বৃহস্পতিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১৯

আনস্টপেবল

আনস্টপেবল

শঙখ শুভ্র নায়ক




হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢুকল রৌনক। দেবীকার দিকে তাকিয়ে বলল, "তাড়াতাড়ি জিনিস পত্র গুছিয়ে নাও, আমাদের এক্ষুনি বেরুতে হবে।"
দেবীকা অবাক হল। বলল, "কোথায় যাবে?"
রৌনকের মুখ ভয়ার্ত। বলল, "অনির্বাণ বাবুর কাছে যেতে হবে আমাদের, ধ্রুম এখানেও পৌছে গিয়েছে, আমি বাজারে ওকে দেখে এলাম।"
দেবীকার বুকের ভিতরটা শিরশির করে উঠল। বলল, "আমাদের খবর ও কিভাবে পেল? আমরা তো চেন্নাইতেই ওর চোখকে ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম।"
রৌনক বলল, "যে সে রোবট নয় ধ্রুম। ম্যাগনেটিক সেন্সিং রোবট এটা। এরা মানুষের শরীর থেকে বেরিয়ে আসা সামান্য ম্যাগনেটিক পালসকে ধরেই মানুষের লোকেশন ডিটেক্ট করে ফেলতে পারে।"
দেবীকা মাথা নাড়ল। যে সে রোবট যে ধ্রুম নয় তা সে জানে। অনেক দিনের মেহনত দিয়ে ধ্রুমকে বানিয়েছে ওর বাবা। এমন একখানা রোবট, যাকে গুলি করে মারা যাবেনা, আগুনে পোড়ানো যাবেনা, জলে ডুবিয়েও মারা সম্ভব নয়। আর এভাবে যদি ওদের লোকেশন ডিটেক্ট করে নেয় ধ্রুম তাহলে তো ওরা পৃথিবীর যে কোনাতেই লুকিয়ে থাকুক ধ্রুম ওদের ঠিক ধরে ফেলবে। ফিসফিস করে করে দেবীকা বলল, "আমাদের বাঁচার কি কোনো রাস্তাই নেই?"
রৌনক বলল, "জানিনা, আপাতত অনির্বান বাবু আমাদের প্রোটেকশনের ব্যবস্থা করবেন বলেছেন। যদিও উনি শিওর নন উনি আমাদের বাঁচাতে পারবেন কীনা।"

মাথা নেড়ে নিজের টুকটাক জিনিসপত্র গুলো গুছিয়ে নিল দেবীকা। রৌনকের হাত ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে আসতেই ওর মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। এই এক রোগ হয়েছে ওর কিছুদিন ধরে। হঠাৎ হঠাৎ শরীরটা ঝিমঝিম করে ওঠা। বেশ কয়েকমাস আগে ঈল মাছের সঙ্গে ইলিশ মাছের জিন সংযুক্তি ঘটিয়ে একখানা নতুন প্রজাতির মাছ তৈরির চেষ্টা করছিল সে, কিন্তু এক্সিডেন্টলি ইনজেকশনটা ওর নিজের আঙুলেই ফুটে যায়, তারপর এই রোগটা শুরু হয়েছে। কে জানে ওর শরীরে বড় কোনো রোগ বাসা বেঁধেছে কীনা। আসলে ঘটনাগুলো এত তাড়াতাড়ি ঘটে গেল যে সে ডাক্তার দিয়ে চেকাপ করানোর পর্যন্ত সময় পায়নি।

রৌনকের সঙ্গে ওর আলাপ একটা বিয়ে বাড়ির পার্টিতে। ওর মাসির পিসতুতো ভাইয়ের ছেলে এই রৌনক। কথাবার্তা বলে রৌনককে খুব পছন্দ হয়ে যায় দেবীকার। সম্পর্ক গড়াতে গড়াতে এমন একটা পজিশনে চলে আসে যখন রৌনককে ছাড়া দেবীকার পক্ষে বাঁচা অসম্ভব। কিন্তু ঝামেলা হয় বাড়িতে জানাতে গিয়েই। দেবীকার সায়েন্টিস্ট বাবা এই সম্পর্ক মেয়ে নেয়না। দেবীকার মুখের উপরেই বলে বসে, "আমার মেয়ে হয়ে তুই একটা বেকার ছেলেকে বিয়ে করবি, এ আমি কখনোই মানতে পারবনা।"
জীবনে বাবার মুখের উপরে কথা বলেনি দেবীকা, কিন্তু এবারে বলতে বাধ্য হয়। বলে, "আমার জীবনের সিদ্ধান্ত তুমি আমাকেই নিতে দাওনা বাবা।"
দেবীকার বাবা বলে, "এরকম ভুলভাল সিদ্ধান্ত আমি আমার মেয়েকে নিতে দেবনা। তোর বিয়ের ব্যবস্থা আমি করছি।"
দেবীকার অমতে জোর করেই ওর বিয়ের আয়োজন শুরু করে দেয় ওর বাবা। কিন্তু বিয়ের রাতে একটু ফাঁক পেতেই সে রৌনকের সঙ্গে পালিয়ে এসেছে। ঘুরতে ঘুরতে প্রথমে চেন্নাই, তারপর এই দিল্লিতে। আর তাতেই খচে গিয়ে ওর বাবা ধ্রুম কে লেলিয়ে দিয়েছে ওদের পিছনে। এই মানুষটা চিরকালই বড্ড একরোখা। যা ওনার পছন্দ হয়না, তাকে শেষ করে দিতেও উনি পিছপা হননা।

ঘর থেকে বেরিয়ে রৌনকের সঙ্গে অর্নিবান বাবুর কাস্টাডির দিকে হাঁটতে লাগল দেবীকা। রাস্তার উপরে ঘন কুয়াশা। দৃশ্যপট এতই অস্বচ্ছ যে দশফুট দূরের জিনিসকেও দেখা যাচ্ছেনা পরিষ্কার। দুপাশের গাছগুলো এক অদ্ভুত শিহরণ বুকে মেখে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পায়ের নিচে ভিজে নরম ঘাসে ডিগবাজী খাচ্ছে ভয়। এসময় এই কুয়াশার শামিয়ানা ভেদ করে কেউ যদি ওদের অতর্কিতে আক্রমণ করে তো ওরা বুঝতেই পারবেনা।

দেখতে দেখতে ওরা অনির্বাণ বাবুর কাছে এসে পৌঁছাল। একটা প্রোটেক্টেড ঘরে ওদের থাকার ব্যবস্থা করেছেন অনির্বাণ বাবু। ইস্পাতের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা একটা বিশাল ঘর। তাতে তিনখানা জাবদা জাবদা কপাট। সাধারন ভাবে এই কপাট গুলোকে ভাঙা যাবেনা। সামনে ছেয়ে আছে বেশ কিছু পুলিশ। হাতে লেজার গান। ওদের প্রোটেকশনের ব্যবস্থা দেখে ওরা অবাক হয়ে গেল। অনির্বাণ বাবুর দিকে তাকিয়ে রৌনক বলল, "এইজন্য আপনি আমাকে এখানে আসতে বললেন? আপনি আমাদের নিয়ে এতটা ভাবছেন আমি কল্পনাই করিনি।"
অনির্বাণ বাবু বললেন, "একজন সচেতন নাগরিক হিসাবে দেশের আর একজন নাগরিক কে বাঁচানো আমাদের কর্তব্য।"
রৌনক মাথা নাড়ল। ঘরের ভিতরে গিয়ে ওরা ঢুকে পড়ল। ঘরটা ইস্পাতের দেওয়াল দিয়ে তৈরি। উপরে একখানা ঘুলঘুলি রয়েছে বাতাস চলা চলের জন্য। তাছাড়া একটা মনিটর রয়েছে, যার সাহায্যে ওরা দরজা বন্ধ রইলেও বাইরের জিনিসগুলো দেখতে পাবে। ঘরের ভিতরে বসেও গা ছমছম করতে লাগল দেবীকার। বলল, "এখানেও যদি ধ্রুম পৌঁছে যায়।"
রৌনক বলল, "এত ভয় পাচ্ছ কেন? দেখলে না আমাদের জন্য কি রকম প্রোটেকশনের ব্যবস্থা করেছেন অনির্বাণ বাবু।"
দেবীকা মাথা নাড়ল। বলল, "আমি ভয় পাচ্ছি অন্য কারনে। ধ্রুম কে আমি ছোট থেকেই চিনি, এটা জানি, ওকে যদি কোনো অর্ডার দেওয়া হয় সেটা শেষ না করা পর্যন্ত ও ছাড়েনা। আর কাজ শেষের আগে ওকে নতুন কোনো অর্ডার দেওয়াও যায়না।"
রৌনক বলল, "এমন তো হতেই পারে, আমাদের খুঁজে না পেয়ে ধ্রুম অন্য শহরে চলে গেল।"
দেবীকা বলল, "কিন্তু আমরা এভাবে কতদিন আত্মগোপন করে থাকব?"
রৌনক বলল, "যতদিন না বিপদ পুরোপুরি কেটে যায়, ততদিন পর্যন্ত।"
ফস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল দেবীকা। বলল, "দেখা যাক, কবে সেই সুদিন আসে।"

দুটো দিন নিশ্চিন্তে কেটে গেল। এই দু'দিনে রজত নামে একজন কনস্টেবল ওদের বাইরে থেকে খাবার সরবরাহ করেছে। স্বাধীনতা না মিললেও এই যে ওরা এখোনো পর্যন্ত বেঁচে আছে এটা ওদের কাছে অনেক।

আজ সকালে ঘরের মধ্যে পায়চারি করছিল রৌনক। ওর বার বার মনেপড়ে যাচ্ছিল নিজের ঘরের কথা, সেই পুকুরটার কথা, সেই হাঁসগুলোর কথা যেগুলো রোজ বিকেলে প্যাঁক প্যাঁক করতে ওদের বাড়িতে ফিরে আসত। ওর মনেপড়ে যাচ্ছিল নীল আকাশের কথা, পুঞ্জিভূত মেঘের কথা। আর মনেপড়ছিল আকাশে উড়ে বেড়ানো সেই পাখিগুলোর কথা। এক একটা দিন যেন এক একটা বছরের মতো কাটছিল। মনেহচ্ছিল আজ কতদিন সে আকাশ দেখেনি। খোলা হাওয়ায় শ্বাস নেয়নি। বন্ধ ঘরে বসে থাকতে থাকতে যেন সে হাঁসফাঁস করে উঠছিল। ওর মনেহচ্ছিল গুপ্তধন গল্পের মৃত্যুঞ্জয়ের মতো সেও লৌহ কারাগারে বন্দী। মৃত্যুঞ্জয় বন্দী হয়েছিল লোভের বশবর্তী হয়ে আর সে বন্দী হয়েছে মৃত্যুভয়ে। হঠাৎ ঘরের দরজা খুলে অনির্বান বাবু ভিতরে এসে ঢুকলেন। রৌনকের দিকে তাকিয়ে বললেন, "আপনার শ্বশুরমশাইকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। তবে ধ্রুম কে খুঁজে পাওয়া যায়নি। মনেহচ্ছে সে এই শহর ছেড়ে অন্য কোথাও পালিয়েছে।" দেবীকা বলল, "বাবার কাছে ধ্রুমকে আটকানোর কোনো উপায় জানতে পারলেন?"
অনির্বাণ বাবু বললেন, "হ্যাঁ, একটা উপায় জানা গেছে। উনি ধ্রুমকে সাতদিন সময় দিয়েছেন। এই সাতদিনে সে যদি আপনাদের কোনো ক্ষতি করতে না পারে, তাহলে অটোমেটিক ওর অর্ডার ক্যানসিল হয়ে যাবে, আর সে বাড়িতে ফিরে যাবে।"
দেবীকা বলল, "সাতদিন মানে আজই তো শেষ দিন?"
অনির্বাণ বাবু মাথা নাড়লেন। বললেন, "হ্যাঁ, আজকের দিনটা একটু সতর্ক থাকুন, তাহলেই সব বিপদ কেটে যাবে।"
দেবীকা মাথা নাড়ল।

দেখতে দেখতে রাত হয়ে গিয়েছে। এখন নটা বাজে। রৌনকের মুখে হাসি হাসি ফুটে উঠেছে। আর মাত্র তিনঘন্টা। এই তিনঘন্টা কেটে গেলেই ওরা বেঁচে যাবে। মুক্তি পাবে এই ইস্পাতের কারাগার থেকে। না কোনো ঝুঁকি নিতে সে চায়না। খুব সাবধানে কাটাতে হবে এই তিনঘন্টা। হঠাৎ রুমের ভিতরে রাখা মনিটরটা দপ করে জ্বলে উঠল। মনিটরে রৌনক দেখল রাতের খাবার নিয়ে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে রজত। এই রুমের দরজাগুলো ভিতর থেকে অপারেট করা হয়। রৌনকরা সুইচ টিপলে তবেই দরজা খোলে। সুইচ টিপে দরজা খুলে দিল রৌনক।

মেঝেতে শুয়েছিল দেবীকা। আজকাল ওর মাথার যন্ত্রনা অসহ্য হয়ে উঠেছে। মনেহচ্ছে মাথাটা যেন ফেটে যাবে। সারা শরীরে একটা অসম্ভব ঝিমঝিমানি। তবু সব সহ্য করে মুখ বুজে এই রুমে পড়ে রয়েছে সে। রৌনকের ভালর জন্য সে আজ সব যন্ত্রনাকে হাসি মুখে সহ্য করে নেবে।

সুইচ টিপে দ্বিতীয় দরজাটাও খুলে ফেলল রৌনক। দেবীকা মেঝে থেকে উঠে বসল। গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল রৌনকের দিকে। তৃতীয় সুইচ টার দিকে হাত বাড়াচ্ছে রৌনক, দেবীকা মনিটারের দিকে তাকাল। হঠাৎ ভয়ংকর চিৎকার করে বলে উঠল, "দরজা খুলোনা রৌনক। এই হাঁটার স্টাইল আমি আমি চিনি। ওটা রজত নয় ধ্রুম। ও এখন ছদ্মবেশে আছে..."
দুম করে নিজের থাইয়ের উপরে একটা ঘুঁসি মারল রৌনক। তৃতীয় সুইচটা সে অলরেডি টিপে দিয়েছে। ধীরেধীরে খুলে যাচ্ছে ঘরে ঢোকার দরজা। ঝাপিয়ে পড়ে বিপদ সংকেত এলার্মের সুইচটা টেপার চেষ্টা করল দেবীকা, কিন্তু কি যে হল, গোটা ঘরে সর্ট সার্কিট হয়ে গেল। এলার্ম কাজ করলনা। ঘরে এখন একটা ব্যাটারিচালিত টিমটিমে মৃদু আলো জ্বলছে। সেই আলোতে দেবীকা দেখতে পেল ঘরের ভিতরে এসে দাঁড়িয়েছে ধ্রুম। এগিয়ে আসছে রৌনকের দিকে। ওকে থামানোর চেষ্টা করল দেবীকা। বলল, "প্লিজ, তুমি আমাদের কোনো ক্ষতি কোরোনা। আমি তোমার মালিকের মেয়ে, তুমি তো আমাকে ছোট থেকেই চেনো।"
রোবোটিক্স গলায় ধ্রুম বলল, "আমি মানুষ নই, আমি রোবট। আমি কেবল মালিকের অর্ডার পালন করি। মালিক আমাকে অর্ডার দিয়েছেন প্রথমে রৌনক বাবুকে খুন করে তারপর আপনাকে মারতে।"
দেবীকা বলল, "প্লিজ আমার কথা শোন, তোমার মালিক অর্ডার ফিরিয়ে নিয়েছেন।"
ধ্রুম বলল, "আমাকে একবার অর্ডার দিলে সেই অর্ডার ফেরানো যায়না। আমার কাজ আমি কমপ্লিট করবই।"
রৌনকের কাছে এগিয়ে এসেছে ধ্রুম। ভয়ার্ত গলায় রৌনক বলছে, "প্লিজ আমাকে মেরোনা, আমাকে ক্ষমা করে দাও..." পিছোতে পিছোতে ওর পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গিয়েছে। রৌনক এখন ধ্রুমের ইস্পাত কঠিন হাতের মধ্যে ছটপট করছে। ধ্রুম চেপে ধরেছে ওর গলা। ধীরেধীরে ওকে ধরে শূন্যে তুলে ফেলছে ধ্রুম। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে রৌনকের। মুখ থেকে বেরিয়ে পড়েছে আধখানা জীভ। শরীরটা ভীষণ ঝিমঝিম করছে দেবীকার। চোখ ফেটে বেরিয়ে আসছে জল। এই দৃশ্য সে সহ্য করতে পারছেনা। ওর বুকের ভিতরটা ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছে। সে জানে ধ্রুমকে আটকানো যাবেনা, পৃথিবীতে এত নিষ্ঠুর রোবট বোধহয় খুব কমই আছে, তবু সে চেষ্টা করবে। সর্ব শক্তি দিয়ে রৌনককে বাঁচানোর চেষ্টা করবে। ধীরেধীরে দুটো হাত মুঠো করল দেবীকা। নিজের সর্ব শক্তিকে একত্রিত করল ওই দুটো হাতের মধ্যে। তারপর রয়্যালবেঙ্গল টাইগারের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল ধ্রুমের উপরে। ধ্রুমকে ছোঁয়া মাত্রই একটা বিশাল বিষ্ফোরন হল। ওরা তিনজনে ছিটকে পড়ল তিন দিকে।

ধীরেধীরে জ্ঞান ফিরছিল দেবীকার। চোখ খুলতেই দেখল সে হাস্পাতালের বিছানায় শুয়ে আছে। ওর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন ডাক্তার বাবু। ফিসফিস করে দেবীকা বলল, "রৌনক কোথায়?"
পাশ থেকে রৌনক বলল, "এই তো তোমার পাশের বেডে।"
দেবীকা বলল, "তুমি বেঁচে গেছ?"
রৌনক বলল, "হ্যাঁ, আমরা দুজনেই বেঁচে গেছি, কেবল ধ্রুম ছাড়া।"
অবাক গলায় দেবীকা বলল, "কিন্তু এই অলৌকিক ঘটনা কিভাবে ঘটল? আমরা কিভাবে বেঁচে গেলাম?"
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ডাক্তার বাবু বললেন, "আমি বলছি কিভাবে বেঁচে গেলেন। আপনি কি রিসেন্টলি ঈল জাতীয় কোনো মাছের উপরে এক্সপেরিমেন্ট করছিলেন?"
দেবীকা মাথা নাড়ল। বলল, "হ্যাঁ, ঈল মাছের সঙ্গে ইলিশ মাছের ডিএনএ সংযুক্ত করে নতুন প্রজাতির মাছ তৈরি করার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু ভুলবশত ইনজেকশনটা আমার আঙুলে ফুটে যায়।"
ডাক্তারবাবু বললেন, "ওইকারনেই আপনি বেঁচে গেছেন। জলের নিচে বসবাসকারী ছয় প্রজাতির মাছ আছে, যাদের শরীরে ইলেক্টরোসাইটস নামের এক ধরনের কোষ থাকে। আর সেই কোষ থেকে ওরা ওদের শরীরে তৈরি করে বিদ্যুত তৈরি করতে পারে। এই ছয় প্রজাতির একটি হল ঈল মাছ। আপনি এই জিন সংযুক্তির সময় যে ভুল করেছিলেন, তাতে কিছু পরিমান সিরাম আপনার ব্লাডে চলে গিয়েছিল, যা থেকে আপনার ব্লাডে তৈরি হয়েছিল ইলেক্টরোসাইট নামক কোশ। আর তা থেকেই উৎপন্ন হচ্ছিল হাই ভোল্টেজের বিদ্যুৎ। আপনার হাজবেন্ড বললেন ইদানিং নাকি আপনার মাথা ঝিমঝিম করছিল, এসব ওই বিদ্যুৎ তৈরি হওয়ারই লক্ষ্যন। কিন্তু বিদ্যুৎ তৈরি হলেও তা বেরিয়ে আসতে পারছিলনা। যে মুহূর্তে আপনি ওই রোবটটাকে স্পর্শ করেন সেই মুহূর্তেই আপনার শরীরে জমা হওয়া সমস্ত বিদ্যুৎ রোবটটার শরীরে চলে যায়, যাতে রোবটার সমস্ত সার্কিট ফিউজ হয়ে গিয়ে রোবটটা বিকল হয়ে পড়ে। আপনার হাজবেন্ডে শূন্যে থাকার দরুন কিছু ক্ষতি হলেও উনি বেঁচে গিয়েছেন, আর আপনার ব্লাড কালচার করে আমরা আপনার শরীর থেকে সমস্ত ইলেক্টরোসাইট কোশ আলাদা করে দিয়েছি, তাই আপনিও এখন বিপদ মুক্ত।"
ফস করে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল দেবীকা। আনন্দে ওর চোখ ভিজে এল। হাস্পাতালের জানালা দিয়ে সে বাইরে তাকাল। বাদল কেটে গেছে। মেঘের কোলে রোদ এখন মিটিমিটি করে হাসছে। কেউ কি কোথাও আজো কেয়া পাতার নৌকা গড়ে কূলে ভাসিয়ে দিচ্ছে, দুলেদুলে চলার অনাবিল আনন্দ দেখবে বলে?

(সমাপ্ত)
©All rights reserved to sankha subhra nayak

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন