বৃহস্পতিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১৯

মিউজিয়াম

মিউজিয়াম 

শঙখ শুভ্র নায়ক




কলেজে ভর্তি হবার পরে ভাড়াবাড়ি খুঁজতে খুঁজতে আমরা গ্রিন পার্কের কাছে একখানা ভাড়া বাড়ির সন্ধান পেলাম। আমরা বলতে আমি আর অভিক। আমরা দু'জনেই গ্রাম থেকে শহরে পড়তে এসেছিলাম। আমাদের আর্থিক অবস্থা যে বিরাট কিছু স্বচ্ছল ছিল তা নয়, তাই কম ভাড়ায় বাড়িটা পেতে প্রায় লুফে নিলাম। শহরের মাঝে এত কম ভাড়ায় এত সুন্দর একটা রুম উইথ কিচেন এন্ড বাথরুম পাব জীবনে ভাবিনি। যে আমাদের বাড়িটার সন্ধান দিয়েছিল সে আমাদের সাবধান করে বলেছিল ওই বাড়িটা কিন্তু কেউ ভাড়া নিতে চায়না, তাই ভাড়া এত কম। অভিক বলেছিল, "কেন, ভুতের উপদ্রব নাকি?"
লোকটা বলেছিল, "বলতে পারবনা, তবে বাড়িটার একটু বদনাম আছে, ওই রুমে থাকা একটি ছেলের অস্বাভাবিক ভাবে মৃত্যু হয়েছিল কীনা।"
আমি বলেছিলাম, "রুমের ভিতরে মরেছিল নাকি?"
লোকটা বলেছিল, "না, রুমের ভিতরে নয়, অন্যকোথাও আমি ঠিক জানিনা।"
হো হো করে হেসে উঠেছিল অভিক। বলেছিল, "আপনার কাজ রুমের সন্ধান দিয়ে কমিশনি নেওয়া, ভয় দেখানো তো নয়?"
লোকটা বলেছিল, "আপনাদের ইচ্ছেহলে থাকুন না, আমি তো আপত্তি করছিনা। আমি শুধু ঘটনা টুকু জানিয়ে দিলাম, যাতে পরে দোষ না দেন।"
অভিক মাথা নেড়েছিল। আমরা মালিকের সঙ্গে কথা বলে কয়েকদিনের মধ্যেই ওই বাড়িটাতে এসে উঠেছিলাম। জায়গাটা বেশ নিরিবিলি। বাড়ির কাছে কিছু গাছপালা রয়েছে, তাছাড়া রয়েছে একটা ছোটখাটো মিউজিয়াম। আমাদের সত্যিই অবাক লেগেছিল, এত দুর্দান্ত একটা প্লেশে কেউ বাড়িটা ভাড়া নেয়না কেন?

বাড়িটাতে এসে ওঠার পরে প্রথম দু'তিন দিন বেশ নিরুপদ্রবেই কেটে গেল। সকাল বেলায় উঠে কলেজ টিউশনি যেতাম সন্ধ্যেতে ফিরে ক্লান্ত থাকতাম, ঘুমিয়ে পড়তাম। বাড়িতে কিচেন রইলেও আমরা জেনারেলি খাবার বানাতাম না, হোটেলেই খেয়ে নিতাম। অভিক বলত, "ভয় পেয়ে যদি রুমটা না নিতাম, তাহলে বেশ ঠকে যেতাম।"

সেদিন রাতে আমরা একটু তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছিলাম। সকালে উঠে আমাদের বাড়ি যাওয়া ছিল। মাঝ রাতে হঠাৎ একটা শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। চোখ খুলে প্রথমে ঘড়ির টিকটিক শব্দ ছাড়া কিছুই শুনতে পেলাম না। পরক্ষণেই মনেহয় শব্দটা আসছে বাড়ির বাইরে থেকে। একটু থেমে থেমে। শুনলে মনেহচ্ছে যেন লোহার বুট পরা পায়ে কেউ হেঁটে চলেছে। অভিক কে ধাক্কা মেরে বললাম,"কান পেতে শোন তো একটু, কিছু শুনতে পাচ্ছিস?"
খানিকক্ষণ চুপ করে শুয়ে থাকার পরে অভিক বলল, "হ্যাঁ, একটা ঠক ঠক শব্দ আসছে।"
বললাম, "কিসের শব্দ হতে পারে বলতো?"
অভিক বলল, "হয়তো মিউজিয়ামের পেন্ডুলাম ঘড়ির শব্দ। আগেকার কাক্কু ক্লক গুলোর শব্দ বেশ বেশি।"
বললাম, "আমাদের বাড়িতে একটা ছিল, বেশ শব্দ হত, তবে এতটা নয়। শুনলে মনেহচ্ছে লোহার বুট পরে কেউ হাঁটছে।"
অভিক বলল, "কে জানে? ছাড়। ঘুমিয়ে পড়। কাল সকালে উঠতে হবে।"
পরদিন সকালে উঠে আমরা বাড়ি চলে গেলাম। দু'তিন দিন নিশ্চিন্তে কাটিয়ে আসার পরে হঠাৎ মনেহল, মিউজিয়ামের এত কাছে থেকেও আমরা একবারও মিউজিয়ামে ঢুকিনি। আজ একবার ঢুকে পড়া যাক। অভিক কে প্রস্তাব টা দিতেই অভিক লুফে নিল। এক রবিবার সময় করে আমরা মিউজিয়ামে বেড়াতে গেলাম। মিউজিয়ামে লোকজনের ভিড় বিশেষ কিছু নেই। আমাদের দেখে দারোয়ান বেশ খুশি হল। জানতে পারলাম দারোয়ানের নাম উনকু লামা। আমাদের দেখে বলল, "তোমরা কি সামনেই থাকো বাবু মশাই?"
বললাম, "হ্যাঁ, ভাড়া বাড়িতে।"
দারোয়ান বলল, "আমি তোমাদের দেখেছি। চলো, মিউজিয়াম টা দেখাই তোমাদের।"
আমরা মাথা নাড়লাম। উনকুর সঙ্গে আমরা ভিতরে গিয়ে ঢুকলাম। মিউজিয়ামে বিশেষ কিছু জিনিস পত্র নেই। হরপ্পা মহেঞ্জোদারো সভ্যতা থেকে আনা বেশ কিছু মাটি-পাথরের বাসন কোসন, মূর্তি রয়েছে। বেশির ভাগটাই ধোলাভিরা, সুরকোটডা থেকে সংগ্রহ করা। বৈদিক সভ্যতার কিছু টুকিটাকি জিনিস রয়েছে। আগেকার কিছু রাজা রাজড়ার শিলমোহর রয়েছে। উল্কার লোহা, আদিম মানুষের মাথার খুলি এসব ছাড়া দেখার মতো কিছু ছিলনা। মিউজিয়ামের পশ্চিম দিকের একটা ঘর দরজা বন্ধ রয়েছে। উনকুর দিকে তাকিয়ে বললাম, "ওই ঘরটা বন্ধ কেন?"
উনকু বলল, "ওই ঘরে দেখার মতো কিছু নেই, কেবল একটা মমি আছে। একবার ওই ঘরে ঢুকে একটা ছেলে হার্ট ফেল করেছিল, সেই থেকে ঘরটা বন্ধ করা আছে। তালাও লাগানো ছিল, কিন্তু সকালে মিউজিয়াম খুলতে এসে দেখি তালাটা ভেঙ্গে নিচে পড়ে আছে।"
বললাম, "চলো, আমরা ওই ঘরে ঢুকব।"
উনকু একটু থমকে গেল। বলল, "ঘরটা ভীষন নোঙরা হয়ে আছে। ওই ঘরে আর কেন ঢুকবেন?"
অভিক বলল, "আমার খুব মমি দেখার শখ, হাতের এত কাছে পেয়েও যদি দেখতে না পাই, তাহলে আক্ষেপ থেকে যাবে।"
অনিচ্ছার সঙ্গেই উনকু বলল, "চলুন তবে।"
আমরা রুমটার ভিতরে ঢুকলাম। অনেকদিনের অব্যবহারের ফলে রুমটা বেশ অপরিষ্কার। মেঝেতে চাপ চাপ ধুলো জমেছে। স্থানে স্থানে মাকড়শারজাল। কেন জানিনা মনেহল এই ঘরে অন্য কেউ ঢোকে। মেঝেতে পায়ের ছাপ দেখলাম যেন। মাকড়শারজালগুলোও কয়েকজায়গায় ছিঁড়ে গেছে। উনকুকে সে কথা বলতেই বলল, "কই নাতো, এত দিন ঘরটা তালা বন্ধ ছিল, সকাল থেকে কেউ ঢোকেনি, চাবি আমার কাছে থাকে। কেউ কিভাবে ঢুকবে ভিতরে?"
বললাম, "যদি গোপন কোনো দরজা থাকে, তুমি হয়তো জানোনা।"
উনকু বলল, "সেরকম কিছু হলে বলতে পারবনা।"
আমরা মমিটার কাছে গেলাম। একটা কাঁচের বাক্সের ভিতরে মমিটা রাখা ছিল। গোটা গায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা। মুখের কাছে ব্যান্ডেজটা খানিকটা ছিঁড়ে গিয়ে দাঁত গুলো বেরিয়ে পড়েছে। দেখে মনেহচ্ছে ইতিহাস যেন আজো ফস করে তার বিষাক্ত নিঃশ্বাস ফেলছে। বাক্সের গায়ে মমিটার বিবরন লেখাছিল, কিন্তু ধুলো জমে বোর্ডটা নষ্ট হয়ে গেছে। উনকু বলল, "এই মমিটার ব্যাপারে আমি কিছুটা জানি। ফ্যারাওদের এক সম্রাট সিয়ান খামেনের মমি এটা। উনি আনুবিষের পূজারি ছিলেন। ওর মৃত্যু নাকি অভিশপ্ত ভাবে হয়েছিল। জেন্থিড নামে এক কাঁকড়ার কামড়ে উনি নাকি শ্বাস রুদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন। এমনিতে কাঁকড়ারা বিশেষ বিষাক্ত নয়, কিন্তু কথায় আছে ওই কাঁকড়া নাকি মানুষকে জোম্বিতে পরিনত করতে পারে।"
হো হো করে হেসে উঠল অভিক। বলল, "কাঁকড়ার মাংস আমার বেশ সুস্বাদুই লাগে।"
আমি বললাম, "আমারও।"
মিউজিয়াম থেকে ফিরে আসার সময় অভিকের দিকে তাকিয়ে বললাম, "গোটা মিউজিয়ামে কিন্তু কোনো দোলক ঘড়ি দেখতে পেলাম না।"
কথাটা শুনে অভিক আমার দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকাল। বলল, "আমার মনে একটা আলাদা সন্দেহ উঁকি দিচ্ছে।"
বললাম, "বল।"
অভিক বলল, "আমার মনেহচ্ছে কেউ ধীরে ধীরে মিউজিয়ামের জিনিস পত্র বাইরে পাচার করে দিচ্ছে। কাজটা ধীরে ধীরে করছে, যাতে লোকের চোখে না পড়ে। আমরা এতদিন ঠক ঠক করে মমির রুমটার তালা ভাঙার শব্দ পেতাম।"
বললাম, "কিন্তু একটা তালা ভাঙতে এত দিন সময় লাগে?"
অভিক বলল, "ওটাই তো আশ্চর্যের।"

সেদিন রাতে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম হঠাৎ মাঝরাতে প্রচন্ড তেষ্টায় আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। শরীরটা ঘামে ভিজে গিয়েছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। মনেহচ্ছে রাতে ঘুমের ঘোরে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখেছি। বিছানা ছেড়ে উঠে আমি লাইট জ্বালালাম। বোতল থেকে কয়েক ঢোক জল খেয়ে অভিকের বিছানার দিকে তাকাতেই আমার বুকের ভিতর টা শিউরে উঠল। অভিক বিছানাতে নেই। বিছানা বেমালুম ফাঁকা। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলাম দরজা হাট করে খোলা। আর বিছানায় থাকতে পারলাম না। রুম থেকে আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম। অন্ধকারে গাছের আড়ালে একটা ছায়া মূর্তিকে বসে থাকতে দেখলাম। বললাম, "এখানে বসে আছিস?"
কথাটা শুনে অভিক চমকে উঠল। তারপর কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, "ওই দ্যাখ।"
অভিকের দৃষ্টি অনুসরণ করে আমি সামনে তাকালাম। এখান থেকে মিউজিয়ামের জানালা গুলো দেখা যায়। মিউজিয়ামের ভিতরে সারারাত লাইট জ্বলে, তবে জানালা গুলো পর্দায় ঢাকা থাকে বলে ভিতরটা দেখা যায়না। একটু ভাল করে তাকাতেই মনেহল, জানালার পর্দার উপরে যেন কারুর ছায়া এসে পড়েছে। মনেহচ্ছে একটা মানুষ যেন মিউজিয়ামের ভিতরে হেঁটে চলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বললাম, "এটাই কি সেই চোর নাকি, যে মিউজিয়াম থেকে মালপত্র সরায়?"
অভিক বলল, "আমার তো তাই মনেহচ্ছে। কাল উনকু কে কথাটা জানাতে হবে।"

পরদিন সকালে আমরা মিউজিয়ামে গেলাম। উনকুকে রাতের ঘটনাটা বলতেই উনকু হেসে উঠল। বলল, "আপনারা কিছু ভুল দেখেছেন বাবু মশাই। এই মিউজিয়ামে কি এমন অমূল্য জিনিস আছে যে চোর ঢুকবে? তাছাড়া গত ছ'মাসে মিউজিয়ামের কোনো জিনিস উলোট পালট হয়নি।"
বললাম, "ঐতিহাসিক জিনিসের মূল্য কি ধাতুর দামে হয়? চোর ঢুকতেই পারে।"
উনকু বলল, "আমি প্রতি সপ্তাহে লিস্ট দেখে সব জিনিস মিলিয়ে দেখি, গত ছ'মাসে কোনো জিনিস খোয়া যায়নি। কেবল..."
কি যেন বলতে গিয়েও থেমে গেল উনকু। বললাম, "কেবল কি?"
উনকু বলল, "ও কিছু না, মমিটা যে বাক্সে বন্ধ করা আছে ওই বাক্সের ডালাটা মাঝেমাঝে খোলা পাই, আর ওই রুমটার ভিতরে পায়ের ছাপ লক্ষ্য করি। হয়তো বাতাসে খুলে যায়, ডালাটা এমন কিছু শক্ত নয়।"

খানিকটা বোকা ভাবেই রুমেই ফিরে এলাম। অভিকের দিকে তাকিয়ে বললাম, "আমাদের অনুমান যে ঠিক নয় তার প্রমান পেলাম। আমার মনেহচ্ছে এটা চুরির কেস নয়, অন্য কিছু।"
অভিক বলল, "অন্যকিছু আর কীই বা হবে। আমার তো মনেহচ্ছে এই ঘটনার সঙ্গে উনকুও জড়িত।"
বললাম, "একটা মানুষ চুরি করতে এলে এত অসাবধান ভাবে লাইট জ্বালিয়ে রুমের ভিতরে হাঁটবেনা, তাউ আবার দিনের পর দিন। কখনো না কখনো লোকের চোখে পড়ে যাবেই।"
অভিক বলল, "আর একটা সম্ভাবনাই আমার মাথায় ঘুরছে। লোকটা সম্ভবত কোনো ভবঘুরে বা পাগল। রাত হলেই মিউজিয়ামের ভিতরে আশ্র‍য় নেয়, সকাল হলেই চলে যায়, তাই ওকে কেউ দেখতে পায়না।"
বললাম, "তাই যদি হয় সে ঢোকে কোন পথ দিয়ে? চাবি তো উনকুর কাছে থাকে।"
অভিক বলল, "মিউজিয়ামে ঢোকার কোনো গোপন রাস্তা নিশ্চই আছে, উনকু জানেনা।"
বললাম, "ছাড় তো মিউজিয়ামে গোয়েন্দা গিরি করে আমাদের কোনো লাভ নেই। আমরা নিজেদের যে কাজ করতে শহরে এসেছি, সেই পড়াশুনাটা ঠিক করে করি।"
অভিক মাথা নাড়ল। বলল, "তা ঠিক। তবে মাঝেমাঝে বেশ কৌতূহল হয়।"

যাইহোক, দেখতে দেখতে সময় কেটে যাচ্ছিল। এরপরে বেশ কিছুদিন আবার পায়ের শব্দ পেয়েছিলাম, কিন্তু একদিন সেটাও থেমে গেল। একদিন অভিক বলল, "গত কয়েকদিন কিন্তু মিউজিয়ামের ভিতরে কাউকে ঘুরতে দেখিনি, আমার মনেহয় যে পাগলটা মিউজিয়ামের ভিতরে ঘুরত সেটা কোথাও চলে গেছে।"
বললাম, "হতে পারে, আমাদের এত মাথা ঘামিয়ে কোনো লাভ নেই।"
অভিক বলল, "চল, কাল সকালে একবার মিউজিয়ামে যাই।"
পরদিন সকালে আমরা মিউজিয়ামে গেলাম। রুমের কাছে বলে মিউজিয়ামে ঘুরতে যাওয়াটা আমাদের কাছে খানিকটা টাইম পাসের মতো হয়ে গিয়েছিল। মিউজিয়ামের ভিতরে ঘুরতে ঘুরতে আমরা মমির রুমটাতেও এলাম। দেখলাম যে বাক্সটাতে মমিটা রাখা থাকে, সেই বাক্সটার বাইরে একটা বিশাল তালা ঝোলানো আছে। উনকুকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, বাক্সের ডালাটা রোজ খুলে যাচ্ছিল বলে সে তালাটা লাগিয়ে দিয়েছে। মমিটার দিকে তাকিয়ে কেন জানিনা আমার ভীষণ মায়া লাগল। মনেহল কে যেন কাঁদতে কাঁদতে আমার কানে কানে ফিসফিস করে বলছে, 'আমি বন্দি আমাকে মুক্ত করো।'

আমরা রুমে ফিরে এলাম। সেদিন রাতে আমার ঠিক করে ঘুম ধরলনা। বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করতে লাগলাম। অভিকের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ওরও ঠিক এক অবস্থা। ভোরের দিকে যাওবা একটু ঘুমটা ধরে আসছিল একটা ভীষণ আর্তনাদের শব্দে সেটাও ভেঙ্গে গেল। আর্তনাদটা আসছে মিউজিয়ামের ভিতর থেকে। একবার দু'বার তিনবার হয়েই আর্তনাদ টা থেমে গেল। ধড়মড় করে বিছানা ছেড়ে আমার কাছে উঠে এল অভিক। বলল, "শুনতে পেলি?"
বললাম, "হ্যাঁ পেয়েছি, কিন্তু কে এই আর্তনাদ করছে?"
ফিসফিস করে অভিক বলল, "আমি জানি কে এই আর্তনাদ করছে। ও আমাকে ডাকছে, ওকে মুক্ত করতে বলছে।"
অভিকের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওর চোখ মুখের অবস্থা কেমন যেন বদলে গিয়েছে। চোখ দুটো লাল টুকটুকে, ভিতর থেকে যেন আগুন ঠিকরে বার হচ্ছে। ওকে ধরে ঝাঁকুনি দিলাম। বললাম, "কে? কে তোকে ডাকছে? তুই কাকে মুক্ত করবি?"
চাপা গলায় অভিক বলল, "সিয়ান খামেন।"
দেখলাম আমার চোখের সামনে দিয়ে ধীরে ধীরে উঠে অভিক বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। দেখে মনেহল যেন কেউ ওকে টানছে, ওকে আকর্ষণ করছে। সম্মোহিতের মতো এগিয়ে চলেছে অভিক। ওকে ধরে আটকাবার চেষ্টা করলাম। বললাম, "যাসনা, অভিক। কেউ তোকে ডাকছেনা, এ তোর মনের ভুল।"
অভিকের গায়ে তখন কি অমানুষিক শক্তি ভর করেছিল জানিনা, আমাকে টানতে টানতে সে এগিয়ে যেতে লাগল। আর বলতে লাগল, "সিয়ান খামেন এখোনো বেঁচে আছে, ওই বাক্সটার ভিতরে সে বন্দি হয়ে আছে, ওর মুক্তি চাই।"
বেশ কিছুক্ষণ ধরে আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে সে মিউজিয়ামটার কাছে পৌঁছে গেল। আমি বার বার ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। বার বার আটকানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না, অমানুষিক শক্তিতে মিউজিয়ামের একটা জানালা ভেঙ্গে অভিক ভিতরে ঢুকে গেল, সঙ্গে সঙ্গে ভিতর থেকে বেরিয়ে এল একঝলক ঠান্ডা বাতাস। আমার মনেহল ওই বিষাক্ত বাতাসে শ্বাস নিয়ে আমি যেন ধীরে ধীরে জ্ঞান হারাচ্ছি।

সকালে জ্ঞান ফিরতেই আমি ছুটে মিউজিয়ামের গেটের কাছে গেলাম। দেখলাম, উনকু দরজা খুলছে। ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, "আমার বন্ধুর ভীষণ বিপদ, প্লিজ তাড়াতাড়ি ভিতরে ঢোক।"
উনকু অবাক হল। বলল, "কি হয়েছে তোমার বন্ধুর?"
বললাম, "এত বলার সময় নেই। এক্ষুনি আমাদের মমি রুমটাতে যেতে হবে।"
উনকুর পিছনে পিছনে দৌড়ে আমি মমি রুমটাতে ঢুকলাম। মমির রুমটাতে ঢুকে যা দেখলাম তাতে আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। দেখলাম, মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে রয়েছে অভিক। মুখটা ফ্যাকাশে। হাঁ করা মুখ থেকে জিভটা বেরিয়ে পড়েছে। চোখ দুটো খোলা। দু'চোখে বিষ্ফারিত দৃষ্টি। দৃষ্টি সোজা মমিটার দিকে। দেখে মনেহচ্ছে যেন ভয়ে আতঙ্কে প্রান হারিয়েছে অভিক। ধীরে ধীরে মুখ তুলে আমি মমিটার দিকে তাকালাম। মমির বাক্সের ডালাটা খোলা। চাবিটা ভেঙ্গে মেঝেতে পড়ে রয়েছে। আর কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম না। কেবল মনেহল ব্যান্ডেজ ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়া দাঁত গুলো যেন একটু বেশিই লালচে।

(সমাপ্ত)

©All rights reserved to sankha subhra nayak

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন