বৃহস্পতিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১৯

মূর্তি

মূর্তি

শঙখ শুভ্র নায়ক



আজ সকালেই জগদীন্দ্রপুরে এসেছে সৌমিতারা। ছোট হলেও পাহাড়ের কোলে একটি মনোমুগ্ধকর স্থান জগদীন্দ্রপুর। প্রকৃতি যেন এখানে তার রূপের ডালি উজাড় করে দিয়েছে। ঝরনা, ভুট্টার ক্ষেত মিলিয়ে এক লাবন্যের আভা যেন ছড়িয়ে রয়েছে চারপাশে। উত্তর প্রদেশ বেড়াতে এসে এখানে না এলে যে সত্যিই একটা দারুণ জায়গা দেখা মিস হয়ে যেত সেটা বুঝতে পারছে সৌমিতা। কাল রাতে ওদের ট্যুর পোগ্রামের অ্যারেঞ্জার প্রোফেসার কেবি বসু, যাকে আড়ালে ছাত্র ছাত্রীরা তাঁর বিশালাকার টাকের জন্য ব্যাঙ্গ করে বলে কতবেল বসু, বলেছিলেন, "এবারে আমরা যাব জগদীন্দ্রপুর। এটা আমাদের ট্যুর প্ল্যানে ছিলনা, আমরা জায়গাটার নামও জানতাম না, কিন্তু কাল রাতেই একটা বন্ধু মারফত জায়গাটার ব্যাপারে জানতে পেরেছি।"
সৌমিতা বলল, "স্যার, ওখানে কি আছে?"
কেবি বসু বললেন, "গান্ধার শিল্পরীতির নাম তো তোমরা সকলেই শুনেছ, কিন্তু তোমরা কি কেউ মেডুসার নাম শুনেছ কি?"
অয়ন বলল, "হ্যাঁ স্যার শুনেছি। গ্রিক মিথোলজি অনুসারে ফরকিস আর সিটোর কন্যা ছিলেন মেডুসা। ওনার মাথায় সাপ থাকে..."
কথা শেষ হওয়ার আগেই কেবি বসু বললেন, "এক্সজাক্টলি। এই মেডুসারই একখানি মন্দির রয়েছে জগদীন্দ্রপুরে। যদিও আর পাঁচটা পল্লব শিল্পরীতির মতো এখানেও ইন্দোগ্রিক প্রভাব রয়েছে। মনেকরা হয় গ্রিক মেডুসা আর ভারতীয় দেবী কালীর সংমিশ্রণে এই মূর্তি তৈরি করা হয়েছিল।"
রিসিকা বলল, "স্যার, জায়গাটাকে ট্যুর প্ল্যান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল কেন?"
কেবি বসু বললেন, "বাদ দেওয়া হয়নি, আসলে জগদীন্দ্রপুর জায়গাটা ট্যুরিস্ট স্পট হিসাবে তেমন জনপ্রিয় নয়, তাই সেভাবে নাম শোনা যায়নি। ওখানে একটা হোটেল ছাড়া থাকার জায়গাও বেশি কিছু নেই। কিন্তু আমি জায়গাটার নাম জানতে পেরেই, জায়গাটাকে আমাদের ট্যুর পোগ্রামে ইনক্লুড করে নিয়েছি।"
রিসিকা মাথা নাড়ল। ছাত্রছাত্রীদের দিকে তাকিয়ে কেবি বসু বলেছিলেন, "যাও, তোমরা সবাই রুমে যাও। কাল সকাল হলেই আমরা বেরিয়ে পড়ব।"

জগদীন্দ্রপুরে ট্যুরিস্ট বেশি আসেনা বলে ওরা হোটেলে সিট পেয়ে গেল। হোটেল থেকে সামান্য দূরেই পাহাড়ের কোল ঘেঁসে মেডুসার মন্দির। ওরা একজন গাইডও পেয়ে গেল ঘুরে দেখার জন্য। প্রকাশ নামে এই গাইড ওদের নিয়ে চলল মন্দিরের ভিতরে। ভিতরটা দেখে অবাক হয়ে গেল সৌমিতা। মন্দিরের একেবারে শেষ মাথায় একখানি সিংহাসনের উপরে বসে আছেন রানী মেডুসা। গ্রিক উপকথার মতো তাঁর মাথাতে সাপ না রইলেও, তার চোখগুলো জ্বলজ্বল করছে। মনেহচ্ছে চোখের জায়গায় বসানো আছে দু'খানা লাল রঙের মুক্তো। আর তার সামনে সার দিয়ে একের পর এক সাজানো আছে অজস্র পুরুষের মূর্তি। কী নিঁখুত এক একটা মূর্তি। চোখের লোম, কপালের ভ্রূ, এমনকি দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা মাংসের টুকরোটাকেও নিঁখুত ভাবে গড়ে তুলেছেন ভাষ্কর। দেখে মনেহচ্ছে ওই পুরুষগুলো যেন এক সময় সত্যিই জীবন্ত ছিল, কোনোভাবে পাথর হয়ে গেছে। প্রকাশ বলল, "লোকে বলে এই দেবী নাকি জাগ্রত। কয়েকজন দেবীকে রাতের বেলা চলা ফেরা করতেও দেখেছে। যদিও এসবই গুজব হতে পারে। আমি অন্তত এসব আজগুবি কথায় বিশ্বাস করিনা। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে গত দশ বছরে এই মন্দিরে তিনখানা বাড়তি পুরুষের মূর্তি দেখা গেছে। কে যে রাতারাতি মূর্তিগুলো গড়ে দিয়ে গেছে কেউ জানেনা।"
ওরা যখন গুহা থেকে বেরিয়ে এল প্রত্যেকেরই শরীরে রোমাঞ্চ লেগে রয়েছে। মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়ে রিসিকার সঙ্গে গল্প করছিল সৌমিতা। হঠাৎ ওর দিকে তাকিয়ে সুমিত বলল, "এদিকে শোন, কথা আছে।"
সৌমিতা চমকে উঠল। সুমিত আবার ওকে ডাকছে কেন? মাস তিনেক আগে সুমিতের সঙ্গে রিলেশনে জড়িয়ে পড়ে ছিল সৌমিতা। কলেজের সবচেয়ে হ্যান্ডসাম ছেলেগুলোর মধ্যে একজন সুমিত। ওকে দেখলে যেকোনো মেয়েরই বুকের ভিতরে প্রজাপতিরা ডানা ঝাপটাতে শুরু করে, সৌমিতাও ব্যতিক্রম ছিলনা। সুমিতের প্রেমে এতটাই মজে গিয়েছিল যে ঠিক ভুল বোঝার মতো পরিস্থিতিটাই ছিলনা, পরে যখন জানতে পারে সে শুধু একা নয়, কলেজের আরো বেশ কয়েকটা মেয়ের সাথে একই চক্কর চালাচ্ছে সুমিত তখন ওর কাছ থেকে সরে আসে। বলল, "কি কথা বল?"
সুমিত বলল, "সকলের সামনে বলা যাবেনা, আমার কাছে আয়।"
হাটতে হাটতে সুমিতের কাছে এগিয়ে গেল সৌমিতা। বলল, "বল কি বলছিস?"
ফিসফিস করে সুমিত বলল, "আজ রাতে তোর রুমে আসছি, রেডি থাকিস।"
সৌমিতা চমকে উঠল। সে বলতে যাচ্ছিল, "আবার তোর মতো ছেলেকে বিশ্বাস করে রুমে আসতে দেব, তুই ভাবলি কি করে?"
তার আগেই সুমিত বলল, "তোর মান সম্মান কিন্তু আমার হাতের মুঠোয় আছে। সেটা ভেবে ডিসিশন নিস।"
সৌমিতার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বলল, "মানে?"
সুমিত বলল, "সেটা রাতে এলেই দেখতে পাবি।"

রাত্রে বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছিল সৌমিতা। ওর ঘুম ধরছিল না। এই ইউপি ট্যুরটা যে ওর পক্ষে মোটেই সুখকর হতে যাচ্ছেনা সেটা বেশ বুঝতে পারছিল। বিছানা ছেড়ে উঠে সে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। আকাশে ফুটফুটে চাঁদ উঠেছে। দুধেল জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে হোটেলের লন। গত মাসেই সুমিতের সঙ্গে সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়েছে সৌমিতা। সাফ জানিয়ে দিয়েছে সে যেন আর ওর জীবনে ফিরে আসার চেষ্টা না করে। তা সত্বেও আজ আবার কি বলতে চায় সুমিত? কেন রাতে ওর সঙ্গে দেখা করতে চাইল?

টক টক করে রুমের দরজায় আলতো টোকা পড়তেই দরজা খুলল সৌমিতা। এই রুমে সে একাই আছে। অন্যান্য রুমে কলেজের অন্য মেয়েরা দু'তিনজন করে রইলেও সৌমিতার ঘুমের মধ্যে কথা বলার সমস্যার জন্য একটা রুম ওকে ওরা ছেড়ে দিয়েছে। তড়িঘড়ি রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে সুমিত। বিছানায় বসে চাপা গলায় বলল, "আয় পাশে এসে বোস।"
সৌমিতা বলল, "কি বলছিস তাড়াতাড়ি বলে চলে যা। কেউ দেখতে পেলে আমাকে খারাপ ভাববে।"
সুমিত বলল, "আমি যা বলছি সেটা না শুনলে লোকে তোকে আরো বেশি খারাপ ভাববে।"
কী যেন বলতে গিয়ে থেমে গেল সৌমিতা। গুটিগুটি পায়ে সুমিতের পাশে গিয়ে বসল। নিজের মোবাইলটা বার করল সুমিত। একটা ভিডিও চালু করে সৌমিতার দিকে তাকিয়ে বলল, "এটা দ্যাখ।"
ভিডিওটা দেখে সৌমিতার মাথায় যেন বজ্রপাত হল। ওর সঙ্গে সুমিতের ঘনিষ্ঠ অবস্থার একটা দৃশ্য রয়েছে ভিডিওটাতে। কোনোভাবে লুকিয়ে দৃশ্যটা তুলেছে সুমিত। একটু চিৎকার করেই বলে উঠল, "এসব কি?"
ফিসফিস করে সুমিত বলল, "চিৎকার করিসনা। আমি যা বলছি তুই এবার থেকে তাই করবি, নয়তো এই ভিডিওগুলো ভাইরাল হয়ে গোটা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়বে।"
সৌমিতার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বলল, "কি করতে হবে আমাকে?"
সুমিত বলল, "এমন কিছু না, তুই আপাতত শুয়ে পড়। তারপর যা যা বলছি কর।"
তোতলাতে তোতলাতে সৌমিতা বলল, "আচ্ছা, করছি, কিন্তু তুই আগে কথা দে তোর সব কিছু করা হয়ে গেলে তুই ভিডিওগুলো ডিলিট করে দিবি।"
ফিক করে হেসে সুমিত বলল, "তা হয় নাকি? তোর মতো কলেজের আরো অনেকে মেয়ের ভিডিও আমার কাছে আছে। তোদের ইচ্ছেমত নাচাবার এটাই তো উপায় আমার কাছে। ডিলিট করে দিলে হয় নাকি? আপাতত যা বলছি কর, নয়তো কাল সকালে এগুলো ভাইরাল হলে কি ভাল লাগবে?"
ভয়ে ভয়ে শুয়ে পড়ল সৌমিতা। ওর ভীষণ কান্না পেল। নরকে যখন একবার পা রেখেই দিয়েছে, তখন দ্বিতীয় বার সেখান থেকে ঘুরে আসতে ওর বিশেষ কোনো কষ্ট হবেনা। কষ্ট শুধু এটুকুই গতবারে সে নিজের ইচ্ছেতে যা করার করেছিল, আর এবারে যা হচ্ছে ওর ইচ্ছের বিরুদ্ধে। বেশ কিছুক্ষণ সৌমিতাকে আদর করে ছেড়ে দিল সুমিত। বলল, "তোর শরীর থেকে আমার নতুন করে পাওয়ার কিছু নেই, কিন্তু তোর কাছ থেকে আমার অনেক কিছুই পাওয়ার আছে। আর সেই জন্যই ভিডিওগুলো আমার কাছে রাখছি।"
সৌমিতা বলল, "তুই আমাকে ব্ল্যাকমেল করবি?"
সুমিত বলল, "ধরে নে তাই।"

সারাটা দিন জগদীন্দ্রপুরের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে কাটিয়ে দিল সৌমিতারা। যদিও সৌমিতার ঘোরার  দিকে কোনো মন ছিলনা। সে কেবল ভাবছিল কীভাবে সুমিতের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। কীভাবে ওর মোবাইল থেকে ভিডিওগুলো ডিলিট করা যায়। তারজন্য সুমিত যা চাইবে সে দেবে, তবু প্রকাশ্যে ওর কোনো সম্মানহানি হোক সেটা সে চাইবেনা।

তখন রাত বারোটা বাজে। বিছানা পেতে শুয়ে পড়ার উপক্রম করছিল সুমিত, হঠাৎ ওর হোয়াটস আপে টিং টং করে সৌমিতার মেসেজ ঢুকল। সৌমিতা লিখেছে, "তুই এখোনো ঘুমোসনি বোধহয়। একবার হোটেলের বাইরে আসবি।"
সুমিতের ভ্রূ কুঁচকে গেল। এত রাতে কেন সৌমিতা ওকে বাইরে ডাকছে? তবে কি...? মুচকি হেসে হোটেল থেকে বাইরে বেরিয়ে এল সুমিত। বাইরে যেন চাঁদের আলোর বন্যা বইছে। সেই আলোর নিচে একটা গাছ তলায় দাঁড়িয়ে আছে সৌমিতা। গুটিগুটি পায়ে ওর কাছে এগিয়ে এল সুমিত। আজ সৌমিতাকে একেবারে অন্য রকম লাগছে। ওর শরীর থেকে ফেটে পড়ছে রূপ। কী যেন এক মাতাল করা গন্ধ ওর গা থেকে ভেসে আসছে। ওর কাছে এগিয়ে গিয়ে সুমিত বলল, "কি হল, এত রাতে ডাকলি কেন?"
মাথা নামিয়ে সৌমিতা বলল, "আজ আমার ভীষণ অ্যাডভেঞ্চার করতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু এত রাতে কে আমার সঙ্গে যাবে তাই তোকেই ডাকলাম।"
সুমিত অবাক গলায় বলল, "কোথায় অ্যাডভেঞ্চার করবি?"
চাপা গলায় সৌমিতা বলল, "চলনা, একবার চুপিচুপি গিয়ে মেডুসার মন্দিরের ভিতরটা দেখে আসি।"
কি যেন ভেবে সুমিত বলল, "যেতে পারি, কিন্তু আমার একটা শ্বর্ত আছে।"
সৌমিতা বলল, "আজ তুই যা চাইবি সব দেব। আমারও ভীষণ ইচ্ছে আছে আজ।"
সুমিত বলল, "আচ্ছা, চল তবে।"

হাঁটতে হাঁটতে মন্দিরের ভিতরে গিয়ে ঢুকল সুমিত আর সৌমিতা। মন্দিরের কোনো গেট নেই, একসময় হয়তো ছিল, পরবর্তীকালে ভেঙে পড়েছে। ভিতরে ঢুকেই মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে চারপাশটা দেখে নিল সুমিত। মেডুসার সিংহাসনের উপরে আলো ফেলে বলল, "মূর্তিটা কোথায় গেল, আজ সকালেও তো এখানেই ছিল?"
মুচকি হেসে সৌমিতা বলল, "সে আমি কী জানি, হয়তো মূর্তিটা বেড়াতে গেছে।"
মাথা নেড়ে সুমিত বলল, "কাল দেখছিলাম মন্দিরে রিপিয়ারিং শুরু হয়েছে, সম্ভবত সেই কারনেই মূর্তিটা সরানো হয়েছে।"
সৌমিতা মাথা নাড়ল। বলল, "হতে পারে।"
ফিসফিস করে সুমিত বলল, "এরপর?"
মাথা নিচু করে থেকে সৌমিতা বলল, "তুই যা করবি..."
সৌমিতাকে জড়িয়ে ধরল সুমিত। ওর ঠোঁটে চুমু দিল। আবেগে চোখ বুজে ফেলেছিল সৌমিতা। নিজের পোশাক খুলে নগ্ন হয়ে গেল সুমিত। তারপর সৌমিতাকে নগ্ন করে মাটির উপরে শুইয়ে বলল, "তখন থেকে তুই আমার দিকে একবারও তাকাসনি কেন?"
চোখ বুজে থেকে সৌমিতা বলল, "আমার ভীষণ লজ্জা পাচ্ছে।"
সৌমিতার পা দুটোকে ফাক করে শুয়ে পড়তে পড়তে সুমিত বলল, "আমার কাছে তোর লজ্জার কী আছে? এটা তো তোর সঙ্গে আমার প্রথম বার নয়, নে চোখ খোল।"
রহস্যময় ভাবে সৌমিতা বলল, "বলছিস? সত্যিই তাকাব তোর দিকে?"
সুমিত বলল, "নিশ্চয়ই, আমি যখন তোর শরীরের ভিতরে ঢুকব তখন তোর চোখ দুটো যেন খোলা থাকে।"
সৌমিতা মাথা নাড়ল। ধীরেধীরে চোখ খুলে সুমিতের দিকে তাকাল সে। ওর ঠোঁটের দিকে ঠোঁট দুটোকে নামিয়ে আনতে আনতে হঠাৎ থমকে গেল সুমিত। ওর বুকটা ধড়াস করে উঠল। সৌমিতার চোখ দুটো যেন জ্বলছে। একটা উজ্জ্বল আভা বেরিয়ে আসছে ওর চোখের ভিতর থেকে। মনেহচ্ছে চোখ দুটো যেন আসল নয়, ওর অক্ষিকোটরের ভিতরে বসানো আছে দু'খানা লাল রঙের মুক্তো। ওর শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসতে লাগল। গলা থেকে বুক, বুক থেকে পেট, গোটা শরীরটা যেন ধীরেধীরে শুকিয়ে উঠতে লাগল। কী যেন বলার চেষ্টা করল সে, পারলনা। ওর গলার ভিতর থেকে দুটো পাথরের ঠোকাঠুকির ঠকঠাক শব্দ ছাড়া কোনো আওয়াজ বেরিয়ে এলনা।

সকালে সৌমিতার যখন ঘুম ভাঙল তখন প্রায় আটটা বেজে গেছে। ঘুম থেকে উঠেই সে আবিষ্কার করল ওর বিছানার পাশে সাইলেন্ট অবস্থায় নামানো আছে সুমিতের মোবাইল। আর তাতে অন্তত বেশ কয়েকশো বার কল এসেছে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে ক্লাউড স্টোরেজে গিয়ে আগেই ভিডিওগুলো ডিলিট করল সে, তারপর রুম থেকে বেরিয়ে আসতেই রিসিকার সঙ্গে দেখা হল। রিসিকা বলল, "কাল রাতে একটা বিপদ ঘটে গেছে।"
অবাক গলায় সৌমিতা বলল, "কি বিপদ?"
রিসিকা বলল, "কাল রাত থেকে সুমিত গায়েব। হোটেলের সিকিউরিটি নাকি ওকে মাঝ রাতে একটা মেয়ের সঙ্গে মেডুসার মন্দিরের দিকে যেতে দেখেছে।"
সৌমিতা মাথা চুলকাল। ওর আবছা আবছা মনেপড়তে লাগল, কাল রাতে স্বপ্নের মধ্যে সেই সুমিতকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল মেডুসার মন্দিরে। সেটা কি তবে স্বপ্ন ছিলনা, সে কি সত্যিই সুমিতকে নিয়ে ওখানে গিয়েছিল? নাহলে ওর কাছে সুমিতের মোবাইল এল কিভাবে? কিন্তু তারপর কি হয়েছিল? অনেক ভেবেও পরের অংশটা মনেকরতে পারলনা সৌমিতা। বলল, "বাকি স্টুডেন্সরা কোথায়?"
রিসিকা বলল, "কেবি স্যার, কয়েকজনকে নিয়ে থানায় গেছেন। বাকিরা এদিক সেদিক ঘুরছে। চল আমরা একবার মেডুসার মন্দির থেকে ঘুরে আসি, যদি সুমিতের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়।"
সৌমিতা মাথা নাড়ল। রিসিকার সঙ্গে মেডুসার মন্দিরে চলে গেল সে। মন্দিরে ঢোকার মুখেই একটা নগ্ন পুরুষ মূর্তির দিকে তাকিয়ে রিসিকা বলল, "এই মূর্তিটা তো কাল দেখিনি। এটা নতুন বসানো হয়েছে বলে মনেহচ্ছে।"
হাসার চেষ্টা করল সৌমিতা। বলল, "তুই বোধহয় প্রকাশের কথায় একটু বেশিই প্রভাবিত হয়ে গেছিস। তাই তোর মনেহচ্ছে এখানে প্রতিরাতে এসে কেউ পাথরের মূর্তি বানিয়ে দিয়ে যায়।"
ভ্রূ কুঁচকে রিসিকা বলল, "আমার সত্যিই তাই মনেহচ্ছে। এই স্কাল্পচারটাকে ভাল করে দেখ। এটা কিন্তু অনেকটা সুমিতের মতোই দেখতে।"
স্কাল্পচারটার দিকে তাকাল সৌমিতা। রিসিকা মিথ্যে কিছু বলেনি। স্কাল্পচারটা অনেকটা সুমিতের মতোই দেখতে। সুমিতের চোখ, ঠোঁট এমনকি তাকানোর ভঙ্গি পর্যন্ত স্কাল্পচারটার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে স্কাল্পচারটার ডান উরুর দিকে নজর পড়তেই সৌমিতা থমকে গেল। স্কাল্পচারটার ডান উরুতে বিশাল এক জড়ুল। এই জড়ুলটাকে সে চেনে। সুমিতের উরুতে সে বেশ কয়েকবার এই জড়ুল দেখেছে। ওর বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল। সেদিন মেডুসার ব্যাপারে বলতে গিয়ে আরো একটা কথা বলেছিল অয়ন। বলেছিল, "মেডুসার চোখ দুটো ভীষণ বিষাক্ত। এতটাই যে উনি যার চোখের দিকে তাকান সেই মানুষ সঙ্গেসঙ্গে পাথরের মূর্তিতে পরিণত হয়।"
তবে কি কাল রাতে ওর শরীরে ভর করে মেডুসাই সুমিতকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল এই মন্দিরের ভিতরে? আর এখানে এসে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে সুমিতকে পাথরের মূর্তিতে রূপান্তরিত করেছে? সৌমিতার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। পা দুটো কেঁপে উঠল থরথর করে।

(সমাপ্ত)

©All rights reserved to sankha subhra nayak

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন