ডায়রি রহস্য
শঙখ শুভ্র নায়ক
প্রথম পর্ব
গাঙচিল হোটেলে ঢোকার মুখেই আর ডি এক্সের সঙ্গে দেখা। অবাক সুরে বললাম, "তুমি এখানে? কোনো তদন্তের কাজে, নাকি জাস্ট ঘুরতে আসা?"
আর ডি এক্স ফিসফিস করে বলল, "তোমার লাগেজ রুমে রেখে ফ্রেশ হয়ে এসো, তারপর ডিটেলে বলছি। আমি ততক্ষণ লনে ওয়েট করছি।"
মাথা নেড়ে আমি রিসেপশন থেকে চাবি সংগ্রহ করে দোতলায় চলে গেলাম।
গত কয়েকদিন মুডটা ঠিক ছিল না। লেখালেখিও করতে পারছিলাম না ঠিক করে, তাই ভাবলাম কোথাও থেকে ঘুরে আসা যাক, একটু রিফ্রেশমেন্টের প্রয়োজন। বাড়িতে জানাতেই বাবা বলল, "সদ্য এত বড়ো একটা ধকল গেল তোর উপরে, এখন আর দূরে কোথাও যেতে হবে না, তুই বরং কাছেধারে কোনো জায়গা থেকে ঘুরে আয়।"
আমি সম্মতি জানালাম। তারপর ভাবনা চিন্তা করে পরেরদিনই আমি অনলাইনে দীঘার এই গাঙচিল হোটেল বুক করে এখানে বেড়াতে চলে এসেছি।
সকালে গাড়িতে চেপে দীঘায় পৌঁছাতে পৌঁছাতেই বিকেল পেরিয়ে গেছে। এখন যেহেতু টুরিস্ট সিজিন নয়, তাই হোটেলে রুম পেতে খুব একটা অসুবিধে হয়নি। দোতলায় তেইশ নম্বর রুমটা আমার। ঘরে ঢোকার মুখেই দেখলাম বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক একটি ছেলের সঙ্গে কী নিয়ে কথা কাটাকাটি করছেন। ওনাদের দেখে বাইশ নম্বর রুমের সদস্য বলে মনে হল। কথাবার্তার মাঝে, "টাকা," শব্দটা আমার বার দুয়েক কানে এল। আমাকে দেখেই ওরা থেমে গেলেন। তারপর এক অমলিন হাসি নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে এলেন বৃদ্ধ লোকটি। বললেন, "আজকেই এলেন বুঝি? তা এখানে ঘুরতে তো?"
চাবি খুলতে খুলতে বললাম, "হ্যাঁ, ওই আর কী। মনটা ভাল ছিল না, তাই ভাবলাম ক'দিনের জন্য একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি। আপনারাও বেড়াতে এসেছেন নিশ্চয়?"
ভদ্রলোক বললেন, "হ্যাঁ, আমার সহধর্মিনীর শরীরটা একটু খারাপ ছিল ক'দিন, তাই ডাক্তারের পরামর্শে হাওয়া বদল করতে চলে এলাম।"
আমি সামান্য হাসি বিনিময় করে দরজা খুলে রুমের ভেতরে ঢুকলাম। মালপত্র রেখে বেসিনে গিয়ে মুখে চোখে সামান্য একটু জলের ছিটে দিলাম। আর ডি এক্স নিচে আমার জন্য অপেক্ষা করছে, তাই বেশি সময় নষ্ট না করে মিনিট পাঁচের মধ্যেই বাইরে বেরিয়ে এলাম। দরজায় তালা দিতে দিতে দেখলাম, অল্পবয়সি লোকটা চলে গেলেও, বৃদ্ধ ভদ্রলোক তখনও বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "একাই এসেছ? এসব ট্যুরে তোমাদের বয়সী ছেলে-মেয়েরা সাধারণত কাপল, কিম্বা বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে আসে।"
ভদ্রলোকের আমাকে 'তুমি' সম্বোধনটা কানে লাগলেও মুখে কিছু প্রকাশ করলাম না। ভদ্রলোককে দেখে বেশ মিশুকে আর খোলা মনেরই মনে হল।
বললাম, "আমি এখনও বিয়ে করিনি, তাছাড়া বন্ধু-বান্ধবও বিশেষ কেউ নেই।"
ভদ্রলোক হেসে বললেন, "আচ্ছা, তা একটু আলাপ পরিচয় হতে পারে কি? তুমি যখন একাই এসেছ, আমাদের সঙ্গেই না হয় জুড়ে যেও।"
হেসে বললাম, "নিশ্চয়ই। আমার নাম শুভজিৎ রায়।"
ভদ্রলোক বললেন, "আচ্ছা, আমি রমাপদ মজুমদার। রিটায়ার্ড পারসন। আগে এস বি আই ব্যাঙ্কের ম্যানেজার ছিলাম। তা তুমি কি কর?"
বললাম, "আমি বাধাধরা কোনো চাকরি করিনা। আপাতত টিউশনিই ভরসা, তবে আর একটা পরিচয় আছে অবশ্য।"
তারপর একটু দোনামনা করে বললাম, "সোসাল মিডিয়াতে 'শব্দজটা' নামে আমার একটা নিজস্ব পেজ আছে, সেখানে টুকিটাকি লেখালেখি করি।"
রমাপদবাবু অবাক স্বরে বললেন, "তুমি লেখক? আমিও এক সময় অল্প সল্প লেখালেখি করতাম। তবে এখন আর সময় বা সুযোগ কোনোটাই হয়ে ওঠে না।"
হালকা হেসে বললাম, "আমি নিজেকে লেখক বলে মনে করি না, তবে লেখার চেষ্টা করি, ওটুকুই।"
রমাপদবাবু বললেন, "আচ্ছা, তোমার সাথে পরিচিত হয়ে খুব ভালো লাগল।"
কথা বলতে বলতেই একজন ভদ্রমহিলা ভিতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। ওনার দিকে তাকিয়ে রমাপদবাবু বললেন, "তোমার কোনো একজন লেখকের সঙ্গে পরিচয় করার অনেক দিনের শখ ছিল। এই ছেলেটাকে দেখ, এ একজন লেখক।"
আমি লজ্জিতভাবে নমস্কার করলাম। আমাকে দেখে ভদ্রমহিলার মনের মধ্যে কোনো সম্ভ্রম তৈরি হল বলে মনে হল না। লেখক বললেই সাধারণত মানুষের মনের মধ্যে পাজামা পাঞ্জাবি পরা, গলায় ব্যাগ ঝোলানো চোখে পুরু চশমাওয়ালা একটা লোকের ছবি ফুটে ওঠে। আমার মতো জিন্স আর টিশার্ট পরা, আবার যার লেখার মাধ্যম বলতে বেশিরভাগ সময় মোবাইল, আর কখনো সখনো কম্পিউটার, তাকে লেখক বলে মনে হওয়াটা সত্যিই কষ্টকর। প্রতিনমস্কার জানিয়ে ভদ্রমহিলা বললেন, "তোমার নাম কি?"
আমি নিজের পরিচয় দিলাম। বললাম, "আপনারা কি শুধু দু'জনেই এসেছেন?"
রমাপদবাবু বললেন, "না, না, ওই যে কিছুক্ষণ আগে যাকে দেখলে আমার সাথে কথা বলছিল, ও আমার ছেলে দীপঙ্কর।"
একটু থেমে বললাম, "আপনার ছেলে কোনো কারণে একটু রেগে আছেন বলে মনে হল।"
রমাপদবাবু বললেন, "হ্যাঁ, আসলে ওর ব্যবসায় একটু মন্দা চলছে, তাই আমার কাছে টাকা চাইছিল, কিন্তু আমি..." বলতে গিয়ে ভদ্রলোক নিজের স্ত্রীর দিকে তাকালেন। তারপর ভদ্রমহিলার রক্তচক্ষু দেখে হঠাৎ থেমে গেলেন। ভদ্রলোককে বিব্রত অবস্থায় দেখে বললাম, "আচ্ছা, এখন আমি আসি। একটু তাড়া আছে, আবার পরে কথা হবে।"
ভদ্রলোক মাথা নাড়লেন। সিঁড়ি বেয়ে আমি নিচে নেমে এলাম। নিচে নামতেই দেখতে পেলাম লনে দাঁড়িয়ে একটা মেয়ের সঙ্গে গল্প করছে আর ডি এক্স। মেয়েটায় বয়স আমার চেয়ে একটু বেশিই হবে। দেখতে বেশ সুশ্রী। মেয়েটি যেভাবে আর ডি এক্সের গায়ে ঢলে ঢলে গল্প করছে সেটা দেখে দুটো সম্ভাবনা আমার মাথায় এল, হয় উনি আর ডি এক্স এর খুব ঘনিষ্ঠ কেউ অথবা ওর আর ডি এক্স কে খুব পছন্দ হয়েছে।
আমাকে দেখেই আর ডি এক্স বলল, "এসো, এসো। পরিচয়,করিয়ে দিই।"
আমি সঙ্কোচে আর ডি এক্সের দিকে এগিয়ে গেলাম। আমার দিকে তাকিয়ে আর ডি এক্স বলল, "ইনি হচ্ছেন মিলি সেন। আমাদের হোটেলের প্রতিবেশী।" তারপর মিলির দিকে তাকিয়ে বলল, "এর কথাই আপনাকে বলছিলাম। দুর্দান্ত লেখক, শুভজিৎ রায়। ফেসবুকে ওর শব্দজটা নামে পেজটা রেগুলার ফলো করবেন, দারুণ দারুণ লেখা পাবেন।"
আমি লজ্জায় মাথা নাড়লাম। আমার সামনে কেউ আমার প্রশংসা করলে আমি বেশি ভাউ খেতে পারি না। বরং লজ্জাই লাগে, বড়জোর একটা ধন্যবাদ দিই তাকে, তার বেশি কিছুই বলতে পারি না। আমার দিকে তাকিয়ে মিলি বলল, "আপনার দু'একটা লেখা বোধহয় আমি পড়েছি। আমার একটা বান্ধবী, কথাকলি চৌধুরী শেয়ার করে। নাম জানেন কি?"
খানিক ভেবে বললাম, "নামটা চেনা চেনা লাগছে, দেখেছি হয়তো।"
মিলি বলল, "আচ্ছা, আসি আপাতত। আপনাদের মতো জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিদের সঙ্গে থাকলে ট্যুরটা ভালই জমবে।"
মিলি চলে যাওয়ার পরে আর ডি এক্সের দিকে তাকিয়ে বললাম, "তুমি নিজের কি পরিচয় দিলে? ও আমাকে আর তোমাকে জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি বলল?"
আর ডি এক্স বলল, "আমি অ্যাডভেঞ্চারিস্ট। পাহাড়ে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই। এটাই আমার কাজ। আসার আসল উদ্দেশ্য কি বলা যায় সবাইকে?"
ঘাড় নেড়ে বললাম, "সেটা বলা যায় না ঠিকই, কিন্তু আসল উদ্দেশ্যটা কি সেটা তো আমিও জানলাম না এখনও, এবার জানতে পারি কী?"
আর ডি এক্স বলল, "রেড ডলফিন, যারা তোমার উপরে আক্রমণ করেছিল। ভুলে যাওনি নিশ্চয়? শুনলাম, রেড ডলফিনের একটা সিণ্ডিকেট নাকি রিসেন্টলি দীঘাতে সক্রিয় হয়েছে। তাই একটু খোঁজ খবর নিতে আসা।"
আমি বিস্মিত সুরে আর ডি এক্সের দিকে তাকিয়ে বললাম, "এরকম টুরিস্ট স্পটেও উগ্রপন্থীদের সক্রিয়তা!"
আর ডি এক্স সমুদ্রের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে। আমিও ওর পিছু নিলাম। হাঁটতে হাঁটতে আর ডি এক্স বলল, "সন্ত্রাসবাদীরা তো এরকম টুরিস্ট স্পটগুলোকেই টার্গেট বানায়, যাতে এখানে টুরিস্ট আসা কমে যায়। টুরিস্ট কম আসার অর্থ সরকারের দিক থেকে অনেকটা অর্থনৈতিক ক্ষতি। আর ওরা তো সেটাই চায়।"
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আর ডি এক্সের দিকে তাকালাম। বললাম, "তুমি শিওর এখানে হামলা হবে?"
আর ডি এক্স বলল, "আরে না না। এটা একটা উড়ো খবর। সত্যি হতেও পারে, আবার নাও পারে। তবে খবর যখন এসেছে, তখন তদন্তের দরকার আছে বলেই আমি মনে করি।"
আমি মাথা নাড়লাম। কথা বলতে বলতে আমরা যখন ঝাউবন পেরিয়ে সমুদ্রের তীরে এসে উপস্থিত হলাম তখন বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যে নেমেছে। সমুদ্রের পাড়ে বসে বেশ খানিকক্ষণ আমরা দু'জনে মিলে গল্প করলাম। ঢেউ ছলাৎ ছলাৎ করে আছড়ে পড়তে লাগল তীরে। দূরে দেখতে পেলাম জলের উপরে স্টিমারের উদ্দাম নাচানাচি। শুনতে পেলাম হুইসিলের শব্দ। দূর আকাশের বুকে তারারা নাচতে লাগল। আর মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলতে লাগল চাঁদ।
হোটেলে ফিরে নিজের রুমে ঢুকে পড়ল আর ডি এক্স। আমি নিজের রুমে ফেরার জন্য সিঁড়ি বেয়ে দোতলার বারান্দায় আসতেই রমাপদবাবুর সাথে দেখা। আমার দিকে তাকিয়ে রমাপদবাবু বললেন, "সমুদ্র দেখা হল?"
বললাম, "হ্যাঁ, ওই একচক্কর ঘুরে এলাম। কাল সকাল সকাল উঠে সূর্যোদয় দেখতে যাব ভাবছি।"
রমাপদবাবু বললেন, "এখন তো ফ্রি, আমার রুমে চলো। অনেক দিন আমার পছন্দের বিষয় নিয়ে আলোচনা করার লোক পাইনি। তোমার সঙ্গেই একটু আলোচনা করা যাক।"
বললাম, "আপনি কি একাই আছেন রুমে?"
রুমে ঢুকতে ঢুকতে রমাপদবাবু বললেন, "হ্যাঁ, তোমার মাসিমাকে নিয়ে আমার ছেলে একটু মার্কেটের দিকে গেছে। ওর কিছু ঝিনুকের সেট পছন্দ হয়েছে সেগুলোই কিনতে গেছে।"
রমাপদবাবুর পিছনে পিছনে আমি রুমে এসে ঢুকলাম। বললাম, "আচ্ছা, তা আপনি একা রয়ে গেলেন কেন? সাথে যেতে পারতেন তো।"
রমাপদবাবু বললেন, "আসলে সাড়ে আটটার দিকে একজনের আমার সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করার কথা আছে। তাই আমি আর গেলাম না।"
আমি মাথা নাড়লাম। আর কিছু বললাম না।
কিন্তু রমাপদবাবু এবার নিজের মনেই বলতে শুরু করলেন, "তোমাকে দেখে আমার খুব ভালো লাগছে। এত ভদ্র সভ্য ছেলে তো আজকালকার দিনে বিরল।"
একটু থেমে আবার বললেন, "আমার ছেলেটা পুরো বখে গেছে। আর এর জন্য সম্পূর্ণভাবে দায়ী ওর মা। ওই আদর দিয়ে দিয়ে আমার ছেলেকে মাথায় তুলেছে। আমি ওকে ব্যবসা করার জন্য টাকা দিই, আর সে সব টাকা মদ, গাঁজা, জুয়া আর মেয়েছেলের পিছনে খরচ করে। বাবা হয়ে কথাগুলো মুখে আনতেও লজ্জা লাগে, কিন্তু আমি আজীবন সত্যের পথে চলেছি। আর যা সত্যি সেটাকে তো চাপা দেওয়া যায় না। ইদানিং আমি ওকে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। তাই আজকাল খুব রেগে আছে। টাকা না পেলে খুন করার পর্যন্ত হুমকি দিচ্ছে। আমার স্ত্রীর জন্য আমি ওকে কিছু বলতে পারি না, নাহলে কবেই ত্যাজ্যপুত্র করে বাড়ি থেকে বার করে দিতাম!"
আমরা কথা বলতে বলতেই হঠাৎ একটা লোক খোলা দরজা দিয়ে রুমে এসে ঢুকল। লোকটার বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। দেখে বিহারি বলে মনে হল। ওর দিকে তাকিয়ে রমাপদবাবু প্রায় ভূত দেখার মতোই চমকে উঠলেন। চিৎকার করে বললেন, "তুমি...?"
লোকটা বলল, "জি হা হুজুর, আপনি ইস হোটেলে এসে উঠেছেন শুনে মোলাকাত করতে এলাম।"
আমার দিকে তাকিয়ে রমাপদবাবু বললেন, "তুমি এখন নিজের ঘরে যাও, আমি কিছুক্ষণের মধ্যে তোমার কাছে আসছি।"
আমি মাথা নেড়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে এলাম। কিন্তু তক্ষুণি নিজের রুমে গেলাম না। কিছুটা কৌতুহলবশতঃই ওনার রুমের বাইরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূরে ঝাউবনের দিকে তাকিয়ে প্রকৃতির মায়া উপভোগ করতে লাগলাম। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে শুনতে পেলাম ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। আর সেগুলো ছাপিয়ে রমাপদবাবুর রুমের চাপা কথাকাটাকাটির শব্দ। কিছুক্ষণ পরে আমি নিজের ঘরে এসে ঢুকলাম। ফ্রেশ হয়ে নিজের মোবাইলটা হাতে নিয়ে বসলাম। সোসাল সাইটে লগ ইন করে নোটিফিকেশন চেক করতে শুরু করলাম।
বেশ খানিকক্ষণ কেটে যাওয়ার পরে আমার রুমে টোকা পড়ল। দরজা খুলে দেখলাম বাইরে রমাপদবাবু দাঁড়িয়ে আছেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "তখন তোমাকে ওভাবে যেতে বললাম, কিছু মনে করলে না তো ভাই?"
বললাম, "আরে না না, মনে করব কেন? কিন্তু লোকটা কে ছিল, জানত পারি কি? দেখে তো বিশেষ ভাল লোক বলে মনে হল না।"
রমাপদ লবাবু বললেন, "ঠিকই বুঝেছ তুমি। ভাল লোক নয় মোটেই। ওর নাম রামশঙ্কর পান্ডে। কাঠের চোরাকারবারি করে। আমি যখন ব্যাঙ্ক ম্যানেজার ছিলাম তখন বেশ কয়েকবার লোনের জন্য অ্যাপ্লাই করেছিল, কিন্তু ওর পেপারস ক্লিয়ার না থাকায় আমি ওর লোনটা রিজেক্ট করেছিলাম। সেইজন্যই আমার উপর রাগ, আমাকে মেরে ফেলার ভয়ও দেখিয়েছিল। পরে অবশ্য ক্ষমাও চেয়ে নেয়। এখন আবার কোথাও থেকে খবর পেয়েছে ওই ব্যাঙ্কের নতুন ব্রাঞ্চ ম্যানেজার আমার পরিচিত, তাই ঝোলাঝুলি করছিল, আমি যাতে নতুন ম্যানেজারকে বলে ওর লোনটা স্যাংশন করিয়ে দিই।"
বললাম, " তা আপনি কি বললেন?"
রমাপদবাবু বললেন, "আমি আর কী বলব? তুমিই বল, হয় নাকি কখনও এভাবে? আমি বললেই নতুন ম্যানেজার শুনবে কেন! তাছাড়া লোনের অংকটাও তো কম নয়, প্রায় তিনকোটি টাকা। এইরকম একটা লোককে শুধুমাত্র বিশ্বাসের ওপর বেস করে এতটাকা দেওয়া যায় নাকি?"
আমি মাথা নাড়লাম।
রমাপদবাবু হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, "আচ্ছা, আপাতত এলাম। আমার সহধর্মিণীটি আবার হোটেলে ফিরে আমায় ঘরে দেখতে না পেলে চিৎকার জুড়ে দেবে। পরে আবার কথা হবে।"
আমি মাথা নাড়লাম। রমাপদ বাবু নিজের রুমে চলে গেলেন।
রুমে একা একা বসে আমার সময় কাটছিলনা, তাই আমি হেডফোন নিয়ে একটা সিনেমা দেখতে লাগলাম। সিনেমাটা শেষ হতে হতে প্রায় রাত সাড়ে নটা বেজে গেল। হঠাৎ কান থেকে হেডফোন খুলতেই বাইরে একটা হট্টগোলের শব্দ শুনতে পেলাম। আমি তাড়াতাড়ি রুম থেকে বাইরে বেরিয়ে এলাম। দেখলাম, রমাপদবাবুর রুমের বাইরে বেশ ভিড় জমে গেছে। হোটেলের ম্যানেজার থেকে শুরু করে বেয়ারা, প্রায় সমস্ত লোকই ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। ভিড়ের মধ্যে আর ডি এক্স'কেও আমি দেখতে পেলাম। আমি অবাকভাবে আর ডি এক্স'এর দিকে এগিয়ে গেলাম। আমার দিকে তাকিয়ে আর ডি এক্স বলল, "এতক্ষণ রুমে বসে কি করছিলে? এতকিছু হয়ে গেল, তোমার দেখা সাক্ষাত নেই।"
আমি বললাম, "আমি তো রুমে বসে কানে হেডফোন লাগিয়ে সিনেমা দেখছিলাম, তারপর হেডফোন খুলতেই হট্টগোলের শব্দ শুনতে পেলাম। এতক্ষণ বাইরের কোনো শব্দই আমি শুনতে পাইনি। কিন্তু কি হয়েছে?"
আর ডি এক্স বলল, "এই রুমে রমাপদ মজুমদার নামে এক ভদ্রলোক খুন হয়েছেন। হোটেলের বয় রুমে ডিনার পৌঁছে দিতে এসে ওনার ডেডবডি আবিষ্কার করে।"
কথাটা শুনে আমার বুকটা ধড়াস করে উঠল। ভিড় ঠেলে আমি দরজা দিয়ে ভিতরে উঁকি মারলাম। দেখতে পেলাম, বিছানায় চিৎ হয়ে পড়ে আছেন রমাপদবাবু। গোটা বিছানা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। বিছানার পাশেই মেঝেতে পড়ে আছে মশলা পেশাই করার একটা লোহার ডান্ডা। এটা আগেও আমার নজরে পড়েছিল, কিন্তু এই নিয়ে আমি কোনো প্রশ্ন করিনি। অনুমান করলাম, ওই ডান্ডা দিয়েই রমাপদবাবুর মাথায় বাড়ি মেরে কেউ ওনাকে খুন করেছে। আমি বেশিক্ষণ দৃশ্যটা দেখতে পারলাম না। আমার মাথা ঘুরতে লাগল। টলতে টলতে দরজার সামনে থেকে সরে এলাম। সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সিঁড়ি বেয়ে রমাপদবাবুর স্ত্রী উপরে উঠে আসছেন।
দরজার সামনে ভিড় দেখে উনি হঠাৎ চমকে উঠলেন। তারপর বললেন, "কি হল এখানে এত ভিড় কেন?"
কেউ কোনো উত্তর দিল না। ওনার কাছে এগিয়ে গিয়ে আর ডি এক্স বলল, "আপনার ছেলে কোথায়?"
ভদ্রমহিলা বললেন, "ও কিছুক্ষণ আগেই আমার সঙ্গ ছাড়া হয়ে গিয়েছে। আমি একটা জিনিস কিনতে দোকানে ঢুকেছিলাম, বেরিয়ে এসে দেখি ও নেই। তারপর ওকে এদিক ওদিক খুঁজে না পেয়ে একাই হোটেলে ফিরে এলাম। কিন্তু আপনারা এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?"
তারপর হঠাৎই কি যেন ভেবে নিয়ে বলে উঠলেন, "আমাদের উনি ঠিক আছেন তো?"
বলতে বলতেই ভিড় ঠেলে দরজার কাছে এগিয়ে গেলেন ভদ্রমহিলা। তারপর ভিতরে তাকিয়ে, "খুন, খুন, পুলিশ, পুলিশ..." বলতে বলতে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। দু'তিনজন লোক ওনাকে দরজার সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল। আমি আর ডি এক্স'এর কাছে এগিয়ে গেলাম। বললাম, "পুলিশে কি খবর দেওয়া হয়েছে?"
আর ডি এক্স বলল, "হ্যাঁ, ম্যানেজারবাবু ফোন করেছিলেন। ওরা কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে যাবে।"
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই হোটেলের নিচে একটা গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
অন্তিম পর্ব
কিছুক্ষণের মধ্যেই একদল পুলিশ দোতলায় উঠে এল। রমাপদবাবুর ঘরে ঢুকে ওরা তন্নতন্ন করে তল্লাসি চালাল। গোটা কয়েক ছবি তুলল। বারান্দার একপাশে দাঁড়িয়ে আমি আর আর ডি এক্স নীচু স্বরে কথা বলছিলাম। কথা বলার ফাঁকেই দেখলাম কখন যেন রমাপদবাবুর ছেলে দীপঙ্কর দোতলায় উঠে এসেছে। সে বোধহয় হোটেলে ঢোকার আগেই বাবার মৃত্যুর ব্যাপারে খবর পেয়েছে। ওকে দেখে ততটা বিচলিত বলে মনে হল না। ইতিমধ্যে রমাপদবাবুর স্ত্রীর জ্ঞান ফিরেছে। উনি ছেলের কাছে এগিয়ে গেলেন, তারপর ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।
বেশ কিছুক্ষণ তল্লাসি চালানোর পরে হঠাৎ ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে পুলিশ অফিসার বললেন, "আপনাদের মধ্যে পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে কে দীঘাতে বেড়াতে এসেছে?"
আমি একটু চমকে উঠলাম। বুকটা ধড়াস করে উঠল। ম্যানেজার বাবু আমার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, "ওই ছেলেটা..."
পুলিশ অফিসার আমাকে কাছে ডাকলেন। আমি গুটিগুটি পায়ে অফিসারের দিকে এগিয়ে গেলাম। আমার পিছনে পিছনে এগিয়ে এল আর ডি এক্স ও। আমার দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় পুলিশ অফিসার বললেন, "কি ব্যাপার? আপনার বাসের টিকিট রমাপদবাবুর রুমে কেন?"
আমি তোতলাতে তোতলাতে বললাম, "আমি যখন রুমে ঢুকেছিলাম তখন হয়তো পকেট থেকে পড়ে গেছে।"
পুলিশ অফিসার আরও জোরে ধমক দিয়ে বললেন, "রুমে কেন ঢুকেছিলেন? খুন করতে? কে সুপারি দিয়েছে আপনাকে খুন করার? নাকি নিজেরই শত্রুতা ছিল?"
হঠাৎ আর ডি এক্সের মুড একশো আশি ডিগ্রি অ্যাঙ্গলে ঘুরে গেল। পুলিশ অফিসারকে ধমকে দিয়ে সে বলে উঠল, "ভদ্রলোকের সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলুন। জানেন উনি একজন সম্মানীয় লেখক।"
আর ডি এক্সের দিকে তাকিয়ে পুলিশ অফিসার বললেন, "আপনি কে মশাই আমাকে ডিউটি শেখাচ্ছেন? আর লেখক হলেই কি তিনি খুন করতে পারেন না?"
আর ডি এক্স বলল, "আপনি তো কোনো রকম প্রমাণ ছাড়া আগেই অনুমান করে নিচ্ছেন যে উনিই খুন করেছেন! একটা বাসের টিকিট হাওয়াতেও ভিতরে উড়ে গিয়ে ঢুকতে পারে, তার মানে কি যার টিকিট সেই খুনি?"
পুলিশ অফিসার কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, "আপনি এই রুমে কেন ঢুকেছিলেন সেটা বলুন?"
আমি এই হোটেলে আসার পর থেকে যা যা ঘটেছিল তার আনুপূর্বিক বিবরণ দিলাম। এরপর পুলিশ অফিসার রমাপদবাবুর ছেলে এবং স্ত্রীকে ডেকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। শেষে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনাদের কি কাউকে সন্দেহ হয়?"
রমাপদবাবুর স্ত্রী বললেন, "আমাদের ওনার সঙ্গে প্রত্যেকেরই খুব ভাল সম্পর্ক ছিল, উনি খুব মনখোলা মানুষ ছিলেন। ওকে খুন করার মতো তো কেউ আছে বলে মনে পড়ছে না।"
দীপঙ্কর আমার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, "আমি তো ওই ছেলেটিকেই লাস্ট টাইম বাবার সঙ্গে কথা বলতে দেখেছি। আমার মনে হয় টাকা পয়সার লোভে ও'ই বাবাকে খুন করেছে। আপনারা ওকে তুলে নিয়ে যান, অনেক তথ্য জানতে পারবেন।"
পুলিশ অফিসার আমার কাছে এগিয়ে এসে বললেন, "আমি এক্ষুণি আপনাকে অ্যারেস্ট করছি না। তবে সবার সন্দেহের তালিকায় আপনার নাম কিন্তু সবচেয়ে উপরে। আমাদের তদন্ত শেষ হওয়ার আগে আপনি এই হোটেল ছেড়ে কোথাও যাবেন না।"
আমি সম্মতি জানালাম।
পুলিশ লাশ তুলে নিয়ে যাওয়ার পরে রাত বারোটা নাগাদ খাওয়া দাওয়া সেরে শুয়ে পড়লাম। আমার যে কী কষ্ট হচ্ছিল বলে বোঝাতে পারব না। কিছুক্ষণের মধ্যে আমার মতো একটা নির্বিবাদী মানুষ খুনি হয়ে উঠল। "স্লিপার সেল রহস্য"তেও সন্দেহের তীর আমার উপরে রইলেও আমাকে এভাবে ডাইরেক্ট খুনি কেউ বলেনি, বরং আমার পাড়া প্রতিবেশী, বাবা মা সকলের আমার উপরে বিশ্বাস ছিল। কিন্তু এই ঘটনায় হোটেলের সকলে বিশ্বাস করে নিয়েছে খুন আমিই করেছি। আমি ডিনারের জন্য যখন নিচে গিয়েছিলাম, তখন সকলে যেভাবে আমার দিকে তাকাচ্ছিল তাতে আমার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল। রাত দুটো আড়াইটা পর্যন্ত আমি বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে লাগলাম। ঘুম এল না। তারপর তিনটের পরে আমি যে কীভাবে ঘুমিয়েছি তা শুধু আমিই জানি।
সকাল বেলায় দরজায় টোকার শব্দ পেয়ে দরজা খুলে দেখলাম দরজার বাইরে আর ডি এক্স দাঁড়িয়ে আছে। আমার দিকে তাকিয়ে আর ডি এক্স বলল, "রাতে ঘুম হয়নি বোঝা যাচ্ছে।"
বললাম, "শান্তিতে ক'দিনের জন্য বেড়াতে এসে কি রকম ঝামেলায় ফেঁসে গেলাম দেখতে পাচ্ছ তো? এতে কিভাবে ঘুমাই বলো?"
আর ডি এক্স বলল, "তুমি যদি নির্দোষ হও, তোমার কিচ্ছু হবেনা, তুমি নিশ্চিন্তে থাকতে পারো।"
বললাম, "সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু অপরাধী ধরা পড়ার আগে গোটা দীঘার মানুষের চোখে তো আমি খুনি হয়ে গেলাম।"
আর ডি এক্স বলল, "এগুলো নিয়ে একদম ভেবো না। এরকম একটু আধটু সবার জীবনেই ঘটে। তুমি আমাকে একটা কথা বলো, তুমি কাল রাতের দিকে ঘরে বসে সিনেমা দেখার সময় কি কোনো কিছু শুনতে পেয়েছিলে? কোনো অদ্ভুত শব্দ বা কিছু? তোমার পাশের রুমেই একটা লোক খুন হয়ে যাচ্ছে..."
আর ডি এক্স আমায় কি বলতে চাইছে অনুমান করলাম কিছুটা, বললাম, "আমার হেড ফোন সাউন্ডপ্রুফ। একবার কানে লাগালে বাইরের কোনো শব্দ আর শোনা যায় না।"
আর ডি এক্স মাথা নাড়ল। বললাম, "তুমি কি এই কেসটা নিয়ে ভাবনা চিন্তা করছ?"
আর ডি এক্স বলল, "হ্যাঁ, আমি কাল রাতেই একটু তদন্ত করছিলাম। এক সময় আমার জন্য তুমি অনেক কষ্ট পেয়েছ। দীর্ঘদিন হাস্পাতালে পড়ে থাকতে হয়েছে। আমি চাইনা আমি উপস্থিত থাকাকালীন আবার নতুন কোনো রহস্যের আঁচ তোমার উপরে আসুক।"
আমি একটা বড়ো দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আর ডি এক্সের মতো বড়ো অফিসার যদি আমার পাশে থাকে, তাহলে আমার বাঁচার আশা থাকবে। (যারা এখনও আর ডি এক্সের ব্যাপারে জানেন না, তাদের বলে রাখি আর ডি এক্স ইন্টারপোলের একটি শাখা সংগঠন আই আই বি, বা ইন্টারন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর অফিসার, সন্ত্রাসবাদ দমন করা যাদের মূল কাজ)। বললাম, "এখনও পর্যন্ত কিছু জানতে পারলে কী এই কেসটার ব্যাপারে? কোনো আইডিয়া এল?"
আর ডি এক্স বলল, "হ্যাঁ, তুমি পুলিশকে যে দুটো তথ্য দিয়েছে, আমি সেগুলোর ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছি। দীপঙ্করের কোনো ব্যবসা নেই। বাবার টাকায় ফূর্তি করাই ওর কাজ। বাবার সঙ্গে ওর সম্পর্কও ভাল নয়, সুযোগ পেলে বাবাকে খুন করে বাবার সমস্ত সম্পত্তির দখল নিতে ও পিছপা হবেনা। আর রামশঙ্কর পান্ডে একজন ঘুঘু লোক। কাউকে খুন করা ওর পক্ষে কোনো ব্যাপারই নয়।"
বললাম, "খুনি এই দু'জনের মধ্যে যে কেউ হতে পারে।"
আর ডি এক্স বলল, "কিম্বা কোনো তৃতীয় ব্যক্তি, যার সঙ্গে রমাপদবাবুর সাড়ে আটটায় দেখা করার কথা ছিল।"
বললাম, "কিন্তু সে কে? আমি ওর ব্যাপারে কিছুই জানিনা।"
আর ডি এক্স বলল, "ওটাই তো আমাদের খুঁজে বার করতে হবে। এই হোটেলে সিসিটিভি নেই, নাহলে ফুটেজ দেখলে সহজেই বোঝা যেত কে কে উপরে গেছে বা নেমেছে। আজ একবার থানায় যাব। রমাপদবাবুর যে সব জিনিস পুলিশ বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে গেছে সেগুলো থেকে কিছু ক্লু পাই কীনা দেখি।"
আমি মাথা নাড়লাম।
দুপুর নাগাদ আমি ঝাউবনের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিলাম। টিপটিপিয়ে বৃষ্টি পড়ছিল। ভিজতে আমার বেশ ভালই লাগছিল। বুকের ভিতরটা যেভাবে শুকনো হয়ে গিয়েছিল, এই বৃষ্টি যেন তাতে সামান্য একটু প্রাণ সঞ্চার করছিল। অজস্র লোকের চোরা চাহনির কাছে নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগছিল। দৃষ্টির সাহায্যেও যে অপমান করা যায়, সেটা এই প্রথম উপলব্ধি করছি। এত অপমান আমি জীবনে সহ্য করিনি। বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরে হঠাৎ দেখলাম আর ডি এক্স হোটেলে ফিরে আসছে। আমি ওর দিকে এগিয়ে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, "কোথায় গিয়েছিলে?"
আর ডি এক্স গম্ভীর স্বরে বলল, "একবার থানা থেকে ঘুরে এলাম।"
বললাম, "রমাপদবাবুর জিনিসপত্র কিছু দেখলে?"
আর ডি এক্স মাথা নাড়ল। উদগ্রীব সুরে বললাম, "কিছু জানতে পারলে?"
আর ডি এক্স বলল, "না, সাড়ে আটটার সময় ওনার সঙ্গে কার দেখার করার কথা ছিল, তা জানতে পারিনি, তবে একটা ক্লু পেয়েছি।"
বললাম, "কি ক্লু?"
আর ডি এক্স বলল, "১০০০,১,৫০,১-অগ্রহায়ণ, সেপ্টেম্বর।"
বললাম, "এটা আবার কি?"
আর ডি এক্স বলল, "তুমি জানো কি জানিনা, রমাপদবাবু এক সময় টুকিটাকি লেখালেখি করতেন, তাই নিজের ডায়রিতে উনি অনেক কথাই বিভিন্ন হেঁয়ালি আর কোড দিয়ে লিখে গেছেন। সম্ভবত এই ডায়রি ওনার স্ত্রী বা ছেলের হাতে পড়লে ওনার সমস্যা হতে পারত, তাই এই কোডের ব্যবহার।"
আমি জিজ্ঞেস করলাম, "কিন্তু অত কোডের মধ্যে থেকে এই কোডটাকেই কেন তুমি ক্লু বলছ?"
আর ডি এক্স বলল, "এই কোডটা ছিল ডায়রির লাস্ট পাতায়, আমার অনুমান উনি যার সঙ্গে দেখা করতে চাইছিলেন তার নাম কোডের মাধ্যমে লিখে রেখেছেন। কোডটা অবশ্য আমারও মাথায় ঢোকেনি। চলো সমুদ্রের পাড়ে যাওয়া যাক। ওখানে বসে ভাবা যাবে।"
আমি মাথা নাড়লাম। তারপর আর ডি এক্সের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে সমুদ্রের পাড়ে চলে এলাম। এখন ভাটা চলছে, সমুদ্রের জল পাড় থেকে অনেকটা সরে গেছে। বেশ কিছু টুরিস্ট ভিড় করে সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুই একজন বাচ্চা এদিকওদিক ছোটাছুটি করে খেলা করছে। বালির উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমার দিকে তাকিয়ে আর ডি এক্স বলল, "তোমার কি মনে হয়, কে খুন করতে পারে? তুমি তো লেখক। গোয়েন্দা গল্পের মতো সাজাও দেখি।"
বললাম, "খুন তো তিনজনের মধ্যে একজন করতে পারে। প্রথমত, দীপঙ্কর, ওর কাছে খুন করার মোটিভ আছে। বাবার সম্পত্তি সে দখল নিতে চায়। এমনকি মিসেস মজুমদারের সঙ্গ ছাড়া হওয়ার পরে বাকি টাইমটা ও কোথায় ছিল, সেই নিয়ে ওর কোনো অ্যালিবাই নেই। হতে পারে, ওই হয়তো হোটেলে ফিরে এসে বাবাকে খুন করেছিল। আবার রামশঙ্কর পান্ডেও খুন করতে পারে। সে বার বার রমাপদবাবুর কাছে লোনের জন্য অ্যাপ্লাই করেছিল। কিন্তু উনি নাকচ করেছেন। সেই কারণেই খুন। কিম্বা ওই তৃতীয় ব্যক্তি যার নাম কিম্বা খুনের মোটিভ আমরা কেউ জানিনা।"
আমরা কথা বলতে বলতেই হঠাৎ মিলি সেনের সঙ্গে দেখা হল। সমুদ্রের তীরে উনি একাই দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমাদের দেখে হেসে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনারা কি ঘুরতে বেরোলেন?"
আর ডি এক্স বলল, "হ্যাঁ, ওই আর কী, এদিক ওদিক।"
মিলি বললেন, "এখানে সামনেই একটা পার্ক আছে, অমরাবতী পার্ক, হাতে সময় থাকলে ওখান থেকে ঘুরে আসতে পারেন, কিম্বা সায়েন্সসিটিটাও দেখে আসতে পারেন।"
আর ডি এক্স বলল, "বিকেলে একবার শঙ্করপুরে যাব ভাবছি। আপনিও তো একাই এসেছেন, চাইলে আমাদের সঙ্গে যেতে পারেন।"
মিলি বললেন, "না, শঙ্করপুর আমি ছোটবেলায় একবার গিয়েছিলাম। ওখানে মাছের যা আঁশটে গন্ধ, সহ্য করতে পারিনি।"
আর ডি এক্স মাথা নাড়ল। বলল, "আপনি এখানে থাকছেন তো আরও কিছুদিন?"
মিলি বললেন, "না, আমার মোটামুটি ঘোরা কমপ্লিট। আজ বিকেল হলেই চলে যাব।"
মিলির সাথে কথা বলার পর আমরা দু'জনে সমুদ্রের তীর বরাবর এগিয়ে গেলাম। বেশ খানিকক্ষন হাঁটার পরে হঠাৎ আর ডি এক্স বলল, "আজ জুন মাসের ত্রিশ তারিখ না? কাল তো পয়লা?"
বললাম, "হ্যাঁ, জুন মাস তো তিরিশ দিনেই হয়। এপ্রিল, জুন, সেপ্টেম্বর আর নভেম্বর, সব কয়টা মাসই তো তিরিশ দিনে শেষ হয়।"
আর ডি এক্সের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, "কোডের একটা ওয়ার্ড সলভ হয়ে গেছে।"
বললাম, "কোনটা?"
আর ডি এক্স বলল, "কোডটা একবার ভালো করে ভাবো। ১০০০,১,৫০,১-অগ্রহায়ণ, সেপ্টেম্বর। এখানে সেপ্টেম্বর ত্রিশ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, আমার অনুমান অগ্রহায়ণ সেপ্টেম্বরের মধ্যে উনি টাইমটা লিখতে চেয়েছিলেন। আটটা ত্রিশ। কিন্তু অগ্রহায়ণ কিভাবে আট হয়?"
বললাম, "বাংলার অষ্টম মাস অগ্রহায়ণ।"
আর ডি এক্স শাবাশের সুরে বলল, "বাহহ, রাইট। একটা পার্ট সলভ হয়ে গেল।"
বললাম, "আটটা তিরিশ ব্যাপারটা সলভ না করলেও চলত, এটা আমিও জানি। কিন্তু আটটা তিরিশে কে এসেছিল সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।"
আর ডি এক্স বলল, "গোটা কোডটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা অগ্রহায়ণ সেপ্টেম্বরের মিস্ট্রি সলভ করে নিলাম মানে, কোডটা অনেক ছোট হয়ে গেল। এবারে শুধু ১০০০, ১, ৫০, ১ নিয়ে ভাবলেই হবে। আমার অনুমান এখানেই সেই ব্যক্তির নাম লুকিয়ে আছে।"
আমি মাথা নাড়লাম। ঢেউ তীরে এসে আছড়ে পড়ছে। ঢেউয়ের সাথে ভেসে আসছে হাজার হাজার ঝিনুক। বহুদূরে একটা বিশাল জাহাজ হুইসিল দিতে দিতে এগিয়ে যাচ্ছে হলদিয়া বন্দরের দিকে।
আজ সকাল থেকে হোটেল অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গেছে। কাল রাতে পুলিশের কাছ থেকে গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে অনেকেই হোটেল ছেড়ে চলে গেছেন। কেবল হোটেলে রয়ে গিয়েছি, আমি আর আর ডি এক্স। এইসব ঝামেলায় ক'দিন আমাদের দীঘাতে ঘুরে দেখার সময় হয়নি। কাল বিকেলে আর ডি এক্সের সঙ্গে শঙ্করপুর গিয়েছিলাম। ওখানে ওর কিছু কাজ ছিল। রেড ডলফিনের ব্যাপারে কিছু খোঁজ খবর নিল ও। আজ সকালের দিকে ব্রেকফাস্টের পর আমরা অমরাবতী পার্ক আর সায়েন্সসিটি ঘুরে এলাম। আর ডি এক্সের সঙ্গে বেশ খানিকক্ষণ পার্কের ভিতরের লেকটাতে বোটিংও করলাম। অবশ্য এইসব কিছুর মাঝে আর ডি এক্স ওর তদন্ত বন্ধ করেনি। বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে রামশঙ্কর পান্ডের ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছে। সাথে দীপঙ্করের ব্যাপারেও খোঁজ খবর চালিয়ে যাচ্ছে।
বিকেলে রুমে বসে আমি অপেক্ষা করছি। দরজাটা খোলাই রাখলাম, আর ডি এক্স'এর আসার কথা রয়েছে। আমার মাথায় হাজার রকমের চিন্তা ঘুরছে। এখনও মার্ডার কেসটার কোনো কুল কিনারা পাওয়া গেল না, এইবারও কি আমিই আবার ভাগ্যচক্রে ফেঁসে গেলাম! এইসবই ভাবছিলাম, হঠাৎ আর ডি এক্স রুমে এসে ঢুকল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "দীপঙ্কর এবং রামশঙ্কর পান্ডে দু'জনেই ব্যাপারেই খোঁজ নিলাম, আমার অনুমান এদের কেউই খুনি নয়। রামশঙ্কর পান্ডে এখান থেকে ফিরে ওর ঠেকে যায়। ওখানেই সারারাত ধরে মদ আর জুয়ার আড্ডা চলে, খুনের সময় ও যে এখানে ছিলনা, তার প্রমাণ আছে। আর দীপঙ্কর সেদিন অনেকক্ষণ ওর মাকে খোঁজাখুঁজি করেছিল। আশেপাশে দোকানগুলোতে খোঁজ নিয়ে সেকথা জানতে পারলাম, এরমাঝে কোনো এক ফাঁকে যদি হোটেলে ফিরে বাবাকে খুন করে যায় আলাদা ব্যাপার, তবে মনেহয়না এতটা সময় ওর হাতে ছিল।"
আমি মাথা চুলকালাম। বললাম, "এরা খুন না করলে তৃতীয় খুনিটা কে?"
আর ডি এক্স বলল, "সে ব্যাপারেও আমি তদন্ত করেছি। রহস্যের একটা নতুন মোড় আমাদের কাছে উন্মোচিত হয়েছে। রমাপদবাবুর অতীত জীবনের ব্যাপারে আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম ভদ্রলোকের দুটো বিয়ে। প্রথম স্ত্রীকে ডিভোর্স না দিয়েই উনি আবার বিয়ে করেন। ওনার প্রথম স্ত্রী নিতান্তই সাদামাটা ঘরের, তাই এই নিয়ে কোর্টকাছারি করেননি।"
আমি অবাক ভাবে শুনছিলাম আর ডি এক্স এর কথাগুলো। জিজ্ঞেস করলাম, "কিন্তু তার সাথে এই খুনের সম্পর্কটা কি রকম?"
আর ডি এক্স বলল, "কয়েকদিন আগেই ওনার প্রথম স্ত্রী মারা গেছেন। ওনার প্রথম পক্ষের একজন সন্তান আছে। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পরে তারও কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।"
আর ডি এক্সের দিকে তাকিয়ে বললাম, "তার মানে কি রমাপদ বাবুর প্রথম পক্ষের সন্তানই ওনার খুনি? তাই সে বেপাত্তা! হয়তো ওইদিন তার সঙ্গেই হোটেলে দেখা করার কথা ছিল। রমাপদবাবু সেদিন যেভাবে বারবার ঘড়ি দেখছিলেন, তাতে ওনাকে বেশ উদ্বিগ্ন বলে মনে হচ্ছিল।"
হঠাৎ আর ডি এক্সের চোখ চকচক করে উঠল। বলল, "ও ইয়েস! ঘড়ি! রমাপদ বাবুর হাতের ঘড়ি ছিল তাই না?"
বললাম, "ছিল তো। মৃত্যুর পরেও তো হাতে ঘড়িটা দেখেছিলাম বলেই মনে হয়। কিন্তু তাতে এত আনন্দিত হওয়ার কী হল?"
আর ডি এক্স বলল, "থ্যাঙ্ক ইউ ডিয়ার।তুমি আমাকে দারুণ একটা হেল্প করলে। এইবার মনে হচ্ছে কোডটা সমাধান যাবে।"
আমি ভ্যাবাচ্যাকা ভাবে বললাম, "আমি কীভাবে হেল্প করলাম তোমায়?"
আর ডি এক্স অস্পষ্টভাবে কি যেন বিড়বিড় করল, তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "আমি বুঝে গেছি সাড়ে আটটার সময় কে ওনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। এবার ওই আসল খুনী কীনা, সেটা পুলিশ তদন্ত করে বার করুক। লোহার ডান্ডাতে যে ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেছে, তা যদি ওর সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে নিশ্চিন্তে প্রমাণিত হবে যে সেই খুনি।"
বললাম, "কিন্তু খুনিটা কে? আমার তো কিছুই মাথায় ঢুকছে না।"
আর ডি এক্স বলল, "খুনি আমাদের চোখের সামনেই ছিল, আমরা এতদিন তাকে দেখতে পাইনি। কোডটা নিয়ে একটু ভাবো, তাহলে তুমিও বুঝতে পারবে। শুধু এইটুকু হিন্ট দিচ্ছি, ওই কোডটা ঘড়ির সঙ্গে সম্পর্কিত। অনেক হাত ঘড়ি বা দেওয়াল ঘড়িতেও ওইরকম লেখা থাকে।"
বললাম, "ঘড়িতে নাম্বার তো লেখা থাকে, কিন্তু ১০০০, ৫০ এগুলো তো থাকে না।"
আর ডি এক্স হাসল। বলল, "ভাবো বন্ধু, ভালো করে ভাবো। আমি আমি শিওর তুমি পারবেই। আমি এক্ষুণি কিছু বলছি না।"
সন্ধ্যে নাগাদ রুমে বসে আর ডি এক্সের জন্য আমি অপেক্ষা করছিলাম। কোডটা আমি সলভ করে ফেলেছি ইতিমধ্যেই, তবু আর ডি এক্সের কাছে সেটা খোলসা করতে চাইছিলাম না। ওর মুখ থেকেই ডিটেলটা শুনতে চাইছিলাম। আর ডি এক্স রুমে নক করতেই দরজা খুলে দিলাম। এক মুখ হাসি নিয়ে ও ভেতরে ঢুকে এল। হাসির কারণটা অনুমান করতে পেরে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, "অর্থাৎ অপরাধী গ্রেফতার হয়েছে?"
আর ডি এক্স বলল, "হ্যাঁ, হয়েছে। আজ দুপুরেই কলকাতা পুলিশ তাকে অ্যারেস্ট করে ফেলেছে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্টরা কনফার্ম করেছে যে ওই ডান্ডায় হাতের ছাপটা তারই ছিল। তাছাড়া পুলিশের জেরায় সেকথা স্বীকার করেছে সে। সেদিন রমাপদবাবুর ঘরে কথাবার্তা চলাকালীন উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে সে ভদ্রলোকের মাথায় আঘাত করে, কিন্তু উনি যে মারা যাবেন সেটা ও বুঝতে পারেনি।"
বললাম, "কিন্তু খুনি কে সেটা তো আমি এখনও জানতে পারলাম না।"
আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আর ডি এক্স বলল, "তুমি এখনও কোডটা সলভ করতে পারোনি?"
আমি মনে মনে একবার হেসে বললাম, "না, কিভাবে পারব, তুমি তো আমাকে খোলসা করে কিছু বললেই না!"
আর ডি এক্স বলল, "তুমি তো লেখক, ডিটেকটিভ গল্প লেখ, আর এই সামান্য কোডটা সলভ করতে পারলে না? এটা কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছে না। তাও যদি আমার মুখ থেকেই শুনতে চাও তো বলছি।"
তারপর একটু থেমে বলল, "কোডটা কি ছিল, আর একবার ভেবে বল।"
আমি বললাম "১০০০, ১, ৫০, ১।"
আর ডি এক্স বলল, "এইবার কোডগুলো রোমান হরফ দিয়ে ভাবো, অনেক ঘড়িতে যেমন লেখা থাকে। ১০০০ কে রোমান হরফে বলা হয় 'M' , ১ কে 'I' , ৫০ কে 'L' , আর..."
আর ডি এক্স'এর কথা শেষ হওয়ার আগেই বলে উঠলাম, "আর তারপর আবার ১, অর্থাৎ 'I', ঠিক তো?
আর ডি এক্স মাথা নেড়ে বলল, "তাহলে কি দাড়াল এইবার বল?"
আমি চিৎকার করে বললাম, "MILI, আইমিন মিলি সেন! কিন্তু উনি কেন রমাপদবাবুকে খুন করলেন?"
আর ডি এক্স বলল, " এই মিলি সেনই হল রমাপদ বাবুর প্রথম পক্ষের সন্তান। ওর মাকে ফেলে পালিয়ে ছিলেন রমাপদবাবু। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত মিলির মা প্রচন্ড কষ্টে কাটিয়েছেন, কিন্তু কখনওই মিলির বাবার নাম বলেননি। মৃত্যু সজ্জায় উনি মিলিকে ওর বাবার নাম বলে যান। কয়েকদিনের মধ্যেই মিলি রমাপদবাবুর বাড়িতে আসে, এবং ওনার সম্পত্তি আর প্রতিপত্তি দেখে এটাকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে। ওর মায়ের উপরে উনি যে অবিচার করেছেন, তার ক্ষতিপূরণ দাবী করে, কিন্তু রমাপদবাবু ক্ষতিপূরণ দেওয়া তো দূর ওর মাকে চিনতেই অস্বীকার করেন, এতেই রেগে যায় মিলি। ও ওর মায়ের বিয়ের একটা ছবি নিয়ে রমাপদবাবুকে ব্ল্যাকমেল করতে শুরু করে। বোধ হয় ফলোও করতে শুরু করে। আর এখানে চলে আসে। এই দীঘাতে মিলিকে দেখে রমাপদবাবু ভয় পেয়ে যান, আর তাই ওকে নিজের রুমে দেখা করতে বলেন। আমার অনুমান রমাপদবাবু নিজেই ওনার স্ত্রী আর ছেলেকে বাইরে থেকে ঘুরে আসার কথা বলেন, যাতে সেই সময়টা ঘরে কেউ না থাকে। তারপর তো সন্ধ্যের পর থেকে কী কী হয় সেটা তুমি নিজেই জানো।তোমার বয়ান অনুযায়ী, তোমার সাথে কথা বলে রমাপদবাবু যখন নিজের রুমে ফিরে যান, তখনও সাড়ে আটটা বাজেনি। আমার অনুমান, সাড়ে আটটার পরেই নিজের রুম থেকে রমাপদবাবুর রুমে যায় মিলি, কিন্তু এবারেও হতাশ হয়। কথোপোকথন চলাকালীন কাছে পড়ে থাকা একটা লোহার ডান্ডাটা দিয়ে রমাপদবাবুর মাথায় আঘাত করে, ব্যাস, স্পট ডেথ।"
আর ডি এক্সের দিকে তাকিয়ে বললাম, "বাপরে! কী জটালো রহস্য! কিন্তু মিলি ওই লোহার রডটা রুমে পেল কিভাবে?"
আর ডি এক্স বলল, "হোটেলের স্টাফের কাছে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম ওটা হোটেলে কুটনো কোটার কাজে ব্যবহৃত হত। রমাপদ বাবুর ওয়াইফ কোনো প্রয়োজনে ওটাকে নিজের রুমে নিয়ে যান, কিন্তু ফেরত দেননি, তখন থেকে ওই ডান্ডাটা ওখানে রয়ে গিয়েছিল।"
আমি মাথা নাড়লাম। কৃতজ্ঞতার সুরে বললাম, "তোমাকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষা নেই। তুমি না থাকলে এই রহস্য হয়তো সমাধানই হত না। মাঝখান থেকে পুলিশ আমাকে তুলে নিয়ে যেত, আর আমাকে জেলে পঁচে মরতে হত।"
মৃদু হেসে আর ডি এক্স বলল, "আমাদের জন্য তোমার এক সময় যে ক্ষতি হয়ে ছিল, এটা তার প্রতিদান হিসাবে ধরে নিতে পারো।"
(সমাপ্ত)
©All rights reserved to sankha subhra nayak

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন