বৃহস্পতিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১৯

রক্ত

রক্ত

শঙখ শুভ্র নায়ক



"বিছানায় রক্ত দেখেছিলে বৌদি? আমি তো গোটা বেড কভারে কেবল নারকেল তেলের ছাপই দেখলাম, রক্ত তো খুঁজেই পেলাম না।" রাতে শোয়ার পরে এক মহিলা আর এক মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন। দ্বিতীয় মহিলা বললেন, "হ্যাঁ, আমি রক্ত দেখেছি, খুব কম ছিল যদিও।" প্রথম মহিলা হাঁপ ছাড়লেন। বললেন, "তাহলে ঠিকই আছে।"

বছর দশেক আগের কথা। একরাতে ঘুম ভেঙ্গে গিয়ে ঠিক এই কথাগুলোই শুনেছিল অরিত্র। যদিও বিছানায় রক্ত না রইলে কি হত তা সে বোঝেনি। আজ সে বুঝতে পারে ওর মা আর পিসি ওর কাকুর বিছানায় কেন তন্ন তন্ন করে রক্ত খুঁজছিল। সতী আর অসতীর ধারনাটা কেউ যেন অজান্তেই সেদিন ওর মনের মধ্যে গেঁথে দিয়েছিল। দেখতে দেখতে সে বড় হল। স্কুল টিচার অরিত্র এখন সমাজ গঠনের কাজ করে, তবু ওর মনের মধ্যে গেঁথে থাকা সেই ধারনা থেকে সে বেরুতে পারেনি। দিন দুয়েক হল বিয়ে হয়েছে অরিত্রর। আজ ওর ফুলশয্যা। বিয়েটা এরেঞ্জ ম্যারেজ করেই হল। পাঁচলক্ষ টাকা পন পেয়েছে সে। অবশ্য ওর কোনো ইচ্ছে ছিলনা পন নেওয়ার। কিন্তু পন নিতে না চাওয়ায় এর আগে ওর দুটো সম্বন্ধ ভেঙ্গে গিয়েছিল। পাত্রী পক্ষের মনেহয়েছিল পাত্রের নিশ্চই কোনো খুঁত আছে। নাহলে টাকা নিতে চায়না কেন? তাই এবারে কোনো রিস্ক নেয়নি সে। কড়ায় গণ্ডায় পুরোটাকা আদায় করেছে। কিন্তু পাত্রীর বাবার মুখ দেখে মনেহয়েছিল ওরা বড্ড কম দাবি করেছে, ওনার আরো দেওয়ার ইচ্ছে ছিল। সেই থেকেই ওর মনটা বড্ড খুঁত খুঁত করছে।

সন্ধ্যে নাগাদ যা কিছু নিয়ম কানুন সব শেষ করে বাথরুম থেকে ফিরে রুমে এসে ঢুকল অরিত্র। দরজা বন্ধ করে বেডের দিকে এগিয়ে গেল। রুমটা খুব সুন্দর ভাবে সাজানো আছে। সামনে সোফা। তারপাশে টেবিল। টেবিলের গা ঘেঁসে ওদের বেড। বেডের ডান্ডা গুলো রজনীগন্ধা, গাঁদার মতো ফুলের মালা দিয়ে সাজানো আর বেডটাতে ছড়ানো রয়েছে গোলাপের পাপড়ি। বেডের একপাশে একটা বালিসে ঠেস দিয়ে বসে আছে তৃষ্ণা। সম্বন্ধ হবার পরে প্রায় তিন মাস ওদের ফোনে কথাবার্তা হয়েছে। কথাশুনে মনেহয়েছে তৃষ্ণা সত্যিই খুব ভাল মেয়ে। খুব কেয়ারিং। এরকম স্ত্রী পাওয়া সত্যিই খুব ভাগ্যের। বেডে উঠে তৃষ্ণার পাশে গিয়ে বসল অরিত্র। বিছানা ছেড়ে উঠে এল তৃষ্ণা। টেবিল থেকে তুলে একটা দুধের গ্লাস ওর দিকে এগিয়ে দিল। বলল, "অর্ধেকটা খেয়ে বাকি টুকু আমার জন্য রেখে দাও।"
দুধের গ্লাসে দুটো চুমুক দিল অরিত্র। বাকিটুকু শেষ করে গ্লাসটাকে টেবিলে নামিয়ে রেখে ড্রেস চেঞ্জ করে নাইটি পরল তৃষ্ণা। অরিত্রর পাশে গিয়ে বসে বলল, "শোবেনা?"
অরিত্র মাথা নাড়ল। বালিশে মাথা রেখে সে শুয়ে পড়ল । নাইট বাল্ব নিভিয়ে ওর গা ঘেঁসে শুয়ে পড়ল তৃষ্ণা। খানিকক্ষণ এপাশ ওপাশ করে শেষ পর্যন্ত তৃষ্ণাকে জড়িয়ে ধরল অরিত্র, তৃষ্ণাও সম্মতি দিল।

মাঝরাতে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল অরিত্র। ওর মনের মধ্যে পোকাটা গুনগুন করতে শুরু করেছে। নাইট বাল্ব জ্বালিয়ে টর্চটা হাতে তুলে নিল। বেশ খানিকক্ষণ হল ঘুমিয়ে পড়েছে তৃষ্ণা। সে বিছানায় উঠে এল। গোটা চারপাশে আলো ফেলে তন্নতন্ন করে সেই দাগটা খুঁজতে লাগল। না, কোথাও একবিন্দুও রক্ত নেই। তারমানে...?

প্যান্ট পরে বাথরুমে গেল অরিত্র। ফিরে এসে সোফায় বসে একটা সিগারেট ধরাল। চাঁদের আলো ফিকে হয়ে জানালায় এসে পড়েছে। সেদিকে তাকিয়ে আজ সকালের কাগজে পড়া একটা খবর ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল। গতকাল দুপুরে গড়িয়াহাটের এক গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছে। মাত্র তিন মাস হল মেয়েটির বিয়ে হয়েছিল। শাশুড়ি মা কোনো ভাবে মেয়েটির আগের সম্পর্কের ব্যাপারে জানতে পারে, সেই নিয়ে রেগুলার খোঁটা দিত। সহ্য করতে না পেরে মেয়েটা গলায় দড়ি দেয়।

সিগারেট শেষ করে তৃষ্ণার মুখের দিকে তাকাল অরিত্র। কী নিষ্পাপ একটা মুখ! অথচ ওই মুখের আড়ালে কী পাপ লুকিয়ে আছে? ভাবতেই ওর শরীর শিউরে উঠল। খুব ক্লান্ত লাগছে ওর। জানালার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা বাতাস রুমে এসে ঢুকছে। সে সোফায় হেলান দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওর দুটো চোখ ধীরেধীরে বুজে এল।

রাতের বেলায় সাত নম্বর গলিটা সচরাচর এড়িয়েই চলে অরিত্র। দশটার পরে এই গলিতে লোক দেখা যায়না। রায়টের সময় তিন তিন খানা ডেড বডি আবিষ্কার হয়েছিল এই গলির ভিতরে। একটা দেখেছিল সে। ধারালো কিছু দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয়েছিল লোকটাকে। কী বিভৎস লাগছিল! সেই থেকে আজো এই গলিটা দিয়ে পেরুলে ওর গা ছমছম করে ওঠে। কিন্তু এই গলিতে সে কিভাবে এল? কেনই বা এল কিচ্ছু বুঝতে পারলনা অরিত্র। ওর যতদূর মনেপড়ে সে সোফায় হেলান দিয়ে শুয়ে পড়েছিল, তারপর ঘুমের ঘোরে হাঁটতে শুরু করেছিল কি? নাকি কেউ ওকে তুলে এনেছে? ওর বুকটা ধক করে উঠল। পকেট থেকে মোবাইল বার করল। রাত দুটো বাজে। ফোন করতে গিয়ে বুঝল মোবাইলে নেটওয়ার্ক নেই। ফোনটা নামিয়ে রাখছিল অরিত্র ঠিক তখনই ওর ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। সামনে তাকিয়ে দেখল একটা কুকুর যেন গলিটা দিয়ে পেরিয়ে গেল। ফোনটা হাতে তুলে নিল অরিত্র। ওপাশ থেকে মেয়েলি গলায় কেউ বলে উঠল, "কেমন আছো অরিত্র? ফুলশয্যার রাত কেমন কাটছে?"
অরিত্র ভ্যাবাচ্যাকা খেল। বলল, "কে বলছেন? আমি তো আপনাকে ঠিক...?"
মেয়েটা হাসল। বলল, "আমি সোমা বলছি। এত তাড়াতাড়ি আমাকে ভুলে গেলে অরিত্র? তোমার মনে পড়ছেনা, প্রথম ফুলশয্যাটা তুমি আমার সঙ্গেই করেছিলে?"
অরিত্রর বুকটা ধক করে উঠল। বলল, "হ্যাঁ মনেপড়েছে। কেমন আছো? এতদিন পরে হঠাৎ আমার কথা মনেপড়ল?"
সোমা বলল, "মনেকরার মতো ব্যবহার তুমি আমার সঙ্গে করেছিলে নাকি? তোমার জন্য আমার জীবন নষ্ট হয়ে গেল।"
অরিত্র ভ্যাবাচ্যাকা খেল। বলল, "মানে? কোথায় আছো তুমি?"
রহস্য ময় গলায় সোমা বলল, "আমি আর নেই অরিত্র, আমি আর নেই।"
ফোন কেটে গেল। এখোনো টাওয়ারের কোনো সিগন্যাল দেখা যাচ্ছেনা। ভট করে মাটিতে বসে পড়ল অরিত্র। গলির এক কোনায় দাঁড় কাকের মতো ল্যাম্পপোষ্ট টা ঝুলে আছে। তার নিচে ফড়ফড় করে উড়ে বেড়াচ্ছে একটা বাদুড়। একটা বোঁটকা গন্ধ কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে। সোমা ছিল ওর প্রথম প্রেম। যৌবন তখন শরীরে টগবগ করে ফুটছে। সম্পর্ক ভেঙ্গে দেবে ভয় দেখিয়ে একদিন এই সোমাকে সে বিছানায় আসতে বাধ্য করেছিল। যদিও সম্পর্ক টেকেনি। শরীর পাওয়ার পরে আর সোমার প্রতি কোনো ইন্টারেস্ট ওর থাকেনি। শুনেছিল সোমার নাকি বিয়ে হয়েছে। তবে কি?

"অরিত্র ভাল আছো তো?" কাঁধের উপরে একটা ঠান্ডা স্পর্শ পেল অরিত্র। চমকে পিছনে তাকাতেই যা দেখল তাতে ওর গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। একটা মেয়ে, শরীরটা বিভৎস ভাবে পোড়া। ব্লাউজ ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়েছে পোড়া স্তন। গা থেকে বেরিয়ে আসছে বিকট বোঁটকা গন্ধ। ওর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। ছিটকে খানিকটা সরে এল অরিত্র। বলল, "কে আপনি? আমাকে চিনলেন কিভাবে?"
মেয়েটা বলল, "আমি তোমার অনুপমা অরিত্র। তোমার মনেপড়েনা, ইউনিভার্সিটিতে আমি তোমার লাভার ছিলাম।"
অরিত্রর বুকটা ধক করে উঠল। বলল, "তোমার এরকম অবস্থা কিভাবে হল?"
অনুপমা বলল, "তুমি তো জানো অরিত্র, তোমাকে বিশ্বাস করে আমি আমার সব কিছু দিয়েছিলাম, কিন্তু আমার বিয়ে হয়ে গেল আর একজনের সঙ্গে। ওরা জানতে পেরে গেল, তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কের কথা, আর তাই গায়ে কেরোসিন ঢেলে...! আমার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই অরিত্র। তুমি প্লিজ আমাকে তোমার বাড়িতে নিয়ে চলো।"

অরিত্র ভয় পেয়ে গেল। উত্তর না দিয়ে গলি বেয়ে সে হাঁটতে শুরু করল। ওর পিছনে পিছনে ওর দিকে এগিয়ে আসতে লাগল অনুপমা। বলতে লাগল, "কি হল অরিত্র, পালাচ্ছ কেন? আমাকে তো তুমিই অসতী করেছ, আমাকে বাড়ি নিয়ে যাবেনা?"
আর হাঁটতে পারলনা অরিত্র। সে ছুটতে শুরু করল। পিছন থেকে ভেসে আসতে লাগল একটা মেয়েলি কন্ঠের কান্নার শব্দ। বেশ খানিকটা ছুটে যাওয়ার পরে একটা কিছুতে হোঁচট খেয়ে সে মাটিতে আছড়ে পড়ল। কে যেন ওর হাত ধরে উপরে টেনে তুলল। বলল, "ওঠ অরিত্র। তোমার লাগেনি তো?"
মাটি থেকে উঠে দাঁড়াল অরিত্র। আকাশে ফুটফুটে চাঁদ রয়েছে। জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। ওপাশে তেঁতুল গাছের মাথার উপরে বসে কতগুলো পাখি হুটোপুটি শুরু করেছে। জ্যোৎস্নার আলোয় সামনে তাকিয়ে সে যা দেখল তাতে ওর চোখ দুটো ছিটকে বেরিয়ে এল। ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা শাড়ি পরা আস্ত নরকঙ্কাল। খোনা গলায় কঙ্কালটা বলে উঠল, "অনেকদিন পরে তোমার সঙ্গে দেখা হল অরিত্র, তুমি তো আর আমার কোনো খোঁজই রাখোনা।"
জড়ানো গলায় অরিত্র বলল, "কে আপনি? আমাকে কিভাবে চিনলেন?"
মেয়েটা বলল, "আমি চন্দ্রিমা গো, আমাকে ভুলে গেলে তুমি। সেবার মেলার সময় আমাকে মাঠে নিয়ে গিয়ে কত কিছু করলে? সব ভুলে গেলে?"
তোতলাতে তোতলাতে অরিত্র বলল, "তু...তুমি এএ...রকম কিভাবে হলে?"
চন্দ্রিমা বলল, "তুমি তো আমার সঙ্গে সব কিছু করে শহরে চলে গেলে, আমার আর কোনো খোঁজই রাখলেনা, এদিকে আমার পেটে বাচ্চা চলে এল। লোক লজ্জার ভয়ে আমি গলায় দড়ি দিয়ে..." একটু থেমে বলল, "চলো, আমি তোমার বাড়িতেই যাচ্ছিলাম। এবার থেকে তোমার বাড়িতেই থাকব।"
অরিত্রর শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। বলল, "প্লিজ তুমি চলে যাও। আমি যা করেছি ভুল করেছি। আমাকে ক্ষমা করে দাও।"
পিছন থেকে এবারর সোমার কন্ঠস্বর শুনতে পেল অরিত্র। সোমা বলল, "চলে যাবার তো আমরা আসিনি অরিত্র।"
অনুপমা বলল, "আজ থেকে আমরা তোমার বাড়িতেই থাকব।"
চন্দ্রিমা বলল, "হ্যাঁ, তোমার বউ হয়ে থাকব। তুমি আমাদের বউয়ের মর্যাদা দিয়ে রাখবে।"
তিনটা অবয়ব ধীরে ধীরে ওর দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। একজনের মুখ থেকে বেরিয়ে আছে লকলকে জিভ। আর একজনের গোটা শরীরটা বিভৎস ভাবে পোড়া। তৃতীয় জন একটা আস্ত নরকঙ্কাল। ভয়ে চোখ বুজে ফেলল অরিত্র। ওর বুকের ভিতরটা হিম হয়ে গেল। চিৎকার করে বলতে লাগল, "প্লিজ আমাকে ক্ষমা করো, তোমরা চলে যাও প্লিজ।"
টের পেল কয়েকটা শরীর যেন ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। ওর শরীরটাকে পিষ্ট করছে কয়েকটা হাত। ওর ঠোঁট গুলোকে মাড়িয়ে দিচ্ছে কয়েকটা হিমশিতল ঠোঁট।

"এখানে শুয়ে আছো?" তৃষ্ণার ডাকে চোখ খুলল অরিত্র। দেখল সে সোফার উপরে শুয়ে আছে আর ওর গায়ের উপরে উঠে ওকে জড়িয়ে ধরেছে তৃষ্ণা। ওর বুক ধুকপুক করছে। তবু বলল, "কাল রাতে সিগারেট খেতে সোফায় এসে বসেছিলাম, টায়ার্ড ছিলাম সম্ভবত তাই এখানেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।"
তৃষ্ণা হাসল। বলল, "আর এত ঘুম কাতুরে হলে চলে? এবারে তো একটু সচেতন হতে হবে। কাল রাতেও তো করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লে, তারপর সব নোঙরা আমাকেই পরিষ্কার হল!"

কথাটা শুনে অরিত্র চমকে উঠল। সোজা তাকাল তৃষ্ণার দিকে। ওর ঠোঁট কেঁপে উঠল। একবার ভাবল জিজ্ঞেস করে ওই নোঙরার ভিতরে রক্ত ছিল কীনা। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে স্বপ্নে সে যা দেখল তারপর আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস হলনা ওর।

(সমাপ্ত)

©All rights reserved to sankha subhra nayak

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন