বৃহস্পতিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১৯

হিমের ঘর

হিমের ঘর

শঙখ শুভ্র নায়ক



রাত এগারোটা বাজে। ডিনার সেরে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়ে ছিল আকাশ। মৃদুমন্দ হাওয়া বইছে। চাঁদ মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়েছে। সামনের গাছগুলো থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁর স্বর। বহুদূরে দপদপ করে জ্বলছে একখানা ল্যাম্পপোষ্ট। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের অনিশ্চিত চিন্তায় মগ্ন ছিল আকাশ। মনের মধ্যে দোলাচল চলছিল। হঠাৎ সমস্ত নীরবতাকে ছিন্ন করে ওর ফোনটা ঝনঝন করে বেজে উঠল। মোবাইল স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে দেখল একটা আননোন নাম্বার ফুটে উঠেছে। নাম্বারটা দেখে কোনো আত্মীয় পরিজনের নাম্বার বলেও মনে হচ্ছে না। একটু বিরক্তভাবেই ফোনটা ধরল আকাশ। ঝাঁঝাঁলো গলায় বলল, "হ্যালো, কে বলছেন?"
ওপাশ থেকে একটা মেয়ের মিষ্টি স্বর ভেসে এল, "হ্যালো রাজু, আমি পায়েল বলছি।"
উফ! বিরক্তিকর। এই দুশ্চিন্তার সময়ে এইসব উটকো কল মোটেই ভাল লাগেনা আকাশের। তাই "রং নাম্বার" বলেই সে ফোনটা কেটে দিল, অপর পক্ষকে আর কিছু বলার সুযোগ দিল না।

এম এস পাস করে একবছর হাউস স্টাফ, তারপর রুরাল বন্ডে একটা হাস্পাতালে জয়েন করতে চলেছে আকাশ, হরিনারায়নপুর নামে একটা গ্রাম। আকাশের আদি বাড়ি উত্তর কলকাতায়, সেখানেই ওর জন্ম থেকে বড় হয়ে ওঠা। রাতের ঘন অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নানা চিন্তা আকাশের মাথায় আসছিল। কেমন হবে হরিনারায়নপুর জায়গাটা? ওখানের মানুষরাই বা কেমন হবে? যদিও তিনটে বছর কাটিয়েই সে ফিরে আসবে নিজের শহরে। এখানে সুযোগ সুবিধা, যশ, খ্যাতি সবকিছুই অনেক বেশি। প্রাইভেট প্র‍্যাকটিসের স্কোপটাও বেশি। তাছাড়া প্রাইভেট নার্সিংহোম বা সরকারি হাস্পাতাল তো আছেই। কিন্তু এই তিনটে বছর গ্রামের পরিবেশের সাথে নিজেকে অ্যাডজাস্ট করতে পারবে তো! এইসবই চিন্তাভাবনায় ওর মেজাজটা একটু চুলকে ছিল, সেই অবস্থায় এই কল। একটু রুড ব্যাবহারই করে বসল সে, নাহলে হয়তো একটু ভদ্রভাবে কথা বলত।
ছাব্বিশ সাতাশের মতো বয়স হলেও আকাশ এখনও সিঙ্গেল। এতদিন বইয়ের পাতায় মুখগুঁজে পড়ে থাকা আকাশের জীবনে প্রেম আসেনি। দু'একজন যে প্রপোজ করেনি তা নয়, তবে কেউই ওর মনের মধ্যে সেভাবে জায়গা করে নিতে পারেনি। তবে আজকাল মাঝে মাঝে আকাশের মনে হয় একটা রিলেশন হলে মন্দ হত না। এইসব ভাবতে ভাবতে সে বেড রুমে এসে ঢুকল। বিছানা পেতে যখন সে ঠিক শুয়ে পড়ার উপক্রম করছে তখনই দ্বিতীয় বার সেম নাম্বার থেকে কলটা এল। এবারে সে আর ততটা বিরক্তি দেখাল না। ফোনটা ধরে ভদ্রভাবে বলল, "হ্যালো বলুন।"
মেয়েটা বলল, "সরি, আপনাকে আবার বিরক্ত করলাম, কিছু মনে করলেন না তো?"
মেয়েটার গলার স্বর ভীষণ মিষ্টি। আকাশের মনে হল ফোনের ওপারে যেন সেতার বাজছে। ওর মনের সব বিরক্তি এক নিমিষে উধাও হয়ে গেল। বলল, "আরে না না। বরং আমারই সরি বলা উচিৎ, আপনার সঙ্গে ওইরকম ব্যবহার করলাম তখন।"
মেয়েটা হাসল। বলল, "কি যে বলেন আপনি? ডিস্টার্ব করলাম আমি আর ক্ষমা চাইবেন আপনি?" একটু থেমে বলল, "যাইহোক, ভুল করে ফোনটা যখন লেগেই গেল, তখন আপনার সঙ্গে আলাপ হতে পারে কি?"
আকাশ বুঝল মেয়েটা ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাইছে। অন্য সময় হলে সে বিশেষ পাত্তা দিতনা, কিন্তু আজকে মেয়েটার সঙ্গে কথা বলার একটা ইচ্ছে যেন ওকে পেয়ে বসল। বলল, "নিশ্চয়ই পারেন।"
মেয়েটা বলল, "আমার নাম পায়েল, পায়েল বোস, আপনি?"
আকাশ বলল, "আমার নাম আকাশ রয়।"
পায়েল খুব মিষ্টি গলায় বলল, "আচ্ছা, গলা শুনে আপনার বয়স খুব বেশি বলে মনে হচ্ছে না। আপনি ব্যাচেলার নাকি ম্যারেড?"
প্রশ্নটা শুনে মুচকি হাসল আকাশ। ওর মনের ভিতরে কয়েকটা ডলফিন যেন অজান্তেই নেচে উঠল। বলল, "না, আমি ব্যাচেলার। এই সদ্য চাকরিতে জয়েন করতে চলেছি। সেটেল হলে বিয়ে করার ডিসিশন রয়েছে।"
অবাক হওয়া গলায় পায়েল বলল, "ও আচ্ছা, দারুণ ব্যাপার তো! কিসের চাকরি জানতে পারি কি?"
আকাশ বলল, "কিছুদিনের মধ্যেই একটা হাস্পাতালে ডাক্তার হিসাবে জয়েন করতে চলেছি।"
এমনই কিছু শোনার প্রতীক্ষাতেই যেন ছিল পায়েল। বিস্মিতভাবে বলল, "ওয়াও! আই রেসপেক্ট দি ডক্টরস ভেরি মাচ।"
আকাশ বলল, "আপনি কি করেন? পড়াশুনা?"
পায়েল বলল, "পড়াশুনা কমপ্লিট করে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করছি। একা মানুষ। নিজের খরচটুকু ভালোভাবে চলে যায়।"
এই একটা কথাতেই আকাশের মনের ভিতরে মেয়েটা যেন অনেকটা জায়গা করে নিল। আকাশ বলল, "কোনো মেয়ে স্বাবলম্বী হয়ে নিজের জীবন কাটাচ্ছে এটা শুনলে আমার খুব ভাল লাগে।"
পায়েল হাসল। বলল, "ওই আর কি, যার কেউ নেই, তার ঈশ্বর আছেন।"
পায়েলের সঙ্গে আকাশের পরিচয়ের প্রাথমিক পর্বটা অনেকটা এরকমই ছিল। সেদিন ফোন রাখার আগে পায়েল বলেছিল, "আমি যদি আপনাকে মাঝেমাঝে ফোন করি, আপনার অসুবিধে হবে না তো?"
আকাশ বলল, "আমি যতদিন না পর্যন্ত ডিউটিতে জয়েন করছি, ততদিন পর্যন্ত ফ্রি আছি। ফোন করতে পারেন। আমারও কিছুটা টাইম কাটবে।"
পায়েল বলেছিল, "আচ্ছা। তাই হোক। এই টাইমেই করব। আমি এই টাইমটা ফাঁকা থাকি। নাহলে সারাদিনই ব্যস্ত থাকতে হয়। বুঝতেই পারছেন প্রাইভেট সেক্টরে চাকরি, ভীষণ চাপ থাকে।"
আকাশ বলল, "আচ্ছা, তাই হোক।"

ফোন কেটে দিল পায়েল। এরপর থেকে রাত ঠিক এগারোটা বাজলেই আকাশের কাছে পায়েলের ফোন আসে। দিনের বেলায় নাম্বারটাতে দু'একবার ট্রাই করে দেখেছে আকাশ। ফোন সুইচ অফ বলেছে। এই নিয়ে আকাশ অবশ্য কোনো প্রশ্ন করেনি। কারণ দিনের বেলা অফিসে থাকলে ওর ফোন সুইচ অফ থাকে, এটা পায়েল আগেই বলে দিয়েছিল।

সেদিনের সেই প্রাথমিক পরিচয় কয়েকদিনের মধ্যে সিঁড়ি বেয়ে ক্রমশ গভীর হতে শুরু করেছে। এই ক'দিনে পায়েলের ব্যাপারে অনেক কিছুই জেনেছে আকাশ। পায়েলের বাবা মা কেউই নেই, একটা অনাথ আশ্রমে মানুষ। নিজের চেষ্টায় একা হাতে লড়াই করতে করতে সে আজ নিজের মাটিটাকে শক্ত করতে পেরেছে। অনেক কু প্রস্তাব এসেছে জীবনে, সেসব অগ্রাহ্য করে সে ভদ্রভাবে সমাজে বাঁচতে চেয়েছে। শুনতে শুনতে আকাশের কেমন যেন মায়া পড়ে গেছে পায়েলের উপরে। সেদিন রাতে পায়েল ফোন করতেই আকাশ জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, তুমি কোথায় থাকো জানতে পারি কি? এতদিন কথা হচ্ছে কিন্তু এটা তুমি আমাকে কখনোই বলনি।"
পায়েল হাসল। বলল, "তুমিও তো বলোনি। আগে তুমি বলো, তুমি কোথায় থাকো?"
রেগুলার কথা হলেও আকাশ এক্ষুণি নিজের বাড়ির ঠিকানাটা ওকে জানাতে চাইল না। তাই একটু কাব্য করে বলল, "সূর্যের আলো আর চাঁদের জ্যোৎস্না ভরা ঘরে মা বাবার সাথে থাকি। এবার বল, তুমি?"
পায়েলও পালটা হেঁয়ালি করেই বলল, "আমি তো ঠাণ্ডা ঘরের বাসিন্দা, সূর্যের আলো আমায় ছুঁতে পারেনা। আমার বন্ধুদের সাথে থাকি।"
আকাশ হাসল। ব্যঙ্গের সুরে বলল, "তুমি আন্টার্টিকায় থাক নাকি?"
পায়েল বলল, "হতেও পারে।"
হাসতে হাসতে আকাশ বলল, "তাহলে আমরা তো দুই মেরুর বাসিন্দা।"
গুনগুন করে পায়েল গান ধরল, "না চাহিলে যারে পাওয়া যায়, তেয়াগিলে আসে হাতে..."

তারপরে আরো কয়েকটা দিন কেটে গেছে। ওর হাস্পাতালে জয়েনিং এর তারিখ ক্রমশ এগিয়ে এসেছে। সেদিন রাতে ওর মনটা খুব আনচান করছিল। সবাইকে ছেড়ে যেতে হবে একথা ভাবলেই মনটা কেমন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। সেদিন পায়েল ফোন করতেই, আর থাকতে না পেরে পায়েলকে বলে বসল, "এতদিন তো কথা হচ্ছে, প্রায় দু'মাস। অথচ আমি আজ পর্যন্ত তোমাকে দেখিনি। আমি তোমার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই।"
আকাশ জানত সে হতাশ হবে, আর হলও তাই। পায়েল বলল, "এক্ষুণি দেখা করতে পারবনা গো। আমি নিরুপায়। তবে তুমি তো ডাক্তার, দেখবে একদিন না একদিন ঠিক দেখা হয়ে যাবে।"
আকাশ বলল, "কেন, ডাক্তার হলেই কিভাবে দেখা হবে শুনি?"
পায়েল বলল, "ডাক্তারের কাছে তো রুগিকে আসতেই হয়, তাই আমাকেও একদিন তোমার কাছে আসতে হবে।"
আকাশ একটু থমকে গেল। বলল, "তোমার কি কোনো অসুখ আছে?"
একটু থেমে পায়েল বলল, "হ্যাঁ, খুব বড়ো অসুখ। এই অসুখ আর কখনোই সারবে না।"
পায়েলের অসুখটা কি জিজ্ঞেস করার সাহস হল না আকাশের। এত সুন্দর একটা মিষ্টি মেয়ে সে কীনা শরীরে এমন একটা রোগ পুষে রেখেছে, যা কখনো সারবেনা, এটা ভেবেই ওর মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। সে জানে সব অসুখ সারানোর পদ্ধতি মেডিকেল সায়েন্সেরও জানা নেই। তবু সান্ত্বনা দিয়ে বলল, "তুমি এত ভেঙ্গে পড়ো না, তোমার অসুখ আমি ঠিক সারিয়ে তুলব।"
হালকা হেসে পায়েল বলল, "আচ্ছা, তুমি হাস্পাতালে জয়েন করো, তারপর আমি তোমার সঙ্গে দেখা করব।"
আকাশ বলল, "প্রমিশ?"
পায়েল বলল, "একদম পাক্কা প্রমিশ।"

ফোন কাটার পরে খানিকক্ষণ স্তম্ভিতভাবে বসে রইল আকাশ। যাকে সে ভালবেসে মনের মধ্যে জায়গা দিয়েছিল, তার এরকম একটা অসুখ আছে সেটা সে জানতই না। পায়েলকে হারিয়ে ফেলতে হবে ভাবলেই ওর বুকের ভিতরে কতকটা হাওয়া এসে ঢুকে পড়ছিল।

আজ দু'দিন হল নতুন হাস্পাতালে শিফটিং হয়ে এসেছে আকাশ। হাস্পাতালটা যতটা খারাপ হবে সে ভেবেছিল, ঠিক ততটাও নয়, বরং বেশ ভালই বলা যায়। ওটি, মর্গ সবই রয়েছে হাস্পাতালে, কেবল ডাক্তারেরই অভাব। সেই একমাত্র ডাক্তার, আর আছে একজন নার্স ও একজন স্টাফ।

কোয়াটারে গোছগাছ করতে করতেই প্রথম দিনটা কেটে গেল। দ্বিতীয় দিন থেকে পুরোদমে কাজে লেগে পড়ল আকাশ। প্রথমে গোটা হাস্পাতালটাকে ঘুরে ঘুরে দেখল, তারপর হাস্পাতালে স্টাফ রঘুকে নিয়ে মর্গে গেল। মর্গের একপাশে রয়েছে ফ্রিজিং বক্স। বেওয়ারিশ লাশগুলো ওখানেই রাখা থাকে। কয়েকদিন হল একটা খবর হামেশাই চোখে পড়ছে আকাশের। এইসব গ্রামাঞ্চলের হাস্পাতাল থেকে লাশ পাচার আজকাল একটা বড়ো ব্যাবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে, এখানেও সেরকম কিছু হচ্ছে কীনা জানার জন্য রেজিস্টার দেখে ফ্রিজারে রাখা লাশের সংখ্যা সে মিলিয়ে নিতে চাইছিল। কারণ এরপরে কিছু ঘটলে, তার সমস্ত দায় এসে পড়বে আকাশের কাঁধে, আর এইসব ঝুট ঝামেলা সে মোটেই চায় না। কিন্তু রঘুকে এইসব বুঝতে দেয়া যাবেনা, তাই ওর দিকে তাকিয়ে মজার ভঙ্গীতে বলল, "যাও, রেজিস্টারটা নিয়ে এসো। কেস হিস্ট্রি দেখে এই লাশগুলোর সঙ্গে পরিচয় করা যাক।"

রঘু রেজিস্টার নিয়ে ফিরে আসতেই একের পর এক ফ্রিজারের বক্সগুলোকে টেনে টেনে খুলতে লাগল আকাশ। রেজিস্টার আর ছবি দেখে রঘু লাশগুলোর নাম আর কেস হিস্ট্রি বলে দিতে লাগত। গোটা চারেক বক্স খোলার পরে সে যখন পঞ্চম বক্সটাতে এসে পৌঁছেছে তখন রঘু বলল, "এই কেসটা খুবই মর্মান্তিক। আমাদের হাস্পাতালের তো একজন মাত্র ডাক্তার, আপনার আগের ডাক্তারবাবু সেদিন ছুটিতে ছিলেন, আর এই কারণেই বিনা চিকিৎসায় একে মরতে হয়। ওকে অন্য হাস্পাতালে ট্রান্সফার করার মতোও কেউ ছিলনা সেদিন।"

আক্ষেপে মাথা নেড়ে বক্সটা খুলে ফেলল আকাশ। বক্সের ভিতরে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রয়েছে একটা মেয়ে। কি জীবন্ত আর নিষ্পাপ লাগছে মেয়েটার মুখখানা। রঘু বলল, "এই মেয়েটার নাম পায়েল বসু। আমাদের পাশের পাড়াতেই থাকত। একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করত। মাস চারেক আগে রাত এগারোটার দিকে হঠাৎ প্রচন্ড টাইফয়েড নিয়ে হাস্পাতালে ভর্তি হয়। হাস্পাতালে আসার পরেও অনেকক্ষণ বেঁচে ছিল মেয়েটা। আমি স্যারদের সাথে থাকতে থাকতে যেটুকু শিখেছিলাম, সেই বিদ্যে থেকেই দুই একটা ওষুধ দিয়েছিলাম, কিন্তু বাঁচাতে পারিনি, বলতে গেলে বিনা চিকিৎসায় মেয়েটা মারা যায়। অনাথ মেয়ে বলে ওর লাশটাকে নিয়ে যাওয়ার লোকও পাওয়া যায়নি, সে থেকে এখানেই রাখা আছে।"
আকাশের ভ্রূ কুঁচকে গেল। নামটা বার দুই মনে উচ্চারণ করল, এই পায়েল সেই পায়েল নয়তো! না, তা কিভাবে হয়! যার সঙ্গে তার রোজ কথা হয় সে কিভাবে মৃত হতে পারে? বলল, "সত্যিই একটা দারুণ কো-ইন্সিডেন্স। আমারও এখানে আসার বেশ কিছুদিন আগেই একজনের সাথে পরিচয় হয়েছে, আর তার নামও পায়েল, সেও প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে, আর সেও অনাথ।"
রঘু বলল, "তাই? তার বাড়ি কোথায়?"
রঘুর প্রশ্নটা শুনেই হঠাৎ বিদ্যুৎ ঝলকের মতো একটা কথা মনে পড়ে গেল আকাশের, ওর সারা শরীরটা কাঁটা দিয়ে উঠল। পায়েল বলেছিল, ও খুব ঠান্ডা একটা ঘরে ওর বন্ধুদের সাথে থাকে, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না।
এই ফ্রিজারের ভিতরটাও তো খুব ঠান্ডা। এখানেও সূর্যের আলো পৌঁছায়না। তাছাড়া এখানেও তো পায়েলের মতো আরো অনেকেই আছে!
তাড়াহুড়ো করে রঘুকে বলল, "আচ্ছা, পায়েলের কোনো মোবাইল নম্বর তোমার কাছে আছে?"
রঘু বলল, "হ্যাঁ, রেকর্ডে আছে, হাস্পাতালে ভর্তি হওয়ার পরে কেউ ওর ফোনটা হাস্পাতালে জমা দেয় তখনই নাম্বারটা রেকর্ড করা হয়।"
নিজের ফোনটাকে বার করে নাম্বারটা বলে আকাশ জানতে চাইল, "এই নাম্বারটা নয়তো?"
রঘু ফাইল থেকে চেক করে ভ্রূ কুঁচকে বলল, "হ্যাঁ, এই নাম্বারটাই তো, কিন্তু নাম্বারটা আপনি কিভাবে পেলেন? ওর ফোন তো আজ বহুকাল ধরে আমাদের স্টোর রুমে সুইচ অফ হয়ে পড়ে আছে।"
আকাশের হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, কপালে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। রঘুর কথার কোনো উত্তর না দিয়ে ফ্রিজারের বাক্সটাকে ভিতরের দিকে ঠেলে বন্ধ করে দিল ও। পিছন ফিরতেই শুনতে পেল কে যেন ওর কানে কানে ফিসফিস করে বলছে, "বলেছিলাম না, তুমি হাস্পাতালে জয়েন করো, তারপর আমি তোমার সঙ্গে দেখা করব। আমি কিন্তু কথা রেখেছি আকাশ।"
আকাশের বুকের ভিতরটা মুচড়ে উঠল। কি যেন বলার চেষ্টা করল সে। পারল না। রঘু বলল, "গ্রামের হাস্পাতাল বলে এখানে কেউ এলেও দু'তিন বছরের বেশি থাকতে চায়না। চলে গেলে হাস্পাতাল আবার ডাক্তারশূন্য হয়ে যায়। আমাদের মতো মানুষগুলোর জীবনের তো কোনো দাম নেই স্যার, তাই আমাদের বিনা চিকিৎসায় মরতে হয়।"
আকাশের চোখের কোণায় একবিন্দু জলের রেখা দেখা দিয়েছে। নিজের প্রিয়জনের বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ার দুঃখ আজ বুঝেছে আকাশ, পায়েল ওকে বুঝিয়ে দিয়েছে সেই কষ্ট। মনে মনে ভাবল, পায়েলের এই চেষ্টাকে নিজের স্বার্থের জন্য, সুখের জন্য বৃথা হয়ে যেতে দেবে না সে। রঘুর দিকে তাকিয়ে আশ্বাসের সুরে বলল, "আমি থাকব রঘু। যতদিন না পর্যন্ত আমার ট্রান্সফার হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত আমি থাকব। আর তারপরেও এই গ্রামের কাছাকাছিই কোনো একটা হাস্পাতালে চাকরি নিয়ে এখানেই প্র‍্যাকটিস শুরু করব, আর কোনো পেসেন্টকে আমি বিনা চিকিৎসায় মরতে দেব না।"

(সমাপ্ত)

©All rights reserved to sankha subhra nayak

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন