বৃহস্পতিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১৯

স্বপ্নযাত্রা

স্বপ্নযাত্রা

শঙখ শুভ্র নায়ক


মধ্যরাতে হঠাৎ চোখ খুলতেই সৌরভ দেখতে পেল, সে একটা ধানের ক্ষেতের মাঝখানে পড়ে আছে। আকাশে জ্বলজ্বলে আধখানা চাঁদ উঠেছে। ওর কোলের উপরে লাফালাফি করছে একটা ইঁদুর। ওপাশে বট গাছের পাতায় জোনাকি জ্বলজ্বল করছে। আর গাছের ডালে বসে ওর কোলের দিকে শ্যেনদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে একটা কালো কুচকুচে প্যাঁচা।

বসে বসে বেশ খানিকক্ষণ ধরে কী যেন ভাবল সৌরভ। এখানে সে কিভাবে এল? ওর কী হয়েছিল? অবশেষে সে যখন শিওর হল, এটা বাস্তব নয়, একটা স্বপ্নমাত্র, তখন মাটি থেকে উঠে দাঁড়াল। চারপাশে একবার তাকিয়ে বুঝতে পারল, স্বপ্নের মধ্যে সে পৌঁছে গেছে ওর পুরানো গ্রামে। এই গ্রামেই ওর বাল্যকাল কেটেছে, এখানেই ওর বড়ো হয়ে ওঠা। বয়ঃপ্রাপ্ত হবার পরে এই গ্রামেরই মেয়ে শিঞ্জিনীর সঙ্গে ওর সম্পর্ক হয়েছিল। এই ধানক্ষেত, ওই সরষে ক্ষেত, কিম্বা দূরের ওই বাঁশ বাগানের আড়ালের পোড়ো বাড়িতে একদিন শিঞ্জিনীকে কত আদরই না করেছে! ওকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কত ভালোবাসাই না চুরি করে নিয়েছে!
গ্রামের ব্রিলিয়ান্ট ছেলে ছিল সৌরভ। স্কুল থেকে ঝাঁ চকচকে রেজাল্ট নিয়ে পাস করার পরে ভর্তি হয়েছিল বিটেক কলেজে। কলেজ থেকে পাস করে বেরোনোর পরেই হঠাৎ বিদেশ থেকে দুর্দান্ত একখানা অফার পেয়ে সে পাড়ি দিয়েছিল লন্ডনে। কিন্তু এখানে আসার পরে শহরের এই গতিময় জীবনযাত্রার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে খাওয়াতে সে ভুলে গিয়েছিল নিজের অতীতের কথা। ভুলে গিয়েছিল নিজের মা-বাবার কথা এমনকি শিঞ্জিনীর কথাও।

কোম্পানিতে কাজ করতে করতেই একদিন কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টার জেকবের মেয়ে জেনির সঙ্গে ওর ঘনিষ্টতা হয়। জেনি ডিভোর্সি। ওর চেয়ে বয়সেও বছর কয়েকের বড়ো। কিন্তু অগাধ সম্পত্তির মালিক। তাই ওকে বিয়ে করতে পারলে সে যে একটা বড়ো দাঁও মেরে দেবে সেকথা খুব ভাল করেই বুঝতে পেরেছিল সৌরভ। সুতরাং সিদ্ধান্তটা নিতে লেট করেনি।

সেই দিনের কথা ছবির মত স্পষ্ট মনে আছে সৌরভের। জেনিকে প্রপোজ করার জন্য একটা কফিশপে ডেকেছিল সৌরভ, হঠাৎ ওর মোবাইলে শিঞ্জিনীর কল ঢুকল। বিরক্ত ভাবে ফোনটা রিসিভ করল সৌরভ। এরকম একটা টাইমে শিঞ্জিনীর কল এলে সত্যিই মুডটা নষ্ট হয়ে যায়। কড়া গলায় বলল, "কি হল? এই টাইমে কল করলে কেন?"
ওইপ্রান্ত থেকে শিঞ্জিনীর স্বর ভেসে এল, "কি করছ তুমি? এমনিতে তো আমার ফোন ধরই না, আজ যদিও বা ধরলে এত বিরক্তি কেন দেখাচ্ছ?"
সৌরভ বলল, "আমি অফিসে কাজ করছি, এখন আমাকে ডিস্টার্ব করো না। কি বলতে চাইছ তাড়াতাড়ি বলো?"
শিঞ্জিনী উত্তর দিল, "তুমি তো জানোই আমি কি বলতে চাইছি। তুমি কবে ফিরবে?"
সৌরভ বলল, "আমি আর ফিরব না, এখানেই বিয়ে করে সেটেল হব। আর কিছু বলার আছে?
শিঞ্জিনী সেদিন কাঁদতে কাঁদতে বলল "প্লিজ এরকম করোনা সৌরভ। তুমি না ফিরলে আমি মরে যাব। আমাকে সুইসাইড করতে হবে।"
কথাটা শুনেই সৌরভের মেজাজটা রুক্ষ হয়ে গেল, বলে উঠল "হোয়াট দা হেল! তোমার কত টাকা চাই, বলো? বাট আমাকে আর ডিস্টার্ব করো না।"
শিঞ্জিনী বলল, "প্লিজ সৌরভ, আমাদের ভালবাসাকে এভাবে অপমান করো না। তোমাকে আমি এত দিন বলিনি, আজ বলতে বাধ্য হচ্ছি, আমি প্রেগন্যান্ট, তোমার বাচ্চার মা হতে চলেছি।"
সৌরভ থমকে গেল, জিজ্ঞেস করল, "কি, কি বলছ এসব? অপারেশন করাওনি কেন? কালই গিয়ে অপারেশন করিয়ে এসো। যা খরচ লাগে, আমি দিয়ে দেব। কিন্তু তোমার সন্তানের দায়িত্ব নিতে পারব না।"
শিঞ্জিনী আর্দ্রস্বরে বলল, "তা আর সম্ভব নয়, বাচ্চাটা অনেক বড়ো হয়ে গেছে। এরপর অ্যাবর্শন করাতে গেলে আমি বাঁচবনা।"
সৌরভ চিৎকার করে বলল, "তাহলে তুমি মরো, আই কান্ট ডু নাথিং।"

ফোন কেটে দিল সৌরভ। ওর দিকে তাকিয়ে জেনি বলল, "এনি প্রবলেম?"
নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল সৌরভ বলল, "নো নো, এভরিথিং ইজ অলরাইট।"

তারপর জেনির আঙুলে একটা আঙটি পরাতে পরাতে বলে উঠল, "উইল ইউ মেরি মি?"
মুখ চাপা নিল জেনি। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বলল, "রিয়েলি? আই ক্যান্ট বিলিভ দিস!"
সৌরভ বলল, "ইয়েস, রিয়েলি আই লাভ ইউ।"
সৌরভকে জড়িয়ে ধরে জেনি বলল, "আই লাভ ইউ টু মাই লাভ।"

সেদিনই শিঞ্জিনীর সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল সৌরভের। সে ভেবেছিল, ওর কাছ থেকে এরকম প্রত্যাখ্যান পেয়ে শিঞ্জিনী হয়তো ওর কথা ভুলে যাবে। অন্য কাউকে বিয়ে করে নেবে। যদি ওর বিয়ের জন্য কিছু টাকা চায়, সৌরভ না হয় সেইটুকু সাহায্য করবে, কিন্তু ওকে যে এমন একটা সংবাদ শুনতে হবে একথা সে কল্পনাও করেনি।

সেদিন জেনির সঙ্গে প্রথম রাত্রি ছিল সৌরভের। জেনির সুসজ্জিত রুমে, সুশোভিত বিছানায় একটা হালকা ড্রেস পরে সে শুয়েছিল। হঠাৎ ওর ম্যাসেঞ্জারে কল এল। ওর বাল্যকালের বন্ধু রেহান ফোন করেছিল। ফোনটা ধরতেই টুকিটাকি কিছু কথা সারার পরে হঠাৎ রেহান বলল, "একটা কথা জিজ্ঞেস করব?"
সৌরভ বলল, "হ্যাঁ, বল, প্রবলেম কি?"
রেহান বলল, "তোর সঙ্গে কি ইদানিং শিঞ্জিনীর কোনো ঝগড়া হয়েছিল?"
এইসময় শিঞ্জিনীর প্রসঙ্গ উঠতে বেশ বিরক্তই হল সৌরভ। বলল, "কেন বলতো?"
রেহান বলল, "কেন যে শিঞ্জিনী এতবড় ডিসিশনটা নিল কেউ বুঝতে পারছে না।"
রেহানের কথা বলার ধরণে সৌরভ চমকে উঠল। বলল, "এতবড় ডিসিশন মানে? কি হয়েছে শিঞ্জিনীর?"
রেহান অবাকভাবে বলল, "তুই কি কিছুই জানিস না? কাল রাতে শিঞ্জিনী ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে সুসাইড করেছে।"
সৌরভ চিৎকার করে উঠল, "হোয়াট! কি বলছিস তুই এসব? শিঞ্জিনী...." নিজের কথা শেষ করতে পারল না সৌরভ।
রেহান বলল, "আই অ্যাম সরি, তাহলে তুই বোধহয় খবরটা পাসনি। তবে যা সত্যি সেটাকে মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।"

ফোন কেটে দিল রেহান।
সৌরভের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে জেনি বলল, "এনি প্রবলেম সুইটহার্ট?"
সৌরভ বলল, "ইয়েস আই হার্ড এ ব্যাড নিউজ অ্যাবাউট মাই মাদার। সি ইজ ভেরি ইল। প্লিজ গিভ মি সাম টাইম।"
জেনি বলল, "ইটস ওকে সুইট হার্ট। টেক ইওর টাইম।"

তারপর প্রায় একটা বছর কেটে গেছে। বড়বড় কাজের জন্য এরকম ছোটখাটো একটা দুটো আত্মবলিদান দিতেই হয়, একথা ভেবেই শিঞ্জিনীর কথা ভুলে গেছে সৌরভ। জেনির সঙ্গে একটা আনন্দময় বৈবাহিক জীবন কাটাচ্ছে। তবু যে ওর মাঝেমাঝে অতীতের কথা মনে পড়ে না তা নয়, ওর মা কখনো সখনো ফোন করলে কান্নাকাটি করে। ওকে বাড়ি ফিরতে বলে, কিন্তু সৌরভ সাফ জানিয়ে দিয়েছে বাড়ি ফেরা আর ওর পক্ষে সম্ভব নয়। সে যা টাকা পাঠাচ্ছে দরকারে সেটা আরো বাড়াবে, তবু ওকে বাড়ি ফেরার জন্য যেমন জেদাজেদি না করে। শিঞ্জিনীর কথাও মনে পড়ে কখনো সখনো। এই তো কালই শিঞ্জিনীর প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী ছিল। হঠাৎই ওর কথা মনে পড়তেই সে বিহ্বল হয়ে গেল। জেনিকে ঠিকঠাকভাবে আদরই করতে পারলনা। তারপর কখন সে ঘুমিয়ে পড়েছে সে নিজেও জানে না। ঘুমোতেই এই স্বপ্ন।

পিঠে টোকা পড়তেই হঠাৎ পিছন ফিরল সৌরভ। তারপর সামনে তাকিয়েই সে চমকে উঠল। ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে শিঞ্জিনী। সে বলে উঠল, "তুমি? তুমি এখানে কিভাবে এলে?"
শিঞ্জিনী বলল, "ও মা! কি বলছ তুমি? এটা তো আমার বাড়ি, আমি এখানে আসতে পারিনা?"
সৌরভ বলল, "কিন্তু আমার স্বপ্নের ভিতরে তুমি কি করছ?"
শিঞ্জিনী হাসল।বলল, "স্বপ্নটা তোমার হতে পারে, কিন্তু এই স্বপ্নের নিয়ন্ত্রা যে আমি। তাই আমি যখন চাইব এখানে আসব, যখন চাইব চলে যাব," একটু থেমে বলল, "তোমার মনে আছে সৌরভ তুমি সেদিন আমাকে কি বলেছিলে, 'তুমি মরো, আই কান্ট ডু নাথিং।' কিন্তু মানুষ কি সহজে মরতে চায় গো, কত লাঞ্ছনা ভোগ করার পরে মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নেয়, সেটা কি তুমি জানো?"
সৌরভ বলল, "তুমি সুসাইড করেছ, তাতে আমি কি করতে পারি? আমার দোষ কি?"
শিঞ্জিনী বলল, "তোমার কোনো দোষ নেই, সব দোষ তো আমার, সবথেকে বড় দোষ করেছিলাম তোমাকে অন্ধের মত বিশ্বাস করে, আর তার মূল্য আমাকে নিজের জীবন দিয়ে শোধ করতে হয়েছিল। বাড়ির অমতে গিয়ে তোমাকে ভালো বেসেছিলাম। পাড়া প্রতিবেশীদের বাঁকা চোখকে অগ্রাহ্য করে গর্বের সাথে ঘুরে বেড়াতাম। আমার বিশ্বাস ছিল তুমি একদিন ফিরবে, আমাদের ভালোবাসাই তোমাকে আবার আমার কাছে ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু তুমি আমাকে ভুলেই গেলে..."
সৌরভ কথার মাঝেই অস্থিরভাবে বলে উঠল, "কেন এসেছ আমার স্বপ্নে? তুমি চলে যাও, আমি তোমাকে সহ্য করতে পারছিনা।"
শিঞ্জিনী হাসল। বলল, "এত রেগে যাচ্ছ কেন? আমি যে তোমাকে খুব ভালোবাসি গো, কোনোদিন তোমাকে না জানিয়ে কিচ্ছু করিনি। শুধু সেইদিন আর কিছু ভাবার সময় পাইনি। তাই আজ তোমাকে দেখাতে এসেছি আমি ঠিক কিভাবে সেদিন মারা গিয়েছিলাম।"
সৌরভের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বলল, "তুমি কি করতে চাও আমাকে নিয়ে?"
শিঞ্জিনী বলল, "এমন কিছুই না, সেদিন আমি ট্রেনের নিচে কাটা পড়েছিলাম, আজ তোমার স্বপ্নে তুমি ট্রেনের নিচে কাটা পড়বে, অনুভব করবে মৃত্যু যন্ত্রণা ঠিক কেমন হয়। কেমন ভাবে হৃদপিন্ড থেমে যায়, কেমন ভাবে পা দুটো শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরেও কাঁপতে থাকে, মাথাটা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে ঠিক কেমন লাগে।"
সৌরভ চিৎকার করে উঠল, "আমি জানতে চাইনা, তুমি চলে যাও।"
শিঞ্জিনী বলল, "তা কি করে হয়? সেদিন তো শুধু আমি একাই মারা যাইনি, আমার সঙ্গে আমাদের সন্তানও মারা গিয়েছিল সেদিন। দু'দুটো মৃত্যু ঘটেছিল সেদিন তোমার জন্য, তাই এটুকু তো অনুভব করতেই হবে।"
সৌরভ অনুনয়ের সুরে বলল, "আমার ভীষণ ভয় লাগছে। প্লিজ আমাকে ছেড়ে দাও।"
শিঞ্জিনী বলল, "ভয় পেওনা সোনা। চলো আমার হাত ধরে চলো। এটা তো শুধুই তোমার স্বপ্ন, এত ভয়ের কী আছে? ওই যে দেখছ ট্রেন লাইন, ওইদিকে চলো।"
সৌরভের হাত ধরল শিঞ্জিনী।
সৌরভ তখনও একই সুরে বলে চলেছে, "প্লিজ আমাকে ছেড়ে দাও। আমি যেতে চাইনা, আমি দেখতে চাইনা।"
শিঞ্জিনী বলল, "ছেড়ে দাও বললেই কি ছাড়া যায় গো? এই জোর, অধিকারবোধ এসবই তো আমি তোমার কাছে থেকেই শিখেছি। তুমি যখন আমাকে পাগলের মতো আদর করতে তখন আমিও ঠিক এইভাবেই বলে যেতাম, আর নয়, আমাকে এবারে ছেড়ে দাও, কিন্তু তুমি কি তখন আমার কথা শুনতে? আমার সতর্কবাণী সেদিন শুনলে হয়তো এইভাবে আমাকে সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে হত না।"
সৌরভ বলল, "আমাকে ক্ষমা করে দাও। তোমার দুর্বলতার আমি সুযোগ নিয়েছি বারবার। আমি তখন অন্য স্বাদে মেতে ছিলাম। কিন্তু তোমাকে এভাবে ঠকানো আমার উচিৎ হয়নি। প্লিজ আমাকে যেতে দাও।"
শিঞ্জিনী দৃঢ় স্বরে বলল, "কোথায় যাবে তুমি? ঘুম ভাঙার আগে এই স্বপ্ন থেকে তো তুমি বেরোতেই পারবেনা, আর এত সহজে তোমার ঘুম ভাঙতে আমি দেব না, এইভাবেই আর কিছুক্ষণ আমার সাথে হেঁটে চলো।"

আকাশে ফুটফুটে চাঁদ। সেই চাঁদের নিচে উড়ে বেড়াচ্ছে মেঘ আর তার নিচ দিয়ে ফরফর করে উড়ছে কয়েকটা বাদুড়। মাঠ পেরুলেই রেল লাইন। ছেলেবেলায় একদিন ওখানে কতবারই না লুকিয়ে খেলাধুলা করেছে সৌরভ। ওখানে খেলতে গিয়েই তো ট্রেনের নিচে একদিন ওর বাল্যকালের বন্ধু সৌমেন কাটা পড়েছিল। সেই দৃশ্য আজো কখনো সখনো ওর চোখের সামনে ফুটে উঠলে ভয়ে ওর শরীরটা কাঁটা দিয়ে ওঠে। না, আর ওখানে সে যেতে চায়না। আর দ্বিতীয় বার সেই দৃশ্য সে দেখতে চায়না, তবু সে যেন থামতে পারছেনা। ওর হাত ধরে ওকে সামনে দিকে টেনে নিয়ে চলেছে শিঞ্জিনী। সম্মোহিতের মতো সে এগিয়ে চলেছে ট্রেন লাইনের দিকে। ওকে নিয়ন্ত্রণ করছে ওর স্বপ্নেরই একটা চরিত্র শিঞ্জিনী। এরচেয়ে কষ্টের হয়তো আর কিছুই হতে পারেনা।

হাঁটতে হাঁটতে ওরা লাইনের উপরে উঠে এল। মাঠের বুক চিরে ট্রেন লাইনটা এঁকে বেঁকে বহুদূর পর্যন্ত এগিয়ে গিয়েছে। কোথা থেকে ভেসে আসছে একটা ঝমঝম শব্দ। লাইনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইলেকট্রিকের পোতগুলোকে অন্ধকারে ভূতুড়ে লাগছে। সৌরভের দিকে তাকিয়ে শিঞ্জিনী বলল, "যাও সোনা, তুমি ওই লাইনের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াও। আর একটু পরেই রাত দেড়টার এক্সপ্রেস আসবে। সামান্য একটু কষ্ট, তারপরেই দেখবে সব শান্তি।"
সম্মোহিতের মতো শিঞ্জিনীর আদেশ পালন করল সৌরভ। ধীরেধীরে সে রেল লাইনের মাঝে গিয়ে দাঁড়াল। বলল, "প্লিজ আমার সঙ্গে এমন করো না। আমি এই কষ্ট অনুভব করতে চাইনা।"
শিঞ্জিনী বলল, "চিৎকার করোনা। ওই দেখ ট্রেনটা আসছে, আর একটু অপেক্ষা কর, তারপরেই তো চিরশান্তি। ধাক্কায় তোমার ঘুম ভেঙে যাবে। আর আমিও তোমার স্বপ্ন থেকে চলে যাব।"
সামনে তাকাল সৌরভ। দেখতে পেল একটা ট্রেন ঝড়ের গতিতে হর্ন দিতে দিতে এগিয়ে আসছে ওর দিকে। ট্রেনের হেড লাইটের আলো সোজা ওর মুখে এসে পড়ছে। সে নড়াচড়া করার চেষ্টা করল। পারল না। ওর পা দুটো যেন লাইনের মাঝে গেঁথে গিয়েছে। ট্রেন থামানোর জন্য সে জোর গলায় চিৎকার করল, কিন্তু ট্রেনের প্রবল ঝমঝম শব্দে ঢাকা পড়ে গেল ওর কণ্ঠস্বর। ওর পা দুটো যেন লাইনের মাঝে গেঁথে গিয়েছে। ট্রেন থামানোর জন্য সে জোর গলায় চিৎকার করল, কিন্তু ট্রেনের প্রবল ঝমঝম শব্দে ঢাকা পড়ে গেল ওর কণ্ঠস্বর। মাটিতে ছিটকে পড়ল সৌরভ। ট্রেনটা প্রবল বেগে ওর শরীরটাকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে বেরিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গেই এক ঝটকায় ওর ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। দেখল চারিদিকে নিবিড় অন্ধকার, ঠান্ডা হাওয়া বইছে। মাথার উপরে ঝাঁকে ঝাঁকে তারা, তার পাশে সাদা হাড়ের মতো লটকে আছে আধখানা চাঁদ।

জেনির দিকে তাকিয়ে লন্ডন পুলিশের অফিসার মাতৃভাষায় বললেন, "এই মৃত্যুর ব্যাপারে আপনি কিছু বলতে পারবেন? কেন আপনার হাজবেন্ড মাঝরাতে বেরিয়ে এলেন, আর কেনই বা ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে সুসাইড করলেন?"
ক্রন্দনরত জেনি নিজের মাতৃভাষায় উত্তর দিল, "নো স্যর, এই ব্যাপারে আমি বিন্দুমাত্র কিছুই জানিনা। আপনাদের কোনো হেল্প করতে পারব না আমি, তবে আমার সঙ্গে ওর কোনোরকম মনোমালিন্য হয়নি এইটুকু আপনাদের কনফার্ম করতে পারি।"
সামনে দাঁড়িয়ে রাস্তার সিসিটিভি ফুটেজ চেক করছিলেন লন্ডন পুলিশের সাইকোলজি বিভাগের অফিসার মিঃ জেমস।
জেনির দিকে তাকিয়ে বললেন, "এর আগে রাতের দিকে কি কখনো মিঃ বোসের মধ্যে কোনো অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করেছিলেন, যেমন ঘুমের মধ্যে হাঁটাচলা করা, কথা বলা...?"
জেনি বললেন, "এমনিতে আমার ঘুম খুবই গাঢ়, তাই রাত্রিবেলা ঘুমের মধ্যে বিশেষ কিছু হুশ থাকে না আমার। তবে দুইএকবার মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে সৌরভকে রুমের মধ্যে পায়চারি করতে দেখেছি। ভেবেছি ওর হয়তো ঘুম আসেছে না, কিম্বা কোনো দুঃশ্চিন্তায় আছে, তাই পায়চারি করছে। দিনের বেলায় এই নিয়ে জিজ্ঞেস করলে ও সেটা স্বীকার করত না, আমি ভেবেছিলাম, হয়তো আমার কাছে এটা লুকোতে চাইছে, তাই পরে আর এসব নিয়ে কোনো প্রশ্ন করিনি।"
জোনস বললেন, "আই আন্ডারস্ট্যান্ড। সিসিটিভি ফুটেজ দেখেও সেটাই মনে হচ্ছিল। মিস্টার বোস সোমনাবুলিজম নামে একটা ডিজিজের শিকার ছিলেন। এই রোগে মানুষ ঘুমের মধ্যে হাঁটাচলা করে, কথা বলে। সে ভাবে সবটাই তার স্বপ্নের মধ্যে ঘটছে, যদিও সে হাঁটাচলা করে বাস্তবেই। সম্ভবত কাল রাতে কোনোভাবে দরজা খোলা পেয়ে উনি বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন, তারপর ট্রেন লাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। আর তার ফলেই এই অ্যাক্সিডেন্ট..."

আরও কি সব যেন বলে যাচ্ছিলেন অফিসার, কিন্তু জেনির কোনো কিছুই মাথায় ঢুকছিল না। সৌরভের ছিন্নভিন্ন ডেডবডির সামনে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছিল সে। ওর বুকের মধ্যে একরাশ দলা পাকানো কান্না ফুলে ফুলে উঠছিল।

(সমাপ্ত)

©All rights reserved to sankha subhra nayak

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন