বৃহস্পতিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১৯

জিগালো রহস্য

জিগালো রহস্য

শঙখ শুভ্র নায়ক




(১)
রাজুর কোমর জড়িয়ে ধরে মেয়েটা বলল, "পুরো দেড় বছর আমি উপবাসি। আস্তে আস্তে আমার শরীরের ভিতরে ঢুকে পড়ে আমার তৃপ্ত করো।"
মেয়েটার গায়ের পোশাক খুলে ফেলল রাজু। এই প্রথম বার সে মেয়েটার সঙ্গে মিলিত হবে। এর আগে পাঁচ ছ'বার মেয়েটার কাছে এসেছে, প্রতিবারই খানিকক্ষণ গল্প করে মেয়েটা ওকে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু ফুল তিন হাজার টাকাই ওকে পেড করেছে, একটি পয়সাও কম করেনি। এর মতো কাস্টমার আরো বেশ কিছু আছে রাজুর। প্রত্যেকেই এক একটা ক্যাটাগরির আইটেম। কেউ কেবল ফোর প্লে তেই তৃপ্ত হয়, আবার কেউ পশ্চাত মৈথুনে, কিন্তু কেবল গল্প করে তৃপ্ত হওয়ার মতো মেয়ে একটাও দেখেনি রাজু। তাই গত কয়েকদিন সে বেশ অবাকই ছিল। অবশ্য অনেক মেয়েরই কাউকে নিজের শরীরে একসেপ্ট করতে একটু টাইম লাগে, তাই ব্যাপারটা নিয়ে খুব একটা গ্রাহ্য করেনি। প্যাকেট কেটে শ্রীজাত বাবুর বর্ণিত জিনিসটিকে বার করল রাজু। মেয়েটা বিছানায় শুয়ে পড়েছে। চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে। রাজু ফোর প্লে শুরু করার আগেই মেয়েটা ওকে টেনে নিজের শরীরে মিশিয়ে নিল। প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট একটানা টানার পরে মেয়েটার চোখের জল মুছিয়ে দিল রাজু। চন্দ্রানী দি'র সংস্থায় ওর দমই সব চেয়ে বেশি, তাই রেটও একটু চড়া। ম্যাক্সিমাম নিম্ফোদের নিয়ে ওকে কারবার করতে হয়। অনেক আঁচড় কামড়ের দাগ ওর শরীরে রয়েছে। তবে সে সব নিয়ে রাজু কেয়ার করেনা। টাকা উপার্জন করতে হলে এগুলো একটু আধটু সহ্য করতে হবে বৈকি। রাজুর ঠোঁটে চুমু খেয়ে মেয়েটা বলল, "হয়ে গেছে?"
রাজু বলল, "হুম। তোমার কি আরো দরকার?"
রাজুকে নিজের শরীরে চেপে ধরে পিষ্ট করতে করতে মেয়েটা বলল, "না ঠিক আছে। আরো কিছুক্ষণ এভাবে থাকো।"
মেয়েটার কাঁধের পাশে মুখ রাখল রাজু। ঠিক তখনই শরীরে একটা প্রবল চাপ অনুভব করল। একটা হাঁতি কিম্বা অজগর সাপ মানুষকে পেঁচিয়ে ধরলে যতটা চাপ হয় এটাও অনেকটা তেমনই। ওর দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করল রাজু।

(২)
শুভকে গাড়িতে চাপিয়ে ডিকে বলল, "কোথায় যাচ্ছি বলতো?"
শুভ বলল, "নতুন কোনো কেস, সেটা তো বুঝতেই পারছি, কিন্তু ব্যাপারটা কি?"
ডিকে হাসল। বলল, "জিগালো কাদের বলে জানিস?"
শুভ মাথা নাড়ল। বলল, "না, নামটা শুনেছি তবে। ওটা কি মাইলো গোত্রিয় কোনো খাবার?"
হো হো করে হেসে উঠল ডিকে। বলল, "তোর বুদ্ধিকে বলিহারি! জিগালো হল সেই পুরুষরা, যারা টাকার বিনিমনে মেয়েদের তৃপ্ত করে।"
চোখ গোলগোল করে ডিকের দিকে তাকাল শুভ। বলল, "ইউ মিন মেল প্রস্টিটিউট?"
ডিকে হাসল। দেখতে দেখতে ওদের গাড়িটা একটা দোতলা বাড়ির সামনে থামল। বাড়িটার উপরে হোডিং দিয়ে বড়বড় অক্ষরে লেখা আছে "ফ্রেন্ড ফাইন্ডার।"
শুভ বলল, "এই সংস্থাটার এডভারটাইজম্যান্ট পেপারে পড়েছি। এরা টাকার বিনীময়ে ছেলে মেয়েদের বন্ধু খুঁজে দেয়।"
ডিকে বলল, "এদের বাইরের বিজনেস বন্ধু খুঁজে দেওয়া হলেও এর পিছনে এরা একটা আলাদা বিজনেস চালায়, সেটা হচ্ছে মেল প্রস্টিটিউশন। অনেক বড়বড় ঘরের সুন্দরী মহিলারা এদের কাস্টমার।"
কথা বলতে বলতে ওরা ঘরের ভিতরে গিয়ে ঢুকল। ঘরের বামপাশে একটা পর্দা খাটানো ঘর আছে ওটাই সম্ভবত অফিস। পর্দার বাইরে গিয়ে চাপা গলায় ডিকে বলল, "মে আই কাম ইন?"
ভিতর থেকে এক মহিলা সুরেলা গলায় বলে উঠলেন, "আসুন আসুন, আপনাদের জন্যই অপেক্ষা করে আছি।"
ওরা রুমের ভিতরে ঢুকল। রুমটা বেশ সাজানো গোছানো, অফিস না বলে বরং বাগান বলা ভাল। রুমের চারপাশে বিভিন্ন ধরনের গাছ। জানালা গুলো পর্যন্ত বাদ যায়নি। রুমের মাঝে একটা বেশ বড়সড় টেবিল। তাতে একটা আদ্যিকালের ল্যান্ডফোন নামানো। টেবিলের এপাশে বেশ কয়েকটা চেয়ার রয়েছে। আর ওপাশে একটা চেয়ারে ল্যাপটপ নিয়ে যিনি খুটখুট করছেন তাঁর বয়স মোটামুটি চল্লিশের কোঠায়। মুখে হালকা মেকাপ করা। বেশ সুশ্রী লাগছে ভদ্রমহিলাকে। ডিকের দিকে তাকিয়ে ভদ্রমহিলা একটু হাসলেন। বললেন, "দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসুন।"
ওরা চেয়ারে গিয়ে বসল। ভদ্রমহিলা বললেন, "আমিই আপনাকে ফোন করেছিলাম। আমার নাম চন্দ্রানী সেন।"
ডিকে বলল, "আপনি তো আমাকে চেনেন বললেন, আর ও শুভ, আমার সহকারী।"
শুভর দিকে তাকিয়ে চন্দ্রানী বললেন, "গল্প বইয়ে পড়েছি গোয়েন্দাদের সহকারী থাকে, আজ নিজের চোখে দেখলাম।"
ডিকে বলল, "আচ্ছা, কেসটা কি বলুন? কি জন্য ফোন করে ডেকেছেন?"
চন্দ্রানী বললেন, "আমাদের সংস্থার এক কর্মী গত দুদিন ধরে নিঁখোঁজ, তার খবর এনে দিতে হবে।"
"আচ্ছা," ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "আমাকে আগে আপনাদের সংস্থার ব্যাপারে খুলে বলুন, এটা জানা থাকলে আমার কাজ করতে সুবিধে হবে।"
চন্দ্রানী বললেন, "আমাদের সংস্থায় কর্মীরা সকলে স্বাধীন ভাবে কাজ করে। প্রত্যেকের আলাদা আলাদা রেট আছে। কাস্টমাররা আমাদের সংস্থায় এসে একটা এন্ট্রি ফি দিয়ে কর্মীদের বুক করে, অনলাইনেও এই কাজটা করা যায়। যদি কেউ সোসাল নেটওয়ার্ক সাইটেও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমরা তাদের রেসপন্স করি, সেক্ষেত্রে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমেও এন্ট্রি পেড করার ব্যবস্থা থাকে।"
ডিকে মাথা নাড়ল। চন্দ্রানী বললেন, "কাস্টমাররা এন্ট্রি পেড করার পরে আমরা আমাদের কর্মীদের ছবি, তার অ্যাপ্রক্সিমেট এফোর্ট আর রেট তাদের জানিয়ে দিই, এবারে কাস্টমার তাদের পছন্দ মতো পার্টনার চুজ করে। আমরা ওদের কন্টাক্ট নাম্বার দিয়ে দিই, ওরা নিজেরাই যোগাযোগ করে। এটা নিয়ে আর আমরা মাথা ঘামাইনা। আমরা আর পাঁচটা সংস্থার মতো কর্মীদের কাছ থেকে কমিশন নিইনা। তবে বিশেষ বিশেষ কর্মী বেশ জনপ্রিয় হয়ে যায়, যাদের জন্য আমাদের বিজনেস খুব ভাল হয়।"
ডিকে বললেন, "আচ্ছা, যদি কেউ আপনাদের দেওয়া কাস্টমারের বাইরে নতুন কোনো কাস্টমারকে সার্ভিস দেয় তখন কি করেন?"
চন্দ্রানী বললেন, "এইসব ব্যাপারে অনেক সেফটির জিনিস থাকে, জেনারেলি কাস্টমাররা ডাইরেক্ট কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনা, তবু যদি কেউ এরকম করছে খবর পাই, সেক্ষেত্রে কাস্টমারকে ফোন করে একটু ট্রিট দেওয়া হয়, তাহলেই কাজ হয়ে যায়।"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "আচ্ছা, এবারে নিঁখোজের ব্যাপারে বলুন?"
চন্দ্রানী বললেন, "আমাদের কাস্টমাররা যে সবাই খুব ভদ্র তা নয় অনেক কাস্টমার আছে যারা কর্মীদের উপরে অত্যাচার করে স্যাটিসফ্যাকশন পায়। তাদের শরীরে আঁচড়ে কামড়ে রক্তাক্ত করলে তাদের শান্তি হয়, এইসব বিকৃত মস্তিষ্ক কাস্টমারদের সামলানোর জন্য স্পেশাল কিছু কর্মী আমাদের সংস্থায় আছে, এদের একজন হচ্ছে রাজু। ওর রেট অনেক বেশি, তাছাড়া ওর এনার্জি লেভেল বেশি বলে ওর পপুলারিটি আছে। ওর জন্য অনেক কাস্টমার আমাদের সংস্থায় যোগাযোগ করে। যাইহোক, পরশু রাতে আমার সঙ্গে রাজু শেষ কথা হয়েছিল, তারপর থেকে ওর ফোন সুইচ অফ আসছে। ভেবেছিলাম হয়তো কাজ ছেড়ে ও বাড়িতে চলে গেছে, এসব কাজে বেশিদিন কেউ টেকেনা, তবে অনেক নতুন নতুন কর্মী আসে বলে আমাদের কর্মীর অভাব হয়না। আজ সকালে ওর বাড়ি থেকে ওর ভাই আমাদের সংস্থায় এসেছিল ওর খবর নিতে। সেও নাকি দাদাকে ফোনে পাচ্ছেনা, আর ওর বাবা মৃত্যু শয্যায় ওকে একবার দেখতে চাইছে, তারপরই আপনাদের আমি ফোন করলাম। যদি ওর কোনো খবর এনে দিতে পারেন খুব ভাল হয়।"
ডিকে বলল, "রাজু থাকত কোথায় এখানে?"
চন্দ্রানী বললেন, "পুরানোপট্টির একটা মেসে। ওর ঠিকানায় খোঁজ নিয়েছি। ওখানে ওর রুমমেটরা বলেছে দুদিন আগেই রাজু বেরিয়েছে, এখোনো ফেরেনি।"
ডিকে বলল, "আচ্ছা, ওর একটা ছবি আর ফোন নম্বরটা আমাকে দিন, কি করা যায় আমি দেখছি।"
চন্দ্রানী মাথা নাড়লেন। ড্রয়ার থেকে ছবি বার করতে করতে বললেন, "আপনাকে কত দিতে হবে?"
ডিকে বলল, "খরচ খরচার জন্য পাঁচ দিন, এরপর খবর নিয়ে দেখি, কেসটা কেমন সেই অনুযায়ী বাকি রেট হবে। যদি কোনো জেনারেল কেস হয় ধরুন ও কোথাও চলে গিয়েছে, কিম্বা অন্য কোনো সংস্থা ওকে হাইজ্যাক করেছে, এরকম হলে আর দশ নেব, আর যদি কোনো ক্রাইম কেস হয়, ধরুন কেউ ওকে খুন করেছে, কিম্বা কিডন্যাপ করেছে, সেক্ষেত্রে আর কুড়ি নেব।"
চেক বার করে খসখস করে লিখে দিলেন চন্দ্রানী। রুম থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে আসতে শুভ বলল, "এবারে কি করবে? খুঁজবে কিভাবে?"
ডিকে বলল, "এই নাম্বারটা তো এয়ারটেলের নাম্বার মনেহচ্ছে, তোর কাছে অরিন্দমের ফোন নাম্বার আছে, আমি ট্রাই করছিলাম লাগছিলনা।"
শুভ বলল, "অরিন্দম মানে অরিন্দম রায়ের কথা বলছ, যে এয়ারটেল কাস্টমার কেয়ারে কাজ করে?"
ডিকে মাথা নাড়ল। শুভ বলল, "ও রিসেন্টলি নাম্বার চেঞ্জ করেছে, দাঁড়াও ওকে হোয়াটস আপে মেসেজ করে নতুন নাম্বার টা দিতে বলছি।"
ডিকে বলল, "সঙ্গে রাজুর নাম্বারটাও দিয়ে দে, জিজ্ঞেস কর এই নাম্বারটা কোন নেটওয়ার্ক এরিয়াতে সুইচ অফ হয়েছে।"
"আচ্ছা," শুভ মাথা নাড়ল। গাড়িতে চেপে বাড়ি ফেরার পথে অরিন্দমের কাছ থেকে মেসেজের রিপ্লাই এল। শুভ বলল, "নাম্বারটা সুইচ অফ হয়েছে নতুন বাজার এরিয়াতে।"
ডিকে অবাক হল। বলল, "কেস গোলমাল লাগছে। এটা কোনো জেনারেল কেস নয়।"
শুভ বলল, "কেন? তোমার এরকম কেন মনেহচ্ছে।"
ডিকে বলল, "নতুন বাজার এরিয়াটা সেন্ট্রাল বাসস্ট্যান্ড কিম্বা স্টেশনের সম্পূর্ণ অপোজিট সাইডে। ও যদি এই শহর ছেড়ে কোথায় পালাতে চাইত, তাহলে ও শহরের ভিতরে যেতনা, বাইরে দিকে যেত।"
শুভ বলল, "এমনও তো হতে পারে ও নতুন বাজার থেকে কাউকে রিসিভ করেছে, তারপর ফোন সুইচ অফ করে সেন্ট্রাল বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে বাসধরে কোথাও চলে গিয়েছে।"
ডিকে বলল, "মানে লাভ কেস বলতে চাইছিস। তাহলে সিচুয়েশন গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, জিগালোর কাজ করতে গিয়ে ওর কারুর সঙ্গে পরিচয় হয়, যার প্রেমে পড়ে, এবং নিজের ইমেজ ফ্রেস রাখতে কাউকে কিছু না জানিয়ে তাকে নিয়ে দূরে কোথায় চলে যায়, যেখানে ওকে কেউ চেনেনা।"
শুভ মাথা নাড়ল। বলল, "অথবা নতুন বাজারে গিয়ে অন্যকোনো সংস্থার কোনো প্রতিনিধির সঙ্গে ও যোগাযোগ করে এবং তারসঙ্গে ওদের শহরে চলে যায়।"
শুভর বাড়ির কাছে গাড়ি থামিয়ে ডিকে বলল, "প্রোবাবলিটি তো অনেক কিছুই আছে, তার আগে আমাদের ওর লাস্ট কল ডিটেলস চেক করতে হবে। অরিন্দমের নাম্বারটা আমাকে দে, কাল সকালে আমি তোর বাড়িতে আসছি।"
"আচ্ছা," বলে গাড়ি থেকে নামল শুভ। নিজের বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে ভাবল, আজ থেকে জিগালো রহস্য শুরু হল।

(৩)
পরদিন সকালে ফোন করে শুভকে বেরিয়ে আসতে বলল ডিকে। বাইরে এসে শুভ বলল, "নতুন কিছু জানতে পারলে?"
ডিকে বলল, "একটা ফোন নাম্বার পেয়েছি, যেটা থেকে রাজুর নম্বরে লাস্ট কল এসেছিল, নাম্বারটার টাওয়ার লোকেশন নতুন বাজার এরিয়া। কিন্তু ফেক আইডি থেকে ফোন নাম্বারটা তোলা। এই নাম্বার থেকে আগেও রাজুর নাম্বারে বেশ কয়েকবার কল এসেছে, সম্ভবত এটা ওর কোনো কাস্টমারের নাম্বার। ফার্স্টকল এসেছিল গত মাসের পনেরো তারিখ, সম্ভবত ওই সময়েই রাজুকে সে বুক করে, চল চন্দ্রানীর কাছে গিয়ে ওই কাস্টমারের ব্যাপারে ডিটেলস কিছু জানা যায় কীনা দেখি।"
ডিকের গাড়িতে চেপে শুভ বলল, "চলো তবে। নাম্বারটা কি খোলা আছে?"
ডিকে বলল, "না, যেদিন রাজুর নাম্বার সুইচ অফ হয় এই নাম্বারটাও সেদিনই সুইচ অফ হয়।"
শুভ বলল, "তার মানে তুমি কি বলতে চাইছ, এই কাস্টমারের সঙ্গেই রাজু ভেগেছে?"
ডিকে বলল, "সব কিছুই অনুমান নির্ভর। এর ব্যাপারে ডিটেলস কিছু জানা না গেলে বোঝা যাবেনা।"

ওরা চন্দ্রানীর কাছে পৌঁছাল। সব শুনে চন্দ্রানী বললেন, "কাস্টমারদের সেফটির জন্য ওদের আই ডি আমরা রাখিনা। আর এই মহিলা বুকিং করেছিলেন সোসাল নেট সাইট থেকে, তাই ওকে আমরা চোখে দেখিনি।"
ডিকের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, "যে প্রোফাইল থেকে বুকিং হয়েছে সেই প্রোফাইল টা দেখান আমাকে।"
চন্দ্রানী প্রোফাইলটা দেখালেন। প্রোফাইল নেম এঞ্জেল জেসমিন। প্রোফাইলে একটা অর্ধনগ্ন বিদেশী মহিলার ছবি দেওয়া। ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "এতেই কাজ হবে।"
সেদিন ফিরে শুভর রুমে গিয়ে ঢুকল ডিকে। শুভ বলল, "আচ্ছা, নতুন বাজারের নাম বার বার উঠে আসছে, আমার মনেহয় আমাদের একবার নতুন বাজারে গিয়ে ঢুঁ মারা দরকার। মনেহচ্ছে রাজু এখোনো ওখানেই আছে।"
কম্পিউটার খুলে ডিকে বলল, "হাতে কিছু তথ্য না নিয়ে ওখানে গেলে সেটা অন্ধকারে ঢুঁ মারার মতো ব্যাপার হবে।"
শুভ বলল, "আচ্ছা, তবে দেখ কি বার করতে পারো।"
হাত ছানি দিয়ে শুভকে কাছে ডাকল ডিকে। বলল, "এঞ্জেল জেসমিনের প্রোফাইলে কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার আমি লক্ষ্য করছি।"
কাছে এসে শুভ বলল, "কি ব্যাপার?"
জেসমিনের ফ্রেন্ডলিস্ট খুলে বসেছে ডিকে। একটা ফ্রেন্ডের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, "এই লোকটাকে চিনিস?"
প্রোফাইল পিকটাতে শুভ দেখল একটা পঁয়ত্রিশ চল্লিশ বছরের বিদেশী লোক সি বিচে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটার মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাঁড়ি। হাতের উপরে একটা স্পাইডার ম্যানের ট্যাটু। লোকটার নাম লেখা আছে, কে এন ব্রায়ান। শুভ বলল, "না চিনিনা। কে এই লোকটা?"
ডিকে বলল, "লোকটার নাম কেভিন নীল ব্রায়ান। ইনি অস্ট্রেলিয়ার একজন প্রানী বিজ্ঞানী, বছর কয়েক আগে কিছু একটা গোপন ব্যাপার নিয়ে গবেষনা করতে করতে উনি নিঁখোজ হয়ে যান। অনেক খোঁজ করেও পুলিশ ওর সন্ধান পায়নি।"
"আচ্ছা," শুভ মাথা নাড়ল। বলল, "তার সঙ্গে আমাদের কেসটার কি সম্পর্ক?"
ডিকে বলল, "হয়তো কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু সম্পর্ক থাকাটাও অস্বাভাবিক নয়।"
শুভ হাসল। বলল, "কোথায় কেভিন নীল ব্রায়ান আর কোথায় রাজু গায়েন। আকাশ আর পাতালের সম্পর্ক।"
কয়েক সেকেন্ড খুটখাট করার পরে ডিকে বলল, "এই একাউন্টটা যে কম্পিউটার থেকে লাস্ট টাইম অপারেট করা হয়েছে, সেটার আই পি এড্রেস আমি হ্যাক করে নিয়েছি। এটাও নতুন বাজার এরিয়া থেকে, কম্পিউটারের মালিকের নাম চন্দন দাস।"
শুভ বলল, "ঘুরে ফিরে সেই একটা জায়গার নামই আসছে, নতুন বাজার। চলো যাওয়া যাক ওখানে যদি কিছু পাওয়া যায়।"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "হ্যাঁ যাব। তুই রেডি হয়ে নে। আমরা এবারে চন্দন দাসের বাড়িতে হানা দেব।"
শুভ মাথা নাড়ল। নতুন বাজারে এসে ওরা চন্দন দাসের নাম বলে খোঁজ করতেই এক ভদ্রলোক ওদের একটা ঠিকানা দেখিয়ে দিলেন। ওরা বাড়িটাতে এসে উপস্থিত হল। বাড়ি নয় এটা একটা সাইবার ক্যাফে। ওরা ক্যাফের ভিতরে ঢুকল। ক্যাফেতে একটি আঠারো উনিশ বছরের ছেলে বসেছিল। ওর কাছে গিয়ে ডিকে বলল, "আচ্ছা, চন্দন দাসের সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি।"
ছেলেটা বলল, "আমার নাম চন্দন দাস। কি ব্যাপার বলুন।"
ডিকে বলল, "আমরা গোয়েন্দা ডিপার্টমেন্ট থেকে আসছি। আমাদের কিছু ইনফরমেশন দরকার।"
গোয়েন্দা শুনে ছেলেটার মুখ শুকিয়ে গেছে। বলল, "কি ইনফরমেশন বলুন?"
ডিকে বলল, "গত মাসের তেরো তারিখ সন্ধ্যে সাড়ে ছ'টার সময় একটি মেয়ে এখানে বসে খানিকক্ষণ নেট করেছিল, আমাদের ওই মেয়েটার ব্যাপারে ইনফরমেশন চাই।"
চন্দন বলল, "এখানে তো অনেকেই আসে স্পেশাল কারো ব্যাপারে ইনফরমেশন কিভাবে দেব। দু'একদিন আগের ঘটনা হলে তবুও কথা ছিল, এটা সাতারো আঠারো দিন আগের কথা।"
ডিকে বলল, "কিভাবে দেবে তা আমরা জানিনা, কিন্তু তোমাকে দিতে হবে, তোমার সেন্টারে বসে একটি মেয়ে বে আইনি কাজ করে যাবে, আর তুমি তার ব্যাপারে কোনো ইনফরমেশন রাখবেনা, এরকম হলে আমরা তোমাকে এরেস্ট করতে বাধ্য হব।"
চন্দন বলল, "দাঁড়ান, দাঁড়ান। আমার ক্যাফেতে সিসি টিভি ক্যামেরা লাগানো আছে, আমি বার করে ফেলতে পারব।"
খানিকক্ষণের মধ্যেই সিসি টিভি থেকে সেদিনের ফুটেজ বার করে দিল চন্দন। ওরা দেখতে পেল ডান দিক থেকে তিন নম্বর কম্পিউটারে ক্যামেরার দিকে পিছন ফিরে বসে একটা মেয়ে নেট করছে। হঠাৎ কি একটা প্রোয়োজনে মেয়েটা পিছন ফিরে ক্যামেরার দিকে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে ছবিটা স্টপ করল ডিকে। মেয়েটার মুখটা জুম করে বলল, "এই মুখটাকে এর আগেও আমি কোথাও যেন দেখেছি, ঠিক মনে করতে পারছিনা।"
শুভ বলল, "কোনো ক্রিমিনাল নাকি?"
ডিকে বলল, "না, সম্ভবত কোনো ভিকটিম," চন্দনের দিকে তাকিয়ে বলল, "এই মেয়েটাকে তুমি চেনো?"
চন্দন বলল, "না, তবে রবীন্দ্র এপার্টমেন্ট থেকে দু'একবার ওকে বেরিয়ে আসতে দেখেছি। মেয়েটা দেখতে সুন্দরী বলে চোখে লেগেছে।"
ডিকে মাথা নাড়ল। ছবিটার এক কপি প্রিন্ট আউট বার করে শুভকে নিয়ে নিজের বাড়িতে চলে গেল। শুভ বলল, "আমরা খুব প্যাঁচালো ভাবে তদন্ত করছি বলে আমার মনেহচ্ছে। যে কাজটা খুব সহজেই হয়ে যেত, সেটা নিয়ে খুব বেশি সময় নষ্ট করে ফেলছি।"
ডিকে বলল, "কি রকম?"
শুভ বলল, "আমাদের এক্ষুনি রবীন্দ্র এপার্টমেন্টে হানা দেওয়ার দরকার ছিল, আমার সন্দেহ রাজু এখোনো ওখানেই আছে, আর যদি ওখান থেকে কোথাও পালিয়ে গিয়ে থাকে, খোঁজ করলে তার ঠিকানাটাও হয়তো পেয়ে যেতাম।"
ডিকে বলল, "ব্যাপারটা যদি এতটাই সহজ হত তাহলে আমাদের টাকা দিয়ে ইনভাইট করার কোনো দরকার হতনা, চন্দ্রানীই ওকে খুঁজে বার করে ফেলতে পারত, সেটা পারেনি বলেই আমাদের ইনভাইট করেছে।"
শুভ বলল, "কিভাবে?"
ডিকে বলল, "চন্দ্রানী যতই বলুক ওদের কর্মীরা স্বাধীন ভাবে কাজ করে, যাতে ওদের কর্মীরা ওদের সঙ্গে কোনো রকম প্রতারণা করতে না পারে, তাই কর্মীদের পিছনে ওরা ইনফর্মার লাগিয়ে রাখে, আমার অনুমান ইনফর্মাররা ইনফরমেশন দিতে ব্যর্থ হয়েছে, সেই কারনে আমাদের ইনভাইট করেছে চন্দ্রানী। এটা জেনারেল কেস নয়, ক্রাইম কেস হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ওরা পুলিশে জানাজানি করতে চায়না বলেই আমাদের ডেকেছে।"
শুভ বলল, "মাই গড! কিন্তু এপর্যন্ত কেসের অগ্রগতি কতটা? আমরা তো সরেজমিনে কবে পৌঁছাব?"
ডিকে বলল, "স্টেপ বাই স্টেপ। ভিকটিমকে খুঁজে বার করার আগে নিজেকে সেফ রাখা জরুরি।"
শুভ বলল, "ততদিনে পাখি না উড়ে যায়।"

(৪)
আজ সকালে শুভর কাছে এল ডিকে। টেবিলে একটা গল্পের বই খুলে বসেছিল শুভ। ওর সামনে একটা পেপারের কাটিং নামিয়ে ডিকে বলল, "এই মেয়েটাকে চিনিস?"
কাটিংটা বছর তিনেক আগের হলেও ছবিটা চিনতে পারল শুভ। বলল, "এটা তো কম্পিউটার সেন্টারের মেয়েটা। এর ছবি পেপারে বেরিয়েছিল কেন?"
ডিকে বলল, "খবরটা পড়, তাহলেই বুঝতে পারবি।"
খবরটার আদ্যপ্রান্ত পড়ে শুভ যা বুঝল তার সারমর্ম হচ্ছে এই, কেভিন নীল ব্রায়ান নামে এক জীব বিজ্ঞানী কিছু একটা গোপন ব্যাপার নিয়ে রিসার্চ করছিলেন। ওর সহকারী হিসেবে ছিলেন তৃষ্ণা চক্রবর্তী নামে ভারতীয় একটি মেয়ে। ওদের রিসার্চ যখন প্রায় শেষের পথে তখনই একদিন সন্ধ্যায় ওরা দুজনেই ল্যাব থেকে নিঁখোজ হয়ে যান। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। নাইট গার্ড দরজা দিয়ে কাউকে বেরুতে দেখেনি, মনেহচ্ছে ওরা যেন বেমালুম অদৃশ্য হয়ে গেছে। অনেক খুঁজেও পুলিশ ওদের কোনো সন্ধান করতে পারেনি। রুমের ভিতর থেকে ব্রায়ানের কিছু ইনপটেন্ট রিসার্চ পেপার এবং একটা প্লাস্টার অফ প্যারিসের মূর্তি ছাড়া অন্য কিছু খোয়া যায়নি। অবাক গলায় শুভ বলল, "তার মানে এই নিরুদ্দেশ দুটো পরষ্পর লিঙ্কেজ?"
ডিকে বলল, "দুটো নয়, গত কয়েক বছরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বেশ কয়েকজন এভাবে অদৃশ্য হয়েছে, যার ম্যাক্সিমামের খবর পেপারে আসেনি।"
শুভর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বলল, "কিন্তু কি নিয়ে রিসার্চ করছিল কে এন ব্রায়ান। গোপন জিনিসটা কি?"
ডিকে বলল, "আমি এখোনো জানিনা। ওটা জানার জন্য আমার অস্ট্রেলিয়ান ডিটেকটিভ বন্ধুকে আমি খবর পাঠিয়েছি।"
"আচ্ছা," মাথা নাড়ল শুভ। বলল, "এখন কি করবে?"
ডিকে বলল, "আজ থেকে সরেজমিনে তদন্ত শুরু করব। রেডি হয়ে নে, এখন আমাদের রবীন্দ্র এপার্টমেন্টে যেতে হবে।"
শুভ মাথা নাড়ল। খানিকক্ষণের মধ্যে ওরা রবীন্দ্র এপার্টমেন্টে পৌঁছে গেল। এপার্টমেন্টের কাছে গিয়ে দারোয়ানকে তৃষ্ণার ছবি দেখিয়ে ডিকে জিজ্ঞেস করল, "ইনি কি এই এপার্টমেন্টেই থাকেন?"
দারোয়ান বলল, "হ্যাঁ, পাঁচতলার সাত নম্বর রুম। কিন্তু এখন তো উনি নেই, একটু বেরিয়েছেন?"
ডিকে বলল, "কখন ফিরবেন?"
দারোয়ান বলল, "কখন ফিরবেন তা তো বলতে পারবনা। উনি প্রায়শই এরকম সময়ে বেরিয়ে যান, আসলে ওর খুব কেনা কাটার শখ। এই তো সেদিন একটা বিশাল সাইজের প্লাস্টার অফ প্যারিসের মূর্তি কিনে আনলেন। তবে যখনই যান বিকেলের মধ্যেই ফিরে আসেন। আপনারা কি ওর কেউ হন?"
ডিকে বলল, "হ্যাঁ, আমরা ওর পরিচিত।"
দারোয়ান বলল, "তাহলে ওকে ফোন করুন না।"
ডিকে বলল, "ফোন করেছিলাম, ওর নাম্বার সুইচ অফ বলছে।"
দারোয়ান বলল, "তাহলে আর কি করবেন? একটু অপেক্ষা করুন।"
"আচ্ছা," মাথা নাড়ল ডিকে। পকেট থেকে রাজুর ছবিটা বার করে বলল, "একে চেনো?"
দারোয়ান বলল, "হ্যাঁ দেখেছি, ইনি মাঝেমাঝে ম্যাডামের রুমে যান। সম্ভবত ওর বয়ফ্রেন্ড।"
ডিকে বলল, "লাস্ট কবে একে দেখেছ?"
দারোয়ান বলল, "সম্ভবত পাঁচদিন আগে। বিকেলের দিকে এসেছিলেন।"
ডিকে বলল, "কখন বেরিয়ে যান?"
দারোয়ান বলল, "তা তো বলতে পারবনা। আমি ওকে বেরিয়ে যেতে দেখিনি। সম্ভবত রাতে বেরিয়েছিলেন। রাতের শিফটে যে লোকটা থাকে সে বলতে পারবে।"
ডিকে বলল, "উনি বেরিয়ে আসেননি। আজ পর্যন্ত ওই রুমেই আছেন। সম্ভবত রুমের ভিতরে ওকে খুন করা হয়েছে।"
দারোয়ান চমকে উঠল। বলল, "হায় রাম! আপনারা কি পুলিশের লোক?"
ডিকে বলল, "হ্যাঁ, আমরা পুলিশ থেকে আসছি, ওর রুমটা একবার সার্চ করতে চাই, ডুব্লিকেট চাবি আছে তোমার কাছে।"
দারোয়ান বলল, "হ্যাঁ, আছে। আমার পিছনে পিছনে আসুন, আমি রুম খুলে দিচ্ছি। পনেরো মিনিটের মধ্যে যা সার্চ করার করে নিন।"
ডিকে মাথা নাড়ল। সামনের একটা পান দোকানির হাতে গেটের দায়িত্ব দিয়ে ওদের নিয়ে পাঁচ তলায় চলে গেল দারোয়ান। রুম খুলে দিয়ে বলল, "আমি এখানে দাঁড়াচ্ছি, আপনারা যা দেখার দেখে নিন।"
শুভ কে নিয়ে রুমের ভিতরে ঢুকল ডিকে। শুভর গা ছমছম করতে লাগল। রুমটা বেশ সাজানো গোছানো। অজস্র ছবি আর পোষ্টার আঁটা। আলনায় রকমারি ডিজাইনের পোশাক। রুমের মাঝে একটা বেড। সাদা রঙের নতুন একটা বেড কভার পাতা তাছাড়া রুমের এক পাশে সারদিয়ে রাখা বেশ কয়েকটা প্লাস্টার অফ প্যারিসের তৈরি মূর্তি। দেখলে বোঝা যায় এই রুমের মালিক খুব শৌখিন। রুমের একপাশে কিচেন আর অন্যপাশে এটাচড বাথরুম। শুভর দিকে তাকিয়ে ডিকে বলল, "খুব সাবধানে গোটা রুমটা সার্চ কর। কোথাও অস্বাভাবিক কিছু পেলে আমাকে জানাস।"
শুভ মাথা নাড়ল। খুঁজতে খুঁজতে মেঝের একপাশে খানিকটা সাদা চটচটে পদার্থ খুঁজে পেল শুভ। পাকামি করে বলল, "এখানে দেখ। পৌরুষ খুঁজে পেয়েছি।"
একটা কাঠি দিয়ে পদার্থটাকে তুলে একটা পলিথিনের ভিতরে ঢোকাতে ঢোকাতে ডিকে বলল, "তুই যেটা ভাবছিস এটা সেটা নয়। পাশের স্পট টা লক্ষ্য কর তাহলেই বুঝতে পারবি। কোনো পুরুষের এত ভান্ডার নেই, কোনো হাতি কিম্বা ঘোড়া হলে কথা ছিল।"
শুভ মাথা নাড়ল, "হ্যাঁ তা ঠিক।"

কথা বলতে বলতে ওরা বাথরুমের ভিতরে এসে ঢুকল। বাথরুমের এক কোনা থেকে একটা বেলুনের মতো কিছু তুলে নিল ডিকে। শুভ বলল, "ওটা কি?"
ডিকে বলল, "এটা সম্ভবত কোহিনুর। এর ভিতরে এখোনো রক্তের দাগ লেগে আছে। কি বুঝছিস?"
শুভ বলল, "এর মানে তৃষ্ণা ভার্জিন কিম্বা ঋতুমতী ছিল।"
ডিকে বলল, "তোর মাথা। চল বেরিয়ে পড়া যাক।"
ওরা এপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে এল। দারোয়ানের দিকে তাকিয়ে ডিকে বলল, "আমাদের এই সার্চিং এর খবর তোমাদের ম্যাডাম যেন কোনো ভাবেই জানতে না পারে, তাহলে কিন্তু তুমি এরেস্ট হবে।"
দারোয়ান বলল, "আমি কিছু জানিনা স্যার। আমি কাউকে কিছু বলবনা।"
"আচ্ছা," ডিকে মাথা নাড়ল। বাড়িতে ফেরার পথে শুভ বলল, "আমার মনেহয় আমরা ভুল জায়গায় খুঁজছি। রাজু অলরেডি অন্য কোথাও চলে গেছে।"
ডিকে বলল, "না, আমরা ঠিক জায়গাতেই খুঁজছি। রাজু ওই ফ্ল্যাটেই আছে।"
অবাক ভাবে ডিকের দিকে তাকাল শুভ। বলল, "আমাদের কি মাথা খারাপ হয়েছে? যেভাবে তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়েছে, তাতে এতবড় একটা মানুষের খোঁজ পাওয়া যেতনা? এটা কোনো ইঁদুর ছুঁচো নয় যে গর্তের ভিতরে লুকিয়ে থাকবে।"
হা হা করে হেসে ডিকে বলল, "খোঁজার চোখ থাকলে অনেক কিছুই খুঁজে পাওয়া যায়।"

(৫)
আজ সকাল থেলে শুভর মন খচখচ করছিল। কাল ডিকের সঙ্গে ওরা ল্যাবরেটরি তে গিয়েছিল। তৃষ্ণার বাড়ি থেকে পাওয়া জিনিসগুলো ল্যাবে জমা দিয়েছে, আজ সকালে রিপোর্ট দেওয়ার কথা। কি রিপোর্ট হল কে জানে? আর থাকতে না পেরে ডিকে কে ফোন করল শুভ। ডিকে বলল, "হ্যাঁ বল।"
শুভ জিজ্ঞেস করল, "কোথায় আছো?"
ডিকে বলল, "এই তো ল্যাব থেকে বেরুচ্ছি।"
শুভ বলল, "ল্যাবরেটরির রিপোর্ট পাওয়া গেল?"
ডিকে বলল, "হ্যাঁ পাওয়া গেছে।"
শুভ বলল, "ওই সাদা পদার্থটা কি সেটা জানা গেছে?"
ডিকে বলল, "ওটা এক ধরনের এনজাইম, যা নিম্নশ্রেণীর কীট পতঙ্গদের শরীরে পাওয়া যায়, খাবার পাচিত করার জন্য ওরা এই এনজাইম ব্যবহার করে।"
শুভ বলল, "মাইগড! কতগুলো কীট তাদের শরীর থেকে এনজাইম নির্গত করলে এতটা পরিমানে এনজাইম হয়?"
ডিকে বলল, "পুরো এনজাইম টা একটাই মাত্র প্রানীর। প্রাগৈতিহাসিক যুগে কীট পতঙ্গরা এত ছোট ছিলনা, আজ থেকে সাড়ে উনিশকোটি বছর আগে ডাইনোসর যুগে একটা কীট যে আকারের হত এই প্রানীটাও ঠিক ততটাই বড়।"
শুভ বলল, "কত বড়?"
ডিকে বলল, "সেই কীটটার ওজন মিনিমাম ষাট কেজি।"
শুভ চমকে উঠল। বলল, "আর কন্ডোমে লেগে থাকা রক্ত ওটা কার?"
ডিকে বলল, "নিশ্চিত ভাবে জানা যায়নি। তবে রাজুর যে ব্লাড গ্রুপ, এটাও ওই একই গ্রুপের রক্ত।"
শুভ বলল, "তার মানে তুমি বলতে চাইছ, ষাট কেজি ওজনের একটা কীট কে নিজের বাড়িতে পুষে রেখেছে তৃষ্ণা। এই লোকগুলোর অদৃশ্য হবার কারন ওই কীট।"
ডিকে বলল, "অনেক ওরকমই।"
শুভ বলল, "এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, কেভিন নীল ব্রায়ান কোনো প্রাগৈতিহাসিক কীট খুঁজে পেয়েছিলেন। কিম্বা সাধারণ কোনো কীট কে প্রাগৈতিহাসিক কীটের মতো বড়ো আকারের করতে চেয়েছিলেন। হয়তো তারপরই ওনার মনেহয় এটা প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করবে, তাই উনি কীটটাকে মেরে ফেলতে চান, কিন্তু তৃষ্ণা ওকে সেই কাজে বাধা দেয়, সে ওই কীটটাকে দিয়ে কেভিনকে মেরে ফেলে, এবং কীটের খাদ্য বানায়, যে কারনে কেভিন কে খুঁজে পাওয়া যায়নি।"
ডিকে বলল, "তোর বুদ্ধি খুলছে দেখছি আজকাল। আমার সঙ্গে থাকলে পাকা গোয়েন্দা হয়ে উঠতে বেশি সময় লাগবেনা।"
শুভ বলল, "তা নাহয় বুঝলাম। কিন্তু যদি তাই হবে তাহলে কীটটাকে আমরা খুঁজে পেলাম না কেন? ষাট কেজি ওজনের একটা কীট নিশ্চই খুব ছোট হবেনা। তাছাড়া এত বড়ো একটা কীট যদি কোনো মানুষকে খেয়েও ফেলে তাহলেও তার হাড়গোড় হজম করতে পারবেনা, সেগুলো কোথায় যাবে?"
ডিকে বলল, "সময় আসুক, সব দেখতে পাবি।"

(৬)
গত দুদিন ডিকের কোনো কনটাক্ট নেই। ওকে ফোনেও পাচ্ছিলনা শুভ। আজ সকালে একটা পোকা মারার স্প্রে নিয়ে শুভর রুমে এসে ঢুকল ডিকে। শুভর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বলল, "তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে, এক্ষুণি আমাদের একবার রবীন্দ্র এপার্টমেন্টে যেতে হবে।"
শুভ বলল, "রহস্যের কতদূর?"
ডিকে বলল, "রহস্য সমাধান হয়ে গেছে, এখন স্রেপ অপরাধীর মুখোমুখি হওয়ার পালা।"
শুভ বলল, "রাজুকে খুঁজে পাওয়া গেছে?"
ডিকে বলল, "না, রাজু বেঁচে নেই বলেই আমার বিশ্বাস। ও ওই দানবাকৃতি কীটের খাদ্য হয়ে গিয়েছে।"

ওরা রবীন্দ্র এপার্টমেন্টে এসে পৌঁছেছে। ভিতরে গাড়ি ঢুকিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল ডিকে। ওর পিছনে পিছনেই নেমে এল শুভ। দেখতে পেল একটা টুল নিয়ে দারোয়ান বসে আছে, আর ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরো একটা লোক। সাত ফুটের মতো লম্বা লোকটা। চেহারায় একটা সৈনিক সৈনিক ভাব আছে। শুভকে নিয়ে লোকটার কাছে গেল ডিকে। শুভর দিকে তাকিয়ে বলল, "ইনি হচ্ছেন এখানের লোকাল থানার ওসি, মিস্টার এ ভার্গব, আর এ হচ্ছে আমার ভাই কাম সহকারী শুভজিৎ বোস।"
ভার্গব মাথা নাড়লেন। বললেন, "তোমার সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুব খুশি হলাম।"
দারোয়ানের দিকে তাকিয়ে ডিকে বলল, "তোমাদের ম্যাডাম এখোনো রুমে আছে?"
দারোয়ান মাথা নাড়ল। বলল, "হ্যাঁ, স্যার। আজ উনি রুম থেকে বেরুননি।"
ভার্গব কে নিয়ে পাঁচ তলায় উঠে এলেন ডিকে। ভার্গব বললেন, "ইন্টারপোল থেকে কাল রাতেই ফোন এসেছিল, বলেছে জন্তুটাকে দেখতে পেলেই মেরে ফেলতে কিন্তু এত বড় একটা জন্তু নিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে একজন ইন্ডিয়াতে নিয়ে এল অথচ কেউ দেখতে পেলনা এটা ভাবতেই তো আমার অবাক লাগছে।"
ডিকে বলল, "যদি ভাল করে লক্ষ্য না করেন আপনিও দেখতে পাবেন না জন্তুটাকে, খুব সাবধানে থাকবেন যেকোনো সময় জন্তুটা আক্রমন করতে পারে।"
ভার্গব মাথা নাড়লেন। সাত নম্বর রুমে গিয়ে বেল টিপতেই একটা মেয়ে এসে দরজা খুলে দিল। অবাক ভাবে ওদের তাকিয়ে বলল, "আপনারা?"
এতক্ষণে মেয়েটাকে সামনা সামনি দেখল শুভ। মেয়েটার চেহারা একটু মোটার দিকে। গায়ের রঙ ফর্সা। দেখতে বেশ সুশ্রী। ডিকে বলল, "আমরা পুলিশ থেকে আসছি। আপনাকে একটু জিজ্ঞেসবাদ করতে চাই।"
মেয়েটা অবাক হল। বলল, "কি ব্যাপারে? আমি তো কোনো দোষ করিনি।"
মেয়েটাকে ঠেলে রুমের ভিতরে ঢুকে পড়ল ডিকে। দরজা লক করে বলল, "দোষ করেছেন কীনা সেটা জিজ্ঞেসবাদ করলেই বোঝা যাবে। এখন একটু শান্ত ভাবে বসুন।"
খানিকটা দূরে একটা সোফায় গিয়ে মেয়েটা বসল। ডিকে বলল, "আমি যদি ভুল না করে থাকি, আপনার নাম তৃষ্ণা চক্রবর্তী। আপনি অস্ট্রেলিয়ান জীব বিজ্ঞানী কেভিন নীল ব্রায়ানের সহকারি ছিলেন।"
মেয়েটা বলল, "মোটেই না, আমার নাম ইন্দ্রাণী রায় আর আমি জীবনে কখনো অস্ট্রেলিয়া যাইনি।"
পকেট থেকে পেপারের কাটিংটা বার করল ডিকে। তৃষ্ণার ছবিটা দেখিয়ে বলল, "এই ছবিটা যে আপনার সেটা নিশ্চই অস্বীকার করতে পারেননা।"
অবাক হওয়ার ভান করে মেয়েটা বলল, "একটা মেয়ে আমার মতো দেখতে বলেই আপনি তাকে আমি ভেবে নিলেন?"
ডিকে বলল, "আমরা যথেষ্ট খোঁজ খবর নিয়েই আসছি ম্যাডাম। আপনি নিজেকে যতই লুকোবার চেষ্টা করুন পারবেন না। আপনার ফেসবুক একাউন্ট এঞ্জেল জেসমিন আমরা হ্যাক করেছিলাম, সেখানে কে এন ব্রায়ানের সঙ্গে আমরা আপনার কথোপকথন পেয়েছি, তাছাড়া এখানে এসে যে কম্পিউটার থেকে আপনি একাউন্ট টা ওপেন করেছিলেন সেটার আইপি এড্রেস আমরা হ্যাক করেছি, ওখানের সিসি টিভি ক্যামেরায় আপনার ছবি দেখা গেছে, লুকোবার চেষ্টা করে কোনো লাভ নেই।"
মেয়েটা বলল, "যদি আমি তৃষ্ণাই হয়ে থাকি, আমার অপরাধটা কি?"
ডিকে বলল, "কেভিন কিছু একটা গোপন ব্যাপার নিয়ে রিসার্চ করছিলেন, যেটাতে উনি সফল হন, তারপর আপনি তাকে খুন করে ওর রিসার্চ পেপার নিয়ে অস্ট্রেলিয়া ছেড়ে চলে যান। ঠিক বলছি কি?"
তৃষ্ণা বলল, "কি উল্টোপাল্টা কথা বলছেন?"
ডিকে বলল, "শুধু কে এন ব্রায়ান নয় আফ্রিকা, তানজানিয়া, মিশর এমনকি ইন্ডিয়া যে দেশেই আপনি গেছেন সেখানেই একজন করে মানুষকে খুন করেছেন।"
তৃষ্ণার চোখ লাল হয়ে গেল। বলল, "কিন্তু আমি কেন খুন করতে যাব? খুনের পিছনে তো একটা মোটিভ থাকে? খালিখালি মানুষ খুন করে নিজের বিপদ বাড়িয়ে আমার লাভ কি?"
ডিকে কিছু বলার আগেই শুভ বলল, "আপনি বাড়িতে একটা দানবাকৃতি কীট পুষে রেখেছেন, যাকে খাবার দেওয়ার জন্য আপনি ওই লোকগুলোকে খুন করেছেন।"
তৃষ্ণা বলল, "আপনারা পাগল হয়েছেন। আমার বাড়িতে আমি একখানা দানবকৃতি কীট পুষেছি আর কেউ সেটাকে দেখতে পায়নি, এটাও সম্ভব।"
ভার্গব বললেন, "কে বলল দেখতে পায়নি। আপনার উল্টোদিকের এপার্টমেন্টের এক ভদ্রলোক ওই দিন আমাদের ফোন করে জানিয়েছিল জানালা দিয়ে উনি এক বিশাল সাইজের মাকড়সার মতো জিনিসকে আপনার রুমের ভিতরে ঘুরে বেড়াতে দেখেছিলেন, কিন্তু আমরা ব্যাপারটাকে গ্রাহ্য করিনি, কাল রাতে ইন্টারপোল থেকে ফোন এসেছে ওই জন্তুটা এখানেই আছে, ওকে দেখতে পেলেই যেন মেরে ফেলা হয়।"
হো হো করে হেসে উঠল তৃষ্ণা। ভার্গবের দিকে তাকিয়ে বলল, "রূপকথার গল্প শুনিয়ে এভাবে হাসির খোরাক হবেননা মিষ্টার অফিসার। আপনারা সার্চ করে দেখতে পারেন, আমার বাড়িতে সত্যিই এরকম জন্তু আছে কীনা।"
শুভ আর ভার্গব প্রবল উদ্যমে রুমটা সার্চ করতে আরম্ভ করল। খানিকক্ষণ সার্চ করার পরে হতাস ভাবে ফিরে এসে ভার্গব বললেন, "না, রুমে কিন্তু কোনো জন্তুই নেই।"
শুভ বলল, "কোনো গোপন দরজাও নেই, যার ভিতরে জন্তুটাকে লুকিয়ে রাখা যায়, আর বাথরুমের জানালাটাও এতটা বড় নয় যে ষাট কেজি ওজনের একটা কীট ওটা দিয়ে গলে বেরিয়ে যেতে পারে।"
তৃষ্ণা বলল, "আমার কাছে এমন কিছু নেই, আপনারা ভুল জায়গায় এসেছেন।"
ভার্গবের দিকে তাকিয়ে ডিকে বলল, "এবারে আমি কিছু বলি?"
ভার্গব বললেন, "হ্যাঁ, নিশ্চই।"
ডিকে বলল, "আমি আপনাদের আগেই বলেছিলাম, ভাল করে না দেখলে জন্তুটাকে আপনারা খুঁজে পাবেননা। ওই কারনে জন্তুটা এতক্ষণ আমাদের সামনেই বসে আছে, অথচ আপনারা দেখতে পাননি।"
চমকে উঠে ওরা তৃষ্ণার দিকে তাকাল। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে শুভ বলল, "মানে?"
ডিকে উত্তর দিলনা। তৃষ্ণার দিকে তাকিয়ে বলল, "আপনি আমার কাছে খুনের মোটিভ জানতে চাইছিলেন না, এবারে মোটিভটা বলি, আপনি ওদের খুন করেছেন, কারন আপনার সহজাত ইন্সটিংট বলে পুরুষদের সঙ্গে যৌনসংগম করলে তাদের খুন করে খেয়ে ফেলতে হয়। আর আপনি যাদের খুন করেছেন তাদের সকলেই আপনার সঙ্গে যৌনসংগম করেছিল।"
তৃষ্ণা রেগে গেল। বলল, "মানুষের ধৈর্যের একটা সীমা থাকে। আপনি তখন থেকে উল্টোপাল্টা অভিযোগ করে যাচ্ছেন? কোনো প্রমান আছে আপনার কাছে?"
ডিকে বলল, "প্রমান তো আছেই," বলে কাছে থাকা প্লাস্টার অফ প্যারিসের তৈরি একটা মূর্তি তুলে মেঝের উপরে আছড়ে ফেলল। মূর্তিটা ভেঙ্গে গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে যেতেই ভিতর থেকে বেরিয়ে এল একটা আস্ত নরকঙ্কাল। কিছু না জানার ভান করে তৃষ্ণা বলল, "এটা কিভাবে এখানে এল, আমি তো কিছুই জানিনা।"
ডিকে বলল, "আর ভান করবেন না ম্যাডাম। অস্ট্রেলিয়ার এক বন্ধুর কাছ থেকে ব্রায়ানের রিসার্চের ব্যাপারে সব কিছুই জানতে পেরেছি। আপনি আত্মসমর্পণ করুন, আমরা আপনাকে চিড়িয়াখানায় বন্দি করে রাখব।"
ফোঁস করে উঠে দাঁড়াল তৃষ্ণা। বলল, "বেশ করেছি, খুন করেছি। আমি অভুক্ত ছিলাম, ওরা আমার ক্ষুধা মিটিয়েছে। এবারে আপনারা আমার ক্ষুধা মেটাবেন। আজ আপনাদেরও মেরে ফেলব। তাহলে কোনো প্রমান থাকবেনা।"
ভার্গবের হাতে একটা পিস্তল উঠে এসেছে। বলল, "এই ভুলটা করার চেষ্টা করবেন না। তাহলে এখানেই আপনি এখানেই শেষ হয়ে যাবেন।"
হো হো করে হেসে উঠল তৃষ্ণা, তারপর দু'লাফে দেওয়াল বেয়ে সরসর করে সিলিঙে চড়ে গেল। বুকটা ধক করে উঠল শুভর। বাইরে থেকে একটা এম্বুলেন্সের সাইরেনের আওয়াজ ভেসে এল। দেখতে পেল, তৃষ্ণার শরীর, মুখ, হাত, পা সব বদলে যাচ্ছে। ওর গায়ের পোশাক টা ধীরে ধীরে ছিঁড়তে আরম্ভ করেছে। পেটের ভিতর থেকে কাতারে কাতারে ঠ্যাঙ বেরিয়ে আসছে। পাশে তাকিয়ে দেখল, বিষ্ফারিত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছেন ভার্গব। খানিকক্ষণের মধ্যেই তৃষ্ণার শরীরটা এক বিশাল সাইজের মাকড়সাতে রূপান্তরিত হল। মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল কালো কুচকুচে একখানা জীভ। আতঙ্কিত গলায় ভার্গব বললেন, "একি...?"
মাকড়সাটা চলতে আরম্ভ করছে। ওকে লক্ষ্য করে একটা গুলি চালালেন ভার্গব। সেকেন্ডের মধ্যে নিজেকে সরিয়ে সে বাঁচিয়ে নিল, তারপর ছাদের উপর দিয়ে সরসর করে ছুটে এসে উপর থেকে দুটো ঠ্যাঙে করে জড়িয়ে ভার্গব কে উপরে নিল। পশ্চাৎদেশ  থেকে একটা দড়ির মতো মোটা জাল বার করে ভার্গবের গলায় প্যাঁচ দিতে শুরু করল। ক্যাঁক ক্যাঁক করে ভার্গব বললেন, "কিছু করুন?"
শুভর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে। ঝাঁপিয়ে উঠে ভার্গবকে ধরার চেষ্টা করল, পারলনা, মাকড়সাটা ভার্গব কে জালে জড়িয়ে নিয়ে বাথরুমের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করল। এত বড় একটা মানুষকে তুলে নিয়ে যে প্রানীটা দেওয়াল বেয়ে হাঁটতে পারে তার শক্তি কত হবে সেটা আন্দাজ করেই শুভর শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। ডিকে কে ধাক্কা মেরে বলল, "তুমি কিছু করো।"

ওর পিছনে পিছনেই ছুটে গেল ডিকে। ভার্গিবের দিকে তাকিয়ে বলল, "দম, হারাবেন না, আমি আপনাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি।"
জীভ বার করে ক্যাঁকক্যাঁক করে ভার্গব কি বলল বোঝা গেলনা। পকেট থেকে কীটনাশক স্প্রেটা বার করল ডিকে, মাকড়শার দিকে তাক করে স্প্রে করতে লাগল। বেশ খানিকক্ষণ স্প্রে করার পরে মাকড়সাটার শরীর শিথিল হয়ে এল। ভার্গব কে ধপ করে সে নিচে আছড়ে ফেলল, তারপর নিজেও এসে ভার্গবের পাশে আছড়ে পড়ল। খানিকক্ষণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পরে ভার্গবের কাছে গিয়ে ওর গলায় পেঁচিয়ে থাকা জালটাকে টেনে খুলে ফেলল শুভ। মাকড়শাটার দিকে তাকিয়ে দেখল সেটা আবার মানুষে পরিণত হচ্ছে। খানিকক্ষণের মধ্যেই মেঝের উপরে নগ্ন অবস্থায় তৃষ্ণাকে পড়ে থাকতে দেখল। ওর বুকের উপরে চড়ে বসেছে ডিকে। চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকাতে শুরু করেছে। ওর দিকে তাকিয়ে কাঁদোকাঁদো গলায় তৃষ্ণা বলল, "আমাকে মারবেন না প্লিজ, তাহলে বিজ্ঞানের একটা বিশাল আবিষ্কার নষ্ট হয়ে যাবে।"
স্প্রেটা নিয়ে তৃষ্ণার মুখের উপরে স্প্রে করতে করতে ডিকে বলল, "যে আবিষ্কার আবিষ্কারককেই খুন করে ফেলে সেই আবিষ্কারের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই।"

(৭)
আজ শুভর বাড়িতে সবাই এসে জুটেছে। ডিকে আর শুভ তো আছেই, সঙ্গে রয়েছে চন্দ্রানী আর ভার্গব। ভার্গবের গলায় বেশ চোট লেগেছিল, এখন মোটামুটি সুস্থ। কয়েকটা দিন বেশ ট্রমায় ভুগেছিল শুভ এখন মোটামুটি ট্রমা কাটিয়ে উঠেছে। ডিকের দিকে তাকিয়ে শুভ বলল, "ব্যাপারটা কি, আমাদের একটু খুলে বলো? একটা জলজ্যান্ত মানুষ কিভাবে মাকড়সা হয়ে গেল কিছুই তো বুঝতে পারলাম না।"
ডিকে বলল, "কেভিন নীল ব্রায়ান ছিলেন একজন প্রানী বিজ্ঞানী। ছোট থেকেই ওনার শখ ছিল উনি মানুষের জিনে পরিবর্তন ঘটিয়ে মানুষকে বিভিন্ন প্রানীতে রুপান্তরিত করবেন। স্পাইডার ম্যানের ভক্ত হওয়ার দরুন ওর একটা স্পাইডার ম্যান তৈরির শখ জাগে। তারপর ওর সহকারী তৃষ্ণার জিনে উনি পরিবর্তন ঘটাতে শুরু করেন। অনেক প্রজাতির মাকড়সা উনি সংগ্রহ করেছিলেন, কিন্তু একটি বিশেষ প্রজাতির মাকড়সার জিন মানুষের জিনের সঙ্গে ম্যাচ করে আর উনি এই কাজে সফল হয়ে যান, কিন্তু উনি ভাবতে পারেননি জিনগত পরিবর্তন ঘটালে অনেক সময় সহজাত ইন্সটিংটের পরিবর্তন ঘটে যায়, তাই সফল হবার পরে সহজ বিশ্বাসেই তৃষ্ণার সঙ্গে মিলিত হন। সম্ভবত এই ঘটনায় তৃষ্ণা ওকে উত্তেজিত করেছিল বলেই আমার বিশ্বাস, যে কারনে উনি খুন হয়ে যায়।"
শুভ বলল, "কিন্তু মিলনের পরে খুন ব্যাপারটা আমার ঠিক মাথায় ঢুকছেনা।"
ডিকে বলল, "উত্তর আমেরিকার ব্ল্যাক উইডো মাকড়সার ব্যাপারে শুনেছিস কি?"
শুভ বলল, "হ্যাঁ, এরা মিলনের পরে এদের পার্টনারকে মেরে খেয়ে ফেলে। এটা ক্যানিবলিজমের একটা ভাল উদাহরণ।"
ডিকে বলল, "আমার অনুমান, তৃষ্ণার শরীরে যে মাকড়শাটার জিন ম্যাচিং করেছিল তা একটা ব্ল্যাকউইডো মাকড়শার, এই কারনে তৃষ্ণা মিলনের পরে লোকগুলোকে শুধু খুনই করেনি তাদের শরীরে যেটুকু মাংস এবং জলীয় অংশ সেটুকুকেও খেয়ে ফেলেছে, হাঁড়গুলোকে প্লাস্টার অফ প্যারিসের মূর্তি কিনে তার ভিতরে পুরে ফেলেছে, এরফলে মানুষগুলো খুন হবার পরেও ওদের হাঁড়গোড় গুলো খুঁজে পাওয়া যায়নি।"
শুভ বলল, "কিন্তু তুমি কিভাবে বুঝলে হাঁড়গোড় গুলো ওই মূর্তির ভিতরেই ঢোকানো আছে?"
ডিকে বলল, "তুই বোধহয় কেভিন নীল ব্রায়ানের নিরুদ্দেশ হবার খবরটা মন দিয়ে পড়িসনি। ওখানে লেখা ছিল দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল, কেভিনের বাড়ি থেকে কিছুই খোয়া যায়নি, কেবল ওর কিছু ইনপটেন্ট রিসার্চ পেপার আর একটা প্লাস্টার অফ প্যারিসের মূর্তি ছাড়া। তখনই আমার মনেহয় রিসার্চ পেপার চুরি করার অনেক কারন থাকতে পারে, কিন্তু প্লাস্টার অফ প্যারিসের মূর্তি কেউ কেন বাড়ি থেকে নিয়ে যাবে? মূর্তির ভিতরে খানিকটা ফাঁকা জায়গা থাকে, একমাত্র যদি তার ভিতরে কিছু লুকিয়ে নিয়ে যেতে না হয়, একটা জলজ্যান্ত মানুষকে ওই মূর্তির ভিতরে করে নিয়ে যাওয়া যাবেনা। কিন্তু যদি মানুষটার ছাল, মাংস ছাড়িয়ে কেবল হাঁড়গোড় গুলোকে ওই মূর্তির ভিতরে ঢোকানো যায় তাহলে সেটা কিন্তু অনায়াসেই চলে যাবে।"
"হ্যাঁ, তা ঠিক," শুভ মাথা নাড়ল। ডিকে বলল, "তৃষ্ণার রুমে ঢুকে যখন আমরা রাজুকে খুঁজে পেলাম না, কিন্তু বেশ কয়েকখানা প্লাস্টার অফ প্যারিসের মূর্তি দেখতে পেলাম তখনই ব্যাপারটা আমার কাছে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল।"
চন্দ্রানীর চোখে একটা বিষণ্ণতার ছাপ। বললেন, "শেষ পর্যন্ত রাজুর খোঁজ পাওয়া গেল?"
ভার্গব বললেন, "হ্যাঁ, ডিএনএ পরীক্ষায় জানা গেছে, ডিকে যে স্কাল্পচারটা ভেঙ্গে কঙ্কাল টা বার করেছিলেন ওটাই রাজুর কঙ্কাল, বাকি কঙ্কাল গুলোর সবার আই ডি জানা যায়নি তবে একটা কঙ্কাল কে এন ব্রায়ানের হওয়া সম্ভাবনা আছে। ইন্টারপোলকে খবর পাঠিয়েছি, ওরা এসে বাকি গুলো নিয়ে যাবে।"
চন্দ্রানী মাথা নাড়লেন। ডিকের হাতে একটা চেক দিয়ে বললেন, "আপনার টাকা।"
চেকটা নিয়ে ডিকে বলল, "ধন্যবাদ।"
ভার্গব বললেন, "এই ঘটনার পিছনে আপনি কাকে দায়ি করতে চান? যে বিজ্ঞানী জন্তুটাকে বানিয়েছিল নাকি যে খুন গুলো করছিল?"
ডিকে বলল, "বিজ্ঞানী আবিষ্কারের নেশায় আবিষ্কার করেছেন, উনি মোটেই কোনো খারাপ চিন্তা নিয়ে জিনিসটা আবিষ্কার করেননি, নোবেল ডিনামাইট আবিষ্কার করেছিলেন সমাজের ভালর জন্য, উনি কখনোই ভাবেননি যুদ্ধে এটাকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা হবে, তাই বিজ্ঞানীকে দায়ী করা ঠিক হবেনা, আর তৃষ্ণা তার সহজাত প্রবৃত্তি থেকে খুন করেছে, কখনো আত্মরক্ষার তাগিদে আক্রমণ করেছে, কিন্তু ও চাইলে অনেক খুন করতে পারত, যাদের নাগাল আমরা কখনোই পেতাম না, তাই ওকেও দায়ী করা যায়না। এটাকে এক্সিডেন্ট হিসাবে ধরে নেওয়াই ভাল।"

(সমাপ্ত)


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন