নিশুতি রাতের ডাক
শঙ্খ শুভ্র নায়ক
"ডাক্তারবাবু আমি ঠিক হয়ে যাব তো?"এনাস্থেটিকের প্রভাবে ঘুমে ঢলে পড়ার আগে প্রশ্নটা করল তমোঘ্ন।
ডাক্তার বাবু আশ্বাস দিলেন, "চিন্তার কোনো কারনই নেই, এখন অর্গান ট্রান্সপ্ল্যান্ট অনেক মর্ডান হয়েছে। একবার ফিট হয়ে গেলে আপনি আবার আগের মতোই চলাফেরা করতে পারবেন।"
নিশ্চিন্ত হয়ে চোখ বুজল তমোঘ্ন, মনে মনে ভাবল- সত্যি এও সম্ভব?
বছর পাঁচেক আগেই এক্সিডেন্টটা ঘটেছিল। গাড়ি চালিয়ে অফিস থেকে ফিরছিল তমোঘ্ন, হঠাৎ একটা বেপরোয়া ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ। ট্রাকটা ওর গাড়ির উপরে চেপে গিয়েছিল, শরীরের অর্ধেকটা চলে গিয়েছিল হ্যান্ডেলের তলায়। হাঁটুর নিচ থেকে পা দুটোকে কেটে ওকে বার করে আনতে হয়েছিল। সেই থেকে তমোঘ্ন পঙ্গু।
হুইল চেয়ারে বন্দী হয়ে গিয়েছিল ওর জীবন। মাঝে মাঝে নিজেকে খুব হতাশ আর অসহায় লাগত। প্রতি মুহূর্তে এই অসহায়তা থেকে মুক্তি পেতে চাইত।খরচ করতেও পিছপা ছিলনা সে। ঠিক এসময়ই ড.বিনোদ সরকারের নামটা ওর কানে আসে। এই সার্জেন নাকি অর্গান ট্রান্সপ্ল্যান্টের মাধ্যমে বহু পঙ্গু লোককে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দিয়েছেন। এক বন্ধুর মাধ্যমে যোগাযোগ করে একদিন ড.সরকারের চেম্বারে চলে এসেছিল তমোঘ্ন। কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ড. সরকার ওকে বলেছিলেন- যদি কোন অর্গান ডোনারের খোঁজ পান ওকে জানাবেন। তারপর এ সপ্তাহেই কাঙ্ক্ষিত ফোনটা এল। বহু প্রতিক্ষার পর আজ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চলেছে তমোঘ্ন,শেষ হতে চলেছে একটা দুঃস্বপ্নের সময়।
(দুই)
জ্ঞান ফিরতে তমোঘ্নর মনে প্রথমেই যে প্রশ্নটা জাগল, সে এখন কোথায়? কাঁচের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা ঝকঝকে একটা ঘরের নরম সাদা বিছানায় সে শুয়ে আছে, মাথার উপরে এসির স্পিডটা বড্ড কম, শরীরটাকেও বেশ ভারী ভারী লাগছে। ধীরে ধীরে গত চার ঘণ্টার কথা ওর একটু আধটু মনে পড়তে লাগল। ও. টি তে ওর চোখের উপরে একটা জোরাল আলো জ্বলছিল, ফিসফিস কথা-বার্তার শব্দও শুনতে পেয়েছিল, ওর পাশের বেডে শুয়ে থাকা একটা মানুষকেও লক্ষ্য করেছিল কি?
কোনমতে সাহস করে কোমরটা একটু তুলে নিচের দিকে তাকাল তমোঘ্ন, বিষ্ময় আর আনন্দে ওর চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে গেল।
হ্যাঁ ড.সরকার পেরেছেন,পেরেছেন ওর স্বপ্ন পূরণ করে নতুন এক জীবন দান করতে,পেরেছেন ওকে আবার আগের সেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে ।
ওর ব্যান্ডেজ বাঁধা হাঁটুর নিচে জলজ্যান্ত দুটো পা।যদিও পা দুটোতে এখনো বিশেষ কোনো অনুভূতি টের পাচ্ছে না সে, শুধু ঝিমুনি ধরে গেলে যেমন একটা অনুভূতি হয়, তেমনই একটা অবশ অনুভূতি টের পাচ্ছে, কিন্তু ওর স্থির বিশ্বাস এতটা যখন হয়েছে, তখন বাকিটুকুও বিনাবাধায় হয়ে যাবে।
"আপনার জ্ঞান ফিরে গেছে?"ড. সরকারের কথায় চমকে উঠল তমোঘ্ন। বলল, " হ্যাঁ, স্যার" ওর মনে খুশির বন্যা বইছে,"আপনি মানুষ নন, ভগবান। আপনার এই ঋন আমি সারা জীবনেও শোধ করতে পারবনা।"
ড.সরকার মৃদু হেসে বললেন "প্রশংসা করে আমাকে লজ্জিত করবেন না, এটাই আমার কর্তব্য। সব তাঁরই ইচ্ছে আমরা তো তাঁর সেবক মাত্র?"
তমোঘ্ন বলল, "আর কতদিন পরে আমি চলতে পারব স্যার?"
ড.সরকার বললেন, "এখন সাতদিন আপনাকে অবজারভেশনে থাকতে হবে, তারপর আমরা আপনাকে ছেড়ে দেব। পারবেন না, এই সাতদিন অপেক্ষা করতে?"
তমোঘ্ন উত্তেজিত হয়ে বলল, "কেন পারবনা? এতদিন যখন অপেক্ষা করতে পেরেছি, সাতদিনটা এমন কি ব্যাপার?"
(তিন)
সাতদিনের আজই শেষদিন। প্রথম প্রথম পা দুটোকে নিয়ে মনটা একটু খুঁতখুঁত করছিল, মনে হচ্ছিল পা দুটোর বয়স ওর বাকি শরীরটার বয়সের চেয়ে বেশি, পা দুটো যেন কোনো বয়স্ক ব্যক্তির ।এখন যদিও সেই খুঁতখুঁতানি টাকে বন্ধ করতে পেরেছে এটা ভেবে যে পা দুটো ওর নিজস্ব, আর নিজের জিনিসে কখনো খুঁত ধরতে নেই।
আজকেই বাড়ি ফিরেছে তমোঘ্ন। শরীরের মধ্যে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করছে সে। আগে খিদে পেতনা, বাঁচার প্রয়োজনে যতটুকু না খেলেই নয়, ততটুকুই খেত, আর এখন যেন পেটে ছুঁচোয় ডন মারছে। সকাল থেকে গোগ্রাসে খেয়েও খিদে মিটছে না। ডাক্তার বাবু বলেছেন, এরকম অপারেশনের পরে ছোট খাটো সাইকোলজিক্যাল চেঞ্জ হয়।
পায়ে এখোনো জোর ফিরে পায়নি তমোঘ্ন, স্ক্র্যাচ ধরে হাঁটতে হচ্ছে, শরীর টলমল করছে, তবে একটু অভ্যেস করলে খুব শীঘ্রই এটা ঠিক হয়ে যাবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন ডঃসরকার।
সকাল থেকে ইজিচেয়ারটাতে একরকম ভাবে বসে থেকে বিরক্ত লাগছিল তমোঘ্নর। স্ক্র্যাচটা বগলে চেপে সে উঠে দাঁড়াল। বারান্দা দিয়ে হেঁটে ডাইনিংয়ের বিশাল আয়নাটার দিকে এগিয়ে গেল। এন্টিক জিনিস এটা,অক্সেনে বহুদাম দিয়ে সে কিনেছিল। আয়নাটা কখনো ওর সাথে বেয়াদবি করেনি, কিন্তু আজ করল। মুখের আদলে একটু চেঞ্জ লক্ষ্য করল যেন। ভাবল হয়তো একজায়গায় বসে থাকার বোরিংনেসের জন্যই এই পরিবর্তন। একটু ঘুরে এলে মনটা ভাল হবে এই ভেবে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাশের পার্কটার দিকে এগিয়ে গেল। এখন পার্কে লোকজন বিশেষ কিছু নেই, শুধু বেঞ্চে বসা অরুণাভবাবুকে দেখে সে চমকে উঠল। ওদের কমপ্লেক্সের পাশের কমপ্লেক্সে অরুণাভবাবুর বাড়ি। কিছুদিন আগে বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাথায় চোট পেয়েছিলেন। কোমায় চলে গিয়েছিলেন ভদ্রলোক, বাঁচার আশা ছিলনা। উনি যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন সে কথা তমোঘ্নর জানা ছিলনা। ওর পাশে গিয়ে বসল তমোঘ্ন। ভদ্রলোক ওকে দেখেও যেন চিনতেই পারলেন না। অগত্যা ভদ্রতা রাখার তাগিদে তমোঘ্নকেই কথা শুরু করতে হল।
"কবে এলেন?"
অরুণাভ বাবু বললেন, "এই তো দুদিন হল।"
তমোঘ্ন বলল, "মাথার চোট সারল?"
অরুণাভ বাবু বললেন, "এখন পুরোপুরি ফিট।"
তমোঘ্ন বলল, "আমিও আজ সকালেই ফিরেছি। ড. বিনোদ সরকারের অপারেশনের পর আমি আবার নতুন পা ফিরে পেয়েছি।"
ওর দিকে সরু চোখে তাকালেন অরুণাভ বাবু। বললেন, "আপনিও বিনোদ সরকারের কাছে চিকিৎসা করিয়েছেন?"
তমোঘ্ন অবাক হল, "হ্যাঁ, কেন?"
চাপা গলায় অরুণাভ বললেন, "আমিও তো ওনার কাছেই চিকিৎসা করিয়েই বাড়ি ফিরছি। আপনি আমাকে যে লোক ভাবছেন আমি সে লোক নই।"
ভ্যাবাচ্যাকা খেল তমোঘ্ন "মানে?"
অরুণাভ বাবু বললেন, " আপনিও যেহেতু বিনোদ বাবুর রুগী, তাই আপনার কাছে লুকোবনা, কিন্তু খবরদার, কথাটা গোপন রাখবেন।"
তমোঘ্ন বলল, "আপনি নির্দ্ধিধায় বলতে পারেন।"
"আমি হলাম হরেন সরকার। বাসের কনট্রাকটারি করতাম। হঠাৎ একদিন স্ট্রোকে শরীরটা প্যারালাইজড হয়ে গেল। আমার ব্রেন ছিল জীবিত কিন্তু শরীরে নড়াচড়া করার ক্ষমতা ছিলনা। দীর্ঘ সাত বছর ওই অবস্থায় মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করেছি। তারপর একদিন বিনোদ বাবুর খোঁজ আমি পাই। ভদ্রলোক বলেছিলেন, ব্রেনডেথ হওয়া কোনো রুগীর সন্ধান পেলে জানাবেন, ঠিক এসময় অরুণাভ বাবুর এক্সিডেন্ট হল। ওনার ছেলেরা যেকোনো মূল্যে বাবাকে বাঁচাতে চাইছিল, খবর গেল বিনোদ বাবুর কাছে। কি নিঁখুত হাত ভদ্রলোকের। এত অল্প সময়ে ব্রেন ট্রান্সপ্ল্যান্ট করে দিলেন যে কিছু বোঝার আগেই আমি দেখলাম আমি একটা অন্য মানুষ হয়ে গেছি। দুঃখ একটাই হরেন সরকার মানুষটার কোনো অস্তিত্ব রইলনা। এখন আমাকে সারাজীবন অরুণাভ বোস হয়েই অভিনয় করে যেতে হবে?"আফসোস ঝরে পড়লো অরুণাভ বাবুর কন্ঠে।
তমোঘ্ন বলল, "অন্যের অস্তিত্বকে ঘাড়ে করে বয়ে নিয়ে বেড়াতে আপনার কষ্ট হচ্ছেনা?"
অরুনাভ বাবু বললেন, "পাগল! সাত বছর সময়টা কী কষ্টে কাটিয়েছি জানেন? প্রতিনিয়ত বৌমাদের মুখ ঝামটা সহ্য করতে হত, ছেলে-মেয়ে গুলো বাইরে ফেলে দিয়ে আসার ভয় দেখাত, খেতে দিতনা ভাল করে, আর এখন আমার স্ত্রী-পুত্র-নাতি-নাতনি নিয়ে ভরা সংসার। কালে কালে চিকিৎসা বিজ্ঞানের কি উন্নতি হল? আজ থেকে বছর দশেক আগেও কি এসব কল্পনা করা যেত? এসবই বিনোদ বাবুর মতো ডাক্তারদের কৃতিত্ব। ওনারা মানুষ নন, দেবতা।"
তমোঘ্ন মাথা নাড়ল। ওর মনের কথাটিই বলে দিয়েছেন অরুণাভ বাবু। বেলা হয়ে গেল। বেঞ্চ থেকে উঠে ধীরে ধীরে সে বাড়ির দিকে পা বাড়াল।
(চার)
সকাল বেলায় ঘুম থেকে উঠেই চমকে উঠল তমোঘ্ন। সে এখন কোথায় শুয়ে আছে? এটাতো পার্কের সেই বেঞ্চিটা, কাল এখানে বসেই অরুণাভবাবুর সঙ্গে গল্প করছিল, কিন্তু সে এখানে কিভাবে এল? ওর যতদূর মনে পড়ছে, কাল রাতে নাইট গাউন পরে সে নিজের রুমেই শুতে গিয়েছিল। মাঝরাতে কি একটা দুঃস্বপ্ন ও দেখছিল যেন। হ্যাঁ এখন মনে পড়ছে, আবছা অন্ধকারে একটা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে কে একটা লোক ওকে ডাকছিল, "আয়... আয়..." কিন্তু সে কি সেই ডাকে সাড়া দিয়েছিল? না, ওর মনে পড়ছেনা। ব্যাপারটা খুব রহস্যময় লাগছে তমোঘ্নর।
ডঃ সরকার বলেছিলেন, এসব অপারেশনের পর একটু আধটু সাইকোলজিক্যাল চেঞ্জ হয়, তবে কি সে এখন সেই ফেজটার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে? পার্কের বেঞ্চ থেকে উঠে ঘরের দিকে পা বাড়াল তমোঘ্ন। পা দুটো এখনো ঠিকঠাক বশে আসেনি, এরকম অবস্থায় হুটহাট বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে কখন কি বিপদ ঘটে যাবে তার ঠিক নেই। ব্যাপারটা সুবিধার ঠেকছেনা, খুব তাড়াতাড়িই ডঃ সরকারের সঙ্গে সে একবার কনসাল্ট করে নেবে।
(পাঁচ)
ইদানীং পা দুটো অনেকটাই বশে এসে গেছে। এখন বিকেলবেলায় ঘুরতে যায় সে। এই শহরের পথ ঘাট গুলো ওর নখদর্পণে, ছোট থেকেই এই শহরের বুকে টোটো করে ঘুরে বেড়িয়েছে সে। সেদিন রাতে ঘুরে এসে খুব ক্লান্ত লাগছিল তমোঘ্নর। শুতে যাওয়ার আগে আয়নার সামনে দাঁড়াল। এ কী দেখছে সে! এই কদিনে ওর বয়স অনেকটাই বেড়ে গেছে। চুল গুলো পেকে গেছে। মুখে বয়সের বলিরেখার ভাঁজগুলো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
আয়নাটার গায়ে হাত রাখল তমোঘ্ন। আয়নাটাও যেন ওর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। খুব কান্না পেল তমোঘ্নর। সে কি তবে বুড়িয়ে যাচ্ছে? ঠিক তখনই ওর বুকের ভিতর থেকে কে একটা ওকে ডেকে উঠল, "আয়... আয়..." আর কিছু মনে নেই তমোঘ্নর। সকালে জলের ছিটে পেয়ে ওর ঘুম ভাঙল। দেখল এক ভদ্রলোকের ঘরের দাওয়ায় সে শুয়ে আছে। গজগজ করে ভদ্রলোক বললেন, "অদ্ভুত ঘুম মশাই আপনার! এত করে ডাকছি তবু আপনার ঘুম ভাঙেনা। শেষ পর্যন্ত জলের ছিটে দিয়ে ঘুম ভাঙাতে হল।"
বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে ওর মুখ থেকে একটাই শব্দ বেরিয়ে এল, "আমি এখানে কিভাবে এলাম?"
ভদ্রলোক বললেন, "আপনি এখানে কিভাবে এলেন সেটা তো আপনিই ভাল জানবেন, সকাল বেলায় উঠে দেখছি দুয়ার আগলে আপনি ঘুমোচ্ছেন, যতসব মাতালদের নিয়ে কারবার।"
গা ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল তমোঘ্ন। বাড়ি না ফিরে সোজা ডঃ সরকারের চেম্বারে ছুটল। সব শুনে ডঃ সরকার গম্ভীর হলেন। বললেন, "এমনটাতো হবার কথা নয়। এর একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে, আপনার সোমনাবুলিজম ডিজিজ আছে। এই রোগে মানুষ ঘুমের মধ্যেও হাঁটা চলা করে। এতদিন আপনার পা ছিলনা, তাই রোগটাও ছিলনা, এখন আপনার পা হতেই রোগটা ডিসপোজ হয়ে পড়েছে।"
তমোঘ্ন বলল, "ডাক্তারবাবু, এই রোগ থেকে কি আমার মুক্তি নেই?"
ডঃসরকার বললেন, "কেন থাকবেনা, এখন অনেক আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি আছে। আপনি একবার কোনো একজন সাইকোলজিস্টের সঙ্গে কনসাল্ট করতে পারেন, তবে আমি একটা পদ্ধতি বলছি, এতেও কিছু কাজ হতে পারে।"
তমোঘ্ন বলল, "বলুন।"
ডঃ সরকার বললেন, "সোমনাবুলিজম হল এক ধরনের হিপ্নোটিক স্টেট। এসময় পেসেন্ট অর্ধেক জেগে আর অর্ধেক ঘুমের মধ্যে হাঁটা-চলা করে। আপনি যদি আপনার রুমের দরজায় কোনো সেন্সর এলার্ম লাগিয়ে নেন, যখন দরজাটা ক্রস করবেন তখনই এলার্মটা বেজে উঠবে, তাহলে আপনার ঘুম ভেঙে যাবে আর কোনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখিও হতে হবেনা। যতদিন না পুরোপুরিভাবে সুস্থ হচ্ছেন, ততদিন আত্মসম্মান বাঁচাতে এই পদ্ধতিটা কাজে লাগাতে পারেন।"
ডঃসরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে চেম্বার থেকে বেরিয়ে এল তমোঘ্ন। সাইকোলজিস্টকে দিয়ে ও একবার চেকআপ করিয়ে নিল সেদিন।ওকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সাইকোলজিস্ট বললেন, "আপনার মধ্যে সোমনাবুলিজমের কোনো লক্ষ্যনই তো খুঁজে পাচ্ছিনা। আপনি যে সিম্পটমস গুলো বললেন, সেগুলো হয় মন গড়া নয়তো অলৌকিক"।
তমোঘ্নর খুব খারাপ লাগল। ডাক্তার বাবু কি ওকে মিথ্যেবাদী বলতে চাইছেন? সে আর সেখানে দাঁড়াল না। বাড়িতে ফিরে একটা সেন্সর এলার্ম দরজার উপরে লাগিয়ে দিল।
দু তিন দিন বেশ মানসিক যন্ত্রনা নিয়েই কাটাল সে। প্রতিদিনই সে যেন আরো বেশি করে বুড়িয়ে যাচ্ছে।
মনে হচ্ছিল ওর শরীরে অকাল বার্ধক্য বাসা বেঁধেছে। যদিও সেদিনের পর থেকে নিজেকে আর ঘরের বাইরে আবিষ্কার করেনি, কিন্তু রাতে শুতে যাবার আগে প্রতিদিনই সেই ডাকটা শুনতে পাচ্ছিল, কেউ যেন ওর ভিতর থেকে ওকে ডাকছে- "আয়... আয়..." তবে কি সে পাগল হয়ে যাচ্ছে? কিন্তু ডাক্তার বাবু যে বললেন ওর মধ্যে পাগলামির কোনো লক্ষ্যনই নেই।
(ছয়)
মনটা একটু ফ্রি করার জন্য সেদিন বিকেলে ঘুরতে বেরিয়েছিল সে,হঠাৎ একটা গলির ভিতরে পথ ভুল করে ফেললো। এরকমটা সচরাচর হয়না। আজকাল কি তবে ওর ব্রেন ওর সঙ্গে বেয়াদবি করতে শুরু করেছে? হাঁটতে হাঁটতে একটা ঝুপড়ি ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। ঘরের ভিতরে কাদের যেন চাপা গলায় ঝগড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে। একজন আরেকজনকে বলছে, "তুই কি ভাবছিস, আমি কোন খবর রাখিনা? পাঁচলাখ টাকা হাতিয়েছিস, আর ভাবছিস এক লাখ দিয়েই আমাকে ভুলিয়ে দিবি? ঠকাবার চেষ্টা করলে সোজা পুলিশকে সব জানিয়ে দেব।"
দ্বিতীয় জন বলছে, "এরকমটা করিসনা ভাই, আমি তোকে আরও একলাখ দিচ্ছি, এই মুহূর্তে এর বেশি আমার কাছে নেই..."
চুরি-ডাকাতির কেস নাকি রে বাবা? তমোঘ্নর বুক কেঁপে উঠল। এই জায়গাটাকে সে চেনে। জায়গাটার নাম নিমাইপুরের বস্তি। জায়গাটা নাকি খুব খারাপ। এখান থেকে সরে পড়াই ওর সমীচিন বলে মনে হল। সেই গলিটা দিয়ে কিছুটা এগিয়ে যেতেই হাইওয়েতে এসে পড়ল। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে ঠিক এই জায়গাতেই ওর গাড়িটার একটা লরির ধাক্কা হয়েছিল। কিন্তু সে কেন এখানে এল নিজেই বুঝতে পারলনা, এটা হয়তো অতীতকে নিয়ে বেশি ভাববার ফল।
(সাত)
রাত্রে ঘুম ধরছিলনা তমোঘ্নর। বিছানায় শুয়ে কেবলই এপাশ-ওপাশ করছিল। মনে হচ্ছিল আজকে মারাত্মক কিছু ঘটতে চলেছে। ওর মনের ভিতর থেকে কে যেন ওকে বার বার ডেকে চলেছে "আয়... আয়... আয়..."
নিশির ডাক কি এমনই হয়? সে তো শোনেনি কোনোদিন, কিন্তু তমোঘ্নর মনে হচ্ছিল এ ডাক নিশির ডাকের চেয়েও মারাত্মক। বহু কষ্টে একটু চোখ বুজেছিল তমোঘ্ন, হঠাৎ এলার্মের শব্দে ওর চটকা ভেঙে গেল। ভয় আর বিষ্ময়ে তমোঘ্ন দেখল, সে দরজা দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে যাচ্ছে। ওর পা দুটো আর ওর বশে নেই, তাদের যেন অন্য কেউ নিয়ন্ত্রন করছে।
ঘর থেকে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করল তমোঘ্ন। আকাশের বুক থেকে গোল চাঁদটা কাটা মুন্ডুর মত ঝুলে আছে। ফুটফুটে জ্যোৎস্নার আলোয় চারপাশটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। রাস্তায় কোনো জন মানবের চিহ্ন নেই, খাঁ খাঁ করছে রাস্তাটা। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ গুলোকে খুব রহস্যময় লাগছে। তমোঘ্নর হৃদপিণ্ড গলার কাছে উঠে এসেছে, তবু জোর করে নিজেকে থামানোর চেষ্টা সে করেনি। এর শেষ সে দেখবেই। কে ওকে কোথায় টেনে নিয়ে যেতে চাইছে ওকে জানতেই হবে। এই নিদারুন মানসিক যন্ত্রনা সে আর ভোগ করতে পারছেনা।
অবশেষে বড় রাস্তা পেরিয়ে ,অনেক ঝোপঝাড় ডিঙিয়ে সে একটা নদীর চড়ায় এসে থামল। এটা একটা শ্মশান। চারপাশে মড়া পোড়ানোর অজস্র চিহ্ন। মাথার উপর দিয়ে একটা রাতচরা পাখি চ্যাঁ চোঁ শব্দ করে উড়ে গেল। এতক্ষনে নিজের উপরে নিয়ন্ত্রন ফিরে পেল তমোঘ্ন।
নদীর জলটা ছলাৎছলাৎ শব্দে বয়ে যাচ্ছে, একটানা শোনা যাচ্ছে ঝিঁঝিঁর ডাক। চাঁদের আলোয় বালুকাময় চড়াটা ধূ-ধূ মরুভূমির মতো লাগছে। হঠাৎ হাড় কাঁপিয়ে একদল শেয়াল হুক্কাহুয়া করে ডেকে উঠল। আর একটু হলেই জ্ঞান হারাচ্ছিল তমোঘ্ন, ঠিক এসময়ই শ্মশানের এক কোনায় বড় বড় ঝুরি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বট গাছটা ওর নজরে পড়ল। গাছটার নিচে সাদা চাদর মুড়ি দিয়ে বসে কে একটা যেন খুক খুক করে কাশছে। কাছে এগিয়ে যেতেই দেখল সেটা একটা বুড়ো। ওর পায়ের শব্দ পেয়ে বুড়ো বলল, "কে রে সুধীর এলি নাকি?"
তমোঘ্ন বলল, "আজ্ঞে না, আমি।"
বুড়ো বলল, "মাফ করবেন বাবু, আসলে পায়ের শব্দটা বড্ড চিনা চিনা লাগল।"
তমোঘ্নর কৌতুহল হল। জিজ্ঞেস করল, "সুধীর কে?আপনার কে হয়?"
বুড়ো বলল, "আজ্ঞে বাবু, আমার বড় ছেলে।"
তমোঘ্ন বলল, "ওর জন্য অপেক্ষা করছেন কেন?"
বুড়ো বলল, "সেদিন নারসিংহুম থেকে ফেরার পথে ওই তো আমাকে এই গাছ তলায় বসিয়ে দিয়ে গেল, এখোনো ফেরেনি।"
তমোঘ্ন জানতে চাইল, "আপনার বাড়ি কোথায়? মানে এখানে আসার আগে কোথায় থাকতেন?"
বুড়ো বলল, "আজ্ঞে বাবু, আমার বাড়ি নিমাইপুরের বস্তিতে। আমার দুই ছেলে, বড় সুধীর আর ছোট অধীর। দুজনেই কারখানায় কাজ করত। কিন্তু কারখানা লগ আউট হবার পর থেকেই বড্ড গরীব হয়ে গেছে। আমি বড়টার কাছেই থাকতুম।"
তমোঘ্ন জিজ্ঞেস করল, "নার্সিংহোমে গিয়েছিলেন কেন?"
বুড়ো বলল, "গিয়েছিলুম কি আর সাধে? অভাবী মানুষ আমরা। তা সেদিন বড়টা এসে বলল, আমার রক্ত নাকি খুব বিরল গুরুপের। এই রক্ত নাকি সবাইকে দেওয়া যায়, কিন্তু ওই গুরুপের লোকের কাছ থেকে ছাড়া নেওয়া যায় না। নাসরিংহুমে এক খুব বড়লোক রুগী এসেছে, তারও ওই গুরুপের রক্ত, কুথাও রক্ত পাচ্ছেনা, তাই ওই হাস্পাতালের ডাক্তার বলেছে, যে ওকে রক্ত দেবে তাকে নাকি পাঁচ লাখ টাকা দেবে, তাই গিয়েছিলুম। আমার রক্ত পেয়ে রুগীটাতো বাঁচল, কিন্তু আমি অসুস্থ হয়ে গেলাম। নাসরিংহুম থেকে বেরুবার পরে ছেলে যখন দেখল, বাবা আর আগের মতো নেই, তখন এখানেই ফেলে দিয়ে গেছে।"
বুড়োর উপরে তমোঘ্নর মায়া হল। বলল, "ইস কী নিষ্ঠুর! প্রয়োজন মিটতেই নিজের বাবাকে ফেলে দিয়ে যেতেও দ্বিধা করলনা।"
বুড়ো বলল, "ওদের আর দোষ কী বাবু? দোষ তো সেই ডাক্তারের যে ওদের লাখ লাখ টাকার টোপ দিয়েছিল। এত টাকা পেলে কারই বা মাথার ঠিক থাকে? ওদেরও ছিলনা।"
তমোঘ্ন মাথা গরম হয়ে গেল। ডাক্তার কর্তব্য সেবা করা, ব্যবসা করা নয়। বলল, "সেই ডাক্তারটা কে? কি নাম তার? তার নার্সিংহোম টারই বা কি নাম?"
বুড়ো বলল, "নাসরিংহুমের নাম তো জানিনে বাবু, তবে ডাক্তারটার নাম শুনেছি,বিনোদ সরকার না কী যেন নাম।"
বিনোদ সরকার! নামটা শুনেই তমোঘ্ন চমকে উঠল। এতদিন এই লোকটাকেই ভগবান ভেবে এসেছে, আজ তার নিষ্ঠুরতা মুখটাও ওর কাছে উন্মুক্ত হয়ে গেল। কিন্তু যে লোকটা ওর এতবড় উপকার করেছে, তাকে তো আর দোষ দেওয়া যায়না, তাই কথা ঘোরাতে বলল, "তা এরকম ঝোঁপ জঙ্গলের মাঝে আপনি এখনো পড়ে আছেন কেন? অন্য কোথাও যেতে পারেন তো?"
বুড়ো বলল, "কোথায় যাব বাবু? মরা লোককে কে আর আশ্রয় দেবে?"
তমোঘ্ন ভ্যাবাচ্যাকা খেল, " মা..মানে?"
বুড়ো খ্যাঁকখ্যাঁকে গলায় বলে উঠলো"বিশ দিন আগে আমার রক্ত নিতে গিয়ে বিনোদ সরকার আমাকে মেরে ফেলেছে। মরার পর থেকে এটাই আমার আস্তানা। মরতে তো একদিন হতই, সে জন্য আমার দুঃখ নেই, দুঃখ একটাই মরার পর থেকেই আমি আমার পা দুটোকে আর কোথাও খুঁজে পাচ্ছিনা। ওদের এত করে ডাকছি তবু আমার কাছে আসছেনা,কোথায় যে গেল?"
বলে গায়ের চাদরটা সরাল বুড়ো। ওর দিকে তাকিয়ে তমোঘ্নর চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইল। বুড়োর গলার নিচ থেকে বাকি শরীরটা একটা আস্ত নরকঙ্কাল। বুড়োর পায়ের দিকে চোখ পড়তেই ওর বুকের ভিতরে একটা শিহরন খেলে গেল। বুড়োর হাঁটুর নিচে যেখানে পা দুটো থাকার কথা ছিল, সেখানটায় ব্যান্ডেজ বাঁধা। কেউ যেন সযত্নে অপারেশন করে ওর দুটো পা কেটে নিয়ে সেখানে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছে। এক মুহূর্তে সব রহস্য ওর কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। ভয় আর আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে পিছন ফিরে আপ্রাণ ছুটতে শুরু করল তমোঘ্ন।
ছুটতে ছুটতেই সে শুনতে পেল পিছন থেকে বুড়োটা বলে যাচ্ছে,
"বাবু শুনে যান,ও বাবু শুনুন না, আমার পা দুটো কোথায় একটু বলে দিয়ে যাননা..."।।
(সমাপ্ত)
©All rights reserved to sankha subhra nayak

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন