প্রতিবিম্ব
শঙখ শুভ্র নায়ক
সাতদিন হল আমার জন্ম হয়েছে। না, আমি কোনো রোবট নই, আমি একজন জলজ্যান্ত মানুষ। আমার চোখ, মুখ, নাক, জিভ সবই আছে। আমি নিজের স্পর্শটুকুও নিজে অনুভব করতে পারি, কিন্তু আমি কোনো মায়ের গর্ভ থেকে জন্মানো মানুষ নই। ডঃ সৌমাভ আমাকে জম্ম দিয়েছেন। ক্লোনিং নিয়ে দীর্ঘদিন রিসার্চ করার পরে অবশেষে ঠিক নিজের মতো একজন মানুষের জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছেন। জন্ম হওয়ার পরে চারদিন আমি রিসার্চ ল্যাবরেটরির একখানা কাঁচের বক্সের মধ্যে বন্দি ছিলাম। তারপর একটা ফাঁক বুঝে বাক্সের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসেছি। জন্মদাতা পিতার সম্পূর্ণ দায়িত্ব থাকে তার সন্তানকে সুস্থভাবে সমাজে বেঁচে থাকার উপযোগী করে তোলার। কিন্তু ডঃসৌমাভ আমার কোনো দায়িত্বই নিতে চাননি। আমাকে জন্মদেওয়ার পরেই উনি বলেছিলেন, "তোমাকে সৃষ্টি করেছি আমার রিসার্চের জন্য। যেদিন তোমার প্রোয়োজন মিটে যাবে সেদিন আমি তোমাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেব।"
কাঁচের বাক্সটার ভিতরে আমি ঘুমিয়েছিলাম, তবু ওনার সব কথা আমার কানে আসছিল, তখনই আমি ঠিক করে নিয়েছিলাম আমাকে পালাতে হবে। তারপর কীভাবে ওই বাক্সের ভিতর থেকে আমি বেরিয়ে এসেছি, তা শুধু আমিই জানি।
চারদিন আগে আমি ডঃসৌমাভ র বাড়ি গিয়েছিলাম। ওনার বৈঠক খানায় লুকিয়ে লক্ষ্য রাখছিলাম কখন উনি একা হন। ওনার সঙ্গে আমার কিছু হিসেব নিকেশ মেটানোর ছিল। ঠিক দুপুর বেলা, যখন ওনার স্ত্রী বেরিয়ে গেলেন, আর উনি একা হয়ে গেলেন আমি ওনার কাছে গেলাম। আমাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন ডঃসৌমাভ। বললেন, "তু...তুমি কে? এখানে কিভাবে এলে?"
বললাম, "আমি কিভাবে এখানে এলাম তা আপনার না বুঝলেও চলবে, কিন্তু আপনি আমাকে একটা পরিচয় দিন, যে পরিচয় নিয়ে আমি সমাজে বাঁচতে পারব।"
ডঃসৌমাভ বললেন, "কখনোই না। আমি ছাড়া আমার মতো দেখতে কোনো মানুষকে আমি এই সমাজে ঘোরার পার্মিশন দিতে পারবনা।"
বললাম, "আপনি আমাকে জন্ম দিয়েছেন, তাই পরিচয় তো আপনাকে দিতেই হবে।"
ডঃসৌমাভ ঘাবড়ে গেলেন। বললেন, "আমি ক্লোন নিয়ে গবেষণা করছিলাম ঠিকই, কিন্তু তোমাকে সৃষ্টি করে ফেলেছি, একথা আমার বিশ্বাস হচ্ছেনা। তবে তোমাকে যদি সত্যিই আমি জন্ম দিয়েছি, তাহলে মেরেও ফেলতে পারি। কিন্তু কোনো পরিচয় আমি তোমাকে দিতে পারবনা।"
বললাম, "সেই সুযোগ হয়তো আপনি পাবেন না, হয় আপনি আমাকে পরিচয় দিন, নয়তো আপনি আমাকে আপনার পরিচয়ে বাঁচতে দিন। আপনি গিয়ে আমার জায়গায় থাকুন।"
ডঃসৌমাভ রেগে গেলেন। ড্রয়ার থেকে একখানা পিস্তল বার করে বললেন, "তবে রে বেয়াদব?"
কিন্তু উনি গুলি চালানোর আগেই আমার হাতের কাছে থাকা একখানা ফুলের টব আমি ওনার দিকে ছুঁড়ে মারলাম। সত্যি বলছি, আমি মোটেই ওনাকে খুন করতে চাইনি। আমি তো জাস্ট আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু ফুলদানের আঘাতে যে উনি আমার চোখের সামনে এভাবে তড়পে তড়পে মারা যাবেন ভাবতেও পারিনি। আমি খুব ঘাবড়ে গেলাম। ডঃসৌমাভর বডিটা নিয়ে গিয়ে কাঁচের জারের ভিতরে বন্দী করে দিলাম।
গত তিনদিন ডঃসৌমাভর পরিচয়ে আমি ওনার বাড়িতে আছি। আমি এখন একটা সুখী পরিবার পেয়েছি। ওনার স্ত্রী এখন আমার স্ত্রী। ওনার তিন বছরের বাচ্চা মেয়েটা এখন আমার মেয়ে। সে আমার হাত ধরে "পাপা পাপা" বলে। রিমঝিমের মতো ভাল বউ হয়তো জগতে কমই আছে। সে মাঝেমাঝে বলে, "তুমি বদলে যেতে আমি খুব খুশি হয়েছি। আগে চব্বিশঘণ্টা রিসার্চ রিসার্চ করে আমার মাথা খেতে, এখন আমার প্রতি কত কেয়ারিং হয়েছ।"
আমি হাসি। বলি, "তুমি আমার স্ত্রী। আর স্ত্রীর প্রতি কেয়ারিং হব নাতো কার প্রতি হব?"
আমার বাচ্চা মেয়েটা মাঝেমাঝে আমার কোলে চড়ে বসে। আমাকে হামি খায়। তারপর বলে, "পাপা, চকোলেট খেলাম।" বলেই খিলখিল করে হেসে ওঠে। কী সুইট এই জীবন যাত্রা। হয়তো এগুলোর জন্যই মানুষ বেঁচে থাকে।
কিন্তু গত দু'দিন ধরে আমার একটা অদ্ভুত রোগ হয়েছে। আমি থেকে থেকেই চমকে উঠছি। আমার মনেহচ্ছে আমার আশেপাশে কেউ আছে, যাকে আমি দেখতে পাচ্ছিনা। কিন্তু আমাকে আড়াল থেকে লক্ষ্য করছে। কাল রাতে ডিনার সেরে রুমে যাবার সময় তো এতটাই চমকে গেলাম যে আর একটু হলেই হার্টফেল হয়ে যাচ্ছিল আর কী? রুমে ঢুকতে গিয়ে দেখলাম আমার বিছানায় বসে আছে আরো একটা আমি। স্রেপ এক ঝলক, তারপরই মানুষটা অদৃশ্য হয়ে গেল। না, আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনি আমি, সঙ্গে সঙ্গেই রুম থেকে বেরিয়ে পড়লাম। একবার শিওর হওয়ার দরকার আছে ডঃসৌমাভ সত্যিই মরেছে তো?
আমার বাড়ি থেকে রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে যেতে গেলে বেশ খানিকটা হাঁটতে হয়। ডঃসৌমাভ ইচ্ছে করেই বাড়ির সামনে ল্যাবরেটরি বানাননি। যাতে উনি আর পাঁচজনের চোখের আড়ালে আমাকে লুকিয়ে রাখতে পারেন। বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমি রাস্তায় নেমে এলাম। অন্ধকার রাস্তা। দু'পাশে গাছের সারি। আকাশে সাদা হাঁড়ের মতো চাঁদখানি ঝুলে ছিল। গলির মোড়ে দু'তিনটা কুকুর কেঁও কেঁও করে ডাকছিল। শুনেছি কাছাকাছি কোনো পিপাসু আত্মার অস্তিত্ব থাকলে নাকি ওরা নাকি এভাবে ডাকে। ডঃসৌমাভর স্মৃতিগুলো রয়েছে আমার মাথায় ভিতরে। ছোট বেলায় ওনার মা গল্প করতেন এই রাস্তাতেই নাকি উনি একবার অশরীরীর মুখে পড়েছিলেন। সামনের ওই বট গাছটা থেকে একটা মেয়ে গলায় দড়ি নিয়ে ঝুলে ছিল, আর নিচে বসে ওই মেয়েটাই নাকি কাঁদছিল নিজেকে বাঁচানোর জন্য। না, এসব গল্পে মোটেই বিশ্বাস করা চলেনা। ডঃসৌমাভ একজন বিজ্ঞানী ছিলেন, সুতরাং আমাকেও বিজ্ঞানমনস্ক হতে হবে। মনে জোর এনে আমি পথ হাঁটতে লাগলাম। রাস্তার দু'পাশ থেকে ভেসে আসা অদ্ভুত শব্দগুলোকে পাখির ডানার ঝাপট ভেবে উড়িয়ে দিলাম।
রিসার্চ ল্যাবরটরিতে ঢুকে কাঁচের বাক্সটা খুলতেই দেখলাম ডঃসৌমাভ তার ভিতরে মরে পড়ে আছে। ওর হৃদপিন্ড বন্ধ। চোখ দুটো ঘোলাটে ভাবে খোলা। কিন্তু ঠোঁটে একটা নিষ্ঠুর হাসি যেন খেলা করছে। এই হাসি কোনো মানুষের হতে পারেনা, কেবল পিশাচরাই এমন ভাবে হাসতে পারে। এসব কি ভাবছি আমি? মরা মানুষ কি কখনো জীবন্ত হতে পারে? নিজেকে ধমক দিলাম। ল্যাবরেটরি বন্ধ করে ফিরে আসার সময় আমার হঠাৎই মনেহল আমার কাঁধ স্পর্শ করেছে একটা হাত। একখানা হিমশিতল হাত। চমকে পিছনে তাকিয়ে অবশ্য কাউকেই দেখতে পেলাম না। মনের ভুল ভেবে বাড়িতে ফিরে এলাম। আমাকে রুমে দেখতে না পেয়ে রিমঝিম ততক্ষণে চিন্তা ভাবনা শুরু করে দিয়েছে। আমাকে দেখেই জড়িয়ে ধরে বলল, "কোথায় গিয়েছিলে তুমি?"
বললাম, "আরে হঠাৎ একটা জিনিস মনেপড়ে গিয়েছিল, তাই একবার ল্যাবে গিয়েছিলাম।"
রাগ দেখানো গলায় রিমঝিম বলল, "আবার তোমার মাথায় ল্যাবের ভূত চড়ল? বলেছিনা এসব নিয়ে একেবারেই চিন্তা ভাবনা করবেনা।"
বললাম, "আরে ব্যাপারটা একটু জরুরি ছিল, তাই…"
রিমঝিম বলল, "আচ্ছা, ছাড়ো। টুকুর কাল বার্থ ডে মনে আছে তো?"
বললাম, "কেন মনে থাকবেনা? আমি আগে থেকেই কেকের অর্ডার দিয়ে রেখেছি।"
চোখ কপালে তুলে রিমঝিম বলল, "ওমা! তুমি এত কেয়ারিং কবে থেকে হলে গো? আমার তো সন্দেহ হচ্ছে তুমি আমার সেই স্বামী বট তো?"
আমি গলা খাঁকারি দিলাম। বুকটা হঠাৎই যেন ধক করে উঠল। রিমঝিম বলল, "আরে আমি তো ইয়ার্কি করছি।"
বিছানায় টুকু ঘুমিয়ে কাদা। টুকু আমাদের মেয়ে। আগে ডঃসৌমাভর মেয়ে ছিল সে, এখন আমাদের মেয়ে। কী নিস্পাপ মুখ ওই ছোট্ট শিশুটার, দেখলে যেকোনো বাবারই বুক একটা অদ্ভুত আনন্দে ভরে উঠবে। ওকে আদর করে আমি বিছানায় শুয়ে পড়লাম। তখন মাঝরাত। একটা-দুটো বাজে। হঠাৎ একটা হিমশিতল স্পর্শে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। মনেহল কে যেন আমার কন্ঠ নালীতে আঙুল বোলাচ্ছে। যেন একটা লিকলিকে সাপ আমার গলার উপরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি ধড়মড় করে উঠে বসলাম। আমার বুক ধুকপুক করতে লাগল। লাইট জ্বালাবার আগে একবার হলেও মনেহল একটা ছায়ামূর্তি যেন তার জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার গলা শুকিয়ে উঠেছে। মেরুদন্ড দিয়ে বয়ে চলেছে ঠান্ডা স্রোত। বাইরে কুকুর ডাকছে একটা অদ্ভুত স্বরে। লাইটের আলোয় রিমঝিমও জেগে উঠেছে, আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "কি হল? উঠলে যে?"
ভয়ার্ত গলায় বললাম, "কে যেন এখানে ছিল?"
রিমঝিম বলল, "কে ছিল?"
বললাম, "একটা অদ্ভুত ছায়ামূর্তি। তার চোখ দুটো লাল টুকটুকে। যেন আগুনের জ্বলন্ত গোলা। আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল।"
হো হো করে হেসে উঠে রিমঝিম বলল, "তুমি সম্ভবত কোনো স্বপ্ন দেখেছ।"
বললাম, "স্বপ্ন নয়, সত্যি দেখেছি। ছায়ামূর্তি টা আমার গলায় আঙুল বোলাচ্ছিল। কী ঠান্ডা আর লিকলিকে আঙুল গুলো।"
বিছানা ছেড়ে উঠে গোটা ঘরটা একচক্কর ঘুরে এসে রিমঝিম বলল, "কই এখানে তো কেউ নেই। তাছাড়া ঘরের দরজাও ভিতর থেকে বন্ধ। কে ঢুকবে ভিতরে? সম্ভবত তোমার মনের কোনো ভুল হয়েছে।"
আমি জানি আমার কথা কেউ বিশ্বাস করবেনা, কিন্তু আমি কোনো মিথ্যে কথা বলছিনা। আমি মূর্তিটাকে স্পষ্ট দেখেছি। এমনকি সেই ঠান্ডা শিরশিরে অনুভূতিটাও এখোনো আমার গলায় লেগে আছে।
আজ আমার মেয়ে টুকুর বার্থ ডে ছিল। ধুমধাম করে বার্থডে সেলিব্রেট করা হল। অনেক গেস্ট এসেছিল। সকলেই আমার অতিথি আপ্যায়নের খুব প্রশংসা করল। টুকুও আজকাল বাবার প্রতি খুব ন্যাওটা হয়ে গিয়েছে। সম্ভবত ডঃসৌমাভ ওকে একটুও সময় দিতনা। আমি প্রথম প্রথম ভাবতাম সৌমাভর জায়গা নিয়ে কি আমি ঠিক করছি, কিন্তু এখন মনেহয় ঠিকই করছি। একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়ার আগে একজন মানুষকে একজন দায়িত্বশীল মানুষ হতে হয়। দেশের প্রতি কর্তব্য করলেই সব দায়িত্ব পালন করা শেষ হয়ে যায়না, তাকে একজন দায়িত্বশীল স্বামী এবং একজন দায়িত্বশীল পিতার দায়িত্বটুকুও ঠিকমতো পালন করতে হয়। ডঃসৌমাভ হয়তো দেশের জন্য অনেক কিছুই করেছে, কিন্তু পরিবারের জন্য এটুকু কর্তব্যও ঠিকমতো করেনি। যাইহোক, পার্টি শেষে আমি ওয়াশরুমে এলাম। আমার সারা গায়ে কেক মাখামাখি হয়েছিল। সবাই মিলে যত পেরেছে কেক আর পেস্টের বন্যায় আমার ভাসিয়ে দিয়েছে। এগুলো ধোয়াধুয়ি করতে হবে।
ওয়াশরুমে ঢুকে আমি ট্যাপ চালালাম। যা! ট্যাপে তো একেবারেই জল পড়ছেনা। ভিতরে কি কিছু আটকে রয়েছে? একটা ব্রাশ তুলে নিয়ে ট্যাপের মুখে খোঁচা মারতেই হঠাৎ ট্যাপের ভিতর থেকে ঝরঝর করে পড়তে লাগল, না জল নয়, চাপ চাপ কাঁচা রক্ত। আমার হৃদপিন্ড যেন এক মুহূর্তে থমকে গেল। আমি ছুটে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসার আগেই দেখলাম, ট্যাপ থেকে জল পড়তে শুরু করেছে, আর সেই জলে সব রক্ত ধুয়ে গিয়ে ছিদ্র দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। জল দিয়ে আমি চোখ মুখ ধুলাম। কী হচ্ছে আমার সঙ্গে এসব? কেন এসব দেখছি আমি? না, এগুলোর একটাও সত্যি নয়। সব, সব টুকুই হ্যালুসিনেশন। আমি হাত মুখ ধুয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। মাথা আঁচড়ে বেরিয়ে আসতে যাব, আমার দুটো চোখ যেন অক্ষিকোটর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইল। আয়নার সামনে থেকে আমি সরে এসেছি, কিন্তু আয়নায় আমার প্রতিবিম্ব টা এখোনো একই রকম দাঁড়িয়ে আছে, আর সেটা জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে আমারই দিকে।
মারাত্মক ভয় পেয়ে গেছি আমি। আমার গলা শুকিয়ে উঠেছে। ছুটতে ছুটতে রুমে এসে আমি কয়েক ঢোক জল খেলাম। আমাকে খুঁজতে খুঁজতে রুমে এসে ঢুকেছে রিমঝিম। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "কি হল তোমার এভাবে হাঁপাচ্ছ কেন?"
বললাম, "সেই অদ্ভুত মূর্তিটা। আমি আজ আবার দেখলাম।"
রিমঝিম বলল, "কোথায়?"
বললাম, "ওয়াশরুমের আয়নার ভিতরে। জ্বলন্ত চোখ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়েছিল।"
রিমঝিম বলল, "কে ছিল লোকটা? তুমি চেন ওকে?"
বললাম, "হ্যাঁ, আমি চিনি। লোকটা আমি ছিলাম।"
আজ আমি একটা অদ্ভুত তথ্য জানতে পারলাম। আমি সাইকোলজিস্টের কাছে গিয়েছিলাম আমার এই হ্যালুসিনেশন দেখার কারনে জানতে। এটা যে একটা মানসিক রোগ এর পিছনে যে কোনো অলৌকিক ব্যাপার নেই, আমি সেটা আমি শিওর হতে চাইছিলাম। আমাকে চেক টেক করে ডাক্তার বাবু বললেন, "আপনার মধ্যে কোনো সাইকোলজিক্যাল সমস্যা নেই। তবে আপনার ম্যামরিগত একটা সমস্যা আছে।"
জিজ্ঞেস করলাম, "কি সমস্যা?"
ডঃবর্মন বললেন, "আপনার ব্রেনের মধ্যে দু'তিনটে বছরের স্মৃতি নেই। এই যেমন ধরুন আপনার স্ত্রীর সঙ্গে আপনার কিভাবে পরিচয় হয়েছিল, কিভাবে আপনাদের বিয়ে হয়েছিল, এইসব স্মৃতিগুলো ব্রেন থেকে উড়ে গেছে। স্পেশিফিক ভাবে বলতে গেলে, আপনার ব্রেন থেকে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।"
আমি অবাক হলাম। হ্যাঁ, রিমঝিমের সঙ্গে কিভাবে আমার সম্পর্ক হয়েছিল, কিভাবে আমাদের বিয়ে হয়েছিল এসব কথা সত্যিই আমার মনে নেই, কিন্তু এই স্মৃতিগুলো উড়িয়ে কার কি লাভ? নাকি এর পিছনে গভীর কোনো রহস্য আছে? আমাকে জানতেই হবে।
এই মুহূর্তে আজাদের কথা আমার খুব মনেপড়ছে। ডঃসৌমাভর বাল্যবন্ধু আজাদ। আমার ব্রেনের মধ্যে ডঃসৌমাভর যেটুকু স্মৃতি রয়েছে, তাতে উনি এই আজাদের সঙ্গে ওনার জীবনের সব কথা শেয়ার করতেন। ডঃবর্মনের চেম্বার থেকে বেরিয়ে আমি আজাদকে ফোন করলাম। আজাদ প্রথমে আমাকে চিনতে পারেনি। পরে পরিচয় দিতে অবাক হয়ে বলল, "কি রে তোর এতদিন পরে বন্ধুর কথা মনেপড়ল?"
বললাম, "একটা ব্যাপার নিয়ে আমার তোর হেল্প চাই। প্লিজ হেল্প কর।"
আজাদ বলল, "হ্যাঁ রে ভাই। তুই আমার সঙ্গে যত খারাপ ব্যবহারই করিস না কেন, তুই আমার বন্ধু, তাই তোর পাশে দাঁড়াতে আমি সব সময়ই রাজি আছি। কবে দেখা করবি বল?"
বললাম, "আজই। বটতলার মোড়ে। আমি কফিশপে ওয়েট করছি।"
আজাদ বলল, "আচ্ছা, আমি এক্ষুনি আসছি।"
কফিশপে বসে কিছুক্ষণ ওয়েট করার পরে আজাদ আমার কাছে এল। আমার দিকে একঝলক তাকিয়ে চমকে উঠে বলল, "তুই, তুই সৌম হতেই পারিস না। কে তুই, সত্যি করে বল।"
আমি ঘাবড়ে গেলাম। বললাম, "আমি আগের সৌমাভ নই ঠিকই, কিন্তু আমি ওনার ক্লোন। আমার শরীরে ওনার ডিএনএ রয়েছে, আর আমার ব্রেনটাও ওনার স্মৃতি দিয়েই তৈরি। কিন্তু তুই আমাকে একঝলক দেখেই কিভাবে চিনে ফেললি?"
আজাদ বলল, "সৌমাভর কপালের পাশে একটা কাটা দাগ ছিল। ছোট বেলায় আম পাড়তে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে গিয়ে ওই দাগটা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তোর কপালে সেই দাগটা নেই।"
বললাম, "হ্যাঁ, আমার মনেপড়েছে। আমি, তুই আর রাজু আম পাড়তে গিয়েছিলাম। আমি যে ডালে দাঁড়িয়েছিলাম, হঠাৎ রাজু এসে সেই ডালে চড়ে গেল। দু'জনের ভার সহ্য করতে না পেরে ডালটা ভেঙে গেল। রাজু আগে পড়ল, আমি পড়লাম ওর গায়ের উপরে, ওর মাথার সঙ্গে আমার মাথায় ধাক্কা লেগে কপালটা ফেটে গেল।"
আজাদ বলল, "হ্যাঁ, আচ্ছা, একটা কথা বল, তুই আমাকে এখানে ডাকলি কেন? কি হেল্প চাস?"
বললাম, "আমাকে আমার আর রিমঝিমের বিয়ের ব্যাপারে কিছু বল। আমার মনে আছে, আমি তোকে ফোন করে সব কথা বলতাম, কিন্তু ওইসময়ের স্মৃতিগুলো আমার ব্রেনের মধ্যে আর নেই।"
আজাদ বলল, "তুই রিসার্চের কাজে ঢোকার পর এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলি, যে আমাকে প্রায় ভুলেই গিয়েছিলি। খুব কমই ফোন করতি। কেবল এটুকু বলেছিলি, তুই আর রিমঝিম একটা প্রোজেক্টের উপরেই কাজ করছিস। তোর কাজ একটা শরীর থেকে আর একটা শরীর তৈরি করা আর রিমঝিমের কাজ একটা ব্রেন থেকে তথ্যগুলো নিয়ে আর একটা ব্রেনে ট্রান্সফার করা। তুই আমাকে যেবার লাস্ট ফোন করেছিলি সেবারে বলেছিলি, তোর সঙ্গে রিমঝিমের কোনো বিষয় নিয়ে মতান্তর হচ্ছে, তাই এই রিসার্চ তুই বন্ধ করে দিতে চাস।"
আমি চমকে উঠলাম। যে রিমঝিমকে আমি স্রেপ গৃহবধূ ভাবতাম সে একজন বিজ্ঞানী। বললাম, "তারপর কি হয়েছিল? তুই আমাকে ফোন করার চেষ্টা করিসনি?"
আজাদ বলল, "অনেকদিন ফোন না পেতে আমি একবার তোর বাড়িতে তোর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। দেখলাম, তুই রিমঝিম কে বিয়ে করেছিস। সুখে ঘরকন্না করছিস। আমাকে তো ঢুকতেই দিলিনা ভিতরে। দরজা থেকে অপমান করে তাড়িয়ে দিলি।"
বললাম, "আচ্ছা, ঠিক আছে তুই আমার অনেক উপকার করলি। এবারে যা করার আমাকেই করতে হবে।"
কফিশপ থেকে বেরিয়ে আমি রিসার্চ ল্যাবরটরিতে গেলাম। যে ডঃসৌমাভকে আমি খুন করেছি, তাকে আমি খুব ভাল করেই দেখেছি। এখোনো আমার মনটা খচখচ করছে। একবার শিওর হওয়া দরকার। আমি ল্যাবরেটরি খুললাম। ভিতরে ঢুকে ডঃসৌমাভর বডিটা চেক করতেই চমকে উঠলাম। না, এই সৌমাভরও কপালের পাশে কোনো কাটা দাগ নেই। যার অর্থ এটাই যে এও আসল সৌমাভ নয়। আসল সৌমাভর একখানা ক্লোন মাত্র। কিন্তু কি হল আসল সৌমাভর? কোথায় গেলেন উনি? আর কি নিয়ে রিমঝিমের সঙ্গে ওনার মতান্তর হয়েছিল?
ল্যাব থেকে বেরিয়ে আমি বাইরে এসে দাঁড়ালাম। ল্যাবের বারান্দায় একখানা বিশাল আয়না রয়েছে। আয়নায় আমার প্রতিবিম্ব ফুটে উঠেছে। কিন্তু একি? ওই প্রতিবিম্বের চোখ দুটো এত জ্বলজ্বলে কেন? মনেহচ্ছে যেন আয়নার ওপাশে দাঁড়িয়ে আমারই আর একটা প্রতিমূর্তি কঠোর চোখে আমাকেই দেখছে। প্রতিবিম্বের কপালে এখোনো জ্বলজ্বল করছে সেই কাটা দাগ। তবে আয়নার ভিতরে কি কোনো রহস্য আছে? আমি আয়নাটা সরালাম। সরাতেই চমকে উঠলাম। এই আয়নাটা স্বচ্ছ কাঁচের তৈরি। অর্থাৎ এপাশ থেকে দেখলে ওটাকে আয়না বলে মনেহলেও ওপাশ থেকে ওটা কাঁচ। তবে কি সত্যিই আয়নার পিছনে এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলেন ডঃসৌমাভ? আয়নাটা যথাস্থানে রাখতে গিয়ে হঠাৎ থমকে গেলাম। আয়নার পিছনের দেওয়ালে কাঁচের মতো কিছু লাগানো আছে। ওটা কিছুই নয়, একটা গোপন ক্যামেরা। ক্যামেরাটার কেবিল দেওয়াল বেয়ে উল্টোপাশে বেরিয়ে গেছে। আমি কেবিলটা ধরে খানিকটা এগিয়ে বাথরুমে এসে ঢুকলাম। বাথরুমের ট্যাপের ভিতরে এসে ঢুকেছে কেবিলের অন্য মাথাটা। ট্যাপটা খুলতেই একখানা চিপস আমার হাতে এল। কি আছে এই চিপসে? কি রেকর্ড হয়েছে ওই ক্যামেরায়? আমাকে জানতেই হবে।
আমি বাড়ি ফিরে এলাম। বাড়িতে রিমঝিম নেই। টুকুকে নিয়ে কোথাও বেরিয়েছে। ও ফিরে আসার আগেই চিপসটা দেখে নিতে হবে। কম্পিউটারে ঢুকিয়ে আমি চিপসটা অন করলাম। ধীরেধীরে সময়টাকে পিছিয়ে নিয়ে গেলাম তিন বছর আগের অতীতে। দেখতে পেলাম রিসার্চ ল্যাবের বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন ডঃসৌমাভ আর রিমঝিম। দু'জনের মধ্যে জোর তর্ক চলছে। রিমঝিম বলছে, "স্যার, এই রিসার্চ একটা বিদেশী কোম্পানী কিনতে চাইছে। কোটিকোটি টাকা দেবে, ওরা আমাদের। ভেবে দেখেছেন, আমরা যদি এই রিসার্চ দিয়ে এরকম অজস্র ক্লোন তৈরি করতে পারি, আর তাদের নিজের ইচ্ছেমত কাজে লাগাতে পারি, তাহলে কি হবে। এই দেশ, এই পৃথিবী সব আমাদের দখলে চলে আসবে। আর সেই কাজে ইনভেস্ট করবে ওই কোম্পানি।"
ডঃসৌমাভ বলছেন, "না, আমি এই রিসার্চ সমাজের মঙ্গলের জন্য করছি। কোনো স্বার্থসিদ্ধির জন্য নয়। তাই তোমাকে এই রিসার্চ বেচতে দেবনা।"
রিমঝিম বলল, "সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকাতে হয় স্যার। হয়, আপনি আমাকে এই রিসার্চ দেবেন নয়তো আমাকে রিসার্চ খানা ছিনিয়ে নিতে হবে।" রিমঝিমের হাতে ঝকঝক করছে একখানা পিস্তল।
ডঃসৌমাভ বললেন, "আজ আমার কিছু হলে তুমি বেঁচে যাবে ভেবেছ? আমার খোঁজ না পেলেই আমার বন্ধু আজাদ আমার বাড়িতে আসবে, আর তারপর আমাকে দেখতে না পেলে পুলিশে খবর দেবে..."
রিমঝিম বলল, "সে ব্যবস্থাও আমি করে রেখেছি। আপনার মৃত্যুর পরে আপনার ব্রেনের তথ্যগুলোকে নিজের মতো ব্যবহার করে আমি আপনার তৈরি করা ক্লোনটাকে নিজের কাঠপুতুল বানিয়ে নেব। এসময়ের স্মৃতিগুলো এমন ভাবে ডিলিট করে দেব, যাতে ওর কিছুই মনে না থাকে, আর আজাদের বিরুদ্ধে ওর মনটাকে এমন ভাবে বিষিয়ে দেব যাতে আজাদকে দেখলেই ও ঘৃনা করতে শুরু করে..."
ডঃসৌমাভ বলার চেষ্টা করছিলেন, "প্লিজ, তুমি এভাবে সমাজের ক্ষতি কোরোনা..."
কিন্তু ওনার কথা শেষ হওয়ার আগেই পিস্তলের একটা গুলি ওনার বুকটাকে ফালাফালা করে দিয়ে গেল। ছবি দেখতে দেখতে একমাস পরের আরো একখানা রেকর্ডিং এ এসে আমি থামলাম। রিমঝিম কাউকে ফোনে বলছে, "হ্যাঁ, স্যার। ওনার রিসার্চ আমি চুরি করে নিয়েছি। কিন্তু সৌমাভ মরার আগে আমাদের এভাবে ধোকা দিয়ে যাবে আমি কখনো ভাবিনি। ও অনেক কিছু তথ্য ওর রিসার্চ পেপারে লেখেনি। সেগুলো না পেলে আমি নতুন ক্লোন বানাতে পারছিনা। তবে ওর তৈরি ক্লোনটার ব্রেনে এই তথ্য ঢুকিয়ে দিয়েছি, আমি ওর স্ত্রী। আর অনাথ আশ্রম থেকে আপনি যে বাচ্চাটাকে পাঠিয়েছিলেন ওকে নিজের মেয়ে বানিয়ে নিয়েছি। না স্যার, চিন্তা করবেন না। আমি চেষ্টা করছি।"
আমি স্তম্ভিত হয়ে চেয়ারে বসেছিলাম। আমি যাকে খুন করলাম সে যদি ডঃসৌমাভর তৈরি করা ক্লোন হয় তবে আমি কে? আমাকে কে তৈরি করল? আমি তো জন্মের সময় স্পষ্ট ডঃসৌমাভর গলা শুনেছিলাম। কিন্তু এই ভিডিওতে তার কোনো রেকর্ডিং নেই। সৌমাভর কোনো চিহ্ন নেই গোটা ভিডিওতে। কেবল দেখলাম অনেক দিন পরে ল্যাবরটরির দরজা খুলে আমি বেরিয়ে আসছি। ভিডিওটা অফ করে আমি উঠে দাঁড়াচ্ছিলাম। দেখতে দেখতে কতক্ষণ কেটে গেছে জানিনা। পিছনে তাকাতেই দেখলাম, আমার পিছনে রিমঝিম দাঁড়িয়ে আছে। ওর দু'চোখে যেন আগুন ঠিকরে উঠছে। ওর হাতের পিস্তল আমার দিকে তাক করা। আমার দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় সে বলল, "তুমি একটু বেশিই জেনে ফেললে ডঃসৌমাভর ক্লোন। আর তো তোমাকে বাঁচতে দেওয়া উচিৎ হবেনা।"
টুকু এতক্ষন রিমঝিমের হাত ধরে খুব শান্তভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু রিমঝিমের ওই মূর্তি দেখে সেও ভয় পেয়ে খাটের তলায় গিয়ে লুকিয়ে পড়ল। বললাম, "তুমি কেন এমন করছ রিমঝিম? তুমি একটু বোঝার চেষ্টা করো এতে আমাদের কি লাভ হবে? তুমি কোনো রিসার্চ কে খারাপ কাজে লাগিয়ে দেশের সর্বনাশ করে কি পাবে?"
রিমঝিম বলল, "আমি পৃথিবীর অধিশ্বর হতে চাই। আর এই রিসার্চই সেই কাজে আমাকে সফল করতে পারে। তাই মরার জন্য তৈরি হয়ে যাও। আর ক'টা মাত্র দিন। তারপরই তোমার মতো হাজার হাজার ক্লোন আমি বানিয়ে ফেলব। তারকাছে তোমার এই আত্মবলিদান কিছুই নয়।"
পিস্তলটাকে আমার দিকে তুলে ধরে করে ঘোড়ায় আঙুল ঢোকাল রিমঝিম। আমি রুদ্ধশ্বাস ভাবে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে আছি। আমার জীবনে এক একটা সেকেন্ড ধীরেধীরে কমে আসছে। মনেহচ্ছে প্রতিটা সেকেন্ডই এই মুহূর্তে আমার কাছে ভীষণ মূল্যবান। আমি একবার জোর করে শ্বাস নিলাম, তারপর রিমঝিমের দিকে তাকাতেই আমার সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। দেখলাম রিমঝিমের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে আরো একটা আমি। এই লোকটাই আসল সৌমাভ। কপালের পাশের কাটা দাগটাই সেটা প্রমান করে। আস্তে আস্তে রিমঝিমের কাঁধে হাত রেখে সৌমাভ বলল, "তোমার পাপের ঘড়া পূর্ণ হয়েছে রিমঝিম। তোমার চক্রান্তের শিকার হয়ে, তোমার হাতে আমি খুন হয়েছি। আর তোমাকে এই পাপ করতে দেবনা।"
চমকে পিছনে তাকিয়ে রিমঝিম বলল, "তুমি? তুমি এখানে কিভাবে এলে?"
সৌমাভ উত্তর দিলনা। দেখলাম ওর শরীরের হাড় মাংস সব আস্তে আস্তে খসে পড়ছে। শরীরটা ধীরে ধীরে পরিনত হচ্ছে একটা বিরাট নর কঙ্কালে। কঙ্কালটার অস্থি চর্ম হীন দুটো হাত ধীরেধীরে চেপে ধরছে রিমঝিমের গলা। রিমঝিমের দম বন্ধ হয়ে আসছে। চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। জিভটা মুখের ভিতর থেকে বেরিয়ে পড়েছে। আর পা দুটো বলির পাঁঠার মতো থরথর করে কাঁপছে। এক মুহূর্ত, কয়েক মিনিট, তারপরই রিমঝিমের শরীরটা ধীরেধীরে আলগা হয়ে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। রিমঝিমকে ছেড়ে কঙ্কালটা এবার উঠে দাঁড়াল। আমার দিকে একবার জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে হো হো করে হেসে উঠে হাওয়ায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
টুকুকে নিয়ে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। এবারে আমি মুক্ত। আজ থেকে আমি অন্য জায়গায় চলে যাব। সেখানেই বাসা বাঁধব। টুকুকে নিজের মতো করে মানুষ করে তুলব। যাতে কোনো দিন কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা ওর মনটাকে স্পর্শ করতে না পারে। সকাল হয়ে এসেছে। অন্ধকার ডিঙিয়ে আকাশ ভরে ধীরেধীরে ঠিকরে উঠছে উজ্জ্বল লাল আলো। কোথাও কোনো বালক কি আজো পড়ছে মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সেই সুপরিচিত লাইন গুলো, "পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল, কাননে কুসুম কলি সকলি ফুটিল...?"
(সমাপ্ত)
©All rights reserved to sankha subhra nayak

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন