ভূতুড়ে কেস
শঙখ শুভ্র নায়ক
"কোনো কেসে যখন পুলিশ, ডিটেকটিভ সবাই ফেল মেরে যায়, তখন সেই কেসটাকে বলে ভূতুড়ে কেস, আর তেমনই একটা কেস এই মুহূর্তে আমার হাতে এসেছে," ডিকে বলল।
শুভ জিজ্ঞেস করল, "কেসটা কি? ক্লিয়ারলি বলো?"
ডিকে বলল, "গত কয়েকদিনে মেদিনীপুরের বেশ কয়েকটা ব্যাঙ্কে দুর্ধর্ষ ডাকাতি হয়ে গিয়েছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার ব্যাঙ্কের সিসিটিভি ক্যামেরায় কোনো ডাকাতকে দেখা যায়নি। পুলিশ বা ডিটেকটিভ এটা দেখেই অবাক। এ কিভাবে হয়?"
শুভ বলল, "হয়তো লেজার লাইট দিয়ে সিসিটিভি বিকল করে দিয়েছে।"
ডিকে বলল, "সেই সম্ভাবনা যে পুলিশের মাথায় আসেনি, তা নয়, কিন্তু যদি তুই দেখিস, তোর চোখের সামনে অটোমেটিক ব্যাঙ্কের ভল্ট খুলে যাচ্ছে, তারপর টাকা গুলো উড়তে উড়তে ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, তাহলে তোর কেমন লাগবে?"
শুভর চোখ কপালে। বলল, "স্ট্রেঞ্জ! এমনও হয় নাকি?"
ডিকে বলল, "এখানে তেমনই হয়েছে। তাই পুলিশ বা ডিটেকটিভ ধন্ধে। চোর মানুষ হলে হয়তো ধরা যায়, কিন্তু চোর যদি ভূত হয় ওরা ধরবে কিভাবে?"
শুভ বলল, "কিন্তু তোমাকে কেসটা কে দিল?"
ডিকে বলল, "উনি এসে গেছেন, দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ইতস্তত করছেন।"
বলতে বলতেই দরজার দিকে তাকাল শুভ। দেখল একজন ভারিক্কি চেহারার ভদ্রলোক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। ডিকের দিকে তাকিয়ে বলল, "আপনিই কি ডিটেকটিভ ডিকে?"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "হ্যাঁ, আর এ আমার ভাই, শুভ। আপনি নিশ্চই সুশোভন বাবু, মেদিনীপুর স্টেট ব্যাঙ্কের ম্যানেজার?"
সুশোভন বাবু মাথা নাড়লেন। বললেন, "হ্যাঁ, আমিই আপনাকে ফোন করেছিলাম। আসলে সোসাল মিডিয়াতে আপনার আগের একটা এডভেঞ্চারের গল্প পড়েছিলাম, খুব ভাল লেগেছিল, তাই মনেহল এই ভূতুড়ে কেসে আপনিই আমাদের সাহায্য করতে পারেন।"
ডিকে বলল, "বসুন, তারপর ডিটেলে বলুন কি হয়েছিল ব্যাঙ্কে?"
সুশোভন বাবু বসলেন। ওনার হাতে একটা পেন ড্রাইভ। সেটাকে টেবিলে নামিয়ে রেখে উনি বলতে শুরু করলেন, "অন্যান্য দিনের মতো পরশু, অর্থাৎ শুক্রবার বিকেল পাঁচটাতে আমরা ব্যাঙ্কে চাবি দিয়ে বাড়ি চলে গিয়েছিলাম। ব্যাঙ্কের চাবি ছিল আমাদের স্টাফ অনিকেতের কাছে। আমাদের ব্যাঙ্কে আগে নাইট গার্ড ছিলনা, কিন্তু ইদানিং চুরির ঘটনাগুলো ঘটছে বলে আমরা একজন নাইট গার্ড মোতায়েত করেছিলাম। সকালে অনিকেত আমাদের ফোন করে তাড়াতাড়ি ব্যাঙ্কে আসতে বলল। এসে দেখলাম, আমাদের নাইট গার্ড বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। ব্যাঙ্কের তালা খোলা। ভিতরে ঢুকে দেখলাম ভল্ট খোলা। টাকা পয়সা সব গায়েব। সি সি টিভি ফুটেজে যা উঠেছে তা তো গায়ের লোম খাড়া করে দেওয়ার মতো। ব্যাঙ্কের চাকরি আর করবনা মশাই। কোনদিন পৈত্রিক প্রানটা চলে যাবে কে জানে?"
ডিকে বলল, "ঘাবড়াবেন না, আমরা চোরকে ঠিক খুঁজে বার করব।"
সুশোভন বাবু বললেন, "চোর মানুষ হলে তো খুঁজে বার করবেন, একে তো মানুষ বলেই মনেহচ্ছেনা।"
ডিকে বলল, "সি সি টিভি ফুটেজ টা এনেছেন?"
হাতের পেন ড্রাইভটা এগিয়ে দিয়ে সুশোভন বাবু বললেন, "এতে ওই সময়ের ফুটেজটা আছে। চুরিটা হয়েছে রাত একটা থেকে দেড়টার মধ্যে।"
পেনড্রাইভটা একটা ল্যাপটপে ঢুকিয়ে প্লে করল ডিকে। কয়েকমুহূর্তের যে ছবি ভেসে উঠল সেটা দেখে শুভর চক্ষু স্থির হয়ে গেল। ব্যাঙ্কের দরজা অটোমেটিক খুলে গেল। ব্যাঙ্কের ভল্ট খুলে গেল। টাকা পয়সা, সোনাদানা ভিতর থেকে বেরিয়ে থেকে এসে হাওয়ায় উড়তে উড়তে দরজা দিয়ে বেরিয়ে চলে গেল। ভিডিও টা শেষ হতে ডিকে বলল, "আপনি যে দারোয়ান রেখেছিলেন সে কি বলছে?"
সুশোভন বাবু বললেন, "ও তো বলছে ও কিভাবে ঘুমিয়ে পড়ল কিছুই জানেনা। কিন্তু রক্ত পরীক্ষা করে ওর ব্লাডে নিষিদ্ধ ড্রাগের স্যাম্পেল পাওয়া গেছে। পুলিশ ওকে হেফাজতে নিয়েছে। কিন্তু কিছু পাওয়া যাবে বলে আমার মনে হয়না। এখন যা অবস্থা ভূতের ভয়ে ব্যাঙ্কগুলোর জন্য কোনো দারোয়ান পাওয়া যাচ্ছেনা।"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "আচ্ছা, ফুটেজটা আমার কাছে রাখতে পারি?"
সুশোভন বাবু বললেন, "হ্যাঁ, ওটা আপনার জন্যই এনেছি। যদি কিছু করতে পারেন, খুব উপকার হয়।"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "আমাকে একটু ভাবতে সময় দিন। আশাকরি কিছু না করেই ফেলব।"
সুশোভন বাবু চলে গেলেন। ডিকের দিকে তাকিয়ে শুভ বলল, "এরকম দুর্ধর্ষ কেস, আমি আজ পর্যন্ত দুটি দেখিনি। জলজ্যান্ত একটা ভূত ব্যাঙ্ক থেকে টাকা চুরি করছে?"
ডিকে হাসল। বলল, "না, এটা মোটেই কোনো ভূতুড়ে কেস নয়। ভূতেদের টাকা পয়সার কোনো প্রয়োজনই নেই। এটা নিশ্চই কোনো মানুষ ভূতের কাজ, যার অদৃশ্য হওয়ার ক্ষমতা আছে।"
চোখ বড়বড় করে শুভ বলল, "কিন্তু তুমি কিভাবে সিওর হলে এটা ভূতুড়ে ব্যাপার নয়?"
ডিকে বলল, "ফুটেজটা আর একবার ভাল ভাবে দেখলে তুইও বুঝতে পারবি। ১. দরজা খোলার পরে ভল্ট পর্যন্ত হেঁটে যেতে একটা মানুষের যে সময় লাগে এখানে ভূতটারও তাই লেগেছে। ২. ভল্ট কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে খুলে যায়নি, বেশ কিছু ক্ষণ ধরে খুটখাট করতে হয়েছে। ফুটেজে পরিষ্কার দেখা না গেলেও, আমার মনে হয়েছে, ডুব্লিকেট চাবি ঢুকিয়ে ভল্ট খোলা হয়েছে। আর টাকা পয়সা নিয়ে যাওয়ার সময় তার যে উচ্চতা সেটা ছয় সাড়ে ছয় ফুট দৈর্ঘের কোনো মানুষের হাতের উচ্চতার সমান।"
খানিকক্ষণ মাথা চুলকে শুভ বলল, "হ্যাঁ এগুলো সত্যিই কিন্তু ভাবার মতো পয়েন্ট। কিন্তু আমার মাথায় ঢুকছেনা, যার অদৃশ্য হওয়ার ক্ষমতা আছে সে তো সুপার হিরো হয়ে যেতে পারে, তার চুরি করার কি দরকার?"
ডিকে বলল, "কেবল এটাই নয়, আরো অনেকগুলো পয়েন্ট আছে ভাবার মতো। ১. যার অদৃশ্য হওয়ার ক্ষমতা আছে, সে দিনের বেলাতেই চুরি করতে পারে, রাতে তার চুরি করার কি দরকার? ২. তার দারোয়ান কে অজ্ঞান করারই বা দরকার কি? তাকে তো কেউ দেখতেই পাবেনা। ৩. সে চুরি ছাড়া অন্যকোনো অপরাধ কিন্তু এখোনো পর্যন্ত করেনি। কোনো অদৃশ্য মানুষ কাউকে আক্রমণ করে ঘায়েল করেছে, কিম্বা কাউকে কিডন্যাপ করেছে এমন ঘটনা কিন্তু কানে আসেনি।"
গম্ভীর ভাবে শুভ মাথা নাড়ল। বলল, "হ্যাঁ, তা কিন্তু সত্যি। কিন্তু এর কারন কি হতে পারে?"
ডিকে বলল, "কারন টা কি সেটা দারোয়ানের সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যাবে। চল, এক্ষুনি একবার ওর সঙ্গে মোলাকাত করা দরকার।"
সেদিন বিকেলে কোতোয়ালি থানার সাব ইন্সপেক্টর সুমিত মুখার্জী কে বলে দারোয়ানের সঙ্গে দেখা করল ডিকে। দারোয়ানের নাম রাম সিং। ওর বাড়ি বিহারে। ওর কাছ থেকে বিশেষ কোনো তথ্য পাওয়া গেলনা। রাম সিং বলল, ও কোনো নেশা করেনা। ওকে এরকম ড্রাগ কে খাওয়াল তাও ও জানেনা। ডিকে জিজ্ঞেস করেছিল, "কাল রাতে কোনো অপরিচিত লোক কি তোমাকে কিছু খেতে দিয়েছিল?"
উত্তরে রাম সিং বলল, কাল রাতে সে বাড়ি থেকে খাওয়া দাওয়া করে এসেছিল, এখানে এসে এক বোতল জল ছাড়া কিছুই খায়নি।
তবে সুমিত বাবুর কাছ থেকে যে সব তথ্য পাওয়া গেল তাতে রহস্য আরো জটিল হল। উনি বললেন, ওখানে কোনো পায়ের ছাপ নেই। চাবি দেখে মনেহচ্ছেনা সেটাকে জোর করে খোলা হয়েছে। চাবিগুলো যেমন ভাবে খোলে তেমনি ভাবেই খুলেছে। আর সম্ভবত একজনই এই গোটা চুরিটার সঙ্গে যুক্ত।
থানা থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে ডিকে বলল, "রাম সিং কে সম্ভবত বোতলের জলের সঙ্গে নেশার অষুধ মেশানো হয়েছে। ও বলল, ও একবার ব্যাঙ্কের বাইরের চেয়ারে বোতল রেখে টহলে বেরিয়েছিল, সম্ভবত সেসময়ই কাজটা করা হয়েছে। কিন্তু কোনো ভাবেই আমার মাথায় আসছেনা, এত সহজে চোর ব্যাঙ্কের ভিতরে ঢুকল কিভাবে?"
শুভ বলল, "ভূতেরা সব পারে।"
ডিকে বলল, "এই ভূতটাকেই আমাদের খুঁজে বার করতে হবে, এটাই আমাদের চ্যালেঞ্জ।"
সেদিন বিকেলে রুমের মধ্যে পায়চারি করতে করতে ডিকে বলল, "ব্যাঙ্কের চাবি খুলে যে ব্যাঙ্কের ভিতরে অনায়াসে চুরি করতে পারে, তার কাছে ব্যাঙ্কের চাবি নিশ্চই আছে।"
শুভ বলল, "কিন্তু তা কি করে সম্ভব হয়, তার কাছে এতগুলো ব্যাঙ্কের চাবি কিভাবে আসবে?"
ডিকে বলল, "এটাই তো পয়েন্ট, তার কাছে এতগুলো ব্যাঙ্কের চাবি কিভাবে এল? এমন কি হতে পারেনা সে চাবি বানানোয় এক্সপার্ট, এমন কোনো চাবি বানিয়েছে যা দিয়ে যে কোনো তালা খোলা যায়।"
শুভর চোখে একটা ঝিলিক খেলে গেল। বলল, "তারমানে তুমি বলতে চাইছ এই শহরে চাবি বানানোয় এক্সপার্ট কতজন আছে, তাদের সঙ্গে কথা বললে কিছু না কিছু ক্লু পাওয়া যেতে পারে?"
ডিকে বলল, "ইয়েস, দ্যাট ইজ দা পয়েন্ট।"
ড্রয়ার খুলে কিছু খবরের কাগজের কাটিং বার করল ডিকে। খুঁজতে খুঁজতে একটা কাটিং কে আলাদা করে টেবিলে নামিয়ে রাখল। কাটিং টাতে উঁকি মেরে শুভ দেখল, তাতে একজন আসামির জেল থেকে পালানোর খবর ছাপা হয়েছে। আসামির নাম ছটু এক্সপার্ট। এত ডেঞ্জারাস আসামি যে তাকে জেলের কোনো কুটুরিতে রাখা যায়না। জেলের চাবি খুলে পালানো তার কাছে নেহাতই মামুলি ব্যাপার। দু'মাস আগে সে তার স্পেশাল সেলের চাবি খুলে গায়েব হয়ে গিয়েছে। ডিকে বলল, "আই থিঙ্ক এই ছটু এক্সপার্ট ই ডাকাতি গুলো করছে।"
শুভ বলল, "কিন্তু সে অদৃশ্য হবার ইন্সট্রুমেন্ট গুলো পেল কিভাবে?"
ডিকে বলল, "দু'মাস আগে মেদিনীপুরে একটা সায়েন্স সেমিনার হয়েছিল মনে আছে কি?"
শুভ বলল, "হ্যাঁ শুনেছিলাম। ওখানে বিশ্ববিখ্যাত কালার সায়েন্টিস ডঃজুয়ানের বক্তৃতা দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ওনার রুম থেকে ওনার কিছু সিক্রেট রিসার্চ ডকুমেন্ট চুরি যায়, যে কারনে উনি বক্তৃতা না করেই ফিরে যান।"
ডিকে বলল, "ইয়েস, ওনার কি কি চুরি হয়েছিল তা জানা দরকার। তুই মেদিনীপুর বিজ্ঞান মঞ্চে গিয়ে ওর ইমেল আইডিটা জোগাড় করে আন, আমি ততক্ষণ এদিকে কিছু খোঁজ খবর করি।"
পরদিন সকালে ইমেল আইডি নিয়ে ডিকের কাছে এল শুভ। বলল, "এই নাও ইমেল আইডি।"
ইমেল আইডি নিয়ে ডঃজুয়ানের নাম্বারের ইমেল করতে করতে ডিকে বলল, "চোর ভীষণ চালাক। এতটাই যে সে পুলিশ আর গোয়েন্দাকে তার প্রতিটা মুভমেন্টের ক্লু দিয়ে গেছে, অথচ ওরা টের পায়নি। যেন আমাদের চ্যালেঞ্জ করছে এসো, ক্ষমতা থাকলে আমাকে ধরে দেখাও।"
চোখ কপালে তুলে শুভ বলল, "কি রকম?"
ডিকে বলল, "দেখ, মেদিনীপুরে প্রথম চুরি হয়েছে মাসের এক তারিখ এক্সিস ব্যাঙ্কে মাসের এক তারিখ, পরের চুরি মাসের দু'তারিখ বন্ধন ব্যাঙ্কে, তারপর মাসের তিন তারিখ কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কে, পরপর তিনদিনে তিনটা চুরির পর সবাই যখন সতর্ক তখন সবার নাকের ডোগা দিয়ে মাসের ন'তারিখ আই সি আই সি আই ব্যাঙ্কে চুরি, তারপর ষোল তারিখ পাঞ্জাব ব্যাঙ্কে চুরি আর অবশেষে স্টেট ব্যাঙ্কে চুরি হয়েছে মাসের উনিশ তারিখ। কিছু বুঝতে পারছিস শুভ?"
চোখ গোল গোল করে পাকিয়ে শুভ বলল, "তারমানে চোর চুরি করছে আলফাবেটিক্যাল অর্ডার মেনে, তার নিজের প্রতি কনফিডেন্স এতটাই বেশি যে সে ভাবছে তাকে কেউ ধরতেই পারবেনা।"
ডিকে বলল, "ইয়েস তাই। যদি কেউ তোর সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, আর তুই তাকে দেখতে না পাস, তাহলে তো তার কনফিডেন্স বাড়বেই।"
শুভ বলল, "চোর যে নিয়মে চলছে তাতে তো পরের চুরিটা আজই হওয়া উচিৎ।"
ডিকে বলল, "হওয়া উচিৎ নয়, আজই হবে। আজ একুশ তারিখ আর আলফাবেটিক্যাল অর্ডার মানলে একুশ তম অক্ষর ইউ। অর্থাৎ আজ রাতে ইউনাইটেড ব্যাঙ্কে চুরিটা হবে।"
শুভ বলল, "কিন্তু আমরা চোরকে ধরব কিভাবে? আমরা তো ওকে দেখতেই পাবনা।"
ডিকে বলল, "সমস্যা যখন আছে কিছু না কিছু সমাধান বেরিয়েই যাবে। আজ বিকেলেই রেডি হয়ে আয়। আশাকরা যায় সমস্যার সমাধান করে ফেলব।"
সেদিন বিকেলে ডিকের বাড়িতে এসে হাজির হল শুভ। ডিকের টেবিলে নামানো দুটো কালো চশমা তার একটা শুভর হাতে দিয়ে বলল, "এটা কাছে রাখ, রাতে কাজে লাগবে।"
শুভ বলল, "রাতে তুমি রোদ চশমা পরে অভিযানে যাবে নাকি?"
ডিকে বলল, "এগুলো রোদ চশমা নয়, নাইট ভিশন চশমা। এই চশমার সাহায্যে রাতের বেলায় পশু প্রানীদের দেখা যায়।"
শুভ বলল, "কিন্তু এই চশমার সাহায্যে কি অদৃশ্য লোকটাকে দেখা যাবে?"
ডিকে বলল, "হ্যাঁ যাবে। আমাদের চোখ কোনো বস্তু থেকে প্রতিফলিত আলোকে ধরে লেন্সের মধ্যে প্রতিবিম্ব তৈরি করে। যদি কোনো নিয়মে সেই আলোর প্রতিফলন বন্ধ করে দেওয়া যায়, তাহলে সেই বস্তুটা অদৃশ্য হয়ে যায়, কিন্তু জীবিত প্রতিটা বস্তুর মধ্যে কিছু না কিছু তাপ থাকে, আর এই চশমা সেই তাপকে ধরে ফেলতে পারে, যে কারনে সাধারণ অবস্থায় অদৃশ্য বস্তুও এই চশমার সাহায্যে দেখা যায়।"
তারিফের সুরে শুভ বলল, "এক্সেলেন্ট আইডিয়া, কিন্তু এই আইডিয়া টা তুমি কোথা থেকে পেলে? ডঃজুয়ানের ইমেলের কোনো রিপ্লাই এসেছিল?"
ডিকে বলল, "হ্যাঁ উনি যদি আমাকে ইমেল করে না জানাতেন উনি কী ধরনের রিসার্চ করেছেন তাহলে এই আইডিয়াটা আমার মাথায় আসতনা। উনি এমন একটা কালার আবিষ্কার করেছিলেন, যা অন্য সব কালারের প্রতিফলন আটকে দেয়, তারই কিছু স্যাম্পেল নিয়ে উনি মেদিনীপুরে এসেছিলেন, কিন্তু ওনার রিসার্চের ডেমনস্ট্রেশন এর আগেই স্যাম্পেলটা চুরি হয়ে যায়, আর চোর সেটাই কাজে লাগাচ্ছে।"
শুভ বলল, "ও আই সি। বুঝলাম। চলো, বেরিয়ে পড়া যাক।"
ছোট গলির পাশে ব্যাঙ্ক। ওরা ব্যাঙ্কের কাছে এল। আজ ব্যাঙ্কের কাছে মাতালদের বেশ ভিড়। শুভ বলল, "এরা মানুষকে শান্তিতে থাকতে দেবেনা!"
ডিকে বলল, "এরা কেউই মাতাল নয়, প্রত্যেকে সাদা পোশাকের পুলিশ। আমিই ওদের এখানে আসতে বলেছি, নিজেদের প্রোটেকশনের জন্য।"
শুভ বলল, "মাই গড। তবে এরপর কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে কে জানে?"
ডিকে বলল, "চল, ওই ঝোঁপের আড়ালে গিয়ে বসি।"
শুভ বলল, "আচ্ছা, চলো।"
ওরা ঝোঁপের আড়ালে গিয়ে বসে পড়ল। এখান থেকে ব্যাঙ্কের গেটটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। অপেক্ষা করতে করতে কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছিল শুভ হঠাৎ ডিকের ধাক্কায় ওর চটকা ভেঙ্গে গেল। ডিকে বলল, "চশমা পরে সামনে দিকে তাকিয়ে দেখ।"
চশমা পরে সামনে তাকাল শুভ। তারপর যা দেখল তাতে ওর গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। একটা লাল রঙের অবয়ব হাতে কিছু একটা নিয়ে ব্যাঙ্কের চাবি খোলার চেষ্টা করছে। অষ্ফুটে শুভর গলা দিয়ে বেরিয়ে এল, "ভূত! ভূত!"
ডিকে বলল, "ধূর! ওরা ভূত নয়, ওটা একজন মানুষ। নাইট ভিশন ক্যামেরায় যেকোনো প্রানীকেই লাল রঙের দেখায়," শুভর হাতে একটা স্প্রে র বোতল দিয়ে বলল, "আমি সামনে দিক দিয়ে যাচ্ছি, তুই পিছন দিক দিয়ে গিয়ে এটা ওর গায়ে স্প্রে করবি।"
শুভ বলল, "কি আছে এতে?"
ডিকে বলল, "ফসফরাস! যা অন্ধকারেও জ্বলজ্বল করে। লেটস মুভ।"
ওরা দু'জনে দুদিক দিয়ে এগিয়ে গেল। লোকটার সামনে গিয়ে ডিকে বলল, "ছটু এক্সপার্ট, তোমার খেল খতম। তুমি পুলিশ আর গোয়েন্দাদের নাকে দড়ি দিয়ে অনেক ঘুরিয়েছ, কিন্তু আজ আমার কাছে ধরা পড়ে গিয়েছ। যদি বাঁচতে চাও সারেন্ডার করো।"
লোকটা একটু থমকাল, তারপর আবার নিজের কাজে মন দিল। হাত বাড়িয়ে ছটু এক্সপার্টের হাতটা ধরে ফেলল ডিকে। সঙ্গে সঙ্গে ছটু এক্সপার্ট অন্য হাতটা চালাল ডিকের মুখ লক্ষ্য করে। ডিকে সেটাও ধরে ফেলল। এবারে ছটু এক্সপার্টের গলার আশ্চর্যের সুর। বলল, "কে তুই? আমাকে দেখতে পাচ্ছিস কিভাবে?"
ডিকে বলল, "সব চালাকির একটা সমাধান থাকে, আমি হচ্ছি সেই সমাধান, এখন আমরা তোকে দেখতে পাচ্ছি, এবার থেকে সবাই তোকে দেখতে পাবে। শুভ কুইক।"
সময় নষ্ট না করে ছটু এক্সপার্টের গায়ে ফসফরাস স্প্রে করল শুভ। ঠিক তখনই সাদা পোশাকের পুলিশেরা ওদের ঘিরে দাঁড়াল।
যাইহোক, অবশেষে একটা ভূতুড়ে কেসের সমাধান হয়েই গেল। ছটু এক্সপার্টের বাড়ি থেকে প্রায় সব টাকাই উদ্ধার হল। সেদিন বিকেলে ডিকের বাড়িতে এলেন সুশোভন বাবু। কেসের ব্যাপারে সব কিছু ডিটেলস জানার পর বললেন, "আপনি যে এত দ্রুত কেসটার সমাধান করে ফেলতে পারবেন এটা আমাদের কল্পনার বাইরে ছিল। আমরা ব্যাঙ্ক এসোসিয়েশন এর তরফ থেকে এজন্য আপনাকে কিছু দিতে চাই।"
ডিকে বলল, "কি?"
ডিকের হাতে একটা চেক তুলে দিলেন সুশোভন বাবু। উঁকি মেরে শুভ দেখল চেকটা পঁচিশ লক্ষ টাকার।
(সমাপ্ত)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন