেখিনি। ওর মুখ কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল।"
ডিকে বলল, "এমন কিছু দেখেছ যা দেখে ওকে চেনা যাবে? একটু ভেবে বলো।"
কিছুক্ষণ ভেবে ছটু এক্সপার্ট বলল, "একটা জিনিস দেখেছিলাম। ও যখন বাইকে চড়তে যায়, তখন বাইকের আয়নায় ওর হাতটা একবার দেখেছিলাম। ওর হাতে একটা উল্কি রয়েছে। তাতে লেখা রয়েছ এম এ।"
ডিকে বলল, "আচ্ছা, ঠিক আছে।"

থানা থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে শুভ বলল, "এম এ নিশ্চই মিয়াও এর নামের আদ্যক্ষর। এম দিয়ে মিঁয়াও আর এ দিয়ে আগারওয়াল, কিম্বা অম্বানি কিম্বা আচার্যর কিছু একটা।"
ডিকে বলল, "মিঁয়াও ওর নাম বলে মনেহয়না। ওর নাম মৃনাল, মহিম, মুকুলের মতো কিছু একটা। যা বিকৃত হয়ে মিঁয়াও হয়েছে।"
শুভ বলল, "এখন কোথায় যাবে?"
ডিকে বলল, "যুধিষ্ঠির কে খুঁজতে হবে, ও আমাদের মিঁয়াও এর কাছে পৌঁছে দিতে পারে। আর একবার মিঁয়াও এর কাছে পৌঁছে যেতে পারলে হোটেলে কিভাবে ড্রাগস পৌঁছাল সেই রহস্যও উদ্ধার করে ফেলতে পারব।"
শুভ বলল, "কিন্তু আমরা যুধিষ্ঠিরের কাছে পৌঁছাব কিভাবে? ওর ঠিকানাই তো আমরাই জানিনা।"
ডিকে বলল, "যে ছটু এক্সপার্টকে মিঁয়াও এর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছে তার বাড়ি ছটু এক্সপার্টের বাড়ির কাছাকাছিই হবে। আমরা ওর পাড়ায় গিয়ে খোঁজ করলে যুধিষ্ঠির কেও পেয়ে যাব আশাকরি।"
শুভ বলল, "তাহলে আর দেরি কেন? এক্ষুনি চলো। যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে কথা বলে আসা যাক।"

ওরা একটা টোটো ধরে ছটু এক্সপার্টের পাড়ায় চলে গেল। পাড়াটা বেশ ঘিঞ্জি। বাড়িগুলো গায়ে গায়ে লাগালাগি। কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করার পরে একজন বলল, "যুধিষ্ঠিরকে চিনি তবে সে তো আজ দু'মাস হল বাড়িতে নেই।"
ডিকে বলল, "কোথায় গেলে ওর খবর পাওয়া যাবে বলতে পারবেন?"
লোকটা বলল, "পাণ্ডার কাছে যান, সে সবার খবর রাখে।"
ডিকে বলল, "পাণ্ডার বাড়ি কোথায়?"
লোকটা বলল, "ওই যে রাস্তার মোড়ে ল্যাম্পপোস্টের পাশে ঝুপড়িটা দেখছেন, ওটাই পাণ্ডার বাড়ি।"

শুভ কে নিয়ে পাণ্ডার বাড়িতে গিয়ে ঢুকল ডিকে। বাড়ির ভিতরে একটা হুমদো মতো ভদ্রলোক খাটিয়াতে বসে রেডিওতে গান শুনছিল। ওদের দেখে বলল, "কি চাই?"
ডিকে বলল, "আমি পাণ্ডার কাছে এসেছি। কয়েকটা ব্যাপারে ইনফরমেশন চাই।"
লোকটা বলল, "আমিই পাণ্ডা। কি ইনফরমেশন চাই বলুন?"
ডিকে বলল, "আমি যুধিষ্ঠিরের ব্যাপারে জানতে চাই।"
পাণ্ডা বলল, "পার ইনফরমেশন পাঁচশো টাকা করে লাগবে। টোটাল ইনফরমেশন আড়াই হাজার। এক্সট্রা ইনফরমেশন আরো এক হাজার।"
পকেট থেকে দুটো দু'হাজার টাকার নোট বার করে ডিকে বলল, "কিন্তু যদি ইনফরমেশন ভুল হয়?"
পাণ্ডা বলল, "আমার ইনফরমেশন কখনো ভুল হয়না, পুলিশ, ক্রিমিনাল সবাই আমার কাছ থেকে ইনফরমেশন কিনে নিয়ে যায়।"
পাণ্ডা হাতে নোট দুটো দিয়ে ডিকে বলল, "যুধিষ্ঠিরের ব্যাপারে যা জানা আছে বলো।"
পাণ্ডা বলল, "যুধিষ্ঠিরকে দেখে ভোলাভালা লোক বলে মনেহতে পারে, কিন্তু ও একজন দাগি ক্রিমিনাল, বিখ্যাত ড্রাগ ডিলার মিঁয়াও এর ডান হাত ছিল সে। ওর ওয়েস্টবেঙ্গল সার্কেলের ব্যবসা ওই সামলাত।"
ডিকে বলল, "ছিল মানে, এখন আর নেই।"
পাণ্ডা বলল, "না, নেই। মাস দুয়েক আগে ও মিঁয়াওকে ধোকা দিয়ে ওর কয়েক কোটি টাকার মাল আর সঙ্গে একটা দামি জিনিস নিয়ে পালিয়ে যায়। এখন কম দামে বিভিন্ন জায়গায় সেই ড্রাগস সাপ্লাই করে ও মিঁয়াও এর বিজনেসে ভাগ বসাতে চাইছে।"
ডিকে বলল, "দামি জিনিসটা কি?"
পাণ্ডা বলল, "তা জানিনা। তবে সেটা বিদেশ থেকে আমদামি করা কোনো যন্ত্র। যার খোঁজে মিঁয়াও এর লোকেরা ওকে হন্যে হয়ে খুঁজছে।"
ডিকে বলল, "যুধিষ্ঠির এখন কোথায় আছে?"
পাণ্ডা বলল, "তা বলতে পারবনা। কিছুদিন আগে যুধিষ্ঠিরের খোঁজে মিঁয়াও এর লোকেরাও আমার কাছে এসেছিল। কিন্তু পায়নি। আমি কেবল এটুকু হিন্ট দিতে পারি, যুধিষ্ঠির যে জায়গাতে আছে সেই জায়গাটা ছোটও নয়, আবার বড়োও নয়।"
ডিকে বলল, "আচ্ছা, আর মিঁয়াও এর ব্যাপারে কোনো ইনফরমেশন দিতে পারবেন? ও কোথায় আছে?"
পাণ্ডা বলল, "পাক্কা ইনফরমেশন আছে। ও এখন মেদিনীপুরের সাদা রঙের কোনো হোটেলে রয়েছে।"

পাণ্ডার কাছ থেকে ফিরে আসতে আসতে শুভ বলল, "মেদিনীপুরে সাদা রঙের অনেক হোটেল রয়েছে, তাদের মধ্যে কোনটাতে মিঁয়াও আছে কিভাবে খুঁজে বার করা যাবে। আর শুধু মিঁয়াওকে খুঁজলেই হবেনা। এখন আবার তার সঙ্গে যুধিষ্ঠিরকেও খুঁজতে হবে।"
ডিকে বলল, "মিঁয়াও কোথায় আছে তা নাহয় খুঁজে বার করা যাবে, কিন্তু আমার মন বলছে হর্ষবর্ধন বাবুকে ড্রাগস দেওয়ার পিছনে মিঁয়াও দায়ি নয়। এই কাজ যুধিষ্ঠিরের।"

ওরা হোটেলে ফিরে এল। ডিকেকে দেখে সৌমেন্দ্র বাবু বললেন, "আপনি সিসি টিভি ফুটেজের যে যে অংশ গুলো কাট করে রাখতে বলেছিলেন সেগুলো সব রেডি করে দিয়েছি। এই পেন ড্রাইভে সব সেভ করা আছে। অন্য কোনো হেল্প লাগলে বলবেন।"
ডিকে বলল, "আচ্ছা, আপনাদের রেজিস্টার খাতাটা আমি একবার দেখতে পারি? এই হোটেলে এমন কতজন আছেন, যাদের নাম এবং পদবিতে এম এবং এ অক্ষরটা আছে?"
রেজিস্টার খাতা দিয়ে লিজা বলল, "এই নিন, দেখুন না।"
খাতাটা ওল্টাল ডিকে। শুভ বলল, "তোমার কি মনেহচ্ছে মিঁয়াও এই হোটেলেই আছে?"
ডিকে বলল, "পাণ্ডার ইনফরমেশন সঠিক হলে মিঁয়াও এই হোটেলেই আছে। ও সাদা হোটেল বলতে এই হোয়াইট হাউসের কথাই বলেছে।"
শুভ বলল, "উরিব্বাস! আমরা এতবড় একজন ক্রিমিনালের সঙ্গে বাস করছি।"
রেজিস্টার খাতা চেক করতে লাগল ডিকে। শুভও তাতে চোখ বোলাল। মোট তিনজন পাওয়া গেল, যাদের নামের প্রথমে এম আর শেষে এ অক্ষরটা আছে। তাদের নাম মোহিত আনন্দ, মৃন্ময় অধিকারি, আর মনীষা অগ্রবাল। শুভ বলল, "মিঁয়াও যদি ছেলে হয় তাহলে এই দু'জনের মধ্যে কেউ হবে। এদের উপরে কড়া নজর রাখতে হবে।"
ডিকে বলল, "এই কাজটা বরং তুই কর, চেষ্টা কর মিঁয়াওকে খুঁজে বার করতে আমি ততক্ষণ দেখি যুধিষ্ঠির কে যদি কোনো ভাবে খুঁজে বার করা যায়।"
শুভ বলল, "সত্যি? আমি একা তদন্ত করব?"
ডিকে বলল, "হ্যাঁ, একেবারে সত্যি।"

(৩)
রাতে হোটেলের রুমে বসে সিসি টিভি ফুটেজ চেক করতে করতে ডিকে বলল, "হর্ষবর্ধন বাবুর রুমে যে কজন যাতায়াত করেছে, তাদের মধ্যে একটা বেয়ারাকে আমার অস্বাভাবিক লাগছে। এই বেয়ারাটাকে আমি একবারের জন্যও হোটেলে দেখিনি।"
শুভ বলল, "তাহলে কি ওই বেয়ারাটাই হারাধন বাবুর রুমে ড্রাগস পৌঁছে দিয়েছে?"
ডিকে বলল, "মনেহয়না। বেয়ারা টা লিফট দিয়ে বেরিয়ে হর্ষবর্ধন বাবুর বাবুর রুমের কলিং বেল প্রেস করেছে, প্রতিটা জায়গাতেই ড্রাগ ডিটেকটর আছে। ড্রাগ নিয়ে গেলে ধরা পড়ে যেত।"
শুভ বলল, "তাহলে?"
ডিকে বলল, "একবার সৌমেন্দ্র বাবুকে জিজ্ঞেস করতে হবে, বেয়ারাটাকে উনি চেনেন কিনা? তাহলেই বোঝা যাবে ব্যাপারটা।"
শুভ বলল, "ওকে ফোন করে ডেকে নিলেই তো কিস্যা খতম।"
ডিকে বলল, "না, ফোন করতে হবেনা, আমরাই নিচে যাচ্ছি। খাতাপত্র চেক করতে হতে পারে।"
শুভ বলল, "আচ্ছা চলো তবে।"

ওরা নিচে এসে রিসেপশনে গিয়ে সৌমেন্দ্র বাবুকে বেয়ারাটার ছবি দেখাল। সৌমেন্দ্র বাবু বললেন, "এই বেয়ারাটা তো আমাদের হোটেলের কেউ নয়," লিজার দিকে তাকিয়ে বললেন, "লিজা তুমি বলতে পারবে, এ কে?"
একটু গভীর মনযোগ দিয়ে ছবিটা দেখে লিজা বলল, "জি হাঁ, মে উসে পেহচানতা হুঁ, ইসকা নাম হে, যুধিষ্ঠির। কুচ দিন পেহলে বিনয়কা জাগা ইয়ে আয়া থা কাম করনে কে লিয়ে।"
ধমক দিয়ে সৌমেন্দ্র বাবু বললেন, "যে কেউ এলেই তুমি তাকে কাজ দিয়ে দেবে? একবারও আমাদের জানাবেনা?"
কাঁচুমাচু স্বরে লিজা বলল, "স্যার, উস দিন বিনয় মুঝে ফোন করকে কাঁহা উসকা তবিয়ত কুচ ঠিক নেহি হে, তো ও উসকা এক দোস্ত কো ভেজ রহা হে উসকা জাগা। মে নে শোচা হোটেলমে স্টাফ থোড়া কম হে, তো..."
সৌমেন্দ্র বাবু বললেন, "হোটেলে স্টাফ কম বলেই অচেনা একজনকে কাজে লাগিয়ে দেওয়া যাবে। তোমাদের বুদ্ধিকেও বলিহারি!" ডিকের দিকে তাকিয়ে বললেন, "কেন? এই লোকটা কি কিছু সমস্যা করেছে?"
ডিকে বলল, "আমার অনুমান এই লোকটাই হর্ষবর্ধন বাবুর কাছে ড্রাগস পৌঁছে দিয়েছে। আর কেবল হর্ষবর্ধন বাবু নয়, এই হোটেলের এমন আট দশ কাস্টমারের কাছে ও রেগুলার ড্রাগস পৌঁছে দেয়।"
চোখ কপালে তুলে সৌমেন্দ্র বাবু বললেন, "কিন্তু কিভাবে? আমাদের হোটেলের সিকুইরিটিতে কি কোনো ফাঁক আছে?"
ডিকে বলল, "না, আপনার হোটেলের সিকুইরিটি ঠিকঠাকই আসে। ড্রাগস আসে বাইরে থেকে, কিভাবে সেটা আশাকরি আজ রাতের মধ্যেই জানতে পেরে যাব।"
সৌমেন্দ্র বাবু বললেন, "আচ্ছা, যত তাড়াতাড়ি জানতে পারেন, ততই মঙ্গল, নাহলে আরো কয়েকটা জীবন হয়তো এভাবেই শেষ হয়ে যাবে।"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "এই বিনয়ের ঠিকানা আমি পেতে পারি?"
বিনয়ের ঠিকানা দিয়ে লিজা বলল, "সব কুচ মেরি গলতি হে সাব, ইস যুধিষ্ঠির কো আপ ছোড়না নেহি, নেহি তো মে খুদকো কভি মাফ নেহি কর সাকুঙ্গি।"
আশ্বাস দিয়ে ডিকে বলল, "চিন্তা কোরোনা। যুধিষ্ঠির ঠিক ধরা পড়ে যাবে।"

রাত দেড়টার দিকে ডিকের ধাক্কায় ঘুম ভেঙে গেল শুভর। ডিকের দিকে তাকিয়ে মালুম হল সে এখোনো ঘুমোয়নি। বলল, "কি হল? এত রাতে ঘুম থেকে তুললে?"
ডিকে বলল, "চল, একটা আশ্চর্য জিনিস দেখাব।"
ডিকের পিছনে পিছনে ব্যালকনিতে বেরিয়ে এল শুভ। বলল, "কি আশ্চর্য জিনিস?"
ডিকে বলল, "কথা না বলে চারদিকে চুপচাপ নজর রাখ। কিছুক্ষনের মধ্যে দেখতে পাবি।"

ডিকের কথামত চারদিকে নজর রাখতে শুরু করল শুভ। হোটেলের বাইরে একটা সুইমিংপুল রয়েছে। তারপাশে রয়েছে একটা ছোট খাটো বাগান। কিছুক্ষন পরে বাগানের একটা ঝোঁপের ভিতরে নড়াচড়া শুরু হল। তারপর ঝোঁপের ভিতর থেকে একটা লোক বেরিয়ে হোটেলের লনে উঠে এল। ফিসফিস করে শুভ বলল, "এত রাতে ওই লোকটা লনে কি করছে? গার্ডের নজর এড়িয়ে লোকটা হোটেলে ঢুকলই বা কিভাবে?"
ডিকে বলল, "কথা না বলে চুপচাপ দেখে যা।"
শুভ মাথা নাড়ল। লোকটা ইতিমধ্যেই হোটেলের কাছাকাছি চলে এসেছে। এরপর যা হল সেটা দেখে শুভর নিজের চোখকেও অবিশ্বাস হতে শুরু করল। হোটেলের কাছে এসে লোকটা দেওয়ালে একটা পা রাখল, তারপর গিরগিটি যেভাবে দেওয়ালে চড়ে সেভাবে হোটেলের দেওয়াল বেয়ে লোকটা উপরে উঠতে লাগল। না, চারহাতে পায়ে নয়, কেবল দুটো পায়ের উপরে ভর করে দেওয়ালের উপরে হাঁটতে হাঁটতে। দেখে মনেহল লোকটা যেন দেওয়ালে উপরে ছুটে বেড়াচ্ছে। অভিকর্ষজ তরনের কোনো প্রভাব যেন ওর উপরে হচ্ছেনা। খানিকক্ষণ এ জানালা সে জানালা ঘুরে লোকটা যখন ফিরে গেল, তখন হুঁশ ফিরল শুভর। বলল, "এ আমি কি দেখলাম? এটা স্বপ্ন না সত্যি?"
ডিকে বলল, "যা দেখলি সবই সত্যি। ফোনটা দে। সৌমেন্দ্র বাবুকে ফোন করে হোটেল থেকে ড্রাগ উদ্ধারের ব্যবস্থা করি।"
শুভ মাথা নাড়ল। ফোন নিয়ে সৌমেন্দ্র বাবুকে রুম নাম্বারের ডিটেলস জানাল ডিকে। কথা শেষ হতে শুভর দিকে তাকিয়ে বলল, "তুই খুব চমকে গেছিস দেখছি। আমি কিন্তু চমকাইনি। তুই যাকে মানুষ বলে ভাবছিস ও আসলে কোনো মানুষই না, ও একটা রোবট, আর টিকটিকির মতো ওর পায়েও বায়ুথলী রয়েছে, যার সাহায্যে ও দেওয়ালে আটকে থাকে, তাছাড়া দেওয়ালে চড়ার আগে ওর মোমেন্টাম ওকে দেওয়ালে ঘুরে বেড়াতে সাহায্য করে।"
শুভ বলল, "কিন্তু এসব কথা তুমি কিভাবে জানলে?"
ডিকে বলল, "কাল রূপলেখার ইমেল এসেছিল জাপান থেকে। ও জানিয়েছে এই রোবট জাপানে আবিষ্কার করা হয়। আবিষ্কারক বিজ্ঞানী টেস্ট করার জন্য তাকে একবার শহরে ছেড়েছিলেন, তখনই ওর ছবি কেউ তুলে নেয়। এরপর ওই বিজ্ঞানী খুন হয়ে যায়, আর রোবট টিও হারিয়ে যায়। কেউ জানতনা রোবট টা কোথায় আছে, যদি না আমরা এই হোয়াইট হাউসে তদন্ত করতে আসতাম।"
শুভ বলল, "কিন্তু রোবটটা এই মেদিনীপুরে এসে পৌঁছাল কিভাবে?"
ডিকে বলল, "জাপান থেকে রোবটটা কোনো তেলবাহী জাহাজে চালান হয়ে হলদিয়া তে আসে। সম্ভবত মিঁয়াও এই রোবটটাকে নিজের কাজে লাগাবে বলে কিনেছিল। কিন্তু ওর ডান হাত যুধিষ্ঠির ওকে ধোকা দিয়ে এই রোবট আর কয়েক কোটি টাকার ড্রাগস চুরি করে হাপিস হয়ে যায়। সেই ড্রাগসই এখন হোটেলে পৌঁছাচ্ছে।"
শুভ বলল, "এসব কথা তুমি জানলে কিভাবে?"
ডিকে বলল, "এটা কিছুটা অনুমান আর কিছুটা প্রমান নির্ভর। যাইহোক, যুধিষ্ঠির কোথায় আছে, সেটা আমি বুঝে নিয়েছি, কাল সকালেই সেখানে যাব।"
শুভ বলল, "কোথায় আছে? আর সেটা  বুঝলেই বা কিভাবে?"
ডিকে বলল, "হিন্ট তোর কাছেও আছে, চেষ্টা কর, তাহলে তুইও বুঝতে পারবি।"

পরদিন সকালে শুভ কে নিয়ে হোটেল থেকে বেরুচ্ছিল ডিকে। হঠাৎ অমিয় বাবু ওদের দেখে এগিয়ে এলেন। বললেন, "কেস তো সমাধান করে ফেলেছেন বলে মনেহচ্ছে, কাল রাতে হোটেল থেকে ড্রাগসও উদ্ধার করেছেন শুনলাম।"
ডিকে বলল, "হ্যাঁ, প্রায় সমাধান করে ফেলেছি।"
অমিয় বাবু বললেন, "এখন কোথায় যাচ্ছেন? যুধিষ্ঠিরকে ধরতে নাকি?"
ডিকে বলল, "হ্যাঁ, অনেকটা সেরকমই। যদি ধরতে নাও পারি ওর ডেরাটা একবার ঢুঁ মেরে আসব।"
অমিয় বাবু বললেন, "আপনাদের যদি আপত্তি না থাকে, আমি কি আপনাদের সঙ্গে যেতে পারি?"
ডিকে বলল, "আপত্তি কেন থাকবে? চলুন না আমাদের সঙ্গে, আমাদের একজন সঙ্গীও বাড়বে।"
একটা টোটো ভাড়া করে ওরা তিনজনে মেজোবাজারে এসে উপস্থিত হল। শুভ বলল, "এখানে কেন এলে? তোমার কি মনেহয় যুধিষ্ঠির এখানেই আছে?"
ডিকে বলল, "পাণ্ডা কি বলেছিল মনে আছে? পাণ্ডা বলেছিল যুধিষ্ঠির এমন একটা জায়গায় আছে যে জায়গাটা বড়োও নয়, আবার ছোটও নয়। অর্থাৎ মেজো বাজার। কাল লিজার কাছে বিনয়ের যে ঠিকানা পেলাম সেটাও এই মেজো বাজারের। তাছাড়া ওই রোবট দেড় কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে কাজ করে। হোয়াইট হাউস থেকে বিনয়ের বাড়িও দেড় কিলোমিটারের মধ্যে, জিপিএস লোকেশন তাই বলছে। তাই দুয়ে দুয়ে চার করতে দেরি করিনি..."
শুভ বলল, "ও আচ্ছা। তারমানে এখানে বিনয়ের বাড়িতে বসে ওর কাজ করছে যুধিষ্ঠির।"
ডিকে বলল, "হ্যাঁ, আমার তাই অনুমান। চল আজ ওর খেল খতম করি।"
শুভ বলল, "চলো।"

কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করে ওরা বিনয়ের বাড়িতে এসে পৌঁছাল। বাড়িতে ঢোকার আগে শুভ বলল, "রিস্ক নেওয়া বোধহয় উচিৎ হবেনা। আমার মনেহয় যুধিষ্ঠির কোনো ভাবে টের পেয়েছে আমরা ওর বাড়িতে যাচ্ছি। তাই আমাদের পিছনে লোক লাগিয়েছে।"
ডিকে বলল, "তুই কিভাবে বুঝলি?"
শুভ বলল, "হোটেল থেকে বেরুবার সময় কিছু লোককে আমাদের পিছনে দেখেছিলাম, বাড়ির আশেপাশেও সেই লোকগুলোকে দেখলাম। দেখে মনেহল আমাদের দিকেই নজর রাখছে।"
অমিয় বাবু বললেন, "আমি যতদূর জানি যুধিষ্ঠিরে বিনয় ছাড়া অন্য কোনো সঙ্গী নেই, তাই যাদের দেখেছেন তারা যুধিষ্ঠিরের লোক নয় বলেই আমার ধারনা। চলুন ভিতরে ঢোকা যাক।"
ডিকে বলল, "আপনার উৎসাহ বেশ বেশি দেখছি।"
অমিয় বাবু বললেন, "প্রথম বার কোনো ডিটেকটিভের সঙ্গে এডভেঞ্চারে আসছি, উৎসাহ তো থাকবেই।"
ডিকে বলল, "নাহলে কেউ এই বয়সে হাতে ট্যাটু করে?"
অমিয় বাবু বললেন, "সেটাও দেখে নিয়েছেন দেখছি। হ্যাঁ, ওটা কম বয়সে বানিয়েছিলাম, এখোনো থেকে গিয়েছে।"
দরজার কাছে গিয়ে টোকা মারল ডিকে। একটা কালো মোটামতো লোক দরজা খুলে দিল। ডিকের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল, "কে আপনারা? কাকে চাই?"
ডিকে বলল, "যুধিষ্ঠির আছে?"
লোকটার মুখ সঙ্গে সঙ্গে শুকিয়ে গেল। বলল, "আপনারা কে?"
ডিকে উত্তর দিলনা। লোকটাকে ধাক্কা মেরে ভিতরে ঢুকে পড়ল। বারান্দা পেরিয়ে একটা রুমে যেতেই দেখতে পেল সিসি টিভি ফুটেজে দেখা লোকটা হাতের কাছে বেশ কয়েকটা বাক্স নিয়ে টাকা গুনছে। ডিকেকে দেখেই ওর মুখ শুকনো হয়ে গেল। তোতলাতে তোতলাতে বলল, "কে আপনারা?"
ডিকে বলল, "তোমার ব্যবসা খতম যুধিষ্ঠির। আজ ডিটেকটিভ ডিকের হাতে তুমি ধরা পড়ে গেছ।"
নিজেকে সামলে নিয়ে যুধিষ্ঠির উঠে দাঁড়াল। বলল, "যুধিষ্ঠিরের খেল খতম করতে কেউ পারেনি। মিঁয়াও পর্যন্ত পারেনি। আর তুই চুটে মুটে ডিটেকটিভ  আমাকে এরেস্ট করবি?"
ডিকে কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই যুধিষ্ঠির চিৎকার করল, "এরিগাতো, কিল দেম..."
ঘরের কোনায় একটা কিছুর উপরে কাপড় ঢাকা দেওয়া ছিল। জিনিসটা সঙ্গে সঙ্গে নড়ে চড়ে উঠল। তারপর ভিতর থেকে হোটেলের লনে দেখা মানুষটা বেরিয়ে ডিকে দের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। শুভ চিৎকার করল, "রোবট এটাক।"
রোবটটা কাছাকাছি আসতেই পকেট থেকে বেশ কয়েকটা মার্বেল বার করে ওর পায়ের দিকে গড়িয়ে দিল শুভ। রোবটের পায়ের তলায় ঢুকে যেতেই রোবট টা এদিক ওদিক কয়েকবার হেলে দুলে মাটির উপরে আছড়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে রোবটের গায়ে ঝাপিয়ে পড়ে রোবটটার কান মুচড়ে ওকে শান্ত করে দিল ডিকে। রোবটকে এভাবে কাবু হয়ে যেতে যুধিষ্ঠিরের মুখ শুকনো হয়ে গেল। কোমরে গোঁজা পিস্তল বার করে ডিকে দিকে তাক করে সে বলল, "রোবটের হাত থেকে নাহয় বেঁচে গেলি, এটার হাত থেকে কিভাবে বাঁচবি?"
ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখল শুভ। অমিয় বাবুর হাতের একটা কেরামতিতে যুধিষ্ঠিরের শরীরটা শূন্যে উঠে দড়াম মাটিতে আছড়ে পড়ল, আর ওর পিস্তলটা উঠে এল অমিয় বাবুর হাতে। তারপরেই দুম করে একটা শব্দ। অমিয় বাবুর পিস্তলের একটা গুলি যুধিষ্ঠিরের শরীর ভেদ করে বেরিয়ে গেল। তারিফ করার সুযোগ শুভ পেলনা। কারন পিস্তলটা এবারে উঠে দাঁড়ানো ডিকের দিকে তাক করা। অমিয় বাবু বললেন, "নিন রোবটাকে আস্তে আস্তে আমার হাতে তুলে দিন, ওটা আমার সম্পত্তি।"
ডিকে বলল, "বে আইনি ভাবে কেনা জিনিস কারুর সম্পত্তি হতে পারেনা। শুভ কুইক।"
আর লেট করলনা শুভ। অমিয় বাবুর হাত লক্ষ্য করে ঝেড়ে একটা লাথ চালাল। অমিয় বাবুর হাতের পিস্তলটা একপাশে ছিটকে পড়ল। হাসতে হাসতে অমিয় বাবু বললেন, "আমার হাত থেকে নাহয় তোমরা বেঁচে যাবে, কিন্তু বাইরে আমার দলের লোকেদের হাত থেকে বাঁচবে কিভাবে?"
ডিকে বলল, "সে ব্যবস্থাও আমি করে রেখেছি। সমীর বাবু...?"
ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই শুভ দেখল কয়েকজন কনস্টেবল কে নিয়ে রুমে এসে ঢুকলেন কোতোয়ালি থানার পুলিশ অফিসার সমীর বাবু। কনস্টেবল দের হাতের রাইফেল অমিয় বাবুর দিকে তাক করা। ডিকের দিকে তাকিয়ে তারিফের সুরে বললেন, "গুড জব ডিকে। আপনার এই অবদান পুলিশ অনেক দিন মনে রাখবে। যে কুখ্যাত ডিলার মিঁয়াওকে ধরতে সারা ভারতের পুলিশের কাল ঘাম ছুটে যাচ্ছে তাকে এত সহজে আপনি ধরে ফেলবেন এটা আমাদের কল্পনার বাইরে ছিল।"
ডিকে বলল, "আমরা তো এখানে যুধিষ্ঠির কে ধরতে এসেছিলাম, ও তো উপরি হিসাবে জুটে গেল। আপনাদেরও ধন্যবাদ, আমার একটা সিগন্যাল পেতেই পুরো ফোর্স নিয়ে এখানে হাজির হবার জন্য।"
সমীর বাবু বললেন, "এ তো আমাদের ডিউটি।"

সেদিন বিকেলে হোটেলের লবিতে বসে গল্প জুড়েছিল ডিকে। ম্যানেজার বাবু এমনকি লিজাও কেসের আদ্যোপান্ত জানার জন্য উদগ্রীব হয়েছিল। মেদিনীপুর সংবাদ পত্রিকার রিপোর্টার এসেছে। এই প্রথম বার কোনো পত্রিকার রিপোর্টার ডিকের কাছে এল। ডিকের এই এডভেঞ্জারের ঘটনা নিয়ে তারা একটা রিপোর্ট লিখতে চায়। কেসের সব কিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শোনার পরে সৌমেন্দ্র বাবু বললেন, "আমাদের হোটেলে এতদিন ধরে একটা কুখ্যাত অপরাধি বসে আছে, আমরা জানতেই পারলাম না, আপনি এই কদিন এসেই কিভাবে জেনে ফেললেন?"
শুভ বলল, "আমারও প্রশ্ন সেটাই, তুমি কিভাবে জানলে অমিয় বাবুই আসলে মিঁয়াও?"
ডিকে বলল, "ছটু এক্সপার্ট মিঁয়াও এর ব্যাপারে কি বলেছিল মনে আছে কি তোর?"
শুভ বলল, "হ্যাঁ, মনে আছে। ও বলেছিল মিঁয়াও এর হাতে একটা উল্কি রয়েছে, তাতে লেখা রয়েছে এম এ। কিন্তু অমিয় বাবুর হাতে লেখা রয়েছে এ এম, অমিয় মাইতির সর্ট ফর্ম। দুটো পুরোপুরি আলাদা, তাছাড়া কারুর হাতে উল্কি থাকলেই যে সে মিঁয়াও হবে তারও কোনো গ্যারেন্টি নেই।"
ডিকে বলল, "হ্যাঁ, সেটা ঠিক। কিন্তু আর একটু ভাল করে ভেবে দেখ, ও উল্কিটা কোথায় দেখেছিল?"
একটু ভেবে শুভ বলল, "কোথায় দেখেছিল? বাইকের আয়নায়। উরিব্বাস! এবারে বুঝে গেছি।"
সৌমেন্দ্র বাবু বললেন, "কিন্তু আমরা তো বুঝতে পারলাম না।"
ডিকে বলল, "আমরা যখন ছটু এক্সপার্টের কাছে যাই ও আমাদের বলেছিল সেও মিঁয়াও কে দেখেনি। এমনকি ও এমনই ছদ্মবেশে থাকে, ওর নিজের ডান হাত যুধিষ্ঠিরও ওকে চিনতে পারেনি, তাহলে আমরা কিভাবে চিনলাম? ছটু এক্সপার্ট আমাদের বলেছিল, সে বাইকের আয়নায় মিঁয়াও এর হাতে একটা উল্কি দেখেছিল, যাতে লেখা আছে এম এ। যা সম্ভবত ওর আসল নামের সর্ট ফর্ম। আমি তখনই বুঝে গিয়েছিলাম ওর নামের আসল সর্টফর্ম এ এম। আয়নায় পার্শীয় পরিবর্তনের জন্য আপনি ডান হাত কে বাম হাত আর বাম হাতকে ডান হাত দেখবেন, ঠিক একই ভাবে এ এম কে দেখবেন এম এ। তারপর পাণ্ডার কাছে জানলাম মিঁয়াও এই হোটেলেই আছে, আর অবশেষে হোটেলের রেজিস্টার চেক করে দেখলাম, এ এম সর্ট ফর্মের একজন মানুষই আছে এই হোটেলে তিনি হলেন অমিয় মাইতি।"
ডিকের কথা শেষ হতেই হাত তালি দিয়ে উঠলেন সৌমেন্দ্র বাবু। বললেন, "দুর্দান্ত! এই নাহলে ডিটেকটিভ। আপনার জন্য আমার তরফ থেকে একটা ছোট্ট গিফট রয়েছে।"
বলে পকেট থেকে চেক বুক বার করে খসখস করে একলক্ষ টাকার একটা চেক ডিকের নামে লিখে দিলেন।

(সমাপ্ত)

হিমের ঘর

হিমের ঘর

শঙখ শুভ্র নায়ক



রাত এগারোটা বাজে। ডিনার সেরে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়ে ছিল আকাশ। মৃদুমন্দ হাওয়া বইছে। চাঁদ মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়েছে। সামনের গাছগুলো থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁর স্বর। বহুদূরে দপদপ করে জ্বলছে একখানা ল্যাম্পপোষ্ট। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের অনিশ্চিত চিন্তায় মগ্ন ছিল আকাশ। মনের মধ্যে দোলাচল চলছিল। হঠাৎ সমস্ত নীরবতাকে ছিন্ন করে ওর ফোনটা ঝনঝন করে বেজে উঠল। মোবাইল স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে দেখল একটা আননোন নাম্বার ফুটে উঠেছে। নাম্বারটা দেখে কোনো আত্মীয় পরিজনের নাম্বার বলেও মনে হচ্ছে না। একটু বিরক্তভাবেই ফোনটা ধরল আকাশ। ঝাঁঝাঁলো গলায় বলল, "হ্যালো, কে বলছেন?"
ওপাশ থেকে একটা মেয়ের মিষ্টি স্বর ভেসে এল, "হ্যালো রাজু, আমি পায়েল বলছি।"
উফ! বিরক্তিকর। এই দুশ্চিন্তার সময়ে এইসব উটকো কল মোটেই ভাল লাগেনা আকাশের। তাই "রং নাম্বার" বলেই সে ফোনটা কেটে দিল, অপর পক্ষকে আর কিছু বলার সুযোগ দিল না।

এম এস পাস করে একবছর হাউস স্টাফ, তারপর রুরাল বন্ডে একটা হাস্পাতালে জয়েন করতে চলেছে আকাশ, হরিনারায়নপুর নামে একটা গ্রাম। আকাশের আদি বাড়ি উত্তর কলকাতায়, সেখানেই ওর জন্ম থেকে বড় হয়ে ওঠা। রাতের ঘন অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নানা চিন্তা আকাশের মাথায় আসছিল। কেমন হবে হরিনারায়নপুর জায়গাটা? ওখানের মানুষরাই বা কেমন হবে? যদিও তিনটে বছর কাটিয়েই সে ফিরে আসবে নিজের শহরে। এখানে সুযোগ সুবিধা, যশ, খ্যাতি সবকিছুই অনেক বেশি। প্রাইভেট প্র‍্যাকটিসের স্কোপটাও বেশি। তাছাড়া প্রাইভেট নার্সিংহোম বা সরকারি হাস্পাতাল তো আছেই। কিন্তু এই তিনটে বছর গ্রামের পরিবেশের সাথে নিজেকে অ্যাডজাস্ট করতে পারবে তো! এইসবই চিন্তাভাবনায় ওর মেজাজটা একটু চুলকে ছিল, সেই অবস্থায় এই কল। একটু রুড ব্যাবহারই করে বসল সে, নাহলে হয়তো একটু ভদ্রভাবে কথা বলত।
ছাব্বিশ সাতাশের মতো বয়স হলেও আকাশ এখনও সিঙ্গেল। এতদিন বইয়ের পাতায় মুখগুঁজে পড়ে থাকা আকাশের জীবনে প্রেম আসেনি। দু'একজন যে প্রপোজ করেনি তা নয়, তবে কেউই ওর মনের মধ্যে সেভাবে জায়গা করে নিতে পারেনি। তবে আজকাল মাঝে মাঝে আকাশের মনে হয় একটা রিলেশন হলে মন্দ হত না। এইসব ভাবতে ভাবতে সে বেড রুমে এসে ঢুকল। বিছানা পেতে যখন সে ঠিক শুয়ে পড়ার উপক্রম করছে তখনই দ্বিতীয় বার সেম নাম্বার থেকে কলটা এল। এবারে সে আর ততটা বিরক্তি দেখাল না। ফোনটা ধরে ভদ্রভাবে বলল, "হ্যালো বলুন।"
মেয়েটা বলল, "সরি, আপনাকে আবার বিরক্ত করলাম, কিছু মনে করলেন না তো?"
মেয়েটার গলার স্বর ভীষণ মিষ্টি। আকাশের মনে হল ফোনের ওপারে যেন সেতার বাজছে। ওর মনের সব বিরক্তি এক নিমিষে উধাও হয়ে গেল। বলল, "আরে না না। বরং আমারই সরি বলা উচিৎ, আপনার সঙ্গে ওইরকম ব্যবহার করলাম তখন।"
মেয়েটা হাসল। বলল, "কি যে বলেন আপনি? ডিস্টার্ব করলাম আমি আর ক্ষমা চাইবেন আপনি?" একটু থেমে বলল, "যাইহোক, ভুল করে ফোনটা যখন লেগেই গেল, তখন আপনার সঙ্গে আলাপ হতে পারে কি?"
আকাশ বুঝল মেয়েটা ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাইছে। অন্য সময় হলে সে বিশেষ পাত্তা দিতনা, কিন্তু আজকে মেয়েটার সঙ্গে কথা বলার একটা ইচ্ছে যেন ওকে পেয়ে বসল। বলল, "নিশ্চয়ই পারেন।"
মেয়েটা বলল, "আমার নাম পায়েল, পায়েল বোস, আপনি?"
আকাশ বলল, "আমার নাম আকাশ রয়।"
পায়েল খুব মিষ্টি গলায় বলল, "আচ্ছা, গলা শুনে আপনার বয়স খুব বেশি বলে মনে হচ্ছে না। আপনি ব্যাচেলার নাকি ম্যারেড?"
প্রশ্নটা শুনে মুচকি হাসল আকাশ। ওর মনের ভিতরে কয়েকটা ডলফিন যেন অজান্তেই নেচে উঠল। বলল, "না, আমি ব্যাচেলার। এই সদ্য চাকরিতে জয়েন করতে চলেছি। সেটেল হলে বিয়ে করার ডিসিশন রয়েছে।"
অবাক হওয়া গলায় পায়েল বলল, "ও আচ্ছা, দারুণ ব্যাপার তো! কিসের চাকরি জানতে পারি কি?"
আকাশ বলল, "কিছুদিনের মধ্যেই একটা হাস্পাতালে ডাক্তার হিসাবে জয়েন করতে চলেছি।"
এমনই কিছু শোনার প্রতীক্ষাতেই যেন ছিল পায়েল। বিস্মিতভাবে বলল, "ওয়াও! আই রেসপেক্ট দি ডক্টরস ভেরি মাচ।"
আকাশ বলল, "আপনি কি করেন? পড়াশুনা?"
পায়েল বলল, "পড়াশুনা কমপ্লিট করে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করছি। একা মানুষ। নিজের খরচটুকু ভালোভাবে চলে যায়।"
এই একটা কথাতেই আকাশের মনের ভিতরে মেয়েটা যেন অনেকটা জায়গা করে নিল। আকাশ বলল, "কোনো মেয়ে স্বাবলম্বী হয়ে নিজের জীবন কাটাচ্ছে এটা শুনলে আমার খুব ভাল লাগে।"
পায়েল হাসল। বলল, "ওই আর কি, যার কেউ নেই, তার ঈশ্বর আছেন।"
পায়েলের সঙ্গে আকাশের পরিচয়ের প্রাথমিক পর্বটা অনেকটা এরকমই ছিল। সেদিন ফোন রাখার আগে পায়েল বলেছিল, "আমি যদি আপনাকে মাঝেমাঝে ফোন করি, আপনার অসুবিধে হবে না তো?"
আকাশ বলল, "আমি যতদিন না পর্যন্ত ডিউটিতে জয়েন করছি, ততদিন পর্যন্ত ফ্রি আছি। ফোন করতে পারেন। আমারও কিছুটা টাইম কাটবে।"
পায়েল বলেছিল, "আচ্ছা। তাই হোক। এই টাইমেই করব। আমি এই টাইমটা ফাঁকা থাকি। নাহলে সারাদিনই ব্যস্ত থাকতে হয়। বুঝতেই পারছেন প্রাইভেট সেক্টরে চাকরি, ভীষণ চাপ থাকে।"
আকাশ বলল, "আচ্ছা, তাই হোক।"

ফোন কেটে দিল পায়েল। এরপর থেকে রাত ঠিক এগারোটা বাজলেই আকাশের কাছে পায়েলের ফোন আসে। দিনের বেলায় নাম্বারটাতে দু'একবার ট্রাই করে দেখেছে আকাশ। ফোন সুইচ অফ বলেছে। এই নিয়ে আকাশ অবশ্য কোনো প্রশ্ন করেনি। কারণ দিনের বেলা অফিসে থাকলে ওর ফোন সুইচ অফ থাকে, এটা পায়েল আগেই বলে দিয়েছিল।

সেদিনের সেই প্রাথমিক পরিচয় কয়েকদিনের মধ্যে সিঁড়ি বেয়ে ক্রমশ গভীর হতে শুরু করেছে। এই ক'দিনে পায়েলের ব্যাপারে অনেক কিছুই জেনেছে আকাশ। পায়েলের বাবা মা কেউই নেই, একটা অনাথ আশ্রমে মানুষ। নিজের চেষ্টায় একা হাতে লড়াই করতে করতে সে আজ নিজের মাটিটাকে শক্ত করতে পেরেছে। অনেক কু প্রস্তাব এসেছে জীবনে, সেসব অগ্রাহ্য করে সে ভদ্রভাবে সমাজে বাঁচতে চেয়েছে। শুনতে শুনতে আকাশের কেমন যেন মায়া পড়ে গেছে পায়েলের উপরে। সেদিন রাতে পায়েল ফোন করতেই আকাশ জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, তুমি কোথায় থাকো জানতে পারি কি? এতদিন কথা হচ্ছে কিন্তু এটা তুমি আমাকে কখনোই বলনি।"
পায়েল হাসল। বলল, "তুমিও তো বলোনি। আগে তুমি বলো, তুমি কোথায় থাকো?"
রেগুলার কথা হলেও আকাশ এক্ষুণি নিজের বাড়ির ঠিকানাটা ওকে জানাতে চাইল না। তাই একটু কাব্য করে বলল, "সূর্যের আলো আর চাঁদের জ্যোৎস্না ভরা ঘরে মা বাবার সাথে থাকি। এবার বল, তুমি?"
পায়েলও পালটা হেঁয়ালি করেই বলল, "আমি তো ঠাণ্ডা ঘরের বাসিন্দা, সূর্যের আলো আমায় ছুঁতে পারেনা। আমার বন্ধুদের সাথে থাকি।"
আকাশ হাসল। ব্যঙ্গের সুরে বলল, "তুমি আন্টার্টিকায় থাক নাকি?"
পায়েল বলল, "হতেও পারে।"
হাসতে হাসতে আকাশ বলল, "তাহলে আমরা তো দুই মেরুর বাসিন্দা।"
গুনগুন করে পায়েল গান ধরল, "না চাহিলে যারে পাওয়া যায়, তেয়াগিলে আসে হাতে..."

তারপরে আরো কয়েকটা দিন কেটে গেছে। ওর হাস্পাতালে জয়েনিং এর তারিখ ক্রমশ এগিয়ে এসেছে। সেদিন রাতে ওর মনটা খুব আনচান করছিল। সবাইকে ছেড়ে যেতে হবে একথা ভাবলেই মনটা কেমন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। সেদিন পায়েল ফোন করতেই, আর থাকতে না পেরে পায়েলকে বলে বসল, "এতদিন তো কথা হচ্ছে, প্রায় দু'মাস। অথচ আমি আজ পর্যন্ত তোমাকে দেখিনি। আমি তোমার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই।"
আকাশ জানত সে হতাশ হবে, আর হলও তাই। পায়েল বলল, "এক্ষুণি দেখা করতে পারবনা গো। আমি নিরুপায়। তবে তুমি তো ডাক্তার, দেখবে একদিন না একদিন ঠিক দেখা হয়ে যাবে।"
আকাশ বলল, "কেন, ডাক্তার হলেই কিভাবে দেখা হবে শুনি?"
পায়েল বলল, "ডাক্তারের কাছে তো রুগিকে আসতেই হয়, তাই আমাকেও একদিন তোমার কাছে আসতে হবে।"
আকাশ একটু থমকে গেল। বলল, "তোমার কি কোনো অসুখ আছে?"
একটু থেমে পায়েল বলল, "হ্যাঁ, খুব বড়ো অসুখ। এই অসুখ আর কখনোই সারবে না।"
পায়েলের অসুখটা কি জিজ্ঞেস করার সাহস হল না আকাশের। এত সুন্দর একটা মিষ্টি মেয়ে সে কীনা শরীরে এমন একটা রোগ পুষে রেখেছে, যা কখনো সারবেনা, এটা ভেবেই ওর মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। সে জানে সব অসুখ সারানোর পদ্ধতি মেডিকেল সায়েন্সেরও জানা নেই। তবু সান্ত্বনা দিয়ে বলল, "তুমি এত ভেঙ্গে পড়ো না, তোমার অসুখ আমি ঠিক সারিয়ে তুলব।"
হালকা হেসে পায়েল বলল, "আচ্ছা, তুমি হাস্পাতালে জয়েন করো, তারপর আমি তোমার সঙ্গে দেখা করব।"
আকাশ বলল, "প্রমিশ?"
পায়েল বলল, "একদম পাক্কা প্রমিশ।"

ফোন কাটার পরে খানিকক্ষণ স্তম্ভিতভাবে বসে রইল আকাশ। যাকে সে ভালবেসে মনের মধ্যে জায়গা দিয়েছিল, তার এরকম একটা অসুখ আছে সেটা সে জানতই না। পায়েলকে হারিয়ে ফেলতে হবে ভাবলেই ওর বুকের ভিতরে কতকটা হাওয়া এসে ঢুকে পড়ছিল।

আজ দু'দিন হল নতুন হাস্পাতালে শিফটিং হয়ে এসেছে আকাশ। হাস্পাতালটা যতটা খারাপ হবে সে ভেবেছিল, ঠিক ততটাও নয়, বরং বেশ ভালই বলা যায়। ওটি, মর্গ সবই রয়েছে হাস্পাতালে, কেবল ডাক্তারেরই অভাব। সেই একমাত্র ডাক্তার, আর আছে একজন নার্স ও একজন স্টাফ।

কোয়াটারে গোছগাছ করতে করতেই প্রথম দিনটা কেটে গেল। দ্বিতীয় দিন থেকে পুরোদমে কাজে লেগে পড়ল আকাশ। প্রথমে গোটা হাস্পাতালটাকে ঘুরে ঘুরে দেখল, তারপর হাস্পাতালে স্টাফ রঘুকে নিয়ে মর্গে গেল। মর্গের একপাশে রয়েছে ফ্রিজিং বক্স। বেওয়ারিশ লাশগুলো ওখানেই রাখা থাকে। কয়েকদিন হল একটা খবর হামেশাই চোখে পড়ছে আকাশের। এইসব গ্রামাঞ্চলের হাস্পাতাল থেকে লাশ পাচার আজকাল একটা বড়ো ব্যাবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে, এখানেও সেরকম কিছু হচ্ছে কীনা জানার জন্য রেজিস্টার দেখে ফ্রিজারে রাখা লাশের সংখ্যা সে মিলিয়ে নিতে চাইছিল। কারণ এরপরে কিছু ঘটলে, তার সমস্ত দায় এসে পড়বে আকাশের কাঁধে, আর এইসব ঝুট ঝামেলা সে মোটেই চায় না। কিন্তু রঘুকে এইসব বুঝতে দেয়া যাবেনা, তাই ওর দিকে তাকিয়ে মজার ভঙ্গীতে বলল, "যাও, রেজিস্টারটা নিয়ে এসো। কেস হিস্ট্রি দেখে এই লাশগুলোর সঙ্গে পরিচয় করা যাক।"

রঘু রেজিস্টার নিয়ে ফিরে আসতেই একের পর এক ফ্রিজারের বক্সগুলোকে টেনে টেনে খুলতে লাগল আকাশ। রেজিস্টার আর ছবি দেখে রঘু লাশগুলোর নাম আর কেস হিস্ট্রি বলে দিতে লাগত। গোটা চারেক বক্স খোলার পরে সে যখন পঞ্চম বক্সটাতে এসে পৌঁছেছে তখন রঘু বলল, "এই কেসটা খুবই মর্মান্তিক। আমাদের হাস্পাতালের তো একজন মাত্র ডাক্তার, আপনার আগের ডাক্তারবাবু সেদিন ছুটিতে ছিলেন, আর এই কারণেই বিনা চিকিৎসায় একে মরতে হয়। ওকে অন্য হাস্পাতালে ট্রান্সফার করার মতোও কেউ ছিলনা সেদিন।"

আক্ষেপে মাথা নেড়ে বক্সটা খুলে ফেলল আকাশ। বক্সের ভিতরে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রয়েছে একটা মেয়ে। কি জীবন্ত আর নিষ্পাপ লাগছে মেয়েটার মুখখানা। রঘু বলল, "এই মেয়েটার নাম পায়েল বসু। আমাদের পাশের পাড়াতেই থাকত। একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করত। মাস চারেক আগে রাত এগারোটার দিকে হঠাৎ প্রচন্ড টাইফয়েড নিয়ে হাস্পাতালে ভর্তি হয়। হাস্পাতালে আসার পরেও অনেকক্ষণ বেঁচে ছিল মেয়েটা। আমি স্যারদের সাথে থাকতে থাকতে যেটুকু শিখেছিলাম, সেই বিদ্যে থেকেই দুই একটা ওষুধ দিয়েছিলাম, কিন্তু বাঁচাতে পারিনি, বলতে গেলে বিনা চিকিৎসায় মেয়েটা মারা যায়। অনাথ মেয়ে বলে ওর লাশটাকে নিয়ে যাওয়ার লোকও পাওয়া যায়নি, সে থেকে এখানেই রাখা আছে।"
আকাশের ভ্রূ কুঁচকে গেল। নামটা বার দুই মনে উচ্চারণ করল, এই পায়েল সেই পায়েল নয়তো! না, তা কিভাবে হয়! যার সঙ্গে তার রোজ কথা হয় সে কিভাবে মৃত হতে পারে? বলল, "সত্যিই একটা দারুণ কো-ইন্সিডেন্স। আমারও এখানে আসার বেশ কিছুদিন আগেই একজনের সাথে পরিচয় হয়েছে, আর তার নামও পায়েল, সেও প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে, আর সেও অনাথ।"
রঘু বলল, "তাই? তার বাড়ি কোথায়?"
রঘুর প্রশ্নটা শুনেই হঠাৎ বিদ্যুৎ ঝলকের মতো একটা কথা মনে পড়ে গেল আকাশের, ওর সারা শরীরটা কাঁটা দিয়ে উঠল। পায়েল বলেছিল, ও খুব ঠান্ডা একটা ঘরে ওর বন্ধুদের সাথে থাকে, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না।
এই ফ্রিজারের ভিতরটাও তো খুব ঠান্ডা। এখানেও সূর্যের আলো পৌঁছায়না। তাছাড়া এখানেও তো পায়েলের মতো আরো অনেকেই আছে!
তাড়াহুড়ো করে রঘুকে বলল, "আচ্ছা, পায়েলের কোনো মোবাইল নম্বর তোমার কাছে আছে?"
রঘু বলল, "হ্যাঁ, রেকর্ডে আছে, হাস্পাতালে ভর্তি হওয়ার পরে কেউ ওর ফোনটা হাস্পাতালে জমা দেয় তখনই নাম্বারটা রেকর্ড করা হয়।"
নিজের ফোনটাকে বার করে নাম্বারটা বলে আকাশ জানতে চাইল, "এই নাম্বারটা নয়তো?"
রঘু ফাইল থেকে চেক করে ভ্রূ কুঁচকে বলল, "হ্যাঁ, এই নাম্বারটাই তো, কিন্তু নাম্বারটা আপনি কিভাবে পেলেন? ওর ফোন তো আজ বহুকাল ধরে আমাদের স্টোর রুমে সুইচ অফ হয়ে পড়ে আছে।"
আকাশের হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, কপালে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। রঘুর কথার কোনো উত্তর না দিয়ে ফ্রিজারের বাক্সটাকে ভিতরের দিকে ঠেলে বন্ধ করে দিল ও। পিছন ফিরতেই শুনতে পেল কে যেন ওর কানে কানে ফিসফিস করে বলছে, "বলেছিলাম না, তুমি হাস্পাতালে জয়েন করো, তারপর আমি তোমার সঙ্গে দেখা করব। আমি কিন্তু কথা রেখেছি আকাশ।"
আকাশের বুকের ভিতরটা মুচড়ে উঠল। কি যেন বলার চেষ্টা করল সে। পারল না। রঘু বলল, "গ্রামের হাস্পাতাল বলে এখানে কেউ এলেও দু'তিন বছরের বেশি থাকতে চায়না। চলে গেলে হাস্পাতাল আবার ডাক্তারশূন্য হয়ে যায়। আমাদের মতো মানুষগুলোর জীবনের তো কোনো দাম নেই স্যার, তাই আমাদের বিনা চিকিৎসায় মরতে হয়।"
আকাশের চোখের কোণায় একবিন্দু জলের রেখা দেখা দিয়েছে। নিজের প্রিয়জনের বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ার দুঃখ আজ বুঝেছে আকাশ, পায়েল ওকে বুঝিয়ে দিয়েছে সেই কষ্ট। মনে মনে ভাবল, পায়েলের এই চেষ্টাকে নিজের স্বার্থের জন্য, সুখের জন্য বৃথা হয়ে যেতে দেবে না সে। রঘুর দিকে তাকিয়ে আশ্বাসের সুরে বলল, "আমি থাকব রঘু। যতদিন না পর্যন্ত আমার ট্রান্সফার হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত আমি থাকব। আর তারপরেও এই গ্রামের কাছাকাছিই কোনো একটা হাস্পাতালে চাকরি নিয়ে এখানেই প্র‍্যাকটিস শুরু করব, আর কোনো পেসেন্টকে আমি বিনা চিকিৎসায় মরতে দেব না।"

(সমাপ্ত)

©All rights reserved to sankha subhra nayak

স্বপ্নযাত্রা

স্বপ্নযাত্রা

শঙখ শুভ্র নায়ক


মধ্যরাতে হঠাৎ চোখ খুলতেই সৌরভ দেখতে পেল, সে একটা ধানের ক্ষেতের মাঝখানে পড়ে আছে। আকাশে জ্বলজ্বলে আধখানা চাঁদ উঠেছে। ওর কোলের উপরে লাফালাফি করছে একটা ইঁদুর। ওপাশে বট গাছের পাতায় জোনাকি জ্বলজ্বল করছে। আর গাছের ডালে বসে ওর কোলের দিকে শ্যেনদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে একটা কালো কুচকুচে প্যাঁচা।

বসে বসে বেশ খানিকক্ষণ ধরে কী যেন ভাবল সৌরভ। এখানে সে কিভাবে এল? ওর কী হয়েছিল? অবশেষে সে যখন শিওর হল, এটা বাস্তব নয়, একটা স্বপ্নমাত্র, তখন মাটি থেকে উঠে দাঁড়াল। চারপাশে একবার তাকিয়ে বুঝতে পারল, স্বপ্নের মধ্যে সে পৌঁছে গেছে ওর পুরানো গ্রামে। এই গ্রামেই ওর বাল্যকাল কেটেছে, এখানেই ওর বড়ো হয়ে ওঠা। বয়ঃপ্রাপ্ত হবার পরে এই গ্রামেরই মেয়ে শিঞ্জিনীর সঙ্গে ওর সম্পর্ক হয়েছিল। এই ধানক্ষেত, ওই সরষে ক্ষেত, কিম্বা দূরের ওই বাঁশ বাগানের আড়ালের পোড়ো বাড়িতে একদিন শিঞ্জিনীকে কত আদরই না করেছে! ওকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কত ভালোবাসাই না চুরি করে নিয়েছে!
গ্রামের ব্রিলিয়ান্ট ছেলে ছিল সৌরভ। স্কুল থেকে ঝাঁ চকচকে রেজাল্ট নিয়ে পাস করার পরে ভর্তি হয়েছিল বিটেক কলেজে। কলেজ থেকে পাস করে বেরোনোর পরেই হঠাৎ বিদেশ থেকে দুর্দান্ত একখানা অফার পেয়ে সে পাড়ি দিয়েছিল লন্ডনে। কিন্তু এখানে আসার পরে শহরের এই গতিময় জীবনযাত্রার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে খাওয়াতে সে ভুলে গিয়েছিল নিজের অতীতের কথা। ভুলে গিয়েছিল নিজের মা-বাবার কথা এমনকি শিঞ্জিনীর কথাও।

কোম্পানিতে কাজ করতে করতেই একদিন কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টার জেকবের মেয়ে জেনির সঙ্গে ওর ঘনিষ্টতা হয়। জেনি ডিভোর্সি। ওর চেয়ে বয়সেও বছর কয়েকের বড়ো। কিন্তু অগাধ সম্পত্তির মালিক। তাই ওকে বিয়ে করতে পারলে সে যে একটা বড়ো দাঁও মেরে দেবে সেকথা খুব ভাল করেই বুঝতে পেরেছিল সৌরভ। সুতরাং সিদ্ধান্তটা নিতে লেট করেনি।

সেই দিনের কথা ছবির মত স্পষ্ট মনে আছে সৌরভের। জেনিকে প্রপোজ করার জন্য একটা কফিশপে ডেকেছিল সৌরভ, হঠাৎ ওর মোবাইলে শিঞ্জিনীর কল ঢুকল। বিরক্ত ভাবে ফোনটা রিসিভ করল সৌরভ। এরকম একটা টাইমে শিঞ্জিনীর কল এলে সত্যিই মুডটা নষ্ট হয়ে যায়। কড়া গলায় বলল, "কি হল? এই টাইমে কল করলে কেন?"
ওইপ্রান্ত থেকে শিঞ্জিনীর স্বর ভেসে এল, "কি করছ তুমি? এমনিতে তো আমার ফোন ধরই না, আজ যদিও বা ধরলে এত বিরক্তি কেন দেখাচ্ছ?"
সৌরভ বলল, "আমি অফিসে কাজ করছি, এখন আমাকে ডিস্টার্ব করো না। কি বলতে চাইছ তাড়াতাড়ি বলো?"
শিঞ্জিনী উত্তর দিল, "তুমি তো জানোই আমি কি বলতে চাইছি। তুমি কবে ফিরবে?"
সৌরভ বলল, "আমি আর ফিরব না, এখানেই বিয়ে করে সেটেল হব। আর কিছু বলার আছে?
শিঞ্জিনী সেদিন কাঁদতে কাঁদতে বলল "প্লিজ এরকম করোনা সৌরভ। তুমি না ফিরলে আমি মরে যাব। আমাকে সুইসাইড করতে হবে।"
কথাটা শুনেই সৌরভের মেজাজটা রুক্ষ হয়ে গেল, বলে উঠল "হোয়াট দা হেল! তোমার কত টাকা চাই, বলো? বাট আমাকে আর ডিস্টার্ব করো না।"
শিঞ্জিনী বলল, "প্লিজ সৌরভ, আমাদের ভালবাসাকে এভাবে অপমান করো না। তোমাকে আমি এত দিন বলিনি, আজ বলতে বাধ্য হচ্ছি, আমি প্রেগন্যান্ট, তোমার বাচ্চার মা হতে চলেছি।"
সৌরভ থমকে গেল, জিজ্ঞেস করল, "কি, কি বলছ এসব? অপারেশন করাওনি কেন? কালই গিয়ে অপারেশন করিয়ে এসো। যা খরচ লাগে, আমি দিয়ে দেব। কিন্তু তোমার সন্তানের দায়িত্ব নিতে পারব না।"
শিঞ্জিনী আর্দ্রস্বরে বলল, "তা আর সম্ভব নয়, বাচ্চাটা অনেক বড়ো হয়ে গেছে। এরপর অ্যাবর্শন করাতে গেলে আমি বাঁচবনা।"
সৌরভ চিৎকার করে বলল, "তাহলে তুমি মরো, আই কান্ট ডু নাথিং।"

ফোন কেটে দিল সৌরভ। ওর দিকে তাকিয়ে জেনি বলল, "এনি প্রবলেম?"
নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল সৌরভ বলল, "নো নো, এভরিথিং ইজ অলরাইট।"

তারপর জেনির আঙুলে একটা আঙটি পরাতে পরাতে বলে উঠল, "উইল ইউ মেরি মি?"
মুখ চাপা নিল জেনি। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বলল, "রিয়েলি? আই ক্যান্ট বিলিভ দিস!"
সৌরভ বলল, "ইয়েস, রিয়েলি আই লাভ ইউ।"
সৌরভকে জড়িয়ে ধরে জেনি বলল, "আই লাভ ইউ টু মাই লাভ।"

সেদিনই শিঞ্জিনীর সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল সৌরভের। সে ভেবেছিল, ওর কাছ থেকে এরকম প্রত্যাখ্যান পেয়ে শিঞ্জিনী হয়তো ওর কথা ভুলে যাবে। অন্য কাউকে বিয়ে করে নেবে। যদি ওর বিয়ের জন্য কিছু টাকা চায়, সৌরভ না হয় সেইটুকু সাহায্য করবে, কিন্তু ওকে যে এমন একটা সংবাদ শুনতে হবে একথা সে কল্পনাও করেনি।

সেদিন জেনির সঙ্গে প্রথম রাত্রি ছিল সৌরভের। জেনির সুসজ্জিত রুমে, সুশোভিত বিছানায় একটা হালকা ড্রেস পরে সে শুয়েছিল। হঠাৎ ওর ম্যাসেঞ্জারে কল এল। ওর বাল্যকালের বন্ধু রেহান ফোন করেছিল। ফোনটা ধরতেই টুকিটাকি কিছু কথা সারার পরে হঠাৎ রেহান বলল, "একটা কথা জিজ্ঞেস করব?"
সৌরভ বলল, "হ্যাঁ, বল, প্রবলেম কি?"
রেহান বলল, "তোর সঙ্গে কি ইদানিং শিঞ্জিনীর কোনো ঝগড়া হয়েছিল?"
এইসময় শিঞ্জিনীর প্রসঙ্গ উঠতে বেশ বিরক্তই হল সৌরভ। বলল, "কেন বলতো?"
রেহান বলল, "কেন যে শিঞ্জিনী এতবড় ডিসিশনটা নিল কেউ বুঝতে পারছে না।"
রেহানের কথা বলার ধরণে সৌরভ চমকে উঠল। বলল, "এতবড় ডিসিশন মানে? কি হয়েছে শিঞ্জিনীর?"
রেহান অবাকভাবে বলল, "তুই কি কিছুই জানিস না? কাল রাতে শিঞ্জিনী ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে সুসাইড করেছে।"
সৌরভ চিৎকার করে উঠল, "হোয়াট! কি বলছিস তুই এসব? শিঞ্জিনী...." নিজের কথা শেষ করতে পারল না সৌরভ।
রেহান বলল, "আই অ্যাম সরি, তাহলে তুই বোধহয় খবরটা পাসনি। তবে যা সত্যি সেটাকে মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।"

ফোন কেটে দিল রেহান।
সৌরভের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে জেনি বলল, "এনি প্রবলেম সুইটহার্ট?"
সৌরভ বলল, "ইয়েস আই হার্ড এ ব্যাড নিউজ অ্যাবাউট মাই মাদার। সি ইজ ভেরি ইল। প্লিজ গিভ মি সাম টাইম।"
জেনি বলল, "ইটস ওকে সুইট হার্ট। টেক ইওর টাইম।"

তারপর প্রায় একটা বছর কেটে গেছে। বড়বড় কাজের জন্য এরকম ছোটখাটো একটা দুটো আত্মবলিদান দিতেই হয়, একথা ভেবেই শিঞ্জিনীর কথা ভুলে গেছে সৌরভ। জেনির সঙ্গে একটা আনন্দময় বৈবাহিক জীবন কাটাচ্ছে। তবু যে ওর মাঝেমাঝে অতীতের কথা মনে পড়ে না তা নয়, ওর মা কখনো সখনো ফোন করলে কান্নাকাটি করে। ওকে বাড়ি ফিরতে বলে, কিন্তু সৌরভ সাফ জানিয়ে দিয়েছে বাড়ি ফেরা আর ওর পক্ষে সম্ভব নয়। সে যা টাকা পাঠাচ্ছে দরকারে সেটা আরো বাড়াবে, তবু ওকে বাড়ি ফেরার জন্য যেমন জেদাজেদি না করে। শিঞ্জিনীর কথাও মনে পড়ে কখনো সখনো। এই তো কালই শিঞ্জিনীর প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী ছিল। হঠাৎই ওর কথা মনে পড়তেই সে বিহ্বল হয়ে গেল। জেনিকে ঠিকঠাকভাবে আদরই করতে পারলনা। তারপর কখন সে ঘুমিয়ে পড়েছে সে নিজেও জানে না। ঘুমোতেই এই স্বপ্ন।

পিঠে টোকা পড়তেই হঠাৎ পিছন ফিরল সৌরভ। তারপর সামনে তাকিয়েই সে চমকে উঠল। ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে শিঞ্জিনী। সে বলে উঠল, "তুমি? তুমি এখানে কিভাবে এলে?"
শিঞ্জিনী বলল, "ও মা! কি বলছ তুমি? এটা তো আমার বাড়ি, আমি এখানে আসতে পারিনা?"
সৌরভ বলল, "কিন্তু আমার স্বপ্নের ভিতরে তুমি কি করছ?"
শিঞ্জিনী হাসল।বলল, "স্বপ্নটা তোমার হতে পারে, কিন্তু এই স্বপ্নের নিয়ন্ত্রা যে আমি। তাই আমি যখন চাইব এখানে আসব, যখন চাইব চলে যাব," একটু থেমে বলল, "তোমার মনে আছে সৌরভ তুমি সেদিন আমাকে কি বলেছিলে, 'তুমি মরো, আই কান্ট ডু নাথিং।' কিন্তু মানুষ কি সহজে মরতে চায় গো, কত লাঞ্ছনা ভোগ করার পরে মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নেয়, সেটা কি তুমি জানো?"
সৌরভ বলল, "তুমি সুসাইড করেছ, তাতে আমি কি করতে পারি? আমার দোষ কি?"
শিঞ্জিনী বলল, "তোমার কোনো দোষ নেই, সব দোষ তো আমার, সবথেকে বড় দোষ করেছিলাম তোমাকে অন্ধের মত বিশ্বাস করে, আর তার মূল্য আমাকে নিজের জীবন দিয়ে শোধ করতে হয়েছিল। বাড়ির অমতে গিয়ে তোমাকে ভালো বেসেছিলাম। পাড়া প্রতিবেশীদের বাঁকা চোখকে অগ্রাহ্য করে গর্বের সাথে ঘুরে বেড়াতাম। আমার বিশ্বাস ছিল তুমি একদিন ফিরবে, আমাদের ভালোবাসাই তোমাকে আবার আমার কাছে ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু তুমি আমাকে ভুলেই গেলে..."
সৌরভ কথার মাঝেই অস্থিরভাবে বলে উঠল, "কেন এসেছ আমার স্বপ্নে? তুমি চলে যাও, আমি তোমাকে সহ্য করতে পারছিনা।"
শিঞ্জিনী হাসল। বলল, "এত রেগে যাচ্ছ কেন? আমি যে তোমাকে খুব ভালোবাসি গো, কোনোদিন তোমাকে না জানিয়ে কিচ্ছু করিনি। শুধু সেইদিন আর কিছু ভাবার সময় পাইনি। তাই আজ তোমাকে দেখাতে এসেছি আমি ঠিক কিভাবে সেদিন মারা গিয়েছিলাম।"
সৌরভের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বলল, "তুমি কি করতে চাও আমাকে নিয়ে?"
শিঞ্জিনী বলল, "এমন কিছুই না, সেদিন আমি ট্রেনের নিচে কাটা পড়েছিলাম, আজ তোমার স্বপ্নে তুমি ট্রেনের নিচে কাটা পড়বে, অনুভব করবে মৃত্যু যন্ত্রণা ঠিক কেমন হয়। কেমন ভাবে হৃদপিন্ড থেমে যায়, কেমন ভাবে পা দুটো শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরেও কাঁপতে থাকে, মাথাটা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে ঠিক কেমন লাগে।"
সৌরভ চিৎকার করে উঠল, "আমি জানতে চাইনা, তুমি চলে যাও।"
শিঞ্জিনী বলল, "তা কি করে হয়? সেদিন তো শুধু আমি একাই মারা যাইনি, আমার সঙ্গে আমাদের সন্তানও মারা গিয়েছিল সেদিন। দু'দুটো মৃত্যু ঘটেছিল সেদিন তোমার জন্য, তাই এটুকু তো অনুভব করতেই হবে।"
সৌরভ অনুনয়ের সুরে বলল, "আমার ভীষণ ভয় লাগছে। প্লিজ আমাকে ছেড়ে দাও।"
শিঞ্জিনী বলল, "ভয় পেওনা সোনা। চলো আমার হাত ধরে চলো। এটা তো শুধুই তোমার স্বপ্ন, এত ভয়ের কী আছে? ওই যে দেখছ ট্রেন লাইন, ওইদিকে চলো।"
সৌরভের হাত ধরল শিঞ্জিনী।
সৌরভ তখনও একই সুরে বলে চলেছে, "প্লিজ আমাকে ছেড়ে দাও। আমি যেতে চাইনা, আমি দেখতে চাইনা।"
শিঞ্জিনী বলল, "ছেড়ে দাও বললেই কি ছাড়া যায় গো? এই জোর, অধিকারবোধ এসবই তো আমি তোমার কাছে থেকেই শিখেছি। তুমি যখন আমাকে পাগলের মতো আদর করতে তখন আমিও ঠিক এইভাবেই বলে যেতাম, আর নয়, আমাকে এবারে ছেড়ে দাও, কিন্তু তুমি কি তখন আমার কথা শুনতে? আমার সতর্কবাণী সেদিন শুনলে হয়তো এইভাবে আমাকে সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে হত না।"
সৌরভ বলল, "আমাকে ক্ষমা করে দাও। তোমার দুর্বলতার আমি সুযোগ নিয়েছি বারবার। আমি তখন অন্য স্বাদে মেতে ছিলাম। কিন্তু তোমাকে এভাবে ঠকানো আমার উচিৎ হয়নি। প্লিজ আমাকে যেতে দাও।"
শিঞ্জিনী দৃঢ় স্বরে বলল, "কোথায় যাবে তুমি? ঘুম ভাঙার আগে এই স্বপ্ন থেকে তো তুমি বেরোতেই পারবেনা, আর এত সহজে তোমার ঘুম ভাঙতে আমি দেব না, এইভাবেই আর কিছুক্ষণ আমার সাথে হেঁটে চলো।"

আকাশে ফুটফুটে চাঁদ। সেই চাঁদের নিচে উড়ে বেড়াচ্ছে মেঘ আর তার নিচ দিয়ে ফরফর করে উড়ছে কয়েকটা বাদুড়। মাঠ পেরুলেই রেল লাইন। ছেলেবেলায় একদিন ওখানে কতবারই না লুকিয়ে খেলাধুলা করেছে সৌরভ। ওখানে খেলতে গিয়েই তো ট্রেনের নিচে একদিন ওর বাল্যকালের বন্ধু সৌমেন কাটা পড়েছিল। সেই দৃশ্য আজো কখনো সখনো ওর চোখের সামনে ফুটে উঠলে ভয়ে ওর শরীরটা কাঁটা দিয়ে ওঠে। না, আর ওখানে সে যেতে চায়না। আর দ্বিতীয় বার সেই দৃশ্য সে দেখতে চায়না, তবু সে যেন থামতে পারছেনা। ওর হাত ধরে ওকে সামনে দিকে টেনে নিয়ে চলেছে শিঞ্জিনী। সম্মোহিতের মতো সে এগিয়ে চলেছে ট্রেন লাইনের দিকে। ওকে নিয়ন্ত্রণ করছে ওর স্বপ্নেরই একটা চরিত্র শিঞ্জিনী। এরচেয়ে কষ্টের হয়তো আর কিছুই হতে পারেনা।

হাঁটতে হাঁটতে ওরা লাইনের উপরে উঠে এল। মাঠের বুক চিরে ট্রেন লাইনটা এঁকে বেঁকে বহুদূর পর্যন্ত এগিয়ে গিয়েছে। কোথা থেকে ভেসে আসছে একটা ঝমঝম শব্দ। লাইনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইলেকট্রিকের পোতগুলোকে অন্ধকারে ভূতুড়ে লাগছে। সৌরভের দিকে তাকিয়ে শিঞ্জিনী বলল, "যাও সোনা, তুমি ওই লাইনের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াও। আর একটু পরেই রাত দেড়টার এক্সপ্রেস আসবে। সামান্য একটু কষ্ট, তারপরেই দেখবে সব শান্তি।"
সম্মোহিতের মতো শিঞ্জিনীর আদেশ পালন করল সৌরভ। ধীরেধীরে সে রেল লাইনের মাঝে গিয়ে দাঁড়াল। বলল, "প্লিজ আমার সঙ্গে এমন করো না। আমি এই কষ্ট অনুভব করতে চাইনা।"
শিঞ্জিনী বলল, "চিৎকার করোনা। ওই দেখ ট্রেনটা আসছে, আর একটু অপেক্ষা কর, তারপরেই তো চিরশান্তি। ধাক্কায় তোমার ঘুম ভেঙে যাবে। আর আমিও তোমার স্বপ্ন থেকে চলে যাব।"
সামনে তাকাল সৌরভ। দেখতে পেল একটা ট্রেন ঝড়ের গতিতে হর্ন দিতে দিতে এগিয়ে আসছে ওর দিকে। ট্রেনের হেড লাইটের আলো সোজা ওর মুখে এসে পড়ছে। সে নড়াচড়া করার চেষ্টা করল। পারল না। ওর পা দুটো যেন লাইনের মাঝে গেঁথে গিয়েছে। ট্রেন থামানোর জন্য সে জোর গলায় চিৎকার করল, কিন্তু ট্রেনের প্রবল ঝমঝম শব্দে ঢাকা পড়ে গেল ওর কণ্ঠস্বর। ওর পা দুটো যেন লাইনের মাঝে গেঁথে গিয়েছে। ট্রেন থামানোর জন্য সে জোর গলায় চিৎকার করল, কিন্তু ট্রেনের প্রবল ঝমঝম শব্দে ঢাকা পড়ে গেল ওর কণ্ঠস্বর। মাটিতে ছিটকে পড়ল সৌরভ। ট্রেনটা প্রবল বেগে ওর শরীরটাকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে বেরিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গেই এক ঝটকায় ওর ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। দেখল চারিদিকে নিবিড় অন্ধকার, ঠান্ডা হাওয়া বইছে। মাথার উপরে ঝাঁকে ঝাঁকে তারা, তার পাশে সাদা হাড়ের মতো লটকে আছে আধখানা চাঁদ।

জেনির দিকে তাকিয়ে লন্ডন পুলিশের অফিসার মাতৃভাষায় বললেন, "এই মৃত্যুর ব্যাপারে আপনি কিছু বলতে পারবেন? কেন আপনার হাজবেন্ড মাঝরাতে বেরিয়ে এলেন, আর কেনই বা ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে সুসাইড করলেন?"
ক্রন্দনরত জেনি নিজের মাতৃভাষায় উত্তর দিল, "নো স্যর, এই ব্যাপারে আমি বিন্দুমাত্র কিছুই জানিনা। আপনাদের কোনো হেল্প করতে পারব না আমি, তবে আমার সঙ্গে ওর কোনোরকম মনোমালিন্য হয়নি এইটুকু আপনাদের কনফার্ম করতে পারি।"
সামনে দাঁড়িয়ে রাস্তার সিসিটিভি ফুটেজ চেক করছিলেন লন্ডন পুলিশের সাইকোলজি বিভাগের অফিসার মিঃ জেমস।
জেনির দিকে তাকিয়ে বললেন, "এর আগে রাতের দিকে কি কখনো মিঃ বোসের মধ্যে কোনো অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করেছিলেন, যেমন ঘুমের মধ্যে হাঁটাচলা করা, কথা বলা...?"
জেনি বললেন, "এমনিতে আমার ঘুম খুবই গাঢ়, তাই রাত্রিবেলা ঘুমের মধ্যে বিশেষ কিছু হুশ থাকে না আমার। তবে দুইএকবার মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে সৌরভকে রুমের মধ্যে পায়চারি করতে দেখেছি। ভেবেছি ওর হয়তো ঘুম আসেছে না, কিম্বা কোনো দুঃশ্চিন্তায় আছে, তাই পায়চারি করছে। দিনের বেলায় এই নিয়ে জিজ্ঞেস করলে ও সেটা স্বীকার করত না, আমি ভেবেছিলাম, হয়তো আমার কাছে এটা লুকোতে চাইছে, তাই পরে আর এসব নিয়ে কোনো প্রশ্ন করিনি।"
জোনস বললেন, "আই আন্ডারস্ট্যান্ড। সিসিটিভি ফুটেজ দেখেও সেটাই মনে হচ্ছিল। মিস্টার বোস সোমনাবুলিজম নামে একটা ডিজিজের শিকার ছিলেন। এই রোগে মানুষ ঘুমের মধ্যে হাঁটাচলা করে, কথা বলে। সে ভাবে সবটাই তার স্বপ্নের মধ্যে ঘটছে, যদিও সে হাঁটাচলা করে বাস্তবেই। সম্ভবত কাল রাতে কোনোভাবে দরজা খোলা পেয়ে উনি বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন, তারপর ট্রেন লাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। আর তার ফলেই এই অ্যাক্সিডেন্ট..."

আরও কি সব যেন বলে যাচ্ছিলেন অফিসার, কিন্তু জেনির কোনো কিছুই মাথায় ঢুকছিল না। সৌরভের ছিন্নভিন্ন ডেডবডির সামনে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছিল সে। ওর বুকের মধ্যে একরাশ দলা পাকানো কান্না ফুলে ফুলে উঠছিল।

(সমাপ্ত)

©All rights reserved to sankha subhra nayak

সাক্ষী

সাক্ষী

শঙখ শুভ্র নায়ক



"আমাদের ব্রেন একখানা কম্পিউটারের মতো। আমরা যা কিছু দেখি, যা কিছু করি, যা কিছু পড়ি প্রতিটি তথ্য আমাদের ব্রেনের মধ্যে ক্রমান্বয়ে সাজানো থাকে। আমাদের এই তথ্যগুলোকে পুনরুদ্ধারের ক্ষমতা কম বলে আমরা কোনো কিছু ভুলে যাই, তারমানে এটা নয় সেই স্মৃতিটা ব্রেন থেকে ডিলিট হয়ে যায়। আমাদের জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি দিনের, প্রতিটি মুহূর্তের, প্রতিটি ঘটনার ছবি আমাদের ব্রেনের মধ্যে রয়েছে। অনেক সময় সম্মোহনের মাধ্যমে এই ছবিগুলোর কিছু পুনরুদ্ধার করা যায়, আবার অনেক সময় কিছু জটিল যান্ত্রিক পদ্ধতিতে," ইউনিভার্সিটির হলের স্টেজে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন প্রোফেসার গুপ্ত। হঠাৎ হলের মধ্য থেকে একটা ছাত্র উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "স্যার, আপনি তো ব্রেনের মধ্যে থাকা এই তথ্যগুলোকে সম্পূর্ণ ভাবে পুনরুদ্ধার করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। কিন্তু আমি জানতে চাই, এতে আমাদের কি লাভ হবে?"
প্রোফেসার গুপ্ত বললেন, "এই রিসার্চ এলঝাইমার্স রোগের রুগীদের সবচেয়ে বেশি উপকার করবে। তাছাড়া সাধারণ মানুষও এই রিসার্চ থেকে অনেক উপকার পাবেন। অনেক সময় আপনারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ভুলে যান। এই ধরুন কোনো গুরুত্বপূর্ণ পাসওয়ার্ড, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের রোল নম্বর, এমনকি কোনো গুরুত্বপূর্ণ লোকের নাম, মোবাইল নম্বর। যদি পরবর্তীকালে এই সব জিনিসগুলোর খুব প্রোয়োজন হয় আর এগুলো মনে করতে না পারেন তখন আমার রিসার্চ আপনাকে এই ব্যাপারে সাহায্য করবে।"
ছাত্রটি বলল, "কিন্তু এই রিসার্চ তো খুবই গোপন ভাবে করা হয়েছিল এবং রিসার্চের ফলাফল আজো গোপন রাখা হয়েছে। এত গোপনীয়তার কারন কী?"
প্রোফেসার গুপ্ত বললেন, "যেকোনো ভাল রিসার্চ যাতে শত্রুদেশ চুরি করতে না পারে সেজন্য গোপন করা হয়। আমার রিসার্চও সেজন্যই গোপন রাখা হয়েছে।"
ছাত্রটি বলল, "কারন যদি এটুকুই হত, তাহলে আপনি এই রিসার্চ নিয়ে এত গোপনীয়তা রাখতেন না। নিশ্চই এর পিছনে বেশ বড়ো কিছু কারন রয়েছে, যা আপনি আমাদের বলতে চাইছেন না।"
প্রোফেসার গুপ্ত হাসলেন। অনেক কুয়াশাচ্ছন্ন অতীত এক মুহূর্তে তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল। বক্তৃতা শেষ করে উনি বাড়িতে এসে ঢুকলেন। খুবই রেস্ট্রিক্টেড এরিয়ায় ওনার বাড়ি কাম রিসার্চ ল্যাবরেটরি। সিলেক্টেড কিছু লোক আর স্পেশাল পার্মিশন ছাড়া এখানে কাউকে এলাউ করা হয়না। রুমে এসে ড্রেস ছেড়ে দেওয়ালের দিকে তাকালেন উনি। দেওয়ালে টাঙানো আছে তাঁর বাবা মায়ের ছবি। এরা তাঁর নিজের বাবা মা নন। তাঁর পালক পিতা মাতা।

কোনো এক্সিডেন্টে বাবা মায়ের মৃত্যু ঘটলে বেশিরভাগ শিশু সত্যি সত্যিই অনাথ হয়ে যায়। পাড়াপ্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন কেউ তার দায় নিতে চায়না। তাদের কারুর ঠাঁই হয় অনাথ আশ্রমে, কেউ বা সরকারি বেসরকারি হোমে। পরিবার এদের সবার কপালে জোটেনা। এদের অনেকের জন্যই কেউ এপ্লাই করেনা। এদেরকে একাই বাঁচতে হয়। জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে এরা একদিন ছিনিয়ে খেতে শিখে যায়। আর অবশেষে এরাই একদিন তৈরি হয় চোর, ডাকাত, খুনী, মস্তান।

তাঁর ভাগ্যটা বোধহয় একটু অন্যরকম ছিল। বাবা মায়ের মৃত্যুর পরে তাঁকে এডাপ্ট করেছিলেন এক নিঃসন্তান পুলিশ অফিসার। টাকার অভাব ছিলনা তাঁর, কিন্তু ক্লাস এইট থেকেই তিনি বৃত্তি পেয়েছেন। দশম শ্রেণীর পর থেকে তিনি টিউশনি পড়ান। আর এভাবেই জীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় গোল্ডমেডেল পেতে পেতে অবশেষে আজ তিনি প্রোফেসার গুপ্ত। নিজের জীবনটাকে উৎসর্গ করেছেন সমাজের কাজে। একটা এনজিও খুলেছেন যারা ওই সব মা বাবা হারা ছোট্ট শিশুদের পুনর্বাসনের কাজ করে।

টিং টং বেল বাজতে দরজা খুললেন প্রোফেসার গুপ্ত। তাঁর বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন সি আই ডি অফিসার সৈকত সান্যাল। বললেন, "একটা নতুন কেসে আপনার হেল্প চাই স্যার?"
প্রোফেসার গুপ্ত আদপে প্রোফেসার হলেও তাঁর আসল কাজ ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের হয়ে কাজ করা। বললেন, "হ্যাঁ, নিশ্চই। বলুন?"
সৈকত বাবু বললেন, "কেসটা দিন তিনেক আগের। একটা বাড়িতে কিছু লোক জোর করে ঢুকে স্বামী এবং স্ত্রীকে খুন করেছে। পুলিশ অনেক তদন্ত করেও দোষিদের গ্রেফতার করতে পারেনি, কয়েকজন সন্দেহ ভাজন কে অ্যারেস্ট করা হলেও ওদের বিরুদ্ধে কোনো জোরালো প্রমান না পাওয়ায় ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। এই খুনের একটিই মাত্র সাক্ষী রয়েছে, তা হল ওই দম্পতির একটি বাচ্চা।"
প্রোফেসার গুপ্ত বললেন, "বাচ্চাটার বয়স কত?"
সৈকত বাবু বললেন, "সদ্য দু'বছর। এখোনো ঠিকঠাক ভাবে কথা বলতেও পারেনা। ওরা বাচ্চাটার উপরেও অত্যাচার করেছিল। বাচ্চাটার মাথায় চোট লেগেছে, নেহাত ভাগ্য ভাল ছিল তাই বাচ্চাটা বেঁচে গিয়েছে।"
প্রোফেসার গুপ্তর চোখে একটুকরো বিষন্নতা খেলে গেল। বললেন, "আচ্ছা, কাল বাচ্চাটাকে নিয়ে আসুন, আমি দেখি কী করতে পারি।"
সৈকত বাবু মাথা নাড়লেন।

পরদিন দুপুরে বাচ্চাটাকে নিয়ে প্রোফেসার গুপ্তর ল্যাবরটরিতে এসে উপস্থিত হলেন সৈকত সান্যাল। বাচ্চাটা প্রথমে একটু কান্নাকাটি করছিল ঠিকই, কিন্তু খাবার দিতেই শান্ত হয়ে গেল। আস্তে আস্তে বাচ্চাটার মাথায় হাত বুলিয়ে বাচ্চাটাকে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন প্রোফেসার গুপ্ত। বললেন, "সত্যিই মানুষ কী নিষ্ঠুর হয়। অত্যাচারের হাত থেকে বাচ্চাদেরও রেহাই দেয়না।"
সৈকত বাবু বললেন, "এর ব্রেনের ভিতর থেকে কি আপনি ওইদিনের ছবি বার করতে পারবেন, যেদিন বাচ্চাটার উপরে অত্যাচার হয়েছিল?"
প্রোফেসার গুপ্ত বললেন, "জানিনা, চেষ্টা করে তো দেখতেই হবে।"
বাচ্চাটাকে একটা দোলনায় শুইয়ে পাশেই একটা চেয়ার নিয়ে বসে পড়লেন প্রোফেসার গুপ্ত। বেশ কিছুক্ষন একদৃষ্টে বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, "দেখেছেন, কী নিষ্পাপ একখানা মুখ! এই মুখ দেখেও যে মানুষের কেন মমতা হয়না কে জানে? আমার হাতে যদি ক্ষমতা থাকত, তাহলে যে লোকগুলো এই কাজ করেছে, তাদের আমি ফাঁসিতে ঝোলাতাম।"
সৈকত বাবু বললেন, "কী করবেন বলুন? আইনের তো হাত পা বাঁধা। প্রমান ছাড়া সে কিছুই করতে পারেনা। নেহাত আপনি আছেন তাই আমরা অন্তত কিছু অপরাধিকে শাস্তি দিতে পারছি।"
প্রোফেসার গুপ্ত মাথা নাড়লেন। চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে ল্যাবরেটরির ভিতর থেকে একটা হেলমেট নিয়ে ফিরে এলেন। তাঁর বহুদিনের রিসার্চের ফসল এই হেলমেটটা। হেলমেট থেকে কিছু তার বেরিয়ে এসে যুক্ত হয়েছে প্রোজেক্টরে। এই হেলমেটে বেশ কিছু সূক্ষ্ম কানেক্টর রয়েছে, যা চুলের লোমকূপ দিয়ে ভিতরে ঢুকে ব্রেনের নার্ভের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং ব্রেনের মধ্যে থাকা সব ছবিগুলো গুলোকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলে। ধীরেধীরে হেলমেটটাকে তিনি বাচ্চাটার মাথায় পরালেন। তারপর প্রোজেক্টরের বোতাম চালু করতেই পর্দায় ধীরেধীরে ফুটে উঠতে লাগল একটুকরো আলোক রশ্মি, কিছু আবছা আবছা ছবি আর কিছু মানুষের কথাবার্তার শব্দ। এটা সেই মুহূর্তের ছবি যখন বাচ্চাটা জন্মগ্রহণ করেছিল। চোয়াল শক্ত করে বসলেন প্রোফেসার গুপ্ত। সময়টাকে পার করতে লাগলেন তিনি। এবারে ক্রমশ পর্দার ছবি স্পষ্ট হতে লাগল। সময়টাকে এগিয়ে সেই রাতে নিয়ে আসতেই হঠাৎ বাচ্চাটা ভয়ানক চিৎকার করে কেঁদে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে পর্দার ছবিও কালো হয়ে গেল। প্রোফেসার গুপ্ত বললেন, "বাচ্চাটা এখোনো ট্রমার মধ্যে রয়েছে। ওই রাতের ঘটনা মনে করতেই চাইছেনা।"
সৈকত বাবু বললেন, "কিন্তু ওই রাতের ঘটনা জানতে না পারলে আমরা দোষিদের খুঁজে বার করব কিভাবে?"
প্রোফেসার গুপ্ত বললেন, "আমরা সাধারণত ভয়ঙ্কর স্মৃতিগুলোকে ভুলে যেতে চাই। আমাদের ব্রেনের মধ্যে থাকা কেমিক্যাল আমাদের এই কাজে সাহায্য করে। এই কেমিক্যালের কোনো হেরফের হলেই কোনো কোনো স্মৃতি দুঃস্বপ্নের মতো আমাদের তাড়া করে। তাই এই কাজে মোটেই তাড়াহুড়ো নয়। খুব ধীরেসুস্থে এই কাজ করতে হবে। নাহলে বাচ্চাটার মানসিক ক্ষতি হয়ে পারে।"
সৈকত বাবু মাথা নাড়লেন। ধীরে ধীরে দ্বিতীয় বারের জন্য প্রোজেক্টর চালু করলেন প্রোফেসার গুপ্ত। সময়টাকে এগিয়ে ওইদিনে নিয়ে এলেন। সেদিন সারাদিনে বাচ্চাটা কি কি করেছে, কখন খেয়েছে, কখন টলোমলো পায়ে হাঁটার চেষ্টা করেছে, কখন আধোআধো স্বরে কথা বলার চেষ্টা করেছে, কোনকোন খেলনা নিয়ে খেলাধুলা করেছে, এসব দেখতে দেখতে রাতে চলে এলেন। রাত ন'টা নাগাদ বাচ্চাটা ঘুমিয়ে পড়ল। মনেহল, দু'খানা কপাট ওয়ালা একটা দরজা যেন বন্ধ হয়ে গেল। দরজাটা আর কিছুই নয়, মানুষের দুটো চোখ। তখনও কিন্তু বাচ্চাটার কান সজাগ রয়েছে। পাশ থেকে শোনা যাচ্ছে ওর বাবা মায়ের ফিসফিস কথা বলার আওয়াজ। হঠাৎ মাঝরাতে দড়াম দড়াম করে কিছু একটা শব্দে বাচ্চাটা চমকে উঠল। আর ঠিক তখনই আবার বাচ্চাটা কেঁদে উঠল। পর্দার ছবি ঝাপসা হয়ে যেতে, বাচ্চাটাকে তুলে কিছু খাবার দাবার দিলেন প্রোফেসার গুপ্ত। বেশ কিছুক্ষণ কিছু খেলনা নিয়ে খেলাধুলা করার পরে বাচ্চাটা ঘুমিয়ে পড়তে আবার পদ্ধতিটা শুরু করলেন। এবারে দেখতে দেখতে পেলেন তিনটা লোক দরজা দিয়ে ভিতরে এসে ঢুকেছে। দুটো লোকের হাতে দেশি কাট্টা আর একটা লোকের হাতে ভোজালি। বিছানায় ভয়ে জড়ো সড়ো হয়ে বসে আছে বাচ্চাটার বাবা মা। লোকগুলো এসে প্রথমেই বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিল। তারপর বাচ্চাটার মুখে রুমাল গুঁজে গলায় ভোজালি ধরে বাড়ির সেফে রাখা টাকা পয়সা, গয়না গাঁটি লুট করতে লাগল। লুট করা হয়ে গেলে বাচ্চাটার বাবাকে বেঁধে রেখে বাচ্চাটার মাকে মেঝেতে ফেলে তিনজনে মিলে ধর্ষণ করল এবং শেষে দু'জনকে গুলি করে বাচ্চাটাকে মেঝেতে আছড়ে ফেলল। যাওয়ার সময় একটা লোক আর একটা লোককে বলছিল, "বাচ্চাটাকেও মেরে ফেললে হয়না?"
দ্বিতীয় লোকটা বলল, "খালিখালি গুলি নষ্ট করে কোনো লাভ নেই। ও তো কথা বলতেই পারেনা, আমাদের নাম কাকে বলবে?"

প্রোজেক্টর অফ করলেন প্রোফেসার গুপ্ত। তাঁর হাড় হিম হয়ে এসেছে। বললেন, "পুরো ঘটনাটা চিপসে রেকর্ড করে নিয়েছি। যদি আপনাদের কোনো কাজে লাগে খুব খুশি হব।"
চমক ভেঙে সৈকত বাবু বললেন, "কাজে লাগবে কী বলছেন অপরাধী তো আমরা পেয়ে গেছি। এই তিনটা লোক ছোটখাটো চোর। এরা এরকম কাজ করবে কেউ ভাবেনি। তাই এদের সন্দেহের তালিকাতেও রাখা হয়নি। সবই আপনার ক্রেডিট। আপনি না থাকলে এই লোকগুলোকে ধরা সম্ভবই হতনা কোনোদিন।"
ফস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন প্রোফেসার গুপ্ত। বললেন, "আমি তো নিমিত্ত মাত্র ক্রেডিট যদি দিতেই হয় তাহলে এই বাচ্চাটাকে দিন। ও ঘটনাটা দেখেছিল বলেই আজ আপনারা আপনাদের সঠিক অপরাধী চিহ্নিত করতে পারলেন।"
সৈকত বাবু মাথা নাড়লেন। বললেন, "এই নিয়ে তেত্রিশটা এরকম কেস আপনার জন্য সলভ হল। আপনার তো এবারে সরকারি পুরষ্কার পাওয়া উচিৎ।"
প্রোফেসার গুপ্ত বললেন, "মোটেই না। আমি পুরষ্কার পাওয়ার জন্য এই কাজ করছিনা, সমাজ থেকে জীবানুগুলোকে পরিষ্কার করার জন্য এই কাজ করছি। আজ আমি পুরষ্কার পেলে ব্যাপারটা সকলের কাছে জানাজানি হয়ে যাবে, তখন ওরা হয়তো এই বাচ্চাগুলোকেও বাঁচিয়ে রাখবেনা, যাদের ব্রেন থেকে তথ্য নিয়ে আমি অপরাধীদের চিহ্নিত করছি।"
সৈকত বাবু মাথা নাড়লেন, "একথা ঠিক কিন্তু..." কী যেন বলতে গিয়েও থেমে গেলেন সৈকত বাবু। প্রোফেসার গুপ্তকে সেলুট করে উনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।


বিকেল হয়ে এসেছে। গাছের পাতায় বিকেলের নরম রোদ আলতো করে চুমু দিয়ে যাচ্ছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার কাছে এসে দাঁড়ালেন প্রোফেসার গুপ্ত। সৈকত বাবু যদি জানতেন তিনি কেন এই কাজ করছেন তাহলে হয়তো তাঁকে পুরষ্কারের কথা কখনো বলতেন না। আজ থেকে একান্ন বছর আগে একদিন তার চোখের সামনে এমন ভাবেই ছটপট করতে করতে শেষ হয়ে গিয়েছিল তার বাবা মা। দেখেও সেদিন তাঁর কিছু করার ছিলনা। আজ কিন্তু তিনি পারেন। অনেক কিছুই করতে পারেন।

(সমাপ্ত)
©All rights reserved to sankha subhra nayak

শেষ বাহাত্তর ঘণ্টা

শেষ বাহাত্তর ঘন্টা

শঙখ শুভ্র নায়ক



"হ্যালো, কখন আসছ তুমি?"
"এই তো বেরিয়ে গেছি। পাঁচমিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাব।"
"তুমি চিরকালই এত লেট করো, আজকের দিনটাও একটুও তাড়াতাড়ি আসতে পারোনা?"
"আসছি পাগলি, এত তাড়াহুড়োর কি আছে, আমার কি মনে নেই আজ কি দিন, ওই জন্যই তো..."
"কি ওই জন্য, বলো, বলো..."
"বাড়ি গেলেই দেখতে পাবে।"
"না, এক্ষুনি বলতে হবে, বলো, প্লিজ।"
"আমাদের ফার্স্ট এনিভার্সারিতে আমার পাগলিকে ডায়মন্ড নেকলেস গিফট করব বলে দোকানে এসেছিলাম, এখন দোকান থেকে বেরিয়ে হাইওয়েতে হাটছি।"
"আচ্ছা, ফোন কাটো, তাড়াতাড়ি এসো।"
"হুম, কাটছি, আগে একটা কিস দাও।"
"ধ্যাত, যখন তখন...?"
"না, এক্ষুনি।"
"আচ্ছা, দাড়াও এক সেকেন্ড।"
"হ্যাঁ দাঁড়িয়েছি... হে ভগবান... আঃ!!!"
"কি হল তোমার? হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো!"

চোখের পলক ফেলতে ফেলতে একটা ট্রাক অংশুমান কে দড়াম করে ধাক্কা দিয়েছিল, ধাক্কার আঘাতে সে খানিকটা উড়ে গিয়েছিল, চোখের সামনে ভেসেছিল একটা নাম্বার ডব্লিউ বি থ্রি ফোর... তারপর আর কিছু মনে নেই অংশুমানের। চোখ খুলতেই ওর মনেহল সে একটা অন্ধকার জলের তলায় ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে। জলটা এত স্বচ্ছ যে গায়ে লাগছেনা। মনেহচ্ছে জলটা আলো দিয়ে তৈরি। সব চেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হল জলের ভিতরে ওর শ্বাস প্রশ্বাস চলছেনা, তবু ওর এতটুকুও কষ্ট হচ্ছেনা। মুখ ঘুরিয়ে নিচের দিকে তাকাল অংশুমান। একটা কালো গভীর গর্তের দিকে সে যেন ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। ওটাই কি মৃত্যু?

"সিস্টার, পেসেন্টের কন্ডিশন কেমন?"
"ব্রিদিং স্টপ হয়ে গিয়েছে, হার্টবিট কমে আসছে। এখন টুয়েন্টি।"
"তাড়াতাড়ি অক্সিজেনের ব্যবস্থা করুন, ম্যানুয়ালি পাম্পকরে ফুসফুসে অক্সিজেন ঢোকানোর ব্যবস্থা করুন, আর আপনি ইলেকট্রিক শক রেডি রাখুন।"
"ওকে স্যার।"

মুখ হাঁ করল অংশুমান জোর করে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করল। হ্যাঁ, পারছে। জলের ভিতরেও সে শ্বাস নিতে পারছে। যদিও খুব কষ্ট হচ্ছে শ্বাস নিতে তবুও সে পারছে। কিন্তু কালো গর্তটা আরো, আরো কাছে এগিয়ে এসেছে।

"স্যার অক্সিজেন চালু করা হয়েছে। কিন্তু হার্টবিট দশে নেমে এসেছে।"
"ইলেক্ট্রিক চালু করুন!"
"ওকে স্যার।"

গর্তটা আরো আরো কাছে এগিয়ে আসছে অংশুমানের, আর মাত্র কয়েকসেকেন্ড, তারপরই গর্তটা ওকে গ্রাস করে নেবে। পাঁচ, চার, তিন, দুই, এক..."
হঠাৎ নিচ থেকে একটা ভীষন ধাক্কা অনুভব করল অংশুমান। ধাক্কাটা ওকে গর্তটা থেকে ছিটকে খানিকটা উপরের দিকে তুলল, আবার নিচের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। আরো একটা ধাক্কা। আরো খানিকটা উপরে এল, আবারও নিচের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। তিন নম্বর ধাক্কাটা ভীষন জোরে এল, অংশুমানের মনেহল কয়েকশো মাইল পেরিয়ে সে ক্রমশ উপরে আরো উপরে উঠে আসছে। ওই তো উপরে আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। জল থেকে উঠতেই চারপাশটা খুব ঝাপসা ঝাপসা লাগল। কিন্তু ওর মনেহল এতক্ষনে সে স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস প্রশ্বাস নিতে পারছে। প্রান ভরে হাওয়াটাকে সে শরীরের ভিতরে টেনে নিল।

"ওকে স্যার। হার্টবিট নর্মাল। স্বাভাবিক ব্রিদিং চালু হয়েছে।"
"মস্তিষ্কে আঘাত হয়েছে। সম্ভবত ব্রেনের একটা পার্ট ড্যামেজ হয়েছে। ভিতরে ব্লাড নেই এটাই রক্ষে।"
"হুম, স্যার, পেসেন্টের কিন্তু জ্ঞান ফেরেনি এখোনো।"
"বুঝতে পারছিনা, মনেহচ্ছে কোমার লক্ষন।"
"ও মাই গড।"
"হুম, খানিকক্ষন ওয়েট করুন। জ্ঞান ফিরলে ভাল, নাহলে পেসেন্টকে ভেন্টিলেশনেই রাখতে হবে।"

"ডাক্টার বাবু আমার হাজবেন্ট কেমন আছে?"
"পেসেন্টের অবস্থা স্থিতিশীল, কিন্তু বাহাত্তর ঘন্টা না পেরুলে কিচ্ছু বলা যাচ্ছেনা।"

চারপাশটা পরিষ্কার হতেই অংশুমান দেখতে পেল একটা ঝিলের মতো জায়গার মাঝে সে ভেসে আছে। ওর সামনেই খানিকটা দূরে রয়েছে একটা দ্বীপের মতো খানিকটা চড়া। সাঁতার কেটে চড়াটার দিকে এগিয়ে গেল অংশুমান, চড়াটা হাতের নাগালে আসতেই তাতে চড়ে বসল।

"ডাক্টার বাবু পেসেন্টের হার্ট বিট হঠাৎ বেড়ে গিয়েছে।"
"কত চলছে দেখে বলুন, যদি একসেসিভ হয় তাহলে আমাকে রাউন্ডে যেতে হবে।"
"এইট্টি ফাইভ টু নাইট্টি চলছে এই মুহূর্তে কখনো কখনো নাইন্টি ফাইভ চলে যাচ্ছে।"
"ইটস ওকে। হান্ড্রেড হয়ে গেলে একটা ইনজেকশন পুশ করে দেবেন। হার্টবিট নর্মালে নেমে যাবে।"
"আচ্ছা, স্যার।"

চড়াটার উপরে বসেছিল অংশুমান। হঠাৎ একটা ভীষন মেঘ গর্জনের মতো শব্দ শুনতে পেল। পিছনে তাকাতেই দেখতে পেল একটা বিরাট সাইজের কুমির তার বিশাল কালো মুখ নিয়ে জলের উপর দিয়ে ছুটে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। ভয়ে সেও জলের উপর দিয়ে ছুটতে লাগল। ওর গতি বেড়ে যাচ্ছে, নিজেকে থামাতে পারছেনা অংশুমান। পিছনে কুমিরটা আর নেই, কিন্তু সে তার পায়ের উপরে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলেছে। ছুটতে ছুটতে এক জায়গায় এসে ভয়ানক হোঁচট খেল অংশুমান, চোখ খুলতেই দেখতে পেল সে একটা প্লেন সার্ফেসে এসে পৌঁছেছে।

"ওকে স্যার, ইনজেকশন পুস করেছি, এখন পেসেন্টের হার্টবিট নর্মালে রান করছে।"
"আচ্ছা। ডোন্ট ওরি। পেসেন্টকে চোখে চোখে রাখুন। খুব ভাল যুদ্ধ করছে পেসেন্ট, ওর মধ্যে ভীষন ভাবে বাঁচার তাগিদ রয়েছে, আই থিঙ্ক আমরা খুব তাড়াতাড়ি কোনো পজিটিভ রেজাল্ট দেখতে পাব।"
"স্যার আপনি এখোনো পুরানো গল্প কথা গুলোকে বিশ্বাস করেন?"
"হা হা হা, নিশ্চই করি, কুচ তো হে, যেটা আমাদের ভিতর থেকে বেঁচে থাকার প্রেরনা দেয়। দ্যাটস কলড আত্মা।"

খানিকটা হেঁটে যাওয়ার পরেই অংশুমান দেখল একটা জায়গায় সাতটা দরজা রয়েছে। দুপাশে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। পিছনটাও ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে। একটা দরজার দিকে এগিয়ে গেল অংশুমান। ঠিক তখন এক ভদ্রলোককে দরজার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখল। এতক্ষনে কথা বলার মতো একজন লোককে পেল অংশুমান। ওকে দেখেই অংশুমান বলল, "আচ্ছা দাদা এখান থেকে কিভাবে বার হওয়া যাবে বলবেন?"
ভদ্রলোক বললেন, "আমি যদি সেটা জানতাম তাহলে কি এখানে পড়ে থাকতাম?"
অংশুমান বলল, "আপনি এখানে কিভাবে এলেন?"
ভদ্রলোক বললেন, "ছাদ থেকে পড়ে গিয়েছিলাম, আইমিন একজন ধাক্কা দিয়েছিল, ব্যাস তারপর থেকে আমি এখানেই আছি।"
অংশুমান চমকে উঠল, "তারমানে আপনি বলতে চাইছেন এখানে যতজন আছে সবাই এক্সিডেন্ট করে এখানে এসেছে।"
ভদ্রলোক হাসলেন। বললেন, "যতজন কোথায় পেলেন? এখানে আমরা মোটে দু'জন আছি, আমি আর আপনি। আমার একারই থাকার কথা ছিল, বাইশ বছর ধরে একাই ছিলাম, আজ আপনি এলেন।"
অংশুমান অবাক হল। বলল, "কিন্তু আমরা মাত্র দু'জন কেন? এই পৃথিবীতে আরো অজস্র লোকের এক্সিডেন্ট হয়েছে, তারা সব?"
ভদ্রলোক হাসলেন। বললেন, "এটা একটা ইমাজিনারি ওয়ার্ল্ড। যারা এক্সিডেন্ট করে কোমায় চলে যায়, তারা এই ওয়ার্ল্ডে ঢুকে পড়ে। প্রত্যেকের আলাদা আলাদা ইমাজিনেশন আছে, তাই প্রত্যেকে তাদের নিজস্ব ইমাজিনারি ওয়ার্ল্ডে চলে যায়, যার একটার সঙ্গে অন্যটা কোনো ভাবেই ম্যাচ করেনা।"
অংশুমান বলল, "তাহলে আমি আপনার দেখা পাচ্ছি কিভাবে?"
ভদ্রলোক বললেন, "সম্ভবত আমাদের ব্রেনের গঠন কোনো ভাবে ম্যাচ করে গেছে, যদিও সেটা হওয়ার চান্স এক ভাগের কয়েককোটি ভাগের একভাগ, কিন্তু এই মিরাক্কলটা ঘটেছে, তাই আপনি আমার দেখা পেয়েছেন।"
অংশুমান বলল, "এখানে তো সময় বোঝার কোনো উপায়ই নেই, কিভাবে বুঝলেন বাইশ বছর কেটে গেছে।"
ভদ্রলোক বলল, "পাঁচ বছর আগে আমার একবার জ্ঞান ফিরেছিল, তখনই সময়টা দেখেছিলাম, ওই হিসেব করলে জ্ঞান ফেরার পরে আরো পাঁচ বছরের জন্য হাস্পাতালের বিছানায় আমি কোমায় পড়ে আছি।"
অংশুমান বলল, "আচ্ছা, আপনি তো এখানে বহুদিন আছেন, এই দরজাগুলোর ব্যাপারে কি জানেন?"
ভদ্রলোক বললেন, "এগুলোই সব গুলোই এক একটা পাজল। যার ভিতরে ঢুকে পাজল সলভ করতে করতে এগিয়ে যেতে হয়। আগের স্মৃতি আমার যতদূর মনে আছে আমি পাজলটা শেষ করে ফেলেছিলাম, কিন্তু সামান্য একটা ভুলে সাপের মুখে পড়ে যাই, নাইন্টিনাইন থেকে আমাকে আবার একে ঘুরে আসতে হয়েছে।"
অংশুমান বলল, "ও মাইগড। আমার মনেহয় এই পাজল সলভ করলেই আমরা আমাদের পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারব।"
ভদ্রলোক বললেন, "আমারও তাই মনেহচ্ছে। কিন্তু পাজল সলভ করা তো চারটি খানি কথা নয়। পুরোটাই ভাগ্যের উপরে। আমি পৃথিবীর হিসাবে গত পাঁচ বছর ধরে চেষ্টা করার পর চারনম্বর দরজা দিয়ে ঢুকে আবার এই দরজা দিয়েই বেরিয়ে এলাম। ভিতরে এরকম অজস্র দরজা রয়েছে, সব গুলোতে ঢুকে ঢুকে ট্রাই করতে হলে আমাদের আয়ু শেষ হয়ে যাবে তবু পাজল শেষ হবেনা।"
অংশুমান বলল, "কতগুলো দরজা আছে ভিতরে? আপনার অনুমান?"
ভদ্রলোক বললেন, "চারনম্বর পাজলের ভিতরে আছে দশকোটি দরজা। আমি সর্বাধিক যে দরজার নম্বর দেখেছিলাম তা ন'কোটি আটশো সাতান্ন, ওই হিসাবে বললাম।"
"ও মাই গড, দ্যাটস ইমপসিবল," বলে উঠল অংশুমান। বলল, "বাকি দরজা গুলো, কোনটা সহজ বলে আপনার মনেহয়েছে?"
ভদ্রলোক বললেন, "কোনোটাই সহজ নয়। সবগুলোই একই রকম। তবে দু'নম্বর দরজাটা সব চেয়ে বিপদ জনক। ওখানে অদ্ভুত অদ্ভুত সব প্রানীদের বাস। ওই দরজা দিয়ে কিছুটা গিয়ে আর যেতে পারিনি।"
"আচ্ছা," মাথা নাড়ল অংশুমান। বলল, "যদি মরতেই হয় এডভেঞ্চার করেই মরব, চলুন আমরা দু'নম্বর দরজা দিয়েই ঢুকি।"
ভদ্রলোক বললেন, "কি বলছেন কি? ওই পথে পাঁচ মিটারও যেতে পারবেন না।"
অংশুমান বলল, "দেখাই যাক না, আপনি বাইশ বছর কোমায় পড়ে আছেন, আর বেঁচে থেকেই বা কী করবেন? পৃথিবীতে আর আপনার জন্য আছেটাই বা কী? আর আমি রিস্ক নিতে ভালবাসি। এটা বিশ্বাস করি রিস্ক না নিলে কিচ্ছু পাওয়া যায়না। মরতে তো হতই। যে মুহূর্তে ট্রাক টা আমাকে ধাক্কা দিয়েছিল সেই মুহূর্তেই মরে যেতে পারতাম, এতক্ষন বেঁচে আছি এটাই ঈশ্বরের করুনা। দেখাই যাক না গিয়ে কি হয়।"
ভদ্রলোক বললেন, "আচ্ছা বলছেন যখন চলুন তবে। কিন্তু আমি মারা গেলে আপনি কিন্তু তারজন্য দায়ি থাকবেন।"
অংশুমান হাসল। বলল, "আপনি বোধহয় এই সহজ সত্যিটা এখোনো মানতে পারেননি যে আপনি মারা গেছেন। আপনার কাছে আর হারাবার কিছুই নেই। এত বছর ধরে দরজার পাজল সলভ না করে ওই ভয়ংকর জীব জন্তুদের হাতে যদি আগেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতেন তাহলে আপনার জন্য যে মানুষগুলো খরচ করে এখোনো আপনাকে বাঁচিয়ে রেখেছে, তারা শান্তি পেত।"
ভদ্রলোক হাসলেন। বললেন, "আমি একটা আশা নিয়েই বেঁচে আছি, আমাকে যে মারার চেষ্টা করেছিল কোমা থেকে ওঠার পরে তার নামটা সকলের সামনে প্রকাশ করব।"
অংশুমান বলল, "হুম, যাইহোক এতক্ষণ আপনার সঙ্গে কথা বলছি আপনার নামটাই জানা হয়নি। বলুন আপনার নাম কি?"
ভদ্রলোক বললেন, "আমার নাম জিমি, জিমি কার্টার। আমি লণ্ডনে সাইকোলজির প্রফেসার ছিলাম। আমার বন্ধু জন সামান্য কিছু টাকার জন্য উন্মত্ত অবস্থায় আমাকে ছাদ থেকে ধাক্কা দেয়।"
অংশুমান অবাক হল, "ও মাই গড। আপনিই জিমি কার্টার? বছর পাঁচেক আগে আমি আপনার কেস হিস্ট্রিটা পেপারে পড়েছিলাম। কোমা থেকে ফিরে আসার পরে আপনি নাকি জবানবন্দিতে বলেছিলেন জন আপনাকে ছাদ থেকে ঠেলে খুন করার চেষ্টা করে, একথা শোনার পরে আপনার বন্ধু জন সুইসাইড করে। হিস্ট্রিতে প্রথম বার কোনো ভিক্টিম কোমা থেকে ফিরে এসে তার খুনিকে চিনিয়ে দিতে সাহাজ্য করেছিল, তাই আপনাকে নিয়ে খুব মাতামাতি হয়েছিল সে সময়।"
জিমি বললেন, "তাই কি? আমি এতটা জানতাম না। আমি ওই ঘন্টা খানেকের জন্যই কোমা থেকে ফিরেছিলাম, তারপর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাই।"
অংশুমান বলল, "আচ্ছা, চলুন তবে ভিতরে ঢোকা যাক।"
জিমি মাথা নাড়লেন, "চলুন।"
.......
"নমস্কার আমরা কোতোয়ালি থেকে আসছি। আপনার হাজবেন্ডের ব্যাপারে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাই।"
"হ্যাঁ কি জানতে চান বলুন?"
"আপনার হাজবেন্ডের ব্যাপারটা কি এক্সিডেন্ট, নাকি প্ল্যান মার্ডার, আপনার কি মনেহয়?"
"দেখুন, আমি যতদূর জানি ওনার সেভাবে কোনো শত্রু ছিলনা। তবে উনি একজন বিজনেসম্যান ছিল, সেই হিসেবে ওনার শত্রু থাকতেই পারে, কিন্তু আমাদের ব্যক্তিগত কোনো শত্রু ছিলনা।"
"কেন ম্যাডাম, রাজ সিনহা?"
"হোয়াট?"
"আমরা খবর পেয়েছি রাজ সিনহার সঙ্গে আপনার বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক ছিল।"
"দেখুন আপনি আমার পার্সোনাল ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করছেন।"
"আমরা অনুমান করছি, আপনাদের সম্পর্কের মাঝে অংশুমান বাবু কাঁটা হয়ে উঠেছিলেন, তাই আপনি আর রাজ সিনহা মিলে ওনাকে পথ থেকে সরিয়ে দেবার প্ল্যান করেন। অংশুমান বাবুর কললিস্টে লাস্ট কল কিন্তু আপনাকেই করা হয়েছে।"
"দেখুন রাজের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কথাটা মিথ্যে নয়। রাজ আমার ক্লাস মেট ছিল, ওর সঙ্গে আমার প্রেম ছিল, বিয়ের পরে রাজের সঙ্গে আমার রিলেশন ভেঙ্গে যায়। গত বছর আমি আবার রাজকে ফেসবুকে খুঁজে পাই। অংশুমান আমাকে টাইম দিতে পারতনা, তাই রাজ আমার কাছাকাছি এসে যায়, ওর সঙ্গে আমার বেশ কয়েকবার ফিজিক্যাল রিলেশনও হয়েছে, কিন্তু তার জন্য আমার অংশুমান কে খুন করার দরকার পড়তনা। অংশুমান আমার বেস্টফ্রেন্ড ছিল। আমি ওর গার্লফ্রেন্ড লিজার ব্যাপারে যেমন সব কিছুই জানি ও আমার বয়ফ্রেন্ড রাজের ব্যাপারে সব কিছুই জানে, আমরা কেউ কাউকে এসব নিয়ে বাধা দিইনি।"
"আচ্ছা বুঝলাম, এখন আসি। পরে দরকার পড়লে আবার আপনার যোগাযোগ করব। আচ্ছা, রাজের ঠিকানাটা দিতে পারবেন?"
"দেখুন কিছু না জেনে এসব ব্যাপারে রাজ জড়াক আমি তা চাইনা। আর রাজের ঠিকানায় গেলে আপনি সম্ভবত ওকে পাবেন না, ও দিন সাত আগে এই শহর ছেড়ে চলে গেছে। আমি নিজে ওকে ফ্লাইটে চাপিয়ে দিয়ে এসেছি।"
"ও আচ্ছা, সরি ফর ডিস্টার্ব ইউ। তবে মনে রাখবেন আপনার কথা যদি মিথ্যে প্রমানিত হয়..."
"হুম, সেটা হবেনা। আমার জীবনে গোপন কিছু নেই, আপনারা বরং খুনি গাড়িটাকে খোঁজার চেষ্টা করুন।"
"আচ্ছা, থ্যাঙ্ক ইউ।"
.......

"হ্যালো রাজ?"
"হ্যা, রুমা বলো? অংশুমান দা কেমন আছে?"
"আপাতত অবস্থা স্থিতিশীল। এই মাত্র পুলিশ এসেছিল। তোমার সঙ্গে আমার রিলেশন নিয়ে জিজ্ঞেস করছিল।"
"তুমি বলে দাওনি তো যে আমার সঙ্গে তোমার রিলেশন ছিল।"
"বোকার মতো কথা বোলোনা, আমি কিছু গোপন করার চেষ্টা করলেই আমাদের উপরে ওদের সন্দেহ হত, তখন অযথা পুলিশ তোমাকে হ্যারাস করত। যাইহোক যা বলছিলাম, পুলিশ যদি তোমাকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে কিছু গোপন কোরোনা।"
"আচ্ছা করবনা। তুমি সাবধানে থেকো, আর অংশুমান দা জ্ঞান ফিরলে খবর দিও।"
"আচ্ছা, টা টা।"
"হুম, টা টা।"

....
রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অংশুমান বলল, "উফ! পথের যে কোনো শেষ নেই।"
কার্টার বললেন, "না মশাই পথের কোনো শেষ নেই, পথ মেশে পথের গভীরে। চলুন ওই গাছ তলাটায় গিয়ে একটু আরাম করে বসি।"
অংশুমান বলল, "বসলে তো লেট হয়ে যাবে। আর আপনার অদ্ভুত প্রানীদেরও তো এখোনো পর্যন্ত কোনো দেখা পেলাম না।"
জিমি বললেন, "নিশ্চই পাবেন, অপেক্ষা করুন।"
ওরা দু'জনে গাছের তলায় গিয়ে বসল। গাছটার বিশাল বিশাল ঝুরি ডোগা থেকে মাটি পর্যন্ত নেমে গিয়েছে। জিমি বললেন, "এবারে সামনে দিকে তাকান।"
সামনে তাকিয়ে অংশুমান যা দেখল তাতে ওর গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। এতক্ষণ ধরে ওরা একটা বিশাল সাপের পিঠের উপর দিয়ে হেঁটে আসছিল, সামনেই সাপটা তার অন্ধকার হা মুখ বার করে বসে আছে। জিমি বললেন, "আর একটু এগুলেই আমরা সাপের মুখে পড়ে যেতাম। এখান থেকে এগিয়ে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই।"
অংশুমান বলল, "এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা আছে। হেঁটে যাওয়া হয়তো যাবেনা কিন্তু উড়ে উড়ে ওই জায়গাটা পেরিয়ে যাওয়া যাবে।"
জিমি অবাক হলেন, "উড়ে উড়ে? হাউ ইট ইজ পসিবল?"
অংশুমান বলল, "এই গাছটার দুটো ঝুরি ধরে পাশের খাদে লাফ দিন। চলুন দু'জনে একসঙ্গে করি।"
ওরা দু'জনে গাছের ঝুরি ধরে খানিকটা ছুটে এসে পাশের খাদে লাফদিল। ওদের চাপে গাছটা খানিকটা বেঁকে গেল, তারপর ওদের আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে ঝুরি সমেত সোজা হওয়ার চেষ্টা করল। শূন্যে পৌঁছে অংশুমান বলল, "ঝুরি ছেড়ে দিন জিমি, নাহলে আমাদের আবার আগের জায়গায় ফেরত আসতে হবে।"
ওরা ঝুরি ছেড়ে দিল। আর বিশাল সাপেটার মুখ টপকে একটা বিশাল গুঁড়ির উপরে এসে পড়ল। পিছনে তাকিয়ে অংশুমান বুঝল দুটো পাহাড়ের মাঝের খাদটার মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করছে এই গুঁড়িটা। জিমি বলল, "নিচে দেখুন কি ভয়ংকর!"
নিচের দিকে তাকাল অংশুমান। খাদের নিচে প্রাগৈতিহাসিক যুগের বিশাল বিশাল সাইজের কাঁকড়াবিছে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বলল, "নিচে তাকাবেন না, সোজা দাঁড়িয়ে হাঁটতে থাকুন।"
জিমির পা কাঁপতে লাগল। বললেন, "এখন আমরা যেটার উপরে হাঁটছি সেটাও যে একটা বিশাল সাইজের সাপ বুঝতে পারছেন তো?"
অংশুমান বলল, "তা বুঝতে পারছি, তবে আমরা সম্ভবত সাপটার লেজের দিকে হাঁটছি। দেখছেন না গুঁড়িটা ক্রমশ সরু হয়ে আসছে।"
জিমি বললেন, "কিন্তু সাপটা যদি হঠাৎ নড়ে ওঠে আমাদের কি অবস্থা হবে সেটা ভাবতেই তো আমার গায়ের রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছে।"
অংশুমান বলল, "ভয় পেয়ে কাঁপবেন না বেশি, তাহলেই হবে সাবধানে ধিরে সুস্থে এগিয়ে চলুন।"
শেষের দিকে গুঁড়িটা এত সরু হয়ে গিয়েছে যে হেঁটে সেটা পার হওয়া প্রায় অসম্ভব। ভয়ার্ত গলায় জিমি বললেন, "সম্ভবত আমাদের ফিরে যেতে হবে, এরপর যাওয়ার কোনো উপায় নেই।"
অংশুমান বলল, "এখান থেকে লাফ দিন।"
জিমি বললেন, "আপনি কি পাগল হলেন? এখান থেকে ওপাশের দূরত্ব মিনিমাম পনেরো ফুট। আমি স্কুলেও কোনোদিন এত লম্বা হাইজাম্প মারিনি।"
অংশুমান বলল, "দুর্বল হবেন না। নিজের আত্মার শক্তিতে বিশ্বাস করুন। নিশ্চই পারবেন। চোখ বুজে শ্বাস নিন এবং লাফ দিন।"
জিমি লাফ দিলেন ওর পিছনে পিছনেই লাফ দিল অংশুমান। শূন্যে ভাসমান অবস্থায় জিমির হাত ধরল সে, তখনই দেখতে পেল বাজ পাখির মতো একটা বিশাল সাইজের পাখি পিছন থেকে উড়তে উড়তে ওদের দিকেই এগিয়ে আসছে।

ভয়ার্ত গলায় জিমি বললেন, "আর তো বাঁচার কোনো উপায় আছে বলে মনে হচ্ছেনা।"
অংশুমান বলল, "উপায় আছে।"
পাখিটা কাছাকাছি আসতেই জিমিকে ধাক্কা মারল অংশুমান। জিমি আর অংশুমান দুদিকে খানিকটা করে সরে গেল। পাখিটার মুখটা পেরিয়ে যেতেই অংশুমান চিৎকার করে বলল, "পাখির ডানাটা ধরে ফেলুন।"
জিমি চিৎকার করল, "কি পাগলের মতো কথা বলছেন?"
অংশুমান বলল, "নিচের দিকে তাকালেই গোটাটা বুঝতে পারবেন।"
নিচের দিকে তাকালেন জিমি। নিচে বিশাল বিশাল সাইজের অজস্র ব্যাঙ তাদের লক লকে জিভ আকাশের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভয়ে পাখির একটা ডানা ধরে ফেললেন জিমি। অংশুমান অন্য ডানাটা ধরে পাখিটার পিঠে চেপে পড়ল। ডানা ধরে উড়তে উড়তে জিমি বললেন, "উফ! বলিহারি আপনার সাহস। আপনিই পারবেন এই ট্র‍্যাপ থেকে বেরিয়ে আসতে।"
অংশুমান বলল, "পারব কীনা জানিনা, কিন্তু চেষ্টা করতে আপত্তি কী?"
বেশ খানিকটা যাওয়ার পরে পাখিটা মাটির দিকে নামতে শুরু করল। অংশুমান দেখল নিচে একটা বিশাল ঘাসের বন রয়েছে, তারপাশে রয়েছে একটা ঝিল। পাখিটা ওই ঝিলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অংশুমান বলল, "পাখিটা ঝিল পর্যন্ত যাওয়ার আগেই নিচে লাফ দিন। ঝিলের চারপাশে বিশাল বিশাল কুমির আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে।"
জিমি বললেন, "ঘাস বনটা মোটেই কিছু সেফ জায়গা নয়, তাকিয়ে দেখুন ওখানে বিরাট বিরাট সিংহরা অপেক্ষা করে আছে।"
পাখিটা উড়তে উড়তে একটা গাছের কাছাকাছি আসতেই অংশুমান বলল, "এই গাছের ডাল ধরে ঝুলে পড়ুন, তাহলে সিংহের হাত থেকে রক্ষে পাওয়া যাবে।"
জিমি বললেন, "গাছটা মোটেই কিছু সুবিধের নয়, এক্ষুনি পাখিটার পিঠ থেকে নিচে লাফ দিন নাহলে মরবেন।"
জিমি পাখিটার ডানা ছেড়ে দিয়েছে। আর ভাবনাচিন্তা না করে পাখিটার পিঠ থেকে নিচে লাফ দিল অংশুমান, তখনই দেখতে পেল গাছটার দুটো লতা এসে পাখিটাকে জড়িয়ে ধরল, তারপর পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে পাখিটাকে ছিবড়ে বানিয়ে নিচে আছড়ে ফেলল। নিচে আছড়ে পড়ে জিমি বললেন, "আমারও কিছু কিছু আইডিয়া মাঝে মাঝে কাজে লাগে।"
অংশুমান বলল, "আর ভাবনা চিন্তার সময় নেই, এক্ষুনি গাছটার দিকে দৌড় লাগান নাহলে আমাদের সিংহের মুখে পড়তে হবে।"
জিমি চমকে উঠলেন, "গাছটার দিকে দৌড়াব?  কি বলছেন আপনি?"
অংশুমান বলল, "যা বলছি করুন।"
ওরা গাছটার দিকে দৌড়াতে লাগল। তখনই দেখতে পেল আট দশটা সিংহ ওদের তেড়ে আসছে। গাছটার কাছাকাছি আসতেই অংশুমান বলল, "যতটা সম্ভব গড়াগড়ি দিয়ে গাছটা পার হয়ে যান। যতটা সম্ভব মাটির সঙ্গে চিপকে থাকুন। খবরদার ওপরে ওঠার চেষ্টা করবেন না।"
ওরা গড়াগড়ি দিয়ে গাছের তলাটা পেরিয়ে যেতেই সিংহগুলোকে গাছটা তার লতা দিয়ে পেঁচিয়ে ধরল। কড়মড় করে কয়েকটা হাঁড় ভাঙ্গার শব্দ পেল অংশুমান। কিছুদূর গিয়ে গা ঝেড়ে সে উঠে দাঁড়াল। জিমিকেও হাত ধরে টেনে উপরে তুলল। জিমি বললেন, "খুব বাঁচা বেঁচে গেছি।"
অংশুমান বলল, "আমার মনেহয় সত্যিই বেঁচে গেছি।"
সামনে তাকাতেই দেখতে পেল ওদের সামনে একটা বিশাল দরজা রয়েছে, তার সামনে থেকে আলো এসে ভিতরে ঢুকছে। দরজাটার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে অংশুমান বলল, "যদি বেঁচে উঠি আমাকে মনে রাখবেন তো?"
জিমি বললেন, "নিশ্চই রাখব। কিন্তু বেঁচে ওঠার পরে এই ঘটনাগুলো মনে থাকবে তো?"
হা হা হা করে হেসে উঠল অংশুমান। বলল, "দেখা যাক।"

......

"ডাক্তার বাবু পেসেন্টের জ্ঞান ফিরছে।"
"ওয়াও! খুব ভাল খবর। পেসেন্ট কি বিড়বিড় করছে একটু শুনুন তো কান পেতে।"
"হ্যা ডাক্তার বাবু। পেসেন্ট কিছু একটা নাম্বার বলছে, ডব্লিউ বি থ্রি ফোর ট্রিপল ফাইভ..."
"নম্বরটা নোট করুন। এক্ষুনি, কুইক।"
"হ্যাঁ করে নিয়েছি।"
"আচ্ছা, ওকে।"

.....

"হ্যালো কোতোয়ালি থানা?"
"হ্যাঁ বলছি।"
"আমি সি এম আই হাসপাতাল থেকে বলছি। পেসেন্ট অংশুমান মুখার্জীর এই মাত্র জ্ঞান ফিরেছে। উনি একটা নাম্বার দিয়েছেন, নাম্বারটা নোট করুন, আই থিঙ্ক এটাই সেই ট্রাকের নাম্বার যেটা ওনাকে ধাক্কা মেরেছে।"
"ওকে। আমরা এক্ষুনি ট্রাকটাকে খুঁজে বার করার চেষ্টা করছি।"

.....
"হ্যালো, রুমা মুখার্জী বলছেন?"
"হ্যাঁ বলছি কে বলছেন জানতে পারি?"
"আমি কোতোয়ালি থানা থেকে বলছি। আপনার হাজবেন্ডকে যে ট্রাকটা ধাক্কা মেরেছিল তার খোঁজ আমরা পেয়েছি।"
"হোয়াট? কিছু জানতে পেরেছেন?"
"হ্যাঁ সব কিছুই জানতে পেরেছি। পালাবার চেষ্টা করবেন না। আপনার ফোনের টাওয়ার লোকেশন ট্রাক করে আপনার প্রেমিক রাজ সিনহা কেও আমরা এরেস্ট করেছি। আপনার ঘরের বাইরে আমাদের কনস্টেবলরা ওয়েট করছেন আপনি নিচে নেমে আসুন।"

.....

"অংশুমান বাবু ভাল আছেন?"
"হ্যাঁ এখন মোটামুটি সুস্থ। ইস! সেদিন ফোনে এতটাই ডুবে গিয়েছিলাম যে পিছনে ট্রাকটা আসছে মোটেই খেয়াল করিনি। আপনাদের অজস্র ধন্যবাদ ডাক্তার বাবু। স্বাক্ষ্যাত মৃত্যুর হাত থেকে আপনারা আমাকে ফিরিয়ে এনেছেন।"
"হুম অংশুমান বাবু আপনাকে একটা খারাপ খবর দেওয়ার আছে।"
"খারাপ খবর! কি?"
"আপনি আপনার স্ত্রী'র বয়ফ্রেন্ড রাজ সিনহাকে চিনতেন?"
"হ্যাঁ চিনতাম। বিয়ের রাতেই ও আমাকে বলেছিল রাজ নামে ওর একজন প্রেমিক আছে তাই আমার সঙ্গে স্বাভাবিক বিয়ের সম্পর্ক করা ওর পক্ষে সম্ভব নয়। আমি ব্যাপারটা মেনে নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম বিয়ের আগে এরকম সম্পর্ক অনেকেরই থাকে, আমি যদি ওকে ওর বয়ফ্রেন্ডের চেয়েও বেশি ভালবাসা দিতে পারি ও হয়তো ওর বয়ফ্রেন্ডকে ভুলে গিয়ে আমাকে আপন করে নেবে।"
"বিয়ের পরেও আপনার স্ত্রী'র সঙ্গে রাজ সিনহার রিলেশন ছিল এটা জানতেন?"
"হ্যাঁ শুনেছিলাম। আসলে আমি ব্যাবসার কাজে বিজি রইতাম, সব সময় ওকে সময় দিতে পারতাম না, তাই ও কি করছে না করছে খোঁজ রাখা সম্ভব হতনা। কিন্তু লাস্ট কয়েকমাস আমি নিজেকে বদলে ফেলেছিলাম। ওর খোঁজ খবর রাখার চেষ্টা করতাম, ওকে এনিভার্সারিতে ডায়মন্ড নেকলেস গিফট করার কথা ভেবেছিলাম। তাছাড়া আমাদের একটা বাচ্চা নেওয়ারও প্ল্যান ছিল।"
"ও আচ্ছা, আপনার এতটা কেয়ার ফুল হওয়াই তাহলে আপনার স্ত্রীকে ডেঞ্জারাস করে তুলেছিল। ওই ট্রাক ড্রাইভারকে আপনার স্ত্রীই আপনাকে খুন করার সুপারি দেয়। ওর প্ল্যান ছিল আপনাকে খুন করে আপনার মৃত্যুটাকে এক্সিডেন্ট বলে প্রমান করা এবং আপনার সম্পত্তির মালকিন হয়ে রাজ সিনহাকে বিয়ে করা। কিন্তু দুর্ভাগ্য আপনি বেঁচে যান। আপনার বলা ট্রাকের নাম্বার ধরে পুলিশ ট্রাক ড্রাইভারকে এরেস্ট করে। যদিও নাম্বার প্লেট টা ভুয়ো ছিল। কিন্তু পুলিশ বিশেষ সূত্র ধরে ওই ভুয়ো নাম্বার প্লেট তৈরির কারখানায় পৌঁছে ট্রাক ড্রাইভারের পরিচয় জানতে পারে।"
"হে ভগবান! শেষ পর্যন্ত রুমা আমাকে খুন করার চেষ্টা করল। পুলিশ কি ওদের এরেস্ট করেছে?"
"হ্যাঁ পুলিশ রাজ সিনহাকে এরেস্ট করেছে। কিন্তু আই এম সরি টু সে ওরা আপনার স্ত্রী'র নাগাল পায়নি। এরেস্ট হওয়ার আগেই ও সুইসাইড করেছে..."
"ও মাই গড...."
"কাঁদবেন না অংশুমান বাবু। যা হয়েছে তাকে নিয়তির খেলা হিসাবে ধরে নিন। বাই দ্যা ওয়ে, আপনার সঙ্গে দেখা করবে বলে লিজা নামে একটি মেয়ে অনেকক্ষণ ওয়েট করছে।"
"হ্যাঁ পাঠিয়ে দিন। ও আমার পি এ।"

.....
"ভাল আছেন স্যার।"
"হ্যাঁ ভাল আছি। রুমার ঘটনাটা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল।"
"হ্যাঁ আমারও খারাপ লাগল। উনি এমন করবেন ভাবতে পারিনি। অবশ্য যার মনে এত সন্দেহ সে এরচেয়ে ভাল আর কী বা করতে পারে।"
"সন্দেহ। কি বলছ তুমি?"
"উনি আমাকে আপনার গার্লফ্রেন্ড ভাবতেন। একদিন ফোন করে গালাগালিও দিয়েছিলেন।"
"ও মাই গড। এসব কথা তো আগে বলোনি।"
"স্যার, এই চাকরিটার জন্য আমার ফ্যামেলি চলে। আমি পারতাম না আপনাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির জন্য আমার চাকরিটা শেষ হয়ে যাক, তাই সব অপমান হজম করে নিয়েছিলাম।"
"আচ্ছা, তুমি এখন বাড়ি যাও। আমার জন্য তোমাকে অনেক কলঙ্কের বোঝা বইতে হয়েছে। আর যাতে না হয় সেই ব্যবস্থা আমি করব।"

......

অংশুমান দা চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। বললেন, "কফি খাবে?"
বললাম, "আচ্ছা, বলুন তবে।"
ট্রেনে যেতে যেতে একদিন অংশুমান দা'র সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। মোবাইলে কি প্যাডে আমাকে বাংলা টাইপ করতে দেখে বলেছিলেন, "কি লিখছ?"
বলেছিলাম, "গল্প লিখছি। আমরা ভ্যাগাবণ্ড রাইটার। সময় পেলে টুকিটাকি কিছু লিখে ব্লগে পোষ্ট করি। সামান্য কিছু পাঠক আছে ওরাই পড়ে। কেউ বাহবা দেয়, কেউ গালি দেয়। সব মিলিয়ে চলে যায়।"
অংশুমান দা হেসেছিলেন। বলেছিলেন, "যদি গল্পের প্লট চাও তো আমার বাড়িতে একবার এসো, আমার জীবনটা গল্পের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।"
বলেছিলাম, "আচ্ছা দাদা নিশ্চই যাব।"

সেই সূত্রেই আজ আমার অংশুমান দা'র বাড়িতে আসা। জিজ্ঞেস করলাম, "আচ্ছা দাদা কোমায় আচ্ছন্ন অবস্থায় আপনি যেগুলো দেখেছিলেন সেগুলো কি কেবলই কল্পনা আই মিন স্বপ্ন নাকি এর মধ্যে বাস্তবতা কিছু আছে?"
অংশুমান দা বললেন, "আমি এতদিন কেবল স্বপ্ন হিসাবেই এগুলোকে ভাবতাম, কিন্তু কয়েকদিন আগে জিমি কার্টার নামে এক ভদ্রলোকের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এসেছে আমার ফেসবুক প্রোফাইলে। প্রোফাইল সার্চ করে জানতে পারলাম ভদ্রলোক নাকি বাইশ বছর কোমায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। আমি ভদ্রলোক কে জিজ্ঞেস করেছিলাম ডু ইউ নো মি? তার উত্তরে উনি কি বললেন জানো? উনি নাকি আমার নামটা স্বপ্নে পেয়েছেন। এরপর আর সন্দেহ থাকা উচিৎ নয়।"
কথা বলতেই এক ভদ্রমহিলা আমাদের কফি দিয়ে গেলেন। জিজ্ঞেস করলাম, "তারপর লিজার কি হল? ওনাকে কাজে রেখেছিলেন নাকি কাজ থেকে বার করে দিয়েছিলেন?"
অংশুমান দা হাসলেন। বললেন, "হ্যাঁ, কাজ থেকে বার করে দিয়েছিলাম। কারন ওর আর কাজ করার দরকার ছিলনা। এই মাত্র যে মেয়েটা আমাদের কফি দিয়ে গেল ওই লিজা, এখন আমার স্ত্রী।"
হাতে একখানা টাটকা গল্পের প্লট নিয়ে আমি অংশুমান দার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। আমার মনটা এখোনো খচ খচ করছে। নিজেকে বিজ্ঞান মনষ্ক বলে গর্ব করি, কিন্তু অংশুমান দা'র গল্পটা সেই বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করল। আমি জানিনা এজিনিস বিশ্বাসের যোগ্য কীনা, আপনারাই তার বিচার করুন।

(সমাপ্ত)

রক্ত

রক্ত

শঙখ শুভ্র নায়ক



"বিছানায় রক্ত দেখেছিলে বৌদি? আমি তো গোটা বেড কভারে কেবল নারকেল তেলের ছাপই দেখলাম, রক্ত তো খুঁজেই পেলাম না।" রাতে শোয়ার পরে এক মহিলা আর এক মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন। দ্বিতীয় মহিলা বললেন, "হ্যাঁ, আমি রক্ত দেখেছি, খুব কম ছিল যদিও।" প্রথম মহিলা হাঁপ ছাড়লেন। বললেন, "তাহলে ঠিকই আছে।"

বছর দশেক আগের কথা। একরাতে ঘুম ভেঙ্গে গিয়ে ঠিক এই কথাগুলোই শুনেছিল অরিত্র। যদিও বিছানায় রক্ত না রইলে কি হত তা সে বোঝেনি। আজ সে বুঝতে পারে ওর মা আর পিসি ওর কাকুর বিছানায় কেন তন্ন তন্ন করে রক্ত খুঁজছিল। সতী আর অসতীর ধারনাটা কেউ যেন অজান্তেই সেদিন ওর মনের মধ্যে গেঁথে দিয়েছিল। দেখতে দেখতে সে বড় হল। স্কুল টিচার অরিত্র এখন সমাজ গঠনের কাজ করে, তবু ওর মনের মধ্যে গেঁথে থাকা সেই ধারনা থেকে সে বেরুতে পারেনি। দিন দুয়েক হল বিয়ে হয়েছে অরিত্রর। আজ ওর ফুলশয্যা। বিয়েটা এরেঞ্জ ম্যারেজ করেই হল। পাঁচলক্ষ টাকা পন পেয়েছে সে। অবশ্য ওর কোনো ইচ্ছে ছিলনা পন নেওয়ার। কিন্তু পন নিতে না চাওয়ায় এর আগে ওর দুটো সম্বন্ধ ভেঙ্গে গিয়েছিল। পাত্রী পক্ষের মনেহয়েছিল পাত্রের নিশ্চই কোনো খুঁত আছে। নাহলে টাকা নিতে চায়না কেন? তাই এবারে কোনো রিস্ক নেয়নি সে। কড়ায় গণ্ডায় পুরোটাকা আদায় করেছে। কিন্তু পাত্রীর বাবার মুখ দেখে মনেহয়েছিল ওরা বড্ড কম দাবি করেছে, ওনার আরো দেওয়ার ইচ্ছে ছিল। সেই থেকেই ওর মনটা বড্ড খুঁত খুঁত করছে।

সন্ধ্যে নাগাদ যা কিছু নিয়ম কানুন সব শেষ করে বাথরুম থেকে ফিরে রুমে এসে ঢুকল অরিত্র। দরজা বন্ধ করে বেডের দিকে এগিয়ে গেল। রুমটা খুব সুন্দর ভাবে সাজানো আছে। সামনে সোফা। তারপাশে টেবিল। টেবিলের গা ঘেঁসে ওদের বেড। বেডের ডান্ডা গুলো রজনীগন্ধা, গাঁদার মতো ফুলের মালা দিয়ে সাজানো আর বেডটাতে ছড়ানো রয়েছে গোলাপের পাপড়ি। বেডের একপাশে একটা বালিসে ঠেস দিয়ে বসে আছে তৃষ্ণা। সম্বন্ধ হবার পরে প্রায় তিন মাস ওদের ফোনে কথাবার্তা হয়েছে। কথাশুনে মনেহয়েছে তৃষ্ণা সত্যিই খুব ভাল মেয়ে। খুব কেয়ারিং। এরকম স্ত্রী পাওয়া সত্যিই খুব ভাগ্যের। বেডে উঠে তৃষ্ণার পাশে গিয়ে বসল অরিত্র। বিছানা ছেড়ে উঠে এল তৃষ্ণা। টেবিল থেকে তুলে একটা দুধের গ্লাস ওর দিকে এগিয়ে দিল। বলল, "অর্ধেকটা খেয়ে বাকি টুকু আমার জন্য রেখে দাও।"
দুধের গ্লাসে দুটো চুমুক দিল অরিত্র। বাকিটুকু শেষ করে গ্লাসটাকে টেবিলে নামিয়ে রেখে ড্রেস চেঞ্জ করে নাইটি পরল তৃষ্ণা। অরিত্রর পাশে গিয়ে বসে বলল, "শোবেনা?"
অরিত্র মাথা নাড়ল। বালিশে মাথা রেখে সে শুয়ে পড়ল । নাইট বাল্ব নিভিয়ে ওর গা ঘেঁসে শুয়ে পড়ল তৃষ্ণা। খানিকক্ষণ এপাশ ওপাশ করে শেষ পর্যন্ত তৃষ্ণাকে জড়িয়ে ধরল অরিত্র, তৃষ্ণাও সম্মতি দিল।

মাঝরাতে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল অরিত্র। ওর মনের মধ্যে পোকাটা গুনগুন করতে শুরু করেছে। নাইট বাল্ব জ্বালিয়ে টর্চটা হাতে তুলে নিল। বেশ খানিকক্ষণ হল ঘুমিয়ে পড়েছে তৃষ্ণা। সে বিছানায় উঠে এল। গোটা চারপাশে আলো ফেলে তন্নতন্ন করে সেই দাগটা খুঁজতে লাগল। না, কোথাও একবিন্দুও রক্ত নেই। তারমানে...?

প্যান্ট পরে বাথরুমে গেল অরিত্র। ফিরে এসে সোফায় বসে একটা সিগারেট ধরাল। চাঁদের আলো ফিকে হয়ে জানালায় এসে পড়েছে। সেদিকে তাকিয়ে আজ সকালের কাগজে পড়া একটা খবর ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল। গতকাল দুপুরে গড়িয়াহাটের এক গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছে। মাত্র তিন মাস হল মেয়েটির বিয়ে হয়েছিল। শাশুড়ি মা কোনো ভাবে মেয়েটির আগের সম্পর্কের ব্যাপারে জানতে পারে, সেই নিয়ে রেগুলার খোঁটা দিত। সহ্য করতে না পেরে মেয়েটা গলায় দড়ি দেয়।

সিগারেট শেষ করে তৃষ্ণার মুখের দিকে তাকাল অরিত্র। কী নিষ্পাপ একটা মুখ! অথচ ওই মুখের আড়ালে কী পাপ লুকিয়ে আছে? ভাবতেই ওর শরীর শিউরে উঠল। খুব ক্লান্ত লাগছে ওর। জানালার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা বাতাস রুমে এসে ঢুকছে। সে সোফায় হেলান দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওর দুটো চোখ ধীরেধীরে বুজে এল।

রাতের বেলায় সাত নম্বর গলিটা সচরাচর এড়িয়েই চলে অরিত্র। দশটার পরে এই গলিতে লোক দেখা যায়না। রায়টের সময় তিন তিন খানা ডেড বডি আবিষ্কার হয়েছিল এই গলির ভিতরে। একটা দেখেছিল সে। ধারালো কিছু দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয়েছিল লোকটাকে। কী বিভৎস লাগছিল! সেই থেকে আজো এই গলিটা দিয়ে পেরুলে ওর গা ছমছম করে ওঠে। কিন্তু এই গলিতে সে কিভাবে এল? কেনই বা এল কিচ্ছু বুঝতে পারলনা অরিত্র। ওর যতদূর মনেপড়ে সে সোফায় হেলান দিয়ে শুয়ে পড়েছিল, তারপর ঘুমের ঘোরে হাঁটতে শুরু করেছিল কি? নাকি কেউ ওকে তুলে এনেছে? ওর বুকটা ধক করে উঠল। পকেট থেকে মোবাইল বার করল। রাত দুটো বাজে। ফোন করতে গিয়ে বুঝল মোবাইলে নেটওয়ার্ক নেই। ফোনটা নামিয়ে রাখছিল অরিত্র ঠিক তখনই ওর ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। সামনে তাকিয়ে দেখল একটা কুকুর যেন গলিটা দিয়ে পেরিয়ে গেল। ফোনটা হাতে তুলে নিল অরিত্র। ওপাশ থেকে মেয়েলি গলায় কেউ বলে উঠল, "কেমন আছো অরিত্র? ফুলশয্যার রাত কেমন কাটছে?"
অরিত্র ভ্যাবাচ্যাকা খেল। বলল, "কে বলছেন? আমি তো আপনাকে ঠিক...?"
মেয়েটা হাসল। বলল, "আমি সোমা বলছি। এত তাড়াতাড়ি আমাকে ভুলে গেলে অরিত্র? তোমার মনে পড়ছেনা, প্রথম ফুলশয্যাটা তুমি আমার সঙ্গেই করেছিলে?"
অরিত্রর বুকটা ধক করে উঠল। বলল, "হ্যাঁ মনেপড়েছে। কেমন আছো? এতদিন পরে হঠাৎ আমার কথা মনেপড়ল?"
সোমা বলল, "মনেকরার মতো ব্যবহার তুমি আমার সঙ্গে করেছিলে নাকি? তোমার জন্য আমার জীবন নষ্ট হয়ে গেল।"
অরিত্র ভ্যাবাচ্যাকা খেল। বলল, "মানে? কোথায় আছো তুমি?"
রহস্য ময় গলায় সোমা বলল, "আমি আর নেই অরিত্র, আমি আর নেই।"
ফোন কেটে গেল। এখোনো টাওয়ারের কোনো সিগন্যাল দেখা যাচ্ছেনা। ভট করে মাটিতে বসে পড়ল অরিত্র। গলির এক কোনায় দাঁড় কাকের মতো ল্যাম্পপোষ্ট টা ঝুলে আছে। তার নিচে ফড়ফড় করে উড়ে বেড়াচ্ছে একটা বাদুড়। একটা বোঁটকা গন্ধ কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে। সোমা ছিল ওর প্রথম প্রেম। যৌবন তখন শরীরে টগবগ করে ফুটছে। সম্পর্ক ভেঙ্গে দেবে ভয় দেখিয়ে একদিন এই সোমাকে সে বিছানায় আসতে বাধ্য করেছিল। যদিও সম্পর্ক টেকেনি। শরীর পাওয়ার পরে আর সোমার প্রতি কোনো ইন্টারেস্ট ওর থাকেনি। শুনেছিল সোমার নাকি বিয়ে হয়েছে। তবে কি?

"অরিত্র ভাল আছো তো?" কাঁধের উপরে একটা ঠান্ডা স্পর্শ পেল অরিত্র। চমকে পিছনে তাকাতেই যা দেখল তাতে ওর গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। একটা মেয়ে, শরীরটা বিভৎস ভাবে পোড়া। ব্লাউজ ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়েছে পোড়া স্তন। গা থেকে বেরিয়ে আসছে বিকট বোঁটকা গন্ধ। ওর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। ছিটকে খানিকটা সরে এল অরিত্র। বলল, "কে আপনি? আমাকে চিনলেন কিভাবে?"
মেয়েটা বলল, "আমি তোমার অনুপমা অরিত্র। তোমার মনেপড়েনা, ইউনিভার্সিটিতে আমি তোমার লাভার ছিলাম।"
অরিত্রর বুকটা ধক করে উঠল। বলল, "তোমার এরকম অবস্থা কিভাবে হল?"
অনুপমা বলল, "তুমি তো জানো অরিত্র, তোমাকে বিশ্বাস করে আমি আমার সব কিছু দিয়েছিলাম, কিন্তু আমার বিয়ে হয়ে গেল আর একজনের সঙ্গে। ওরা জানতে পেরে গেল, তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কের কথা, আর তাই গায়ে কেরোসিন ঢেলে...! আমার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই অরিত্র। তুমি প্লিজ আমাকে তোমার বাড়িতে নিয়ে চলো।"

অরিত্র ভয় পেয়ে গেল। উত্তর না দিয়ে গলি বেয়ে সে হাঁটতে শুরু করল। ওর পিছনে পিছনে ওর দিকে এগিয়ে আসতে লাগল অনুপমা। বলতে লাগল, "কি হল অরিত্র, পালাচ্ছ কেন? আমাকে তো তুমিই অসতী করেছ, আমাকে বাড়ি নিয়ে যাবেনা?"
আর হাঁটতে পারলনা অরিত্র। সে ছুটতে শুরু করল। পিছন থেকে ভেসে আসতে লাগল একটা মেয়েলি কন্ঠের কান্নার শব্দ। বেশ খানিকটা ছুটে যাওয়ার পরে একটা কিছুতে হোঁচট খেয়ে সে মাটিতে আছড়ে পড়ল। কে যেন ওর হাত ধরে উপরে টেনে তুলল। বলল, "ওঠ অরিত্র। তোমার লাগেনি তো?"
মাটি থেকে উঠে দাঁড়াল অরিত্র। আকাশে ফুটফুটে চাঁদ রয়েছে। জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। ওপাশে তেঁতুল গাছের মাথার উপরে বসে কতগুলো পাখি হুটোপুটি শুরু করেছে। জ্যোৎস্নার আলোয় সামনে তাকিয়ে সে যা দেখল তাতে ওর চোখ দুটো ছিটকে বেরিয়ে এল। ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা শাড়ি পরা আস্ত নরকঙ্কাল। খোনা গলায় কঙ্কালটা বলে উঠল, "অনেকদিন পরে তোমার সঙ্গে দেখা হল অরিত্র, তুমি তো আর আমার কোনো খোঁজই রাখোনা।"
জড়ানো গলায় অরিত্র বলল, "কে আপনি? আমাকে কিভাবে চিনলেন?"
মেয়েটা বলল, "আমি চন্দ্রিমা গো, আমাকে ভুলে গেলে তুমি। সেবার মেলার সময় আমাকে মাঠে নিয়ে গিয়ে কত কিছু করলে? সব ভুলে গেলে?"
তোতলাতে তোতলাতে অরিত্র বলল, "তু...তুমি এএ...রকম কিভাবে হলে?"
চন্দ্রিমা বলল, "তুমি তো আমার সঙ্গে সব কিছু করে শহরে চলে গেলে, আমার আর কোনো খোঁজই রাখলেনা, এদিকে আমার পেটে বাচ্চা চলে এল। লোক লজ্জার ভয়ে আমি গলায় দড়ি দিয়ে..." একটু থেমে বলল, "চলো, আমি তোমার বাড়িতেই যাচ্ছিলাম। এবার থেকে তোমার বাড়িতেই থাকব।"
অরিত্রর শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। বলল, "প্লিজ তুমি চলে যাও। আমি যা করেছি ভুল করেছি। আমাকে ক্ষমা করে দাও।"
পিছন থেকে এবারর সোমার কন্ঠস্বর শুনতে পেল অরিত্র। সোমা বলল, "চলে যাবার তো আমরা আসিনি অরিত্র।"
অনুপমা বলল, "আজ থেকে আমরা তোমার বাড়িতেই থাকব।"
চন্দ্রিমা বলল, "হ্যাঁ, তোমার বউ হয়ে থাকব। তুমি আমাদের বউয়ের মর্যাদা দিয়ে রাখবে।"
তিনটা অবয়ব ধীরে ধীরে ওর দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। একজনের মুখ থেকে বেরিয়ে আছে লকলকে জিভ। আর একজনের গোটা শরীরটা বিভৎস ভাবে পোড়া। তৃতীয় জন একটা আস্ত নরকঙ্কাল। ভয়ে চোখ বুজে ফেলল অরিত্র। ওর বুকের ভিতরটা হিম হয়ে গেল। চিৎকার করে বলতে লাগল, "প্লিজ আমাকে ক্ষমা করো, তোমরা চলে যাও প্লিজ।"
টের পেল কয়েকটা শরীর যেন ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। ওর শরীরটাকে পিষ্ট করছে কয়েকটা হাত। ওর ঠোঁট গুলোকে মাড়িয়ে দিচ্ছে কয়েকটা হিমশিতল ঠোঁট।

"এখানে শুয়ে আছো?" তৃষ্ণার ডাকে চোখ খুলল অরিত্র। দেখল সে সোফার উপরে শুয়ে আছে আর ওর গায়ের উপরে উঠে ওকে জড়িয়ে ধরেছে তৃষ্ণা। ওর বুক ধুকপুক করছে। তবু বলল, "কাল রাতে সিগারেট খেতে সোফায় এসে বসেছিলাম, টায়ার্ড ছিলাম সম্ভবত তাই এখানেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।"
তৃষ্ণা হাসল। বলল, "আর এত ঘুম কাতুরে হলে চলে? এবারে তো একটু সচেতন হতে হবে। কাল রাতেও তো করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লে, তারপর সব নোঙরা আমাকেই পরিষ্কার হল!"

কথাটা শুনে অরিত্র চমকে উঠল। সোজা তাকাল তৃষ্ণার দিকে। ওর ঠোঁট কেঁপে উঠল। একবার ভাবল জিজ্ঞেস করে ওই নোঙরার ভিতরে রক্ত ছিল কীনা। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে স্বপ্নে সে যা দেখল তারপর আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস হলনা ওর।

(সমাপ্ত)

©All rights reserved to sankha subhra nayak

মূর্তি

মূর্তি

শঙখ শুভ্র নায়ক



আজ সকালেই জগদীন্দ্রপুরে এসেছে সৌমিতারা। ছোট হলেও পাহাড়ের কোলে একটি মনোমুগ্ধকর স্থান জগদীন্দ্রপুর। প্রকৃতি যেন এখানে তার রূপের ডালি উজাড় করে দিয়েছে। ঝরনা, ভুট্টার ক্ষেত মিলিয়ে এক লাবন্যের আভা যেন ছড়িয়ে রয়েছে চারপাশে। উত্তর প্রদেশ বেড়াতে এসে এখানে না এলে যে সত্যিই একটা দারুণ জায়গা দেখা মিস হয়ে যেত সেটা বুঝতে পারছে সৌমিতা। কাল রাতে ওদের ট্যুর পোগ্রামের অ্যারেঞ্জার প্রোফেসার কেবি বসু, যাকে আড়ালে ছাত্র ছাত্রীরা তাঁর বিশালাকার টাকের জন্য ব্যাঙ্গ করে বলে কতবেল বসু, বলেছিলেন, "এবারে আমরা যাব জগদীন্দ্রপুর। এটা আমাদের ট্যুর প্ল্যানে ছিলনা, আমরা জায়গাটার নামও জানতাম না, কিন্তু কাল রাতেই একটা বন্ধু মারফত জায়গাটার ব্যাপারে জানতে পেরেছি।"
সৌমিতা বলল, "স্যার, ওখানে কি আছে?"
কেবি বসু বললেন, "গান্ধার শিল্পরীতির নাম তো তোমরা সকলেই শুনেছ, কিন্তু তোমরা কি কেউ মেডুসার নাম শুনেছ কি?"
অয়ন বলল, "হ্যাঁ স্যার শুনেছি। গ্রিক মিথোলজি অনুসারে ফরকিস আর সিটোর কন্যা ছিলেন মেডুসা। ওনার মাথায় সাপ থাকে..."
কথা শেষ হওয়ার আগেই কেবি বসু বললেন, "এক্সজাক্টলি। এই মেডুসারই একখানি মন্দির রয়েছে জগদীন্দ্রপুরে। যদিও আর পাঁচটা পল্লব শিল্পরীতির মতো এখানেও ইন্দোগ্রিক প্রভাব রয়েছে। মনেকরা হয় গ্রিক মেডুসা আর ভারতীয় দেবী কালীর সংমিশ্রণে এই মূর্তি তৈরি করা হয়েছিল।"
রিসিকা বলল, "স্যার, জায়গাটাকে ট্যুর প্ল্যান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল কেন?"
কেবি বসু বললেন, "বাদ দেওয়া হয়নি, আসলে জগদীন্দ্রপুর জায়গাটা ট্যুরিস্ট স্পট হিসাবে তেমন জনপ্রিয় নয়, তাই সেভাবে নাম শোনা যায়নি। ওখানে একটা হোটেল ছাড়া থাকার জায়গাও বেশি কিছু নেই। কিন্তু আমি জায়গাটার নাম জানতে পেরেই, জায়গাটাকে আমাদের ট্যুর পোগ্রামে ইনক্লুড করে নিয়েছি।"
রিসিকা মাথা নাড়ল। ছাত্রছাত্রীদের দিকে তাকিয়ে কেবি বসু বলেছিলেন, "যাও, তোমরা সবাই রুমে যাও। কাল সকাল হলেই আমরা বেরিয়ে পড়ব।"

জগদীন্দ্রপুরে ট্যুরিস্ট বেশি আসেনা বলে ওরা হোটেলে সিট পেয়ে গেল। হোটেল থেকে সামান্য দূরেই পাহাড়ের কোল ঘেঁসে মেডুসার মন্দির। ওরা একজন গাইডও পেয়ে গেল ঘুরে দেখার জন্য। প্রকাশ নামে এই গাইড ওদের নিয়ে চলল মন্দিরের ভিতরে। ভিতরটা দেখে অবাক হয়ে গেল সৌমিতা। মন্দিরের একেবারে শেষ মাথায় একখানি সিংহাসনের উপরে বসে আছেন রানী মেডুসা। গ্রিক উপকথার মতো তাঁর মাথাতে সাপ না রইলেও, তার চোখগুলো জ্বলজ্বল করছে। মনেহচ্ছে চোখের জায়গায় বসানো আছে দু'খানা লাল রঙের মুক্তো। আর তার সামনে সার দিয়ে একের পর এক সাজানো আছে অজস্র পুরুষের মূর্তি। কী নিঁখুত এক একটা মূর্তি। চোখের লোম, কপালের ভ্রূ, এমনকি দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা মাংসের টুকরোটাকেও নিঁখুত ভাবে গড়ে তুলেছেন ভাষ্কর। দেখে মনেহচ্ছে ওই পুরুষগুলো যেন এক সময় সত্যিই জীবন্ত ছিল, কোনোভাবে পাথর হয়ে গেছে। প্রকাশ বলল, "লোকে বলে এই দেবী নাকি জাগ্রত। কয়েকজন দেবীকে রাতের বেলা চলা ফেরা করতেও দেখেছে। যদিও এসবই গুজব হতে পারে। আমি অন্তত এসব আজগুবি কথায় বিশ্বাস করিনা। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে গত দশ বছরে এই মন্দিরে তিনখানা বাড়তি পুরুষের মূর্তি দেখা গেছে। কে যে রাতারাতি মূর্তিগুলো গড়ে দিয়ে গেছে কেউ জানেনা।"
ওরা যখন গুহা থেকে বেরিয়ে এল প্রত্যেকেরই শরীরে রোমাঞ্চ লেগে রয়েছে। মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়ে রিসিকার সঙ্গে গল্প করছিল সৌমিতা। হঠাৎ ওর দিকে তাকিয়ে সুমিত বলল, "এদিকে শোন, কথা আছে।"
সৌমিতা চমকে উঠল। সুমিত আবার ওকে ডাকছে কেন? মাস তিনেক আগে সুমিতের সঙ্গে রিলেশনে জড়িয়ে পড়ে ছিল সৌমিতা। কলেজের সবচেয়ে হ্যান্ডসাম ছেলেগুলোর মধ্যে একজন সুমিত। ওকে দেখলে যেকোনো মেয়েরই বুকের ভিতরে প্রজাপতিরা ডানা ঝাপটাতে শুরু করে, সৌমিতাও ব্যতিক্রম ছিলনা। সুমিতের প্রেমে এতটাই মজে গিয়েছিল যে ঠিক ভুল বোঝার মতো পরিস্থিতিটাই ছিলনা, পরে যখন জানতে পারে সে শুধু একা নয়, কলেজের আরো বেশ কয়েকটা মেয়ের সাথে একই চক্কর চালাচ্ছে সুমিত তখন ওর কাছ থেকে সরে আসে। বলল, "কি কথা বল?"
সুমিত বলল, "সকলের সামনে বলা যাবেনা, আমার কাছে আয়।"
হাটতে হাটতে সুমিতের কাছে এগিয়ে গেল সৌমিতা। বলল, "বল কি বলছিস?"
ফিসফিস করে সুমিত বলল, "আজ রাতে তোর রুমে আসছি, রেডি থাকিস।"
সৌমিতা চমকে উঠল। সে বলতে যাচ্ছিল, "আবার তোর মতো ছেলেকে বিশ্বাস করে রুমে আসতে দেব, তুই ভাবলি কি করে?"
তার আগেই সুমিত বলল, "তোর মান সম্মান কিন্তু আমার হাতের মুঠোয় আছে। সেটা ভেবে ডিসিশন নিস।"
সৌমিতার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বলল, "মানে?"
সুমিত বলল, "সেটা রাতে এলেই দেখতে পাবি।"

রাত্রে বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছিল সৌমিতা। ওর ঘুম ধরছিল না। এই ইউপি ট্যুরটা যে ওর পক্ষে মোটেই সুখকর হতে যাচ্ছেনা সেটা বেশ বুঝতে পারছিল। বিছানা ছেড়ে উঠে সে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। আকাশে ফুটফুটে চাঁদ উঠেছে। দুধেল জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে হোটেলের লন। গত মাসেই সুমিতের সঙ্গে সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়েছে সৌমিতা। সাফ জানিয়ে দিয়েছে সে যেন আর ওর জীবনে ফিরে আসার চেষ্টা না করে। তা সত্বেও আজ আবার কি বলতে চায় সুমিত? কেন রাতে ওর সঙ্গে দেখা করতে চাইল?

টক টক করে রুমের দরজায় আলতো টোকা পড়তেই দরজা খুলল সৌমিতা। এই রুমে সে একাই আছে। অন্যান্য রুমে কলেজের অন্য মেয়েরা দু'তিনজন করে রইলেও সৌমিতার ঘুমের মধ্যে কথা বলার সমস্যার জন্য একটা রুম ওকে ওরা ছেড়ে দিয়েছে। তড়িঘড়ি রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে সুমিত। বিছানায় বসে চাপা গলায় বলল, "আয় পাশে এসে বোস।"
সৌমিতা বলল, "কি বলছিস তাড়াতাড়ি বলে চলে যা। কেউ দেখতে পেলে আমাকে খারাপ ভাববে।"
সুমিত বলল, "আমি যা বলছি সেটা না শুনলে লোকে তোকে আরো বেশি খারাপ ভাববে।"
কী যেন বলতে গিয়ে থেমে গেল সৌমিতা। গুটিগুটি পায়ে সুমিতের পাশে গিয়ে বসল। নিজের মোবাইলটা বার করল সুমিত। একটা ভিডিও চালু করে সৌমিতার দিকে তাকিয়ে বলল, "এটা দ্যাখ।"
ভিডিওটা দেখে সৌমিতার মাথায় যেন বজ্রপাত হল। ওর সঙ্গে সুমিতের ঘনিষ্ঠ অবস্থার একটা দৃশ্য রয়েছে ভিডিওটাতে। কোনোভাবে লুকিয়ে দৃশ্যটা তুলেছে সুমিত। একটু চিৎকার করেই বলে উঠল, "এসব কি?"
ফিসফিস করে সুমিত বলল, "চিৎকার করিসনা। আমি যা বলছি তুই এবার থেকে তাই করবি, নয়তো এই ভিডিওগুলো ভাইরাল হয়ে গোটা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়বে।"
সৌমিতার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বলল, "কি করতে হবে আমাকে?"
সুমিত বলল, "এমন কিছু না, তুই আপাতত শুয়ে পড়। তারপর যা যা বলছি কর।"
তোতলাতে তোতলাতে সৌমিতা বলল, "আচ্ছা, করছি, কিন্তু তুই আগে কথা দে তোর সব কিছু করা হয়ে গেলে তুই ভিডিওগুলো ডিলিট করে দিবি।"
ফিক করে হেসে সুমিত বলল, "তা হয় নাকি? তোর মতো কলেজের আরো অনেকে মেয়ের ভিডিও আমার কাছে আছে। তোদের ইচ্ছেমত নাচাবার এটাই তো উপায় আমার কাছে। ডিলিট করে দিলে হয় নাকি? আপাতত যা বলছি কর, নয়তো কাল সকালে এগুলো ভাইরাল হলে কি ভাল লাগবে?"
ভয়ে ভয়ে শুয়ে পড়ল সৌমিতা। ওর ভীষণ কান্না পেল। নরকে যখন একবার পা রেখেই দিয়েছে, তখন দ্বিতীয় বার সেখান থেকে ঘুরে আসতে ওর বিশেষ কোনো কষ্ট হবেনা। কষ্ট শুধু এটুকুই গতবারে সে নিজের ইচ্ছেতে যা করার করেছিল, আর এবারে যা হচ্ছে ওর ইচ্ছের বিরুদ্ধে। বেশ কিছুক্ষণ সৌমিতাকে আদর করে ছেড়ে দিল সুমিত। বলল, "তোর শরীর থেকে আমার নতুন করে পাওয়ার কিছু নেই, কিন্তু তোর কাছ থেকে আমার অনেক কিছুই পাওয়ার আছে। আর সেই জন্যই ভিডিওগুলো আমার কাছে রাখছি।"
সৌমিতা বলল, "তুই আমাকে ব্ল্যাকমেল করবি?"
সুমিত বলল, "ধরে নে তাই।"

সারাটা দিন জগদীন্দ্রপুরের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে কাটিয়ে দিল সৌমিতারা। যদিও সৌমিতার ঘোরার  দিকে কোনো মন ছিলনা। সে কেবল ভাবছিল কীভাবে সুমিতের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। কীভাবে ওর মোবাইল থেকে ভিডিওগুলো ডিলিট করা যায়। তারজন্য সুমিত যা চাইবে সে দেবে, তবু প্রকাশ্যে ওর কোনো সম্মানহানি হোক সেটা সে চাইবেনা।

তখন রাত বারোটা বাজে। বিছানা পেতে শুয়ে পড়ার উপক্রম করছিল সুমিত, হঠাৎ ওর হোয়াটস আপে টিং টং করে সৌমিতার মেসেজ ঢুকল। সৌমিতা লিখেছে, "তুই এখোনো ঘুমোসনি বোধহয়। একবার হোটেলের বাইরে আসবি।"
সুমিতের ভ্রূ কুঁচকে গেল। এত রাতে কেন সৌমিতা ওকে বাইরে ডাকছে? তবে কি...? মুচকি হেসে হোটেল থেকে বাইরে বেরিয়ে এল সুমিত। বাইরে যেন চাঁদের আলোর বন্যা বইছে। সেই আলোর নিচে একটা গাছ তলায় দাঁড়িয়ে আছে সৌমিতা। গুটিগুটি পায়ে ওর কাছে এগিয়ে এল সুমিত। আজ সৌমিতাকে একেবারে অন্য রকম লাগছে। ওর শরীর থেকে ফেটে পড়ছে রূপ। কী যেন এক মাতাল করা গন্ধ ওর গা থেকে ভেসে আসছে। ওর কাছে এগিয়ে গিয়ে সুমিত বলল, "কি হল, এত রাতে ডাকলি কেন?"
মাথা নামিয়ে সৌমিতা বলল, "আজ আমার ভীষণ অ্যাডভেঞ্চার করতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু এত রাতে কে আমার সঙ্গে যাবে তাই তোকেই ডাকলাম।"
সুমিত অবাক গলায় বলল, "কোথায় অ্যাডভেঞ্চার করবি?"
চাপা গলায় সৌমিতা বলল, "চলনা, একবার চুপিচুপি গিয়ে মেডুসার মন্দিরের ভিতরটা দেখে আসি।"
কি যেন ভেবে সুমিত বলল, "যেতে পারি, কিন্তু আমার একটা শ্বর্ত আছে।"
সৌমিতা বলল, "আজ তুই যা চাইবি সব দেব। আমারও ভীষণ ইচ্ছে আছে আজ।"
সুমিত বলল, "আচ্ছা, চল তবে।"

হাঁটতে হাঁটতে মন্দিরের ভিতরে গিয়ে ঢুকল সুমিত আর সৌমিতা। মন্দিরের কোনো গেট নেই, একসময় হয়তো ছিল, পরবর্তীকালে ভেঙে পড়েছে। ভিতরে ঢুকেই মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে চারপাশটা দেখে নিল সুমিত। মেডুসার সিংহাসনের উপরে আলো ফেলে বলল, "মূর্তিটা কোথায় গেল, আজ সকালেও তো এখানেই ছিল?"
মুচকি হেসে সৌমিতা বলল, "সে আমি কী জানি, হয়তো মূর্তিটা বেড়াতে গেছে।"
মাথা নেড়ে সুমিত বলল, "কাল দেখছিলাম মন্দিরে রিপিয়ারিং শুরু হয়েছে, সম্ভবত সেই কারনেই মূর্তিটা সরানো হয়েছে।"
সৌমিতা মাথা নাড়ল। বলল, "হতে পারে।"
ফিসফিস করে সুমিত বলল, "এরপর?"
মাথা নিচু করে থেকে সৌমিতা বলল, "তুই যা করবি..."
সৌমিতাকে জড়িয়ে ধরল সুমিত। ওর ঠোঁটে চুমু দিল। আবেগে চোখ বুজে ফেলেছিল সৌমিতা। নিজের পোশাক খুলে নগ্ন হয়ে গেল সুমিত। তারপর সৌমিতাকে নগ্ন করে মাটির উপরে শুইয়ে বলল, "তখন থেকে তুই আমার দিকে একবারও তাকাসনি কেন?"
চোখ বুজে থেকে সৌমিতা বলল, "আমার ভীষণ লজ্জা পাচ্ছে।"
সৌমিতার পা দুটোকে ফাক করে শুয়ে পড়তে পড়তে সুমিত বলল, "আমার কাছে তোর লজ্জার কী আছে? এটা তো তোর সঙ্গে আমার প্রথম বার নয়, নে চোখ খোল।"
রহস্যময় ভাবে সৌমিতা বলল, "বলছিস? সত্যিই তাকাব তোর দিকে?"
সুমিত বলল, "নিশ্চয়ই, আমি যখন তোর শরীরের ভিতরে ঢুকব তখন তোর চোখ দুটো যেন খোলা থাকে।"
সৌমিতা মাথা নাড়ল। ধীরেধীরে চোখ খুলে সুমিতের দিকে তাকাল সে। ওর ঠোঁটের দিকে ঠোঁট দুটোকে নামিয়ে আনতে আনতে হঠাৎ থমকে গেল সুমিত। ওর বুকটা ধড়াস করে উঠল। সৌমিতার চোখ দুটো যেন জ্বলছে। একটা উজ্জ্বল আভা বেরিয়ে আসছে ওর চোখের ভিতর থেকে। মনেহচ্ছে চোখ দুটো যেন আসল নয়, ওর অক্ষিকোটরের ভিতরে বসানো আছে দু'খানা লাল রঙের মুক্তো। ওর শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসতে লাগল। গলা থেকে বুক, বুক থেকে পেট, গোটা শরীরটা যেন ধীরেধীরে শুকিয়ে উঠতে লাগল। কী যেন বলার চেষ্টা করল সে, পারলনা। ওর গলার ভিতর থেকে দুটো পাথরের ঠোকাঠুকির ঠকঠাক শব্দ ছাড়া কোনো আওয়াজ বেরিয়ে এলনা।

সকালে সৌমিতার যখন ঘুম ভাঙল তখন প্রায় আটটা বেজে গেছে। ঘুম থেকে উঠেই সে আবিষ্কার করল ওর বিছানার পাশে সাইলেন্ট অবস্থায় নামানো আছে সুমিতের মোবাইল। আর তাতে অন্তত বেশ কয়েকশো বার কল এসেছে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে ক্লাউড স্টোরেজে গিয়ে আগেই ভিডিওগুলো ডিলিট করল সে, তারপর রুম থেকে বেরিয়ে আসতেই রিসিকার সঙ্গে দেখা হল। রিসিকা বলল, "কাল রাতে একটা বিপদ ঘটে গেছে।"
অবাক গলায় সৌমিতা বলল, "কি বিপদ?"
রিসিকা বলল, "কাল রাত থেকে সুমিত গায়েব। হোটেলের সিকিউরিটি নাকি ওকে মাঝ রাতে একটা মেয়ের সঙ্গে মেডুসার মন্দিরের দিকে যেতে দেখেছে।"
সৌমিতা মাথা চুলকাল। ওর আবছা আবছা মনেপড়তে লাগল, কাল রাতে স্বপ্নের মধ্যে সেই সুমিতকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল মেডুসার মন্দিরে। সেটা কি তবে স্বপ্ন ছিলনা, সে কি সত্যিই সুমিতকে নিয়ে ওখানে গিয়েছিল? নাহলে ওর কাছে সুমিতের মোবাইল এল কিভাবে? কিন্তু তারপর কি হয়েছিল? অনেক ভেবেও পরের অংশটা মনেকরতে পারলনা সৌমিতা। বলল, "বাকি স্টুডেন্সরা কোথায়?"
রিসিকা বলল, "কেবি স্যার, কয়েকজনকে নিয়ে থানায় গেছেন। বাকিরা এদিক সেদিক ঘুরছে। চল আমরা একবার মেডুসার মন্দির থেকে ঘুরে আসি, যদি সুমিতের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়।"
সৌমিতা মাথা নাড়ল। রিসিকার সঙ্গে মেডুসার মন্দিরে চলে গেল সে। মন্দিরে ঢোকার মুখেই একটা নগ্ন পুরুষ মূর্তির দিকে তাকিয়ে রিসিকা বলল, "এই মূর্তিটা তো কাল দেখিনি। এটা নতুন বসানো হয়েছে বলে মনেহচ্ছে।"
হাসার চেষ্টা করল সৌমিতা। বলল, "তুই বোধহয় প্রকাশের কথায় একটু বেশিই প্রভাবিত হয়ে গেছিস। তাই তোর মনেহচ্ছে এখানে প্রতিরাতে এসে কেউ পাথরের মূর্তি বানিয়ে দিয়ে যায়।"
ভ্রূ কুঁচকে রিসিকা বলল, "আমার সত্যিই তাই মনেহচ্ছে। এই স্কাল্পচারটাকে ভাল করে দেখ। এটা কিন্তু অনেকটা সুমিতের মতোই দেখতে।"
স্কাল্পচারটার দিকে তাকাল সৌমিতা। রিসিকা মিথ্যে কিছু বলেনি। স্কাল্পচারটা অনেকটা সুমিতের মতোই দেখতে। সুমিতের চোখ, ঠোঁট এমনকি তাকানোর ভঙ্গি পর্যন্ত স্কাল্পচারটার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে স্কাল্পচারটার ডান উরুর দিকে নজর পড়তেই সৌমিতা থমকে গেল। স্কাল্পচারটার ডান উরুতে বিশাল এক জড়ুল। এই জড়ুলটাকে সে চেনে। সুমিতের উরুতে সে বেশ কয়েকবার এই জড়ুল দেখেছে। ওর বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল। সেদিন মেডুসার ব্যাপারে বলতে গিয়ে আরো একটা কথা বলেছিল অয়ন। বলেছিল, "মেডুসার চোখ দুটো ভীষণ বিষাক্ত। এতটাই যে উনি যার চোখের দিকে তাকান সেই মানুষ সঙ্গেসঙ্গে পাথরের মূর্তিতে পরিণত হয়।"
তবে কি কাল রাতে ওর শরীরে ভর করে মেডুসাই সুমিতকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল এই মন্দিরের ভিতরে? আর এখানে এসে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে সুমিতকে পাথরের মূর্তিতে রূপান্তরিত করেছে? সৌমিতার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। পা দুটো কেঁপে উঠল থরথর করে।

(সমাপ্ত)

©All rights reserved to sankha subhra nayak