পরিত্রাতা
শঙখ শুভ্র নায়ক
মরার আগে হাতে একটা কৌটো দিয়ে বাবা বলেছিলেন, "যদি কোনো দিন জীবন মরন সমস্যা আসে তবেই এটা খুলিস, অন্যথায় এটা খুলিসনি মা, এই কৌটো খুললে মৃত্যু আসবে।"
সত্তর বছরের বৃদ্ধা বিজয়ার জীবনে আজ সম্বল বলতে ওটুকুই। সান্যাল বংশের একমাত্র প্রদীপ বিজয়া সান্যাল আজীবন কুমারী থেকে গেলেন এই বিশাল সম্পত্তি সামলাবার জন্য। বর্তমানে যার বাজার দর প্রায় দুকোটি টাকা। শহরের বুকে এরকম বনেদি বাড়ি খুব কমই আছে, আগে যেটুকু ছিল তাউ প্রোমোটারের দখলে। তার বাড়ির দিকেও যে প্রোমোটাররা হাত বাড়ায়নি তা নয় অনেক লোভনীয় অফার এসেছে, সে সব তিনি সযত্নে অগ্রাহ্য করেছেন। বছর পাঁচেক আগে বাড়িতে একটা চুরির চেষ্টা হবার পরে দূঃসম্পর্কের এক ভাইপো রনিত কে নিজের বাড়িতে এনে রেখেছিলেন বিজয়া, কিন্তু কয়েকদিন আগে সেও বেগড়বাঁই করতে শুরু করল। এক হিন্দুস্থানী ভদ্রলোক কে বাড়িতে এনে ঢোকাল। ভদ্রলোক বললেন, "দেখুন মাসিমা, এই জমি বাড়ির বর্তমান যা বাজার দর তাতে আপনাকে আমি দেড় কোটি দেব, সঙ্গে একখানা ফ্ল্যাট। আপনার মতো একা মানুষের থাকার জন্য আর কী চাই?"
ঠাণ্ডা গলায় বিজয়া বলেছিলেন, "আপনার আগেও অনেক প্রোমোটার এসেছে, আমি সবাইকেই বিদায় দিয়েছি, আপনাকেও বিদায় নিতে হবে। এই জমি আমি কাউকে বেচবনা।"
ভদ্রলোক বলেছিলেন, "আপনি মরার পরে এই জমি তো সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবেন না, তখন বারো ভুতে খাবে, তার চেয়ে বরং এখনি কিছু একটা ব্যবস্থা করুন।"
বিজয়া বলেছিলেন, "ব্যবস্থা আমি করে নিয়েছি। আমার মৃত্যুর পরে আমার সমস্ত সম্পত্তি বৃদ্ধাশ্রমের নামে যাবে আর আমার ভাইপো এত দিন আমার দেখাশুনা করার জন্য প্রতিমাসে পাঁচ হাজার টাকা করে মাসোহারা পাবে।"
নাক কুঁচকে রনিত বলেছিল, "মাত্র পাঁচ হাজার? এই বাজারে পাঁচ হাজার টাকায় কি হয়?"
বিজয়া বলেছিলেন, "এই দিচ্ছি এই নিয়েই খুশি থাকো। তার বেশি চাইতে এসোনা, তাতে পোশায় থাকো, না পোশায় বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে পারো।"
হা হা করে হেসে হিন্দুস্থানী ভদ্রলোক বলেছিলেন, "আমার নামও রামলাল। আমি দেখে নেব আপনি কিভাবে এই সম্পত্তি রাখতে পারেন?"
বিজয়া বলেছিলেন, "আপনি কি আমায় হুমকি দিচ্ছেন?"
ভদ্রলোক বলেছিলেন, "তাই ধরে নিন না। এলাম। ভাল থাকবেন। নমষ্কার।"
ভদ্রলোক চলে গিয়েছিলেন। রনিত বেশ কয়েক বার এই ঘর বাড়ি বেচে দেবার জন্য কাকুতি মিনতি করেছিল, কিন্তু উনি শোনেন নি। অবশেষে যেদিন রনিত রেগে গিয়ে ওনার গায়ে হাত তুলল সেদিন ওকে বাড়ির দরজা দেখিয়ে দিতে দেরি করেননি বিজয়া। কিন্তু তারপর থেকেই প্রতিটা মুহূর্ত তাঁর ভয়ে ভয়ে কাটছে। বিজয়া শুনেছেন রনিত নাকি ইদানিং রামলালের ঠেকে যাতায়াত করতে শুরু করেছে। গুজব শোনা যাচ্ছে সম্পত্তির লোভে পিসিমাকে খুন করতেও সে পিছপা নয়। একদিন থানাতেও গিয়েছিলেন বিজয়া। কমপ্লেন নেওয়া তো দূরে থাক ওসি ভদ্রলোক ঘুরে ওনাকে পরামর্শ দিলেন, "এখন দান ধ্যান করে কি এমন পূন্য হয়, তারচেয়ে রামলালের প্রস্তাব মেনে সম্পত্তিটা বেচে দিন।"
রাগে গা রি রি করে উঠেছিল বিজয়ার। কিন্তু তিনি একরোখা মানুষ। সিদ্ধান্ত যখন নিয়েছেন সম্পত্তি বেচবেন না, তো বেচবেন না।
বিছানায় শুয়ে নিজেকে খুব হতাস লাগছিল বিজয়ার। আজকের রাতটা তিনি পার করতে পারবেন এই বিশ্বাস তার হচ্ছিলনা। বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে রামলাল আবার তার পথ আটকেছিল, ওর সঙ্গে আরো জন দশবারো লোক ছিল। তার কাছ থেকে একই উত্তর পেয়ে হুমকি দিয়েছে, "রাত্রে দেখা হবে মাসিমা, তখন দেখব কিভাবে আটকান।"
তিনি একা মানুষ। এত গুলো লোকের সঙ্গে পেরে ওঠা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। না, আর বোধহয় সম্পত্তিটা আগলে রাখা গেলনা।
আকাশ মেঘলা। বাইরে টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বাইরে রামলালের গলার আওয়াজ শুনতে পেলেন বিজয়া, "মাসিমা দরজা খুলুন, আমরা এসেছি।"
জানালার পাল্লা অল্প একটু ফাঁক করতে দেখতে পেলেন বারো তেরো জন লোক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। বিজয়ার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। অনেকক্ষন হাঁকা-ডাকি করে সাড়া না পেয়ে ওরা কুঠার দিয়ে দরজা কাটতে আরম্ভ করেছে। না, আজই বোধহয় ওনার শেষ দিন। এরকম জীবন মরন সমস্যায় বোধহয় আর কখনোই তাঁকে পড়তে হয়নি। ঠিক তখনই মনেপড়ল বাবার দেওয়া সেই কৌটোটার কথা। বাবা বলেছিলেন, জীবন মরন সমস্যা না এলে এই কৌটো খুলবিনা, কারন কৌটো খুললেই মৃত্যু আসবে। কি আছে ওই কৌটোর মধ্যে। বিষ নাকি? বাইরের লোকের হাতে যাতে ওনাকে মরতে না হয় তাই কি বাবা ওর জন্য বিষ রেখে গিয়েছিলেন? আজই ওই কৌটো খোলার উপযুক্ত সময়। চাবি দিয়ে ধীরে সুস্থে সিন্দুকের তালা খুললেন বিজয়া। খাঁজকেটে নক্সাকরা কৌটোটা বার করলেন। কৌটোটার মুখ খুলতে তাঁকে বেশ কষ্ট করতে হল, কিন্তু খুলেই হতাস হলেন। না, ভিতরে কিচ্ছু নেই। শুধু হুস করে খানিকটা ধোঁয়া ভিতর থেকে বেরিয়ে এল। রামলালের লোকেরা দরজার অনেকটাই কেটে ফেলেছে, গলগল করে গিয়ে ধোঁয়াটা সেই ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে গেল। অনেকরাত পর্যন্ত বিছানার উপরে বসে রইলেন বিজয়া। অনেকক্ষন রামলালদের কথাবার্তার কোনো শব্দ শুনতে পাননি। অনুমান করলেন হয়তো দরজা কাটতে না পেরে হতাস হয়ে ওরা ফিরে গেছে। এগুলো বহুকালের পুরানো দরজা, কাটা এত সহজ ব্যাপার না। শেষ রাতে হালকা করে ঘুমটা ধরে এসেছিল সকালে পাখির ডাকে সেটা ভেঙ্গে গেল। বিছানা ছেড়ে উঠে চা বানালেন বিজয়া, এখনও আতঙ্কে তার হাত পা কাঁপছে। মনটাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখার জন্য টিভি চালালেন। খবরে চ্যানেলে ঘোরাতেই ব্রেকিং নিউজটাতে যা দেখলেন তাতে তার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল।
"কাল রাতে হাইওয়ের পাশে একটা গর্ত থেকে তেরো খানা লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। বডি গুলির হাড়গোড় গুলো এমন ভাবে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে যে দেখে মনেহচ্ছে ওদের পাশাপাশি শুইয়ে রেখে ওদের বডির উপর দিয়ে বুলডোজার চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। খুনের কারন অজানা। দু'খানা লাশকে চিহ্নিত করা গেছে, একটি প্রোমোটার রামলালের এবং অপরটি রনিত নামে একটি ছেলের বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে..."
চোখ বুঝলেন বৃদ্ধা বিজয়া। বাবা ঠিকই বলেছিলেন, "কৌটো খুললে মৃত্যু আসবে..."
(সমাপ্ত)
©All right reserved to sankha subhra nayak

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন