মরন কামড়
শঙখ শুভ্র নায়ক
ছাতিমপুরে মড়ক লেগেছে। গত প্রায় একমাস ধরে ভয়ানক ডেঙ্গি চলছে এখানে। দেখতে দেখতে প্রায় গোটা গ্রামটাই প্রায় উজাড় হয়ে গেল। অনেকে গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে, আর যারা আছে তারা মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। ছাতিমপুরে কান পাতলে এখন ঝোঁপেঝাঁড়ে কুকুর বেড়ালের কান্না আর ঘরের ভিতরে মানুষের গোঁগানির আওয়াজ ছাড়া কিছুই শোনা যায়না। খুঁজে দেখলে হয়তো ভাগাড়ে দু'একটা হাত-পা খুবলানো, ভুঁড়ি ফেটে যাওয়া, কিম্বা ফুলে ঢোল হয়ে যাওয়া লাশের দেখাও মিলতে পারে।
এখন রাত দশটা বাজে। ট্রলি নিয়ে পলাশ বাজার হাস্পাতালে এসেছে রতন। আজকাল ওর ভীষন ব্যস্ততা। ছাতিমপুরের কাছাকাছি এই একটাই হাস্পাতাল। মানুষজন সব ডাঁই হয়ে ওখানেই ভর্তি হয়। হাস্পাতাল উপচে পড়ছে, তবু রুগি আসার বিরাম নেই। সকাল থেকে সারাদিন এই কাজই করতে হয় রতনকে। হাস্পাতালে রুগি পৌঁছে দেওয়া আর নিয়ে আসা। এই কাজ করে হাতে দুটো পয়সা আসছেও আজকাল, তবে এখনের কাজটা অবশ্য আলাদা। পলাশপুরের মর্গ বেশ ছোট বেশি লাশ রাখা যায়না, এদিকে লাশ উপচে পড়ছে, কত লাশ যে বেওয়ারিশ তার ঠিক ঠিকানা নেই, এগুলোকেই ওকে চালান করতে হবে এখান থেকে দশ কিলোমিটার দূরের গড়বেতা হাস্পাতালে। ওর ট্রলির হ্যান্ডেলে একটা এল ই ডি লাইট লাগানো তাই পথ চলতে অসুবিধে হয়না। তবে রাতের বেলা ভয় কি লাগেনা? এত নিঃস্তব্ধতা চারপাশে যে রাতের বেলা তো দূর দিনের বেলাতেই ভয় লাগে।
মর্গ থেকে তিনখানা লাশ পেয়েছে রতন। দুখানা লাশ বাসি, আর একটা টাটকা নধর মেয়ের লাশ। লাশগুলো নিয়ে ট্রলিতে চেপে বসল রতন। প্যাডেলে চাপ দিল। বোঝা বেশি নেই, তাই তরতর করে এগিয়ে চলল সে। পলাশপুর থেকে গড়বেতা যাওয়ার রাস্তাটা অনেকটাই জঙ্গলের মধ্য দিয়ে। দুপাশের গাছগুলোর দিকে তাকালে মনেহচ্ছে অন্ধকারে কে যেন বিশাল বিশাল হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্যাডেল করতে করতে একটু গা ছমছম করছিল রতনের। গাছেগাছে ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে। কোথা থেকে একটা গায়ের ছাল ওঠা ঘেও কুকুর ট্রলির আগে আগে ছুটে চলেছে। আকাশে চাঁদ নেই, তাই চারপাশটাকে কালিঢালা অন্ধকার লাগছে।
ফ্যাঁস! হঠাৎ ট্রলির টায়ার ফেঁসে গেল। সামনের চাকায় কাঁটা-টাঁতা কিছু ঢুকল বোধহয়। গাড়ি থেকে নেমে এল রতন। পিছনে তাকিয়ে দেখল বস্তার বাঁধন খুলে মেয়ের লাশটার মুখটা বেরিয়ে পড়েছে। হাঁ হয়ে আছে মুখটা। দুটো মাছি ভনভন করে উড়ছে মুখের উপরে। রতনের বুকের ভিতরটা কেমন যেন শিরশির করে উঠল। মেয়েটার আধখোলা ঘোলাটে চোখ, আর শুকনো হয়ে যাওয়া ঠোঁট ওকে মাতাল করে দিল। এই নিয়ে তিনবার এই অবস্থাটা হল রতনের। মেয়ের লাশ দেখে শরীরের নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলা। সামনেই মতিগঞ্জের শ্মশান। ওখানে একটা চালা রয়েছে। ওই চালার ভিতরে কাজটুকু সেরে ফেলা যাবে।
ট্রলিটাকে টানতে টানতে শ্মশানে নিয়ে গেল রতন। এর আগেও দু'খানা মেয়ের লাশ দেখে ওর যৌনক্ষুধা জেগে উঠেছিল। লাশের সঙ্গে সঙ্গম করার একটা আলাদা তৃপ্তি আছে। হ্যাঁ, অনেক কিছুই সহজে হয়না। রাইগর মর্টিস না কি যেন বলে সেটা হয়ে যাওয়ার পরে চামড়া শক্ত হয়ে যায়। সহজে ভিতরে ঢোকা যায়না। তেল টেল দিয়ে পিচ্ছিল করতে হয়। কিন্তু এই জোর করতেই ওর আনন্দ লাগে। লাশ প্রতিবাদ করেনা। তাই কোনো রকম চিৎকার চেঁচামেচি ছাড়াই সে সামনে দিয়ে পিছন দিয়ে জোর করে ঢুকে যেতে পারে।
দেখতে দেখতে চালার কাছে এসে পৌঁছে গেল রতন। ট্রলিটা থামিয়ে চালার মেঝেটা পরিষ্কার করল। ওর হাতে একটা ছোট টর্চ রয়েছে, সাপখোপ এলে বেশ বুঝতে পারবে। দুপাশে টর্চ মেরে দেখে নিল কাছাকাছি কেউ আছে কীনা। না যতদূর দেখা যাচ্ছে কোনো জনমনিষ্যি নেই, কেবল খানিকটা দূরে একটা কালো বেড়াল বসে ড্যামড্যাম করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। হাত তুলে দু'বার "হ্যাট হ্যাট" করতেই সেটা পালিয়ে গেল।
লাশটাকে ট্রলি থেকে নামিয়ে মেঝেতে শোয়াল রতন। বেশ ভারী লাশ। এরা ঠিকঠাক খেতে পায়না, তবু বেশ ওজন। একবার টর্চ ফেলে লাশটাকে দেখে নিল। লাশটার পরনে একটা ছেঁড়া চুড়িদার আর একখানা কালি লাগা প্যান্ট। সম্ভবত কোনো ভীখিরির লাশ। কেউ তুলে এনে হাস্পাতালে ভর্তি করে দিয়েছিল। একটা অষুধ অষুধ গন্ধ বার হচ্ছে লাশটার গা থেকে। তবে ভীখিরি হলেও বেশ কচি আর নধর। ওর জীভ দিয়ে জল পড়তে লাগল। ওর ট্রলিতে তেল রাখাই থাকে। কোথাও স্নান করার দরকার হলে সেরে নেয়।
লাশটার পোশাক খুলে নগ্ন করতে ওকে বেশ একটু পরিশ্রম করতে হল। হাত-পা গুলো কেমন বেঁকে শক্ত হয়ে গিয়েছে, তবে ভাগ্য ভাল মরার আগে পা দুটো ফাঁক করে মরেছে, নাহলে ওগুলো ফাঁক করতে বেশ কষ্ট করতে হত।
শিশি থেকে তেল নিয়ে তেলটাকে ঠিকঠাক জায়গায় লাগাল রতন। বেশ কিছুক্ষণ ধরে ঘসেঘসে জায়গাটাকে পিচ্ছিল করল। এবারে ঠিক আছে, এবারে সে অনায়াসেই মেয়েটার শরীরের ভিতরে ঢুকে পড়তে পারবে। আর অপেক্ষা সহ্য হচ্ছেনা রতনের। নিজেকে নগ্ন করে ধীরেধীরে মেয়েটার পায়ের ফাঁক দিয়ে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করল। মেয়েটা সম্ভবত কুমারী ছিল, তাই প্রথমে পরিশ্রম করতে হল। বার তিনেক চেষ্টা করার পরেই ফট করে কিছু একটা ফেটে গেল। এবারে অনায়াসেই ভিতরে ঢুকে পড়ল সে।
করতে করতে একটা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল রতন। বাইরে ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে। চারপাশটা যেন মরুভূমির মতো নিঃস্তব্ধ। কোথা থেকে একটা খট খট খট শব্দ যেন ভেসে আসছে। হঠাৎ ওর পিছনে বেড়ালটা ডেকে উঠল মিউ করে। পিছন ফিরে "হ্যাট হ্যাট" করে বেড়ালটাকে তাড়াতে গিয়ে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল রতন, সামনে তাকাতেই ওর হাড় হিম হয়ে গেল। মেয়েটা চোখ খুলেছে। মরা ছাগলের মতো ঘোলাটে দুটো চোখ। মেয়েটার ঠোঁট গুলো তিরতির করে কাঁপছে। কী এক জিঘাংসা যেন লুকিয়ে রয়েছে মেয়েটার মুখের মধ্যে। কী ভয়ংকর লাল হয়ে উঠেছে মুখটা। মেয়েটার শরীর থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করল রতন। পারছেনা, ভিতরে আটকে গিয়েছে। মেয়েটা ওর দুটো পা দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে রতনের কোমর। মেয়েটার দুটো হাত উঠে আসছে রতনের গলা লক্ষ্য করে। সাঁড়াশির মতো হাতগুলো চেপে ধরছে রতনের গলা। বাঁচার জন্য ছটপট করছে রতন। ওর চিৎকার ধীরেধীরে গোঁগানিতে পরিনত হচ্ছে। রতনের পিছনে এখোনো কালো বেড়ালটা ডাকছে। পরম উল্লাসে সে ডেকেই চলেছে…
হাস্পাতালে দাঁড়িয়ে ডঃবোস জুনিয়ার ডাক্তারদের ধমক দিচ্ছিলেন, "এমন ভুল কিভাবে হয়? তোমরা আগে বুঝতে পারোনি মেয়েটা বেঁচে ছিল?"
মাথা নিচু করে জুনিয়ার ডাক্তার প্রতিম বলল, "স্যার, আমরা যখন চেক করেছিলাম তখন মেয়েটার হার্ট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।"
ডঃবোস বললেন, "তবুও কিছুক্ষণ অবজারভেশনে রাখার দরকার ছিল। পরিমানে খুব কম হলেও এমন কেস ঘটেই যেখানে হার্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে কিছুক্ষণ পরে হার্ট আবার চালু হয়ে যায়।"
ডঃপ্রতিম বলল, "স্যার, আমরা দু'বার পার্লস বিট চেক করেছিলাম।"
ডঃবোস বললেন, "এখানেও তোমরা ভুল করেছ। পার্লস চেক করেছ, কিন্তু দায়সারা ভাবে, পার্লস বিট যদি খুব লো হয়, তখন মানুষের হাতের শিরাতে চাপ দিয়ে রাখলেও ঠিকঠাক বোঝা যায়না। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে, মেয়েটার পার্লস বিট খুব স্লো ছিল, আর মেয়েটার শরীরের মাংস পেশিগুলোও ঠিকঠাক রক্তের অভাবে শক্ত হতে শুরু করে দিয়েছিল, তোমরা ভেবে নিয়েছিলে বোধহয় রাইগর মর্টিস সেট হচ্ছে।"
প্রতিম মাথা নামাল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে দাঁড়ালেন ডঃবোস। এত লাশ দেখলে জুনিয়ার ডাক্তাররাই বা কতক্ষণ ঠিক থাকবে? তারমতো সিনিয়ার ডাক্তারেরই যেখানে মাথার ঠিক রাখা দায় হয়ে পড়েছে। হঠাৎ পিছন থেকে প্রতিম বলে উঠল, "স্যার, রতনের কেসটা কিন্তু এক্সপ্লেন করলেন না?"
ডঃবোস বললেন, "রতনের মধ্যে নেফ্রোমেনিয়াক নামে একটা ডিজিজ ছিল। সম্ভবত লাশ বইতে বইতে ওর মধ্যে লাশেদের প্রতি কাম স্পৃহা জেগে উঠতে শুরু করেছিল, আর তারই ফলশ্রুতিতে সে মরা মেয়েগুলোকে ধর্ষণ করত। কিন্তু রতনও বুঝতে পারেনি এই মেয়েটা তখন মরেনি। সম্ভবত ধাক্কাধাক্কিতে অল্পক্ষণের জন্য মেয়েটার জ্ঞান ফিরেছিল। তখনই মরন কামড়টা সে দিয়ে গিয়েছে। নিজে তো মরেইছে, তারসঙ্গে রতনের গলা চেপে ধরে ওকেও সঙ্গে নিয়ে গিয়েছে।"
(সমাপ্ত)
©All rights reserved to sankha subhra nayak

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন