বৃহস্পতিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১৯

শেষ বাহাত্তর ঘণ্টা

শেষ বাহাত্তর ঘন্টা

শঙখ শুভ্র নায়ক



"হ্যালো, কখন আসছ তুমি?"
"এই তো বেরিয়ে গেছি। পাঁচমিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাব।"
"তুমি চিরকালই এত লেট করো, আজকের দিনটাও একটুও তাড়াতাড়ি আসতে পারোনা?"
"আসছি পাগলি, এত তাড়াহুড়োর কি আছে, আমার কি মনে নেই আজ কি দিন, ওই জন্যই তো..."
"কি ওই জন্য, বলো, বলো..."
"বাড়ি গেলেই দেখতে পাবে।"
"না, এক্ষুনি বলতে হবে, বলো, প্লিজ।"
"আমাদের ফার্স্ট এনিভার্সারিতে আমার পাগলিকে ডায়মন্ড নেকলেস গিফট করব বলে দোকানে এসেছিলাম, এখন দোকান থেকে বেরিয়ে হাইওয়েতে হাটছি।"
"আচ্ছা, ফোন কাটো, তাড়াতাড়ি এসো।"
"হুম, কাটছি, আগে একটা কিস দাও।"
"ধ্যাত, যখন তখন...?"
"না, এক্ষুনি।"
"আচ্ছা, দাড়াও এক সেকেন্ড।"
"হ্যাঁ দাঁড়িয়েছি... হে ভগবান... আঃ!!!"
"কি হল তোমার? হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো!"

চোখের পলক ফেলতে ফেলতে একটা ট্রাক অংশুমান কে দড়াম করে ধাক্কা দিয়েছিল, ধাক্কার আঘাতে সে খানিকটা উড়ে গিয়েছিল, চোখের সামনে ভেসেছিল একটা নাম্বার ডব্লিউ বি থ্রি ফোর... তারপর আর কিছু মনে নেই অংশুমানের। চোখ খুলতেই ওর মনেহল সে একটা অন্ধকার জলের তলায় ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে। জলটা এত স্বচ্ছ যে গায়ে লাগছেনা। মনেহচ্ছে জলটা আলো দিয়ে তৈরি। সব চেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হল জলের ভিতরে ওর শ্বাস প্রশ্বাস চলছেনা, তবু ওর এতটুকুও কষ্ট হচ্ছেনা। মুখ ঘুরিয়ে নিচের দিকে তাকাল অংশুমান। একটা কালো গভীর গর্তের দিকে সে যেন ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। ওটাই কি মৃত্যু?

"সিস্টার, পেসেন্টের কন্ডিশন কেমন?"
"ব্রিদিং স্টপ হয়ে গিয়েছে, হার্টবিট কমে আসছে। এখন টুয়েন্টি।"
"তাড়াতাড়ি অক্সিজেনের ব্যবস্থা করুন, ম্যানুয়ালি পাম্পকরে ফুসফুসে অক্সিজেন ঢোকানোর ব্যবস্থা করুন, আর আপনি ইলেকট্রিক শক রেডি রাখুন।"
"ওকে স্যার।"

মুখ হাঁ করল অংশুমান জোর করে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করল। হ্যাঁ, পারছে। জলের ভিতরেও সে শ্বাস নিতে পারছে। যদিও খুব কষ্ট হচ্ছে শ্বাস নিতে তবুও সে পারছে। কিন্তু কালো গর্তটা আরো, আরো কাছে এগিয়ে এসেছে।

"স্যার অক্সিজেন চালু করা হয়েছে। কিন্তু হার্টবিট দশে নেমে এসেছে।"
"ইলেক্ট্রিক চালু করুন!"
"ওকে স্যার।"

গর্তটা আরো আরো কাছে এগিয়ে আসছে অংশুমানের, আর মাত্র কয়েকসেকেন্ড, তারপরই গর্তটা ওকে গ্রাস করে নেবে। পাঁচ, চার, তিন, দুই, এক..."
হঠাৎ নিচ থেকে একটা ভীষন ধাক্কা অনুভব করল অংশুমান। ধাক্কাটা ওকে গর্তটা থেকে ছিটকে খানিকটা উপরের দিকে তুলল, আবার নিচের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। আরো একটা ধাক্কা। আরো খানিকটা উপরে এল, আবারও নিচের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। তিন নম্বর ধাক্কাটা ভীষন জোরে এল, অংশুমানের মনেহল কয়েকশো মাইল পেরিয়ে সে ক্রমশ উপরে আরো উপরে উঠে আসছে। ওই তো উপরে আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। জল থেকে উঠতেই চারপাশটা খুব ঝাপসা ঝাপসা লাগল। কিন্তু ওর মনেহল এতক্ষনে সে স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস প্রশ্বাস নিতে পারছে। প্রান ভরে হাওয়াটাকে সে শরীরের ভিতরে টেনে নিল।

"ওকে স্যার। হার্টবিট নর্মাল। স্বাভাবিক ব্রিদিং চালু হয়েছে।"
"মস্তিষ্কে আঘাত হয়েছে। সম্ভবত ব্রেনের একটা পার্ট ড্যামেজ হয়েছে। ভিতরে ব্লাড নেই এটাই রক্ষে।"
"হুম, স্যার, পেসেন্টের কিন্তু জ্ঞান ফেরেনি এখোনো।"
"বুঝতে পারছিনা, মনেহচ্ছে কোমার লক্ষন।"
"ও মাই গড।"
"হুম, খানিকক্ষন ওয়েট করুন। জ্ঞান ফিরলে ভাল, নাহলে পেসেন্টকে ভেন্টিলেশনেই রাখতে হবে।"

"ডাক্টার বাবু আমার হাজবেন্ট কেমন আছে?"
"পেসেন্টের অবস্থা স্থিতিশীল, কিন্তু বাহাত্তর ঘন্টা না পেরুলে কিচ্ছু বলা যাচ্ছেনা।"

চারপাশটা পরিষ্কার হতেই অংশুমান দেখতে পেল একটা ঝিলের মতো জায়গার মাঝে সে ভেসে আছে। ওর সামনেই খানিকটা দূরে রয়েছে একটা দ্বীপের মতো খানিকটা চড়া। সাঁতার কেটে চড়াটার দিকে এগিয়ে গেল অংশুমান, চড়াটা হাতের নাগালে আসতেই তাতে চড়ে বসল।

"ডাক্টার বাবু পেসেন্টের হার্ট বিট হঠাৎ বেড়ে গিয়েছে।"
"কত চলছে দেখে বলুন, যদি একসেসিভ হয় তাহলে আমাকে রাউন্ডে যেতে হবে।"
"এইট্টি ফাইভ টু নাইট্টি চলছে এই মুহূর্তে কখনো কখনো নাইন্টি ফাইভ চলে যাচ্ছে।"
"ইটস ওকে। হান্ড্রেড হয়ে গেলে একটা ইনজেকশন পুশ করে দেবেন। হার্টবিট নর্মালে নেমে যাবে।"
"আচ্ছা, স্যার।"

চড়াটার উপরে বসেছিল অংশুমান। হঠাৎ একটা ভীষন মেঘ গর্জনের মতো শব্দ শুনতে পেল। পিছনে তাকাতেই দেখতে পেল একটা বিরাট সাইজের কুমির তার বিশাল কালো মুখ নিয়ে জলের উপর দিয়ে ছুটে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। ভয়ে সেও জলের উপর দিয়ে ছুটতে লাগল। ওর গতি বেড়ে যাচ্ছে, নিজেকে থামাতে পারছেনা অংশুমান। পিছনে কুমিরটা আর নেই, কিন্তু সে তার পায়ের উপরে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলেছে। ছুটতে ছুটতে এক জায়গায় এসে ভয়ানক হোঁচট খেল অংশুমান, চোখ খুলতেই দেখতে পেল সে একটা প্লেন সার্ফেসে এসে পৌঁছেছে।

"ওকে স্যার, ইনজেকশন পুস করেছি, এখন পেসেন্টের হার্টবিট নর্মালে রান করছে।"
"আচ্ছা। ডোন্ট ওরি। পেসেন্টকে চোখে চোখে রাখুন। খুব ভাল যুদ্ধ করছে পেসেন্ট, ওর মধ্যে ভীষন ভাবে বাঁচার তাগিদ রয়েছে, আই থিঙ্ক আমরা খুব তাড়াতাড়ি কোনো পজিটিভ রেজাল্ট দেখতে পাব।"
"স্যার আপনি এখোনো পুরানো গল্প কথা গুলোকে বিশ্বাস করেন?"
"হা হা হা, নিশ্চই করি, কুচ তো হে, যেটা আমাদের ভিতর থেকে বেঁচে থাকার প্রেরনা দেয়। দ্যাটস কলড আত্মা।"

খানিকটা হেঁটে যাওয়ার পরেই অংশুমান দেখল একটা জায়গায় সাতটা দরজা রয়েছে। দুপাশে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। পিছনটাও ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে। একটা দরজার দিকে এগিয়ে গেল অংশুমান। ঠিক তখন এক ভদ্রলোককে দরজার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখল। এতক্ষনে কথা বলার মতো একজন লোককে পেল অংশুমান। ওকে দেখেই অংশুমান বলল, "আচ্ছা দাদা এখান থেকে কিভাবে বার হওয়া যাবে বলবেন?"
ভদ্রলোক বললেন, "আমি যদি সেটা জানতাম তাহলে কি এখানে পড়ে থাকতাম?"
অংশুমান বলল, "আপনি এখানে কিভাবে এলেন?"
ভদ্রলোক বললেন, "ছাদ থেকে পড়ে গিয়েছিলাম, আইমিন একজন ধাক্কা দিয়েছিল, ব্যাস তারপর থেকে আমি এখানেই আছি।"
অংশুমান চমকে উঠল, "তারমানে আপনি বলতে চাইছেন এখানে যতজন আছে সবাই এক্সিডেন্ট করে এখানে এসেছে।"
ভদ্রলোক হাসলেন। বললেন, "যতজন কোথায় পেলেন? এখানে আমরা মোটে দু'জন আছি, আমি আর আপনি। আমার একারই থাকার কথা ছিল, বাইশ বছর ধরে একাই ছিলাম, আজ আপনি এলেন।"
অংশুমান অবাক হল। বলল, "কিন্তু আমরা মাত্র দু'জন কেন? এই পৃথিবীতে আরো অজস্র লোকের এক্সিডেন্ট হয়েছে, তারা সব?"
ভদ্রলোক হাসলেন। বললেন, "এটা একটা ইমাজিনারি ওয়ার্ল্ড। যারা এক্সিডেন্ট করে কোমায় চলে যায়, তারা এই ওয়ার্ল্ডে ঢুকে পড়ে। প্রত্যেকের আলাদা আলাদা ইমাজিনেশন আছে, তাই প্রত্যেকে তাদের নিজস্ব ইমাজিনারি ওয়ার্ল্ডে চলে যায়, যার একটার সঙ্গে অন্যটা কোনো ভাবেই ম্যাচ করেনা।"
অংশুমান বলল, "তাহলে আমি আপনার দেখা পাচ্ছি কিভাবে?"
ভদ্রলোক বললেন, "সম্ভবত আমাদের ব্রেনের গঠন কোনো ভাবে ম্যাচ করে গেছে, যদিও সেটা হওয়ার চান্স এক ভাগের কয়েককোটি ভাগের একভাগ, কিন্তু এই মিরাক্কলটা ঘটেছে, তাই আপনি আমার দেখা পেয়েছেন।"
অংশুমান বলল, "এখানে তো সময় বোঝার কোনো উপায়ই নেই, কিভাবে বুঝলেন বাইশ বছর কেটে গেছে।"
ভদ্রলোক বলল, "পাঁচ বছর আগে আমার একবার জ্ঞান ফিরেছিল, তখনই সময়টা দেখেছিলাম, ওই হিসেব করলে জ্ঞান ফেরার পরে আরো পাঁচ বছরের জন্য হাস্পাতালের বিছানায় আমি কোমায় পড়ে আছি।"
অংশুমান বলল, "আচ্ছা, আপনি তো এখানে বহুদিন আছেন, এই দরজাগুলোর ব্যাপারে কি জানেন?"
ভদ্রলোক বললেন, "এগুলোই সব গুলোই এক একটা পাজল। যার ভিতরে ঢুকে পাজল সলভ করতে করতে এগিয়ে যেতে হয়। আগের স্মৃতি আমার যতদূর মনে আছে আমি পাজলটা শেষ করে ফেলেছিলাম, কিন্তু সামান্য একটা ভুলে সাপের মুখে পড়ে যাই, নাইন্টিনাইন থেকে আমাকে আবার একে ঘুরে আসতে হয়েছে।"
অংশুমান বলল, "ও মাইগড। আমার মনেহয় এই পাজল সলভ করলেই আমরা আমাদের পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারব।"
ভদ্রলোক বললেন, "আমারও তাই মনেহচ্ছে। কিন্তু পাজল সলভ করা তো চারটি খানি কথা নয়। পুরোটাই ভাগ্যের উপরে। আমি পৃথিবীর হিসাবে গত পাঁচ বছর ধরে চেষ্টা করার পর চারনম্বর দরজা দিয়ে ঢুকে আবার এই দরজা দিয়েই বেরিয়ে এলাম। ভিতরে এরকম অজস্র দরজা রয়েছে, সব গুলোতে ঢুকে ঢুকে ট্রাই করতে হলে আমাদের আয়ু শেষ হয়ে যাবে তবু পাজল শেষ হবেনা।"
অংশুমান বলল, "কতগুলো দরজা আছে ভিতরে? আপনার অনুমান?"
ভদ্রলোক বললেন, "চারনম্বর পাজলের ভিতরে আছে দশকোটি দরজা। আমি সর্বাধিক যে দরজার নম্বর দেখেছিলাম তা ন'কোটি আটশো সাতান্ন, ওই হিসাবে বললাম।"
"ও মাই গড, দ্যাটস ইমপসিবল," বলে উঠল অংশুমান। বলল, "বাকি দরজা গুলো, কোনটা সহজ বলে আপনার মনেহয়েছে?"
ভদ্রলোক বললেন, "কোনোটাই সহজ নয়। সবগুলোই একই রকম। তবে দু'নম্বর দরজাটা সব চেয়ে বিপদ জনক। ওখানে অদ্ভুত অদ্ভুত সব প্রানীদের বাস। ওই দরজা দিয়ে কিছুটা গিয়ে আর যেতে পারিনি।"
"আচ্ছা," মাথা নাড়ল অংশুমান। বলল, "যদি মরতেই হয় এডভেঞ্চার করেই মরব, চলুন আমরা দু'নম্বর দরজা দিয়েই ঢুকি।"
ভদ্রলোক বললেন, "কি বলছেন কি? ওই পথে পাঁচ মিটারও যেতে পারবেন না।"
অংশুমান বলল, "দেখাই যাক না, আপনি বাইশ বছর কোমায় পড়ে আছেন, আর বেঁচে থেকেই বা কী করবেন? পৃথিবীতে আর আপনার জন্য আছেটাই বা কী? আর আমি রিস্ক নিতে ভালবাসি। এটা বিশ্বাস করি রিস্ক না নিলে কিচ্ছু পাওয়া যায়না। মরতে তো হতই। যে মুহূর্তে ট্রাক টা আমাকে ধাক্কা দিয়েছিল সেই মুহূর্তেই মরে যেতে পারতাম, এতক্ষন বেঁচে আছি এটাই ঈশ্বরের করুনা। দেখাই যাক না গিয়ে কি হয়।"
ভদ্রলোক বললেন, "আচ্ছা বলছেন যখন চলুন তবে। কিন্তু আমি মারা গেলে আপনি কিন্তু তারজন্য দায়ি থাকবেন।"
অংশুমান হাসল। বলল, "আপনি বোধহয় এই সহজ সত্যিটা এখোনো মানতে পারেননি যে আপনি মারা গেছেন। আপনার কাছে আর হারাবার কিছুই নেই। এত বছর ধরে দরজার পাজল সলভ না করে ওই ভয়ংকর জীব জন্তুদের হাতে যদি আগেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতেন তাহলে আপনার জন্য যে মানুষগুলো খরচ করে এখোনো আপনাকে বাঁচিয়ে রেখেছে, তারা শান্তি পেত।"
ভদ্রলোক হাসলেন। বললেন, "আমি একটা আশা নিয়েই বেঁচে আছি, আমাকে যে মারার চেষ্টা করেছিল কোমা থেকে ওঠার পরে তার নামটা সকলের সামনে প্রকাশ করব।"
অংশুমান বলল, "হুম, যাইহোক এতক্ষণ আপনার সঙ্গে কথা বলছি আপনার নামটাই জানা হয়নি। বলুন আপনার নাম কি?"
ভদ্রলোক বললেন, "আমার নাম জিমি, জিমি কার্টার। আমি লণ্ডনে সাইকোলজির প্রফেসার ছিলাম। আমার বন্ধু জন সামান্য কিছু টাকার জন্য উন্মত্ত অবস্থায় আমাকে ছাদ থেকে ধাক্কা দেয়।"
অংশুমান অবাক হল, "ও মাই গড। আপনিই জিমি কার্টার? বছর পাঁচেক আগে আমি আপনার কেস হিস্ট্রিটা পেপারে পড়েছিলাম। কোমা থেকে ফিরে আসার পরে আপনি নাকি জবানবন্দিতে বলেছিলেন জন আপনাকে ছাদ থেকে ঠেলে খুন করার চেষ্টা করে, একথা শোনার পরে আপনার বন্ধু জন সুইসাইড করে। হিস্ট্রিতে প্রথম বার কোনো ভিক্টিম কোমা থেকে ফিরে এসে তার খুনিকে চিনিয়ে দিতে সাহাজ্য করেছিল, তাই আপনাকে নিয়ে খুব মাতামাতি হয়েছিল সে সময়।"
জিমি বললেন, "তাই কি? আমি এতটা জানতাম না। আমি ওই ঘন্টা খানেকের জন্যই কোমা থেকে ফিরেছিলাম, তারপর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাই।"
অংশুমান বলল, "আচ্ছা, চলুন তবে ভিতরে ঢোকা যাক।"
জিমি মাথা নাড়লেন, "চলুন।"
.......
"নমস্কার আমরা কোতোয়ালি থেকে আসছি। আপনার হাজবেন্ডের ব্যাপারে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাই।"
"হ্যাঁ কি জানতে চান বলুন?"
"আপনার হাজবেন্ডের ব্যাপারটা কি এক্সিডেন্ট, নাকি প্ল্যান মার্ডার, আপনার কি মনেহয়?"
"দেখুন, আমি যতদূর জানি ওনার সেভাবে কোনো শত্রু ছিলনা। তবে উনি একজন বিজনেসম্যান ছিল, সেই হিসেবে ওনার শত্রু থাকতেই পারে, কিন্তু আমাদের ব্যক্তিগত কোনো শত্রু ছিলনা।"
"কেন ম্যাডাম, রাজ সিনহা?"
"হোয়াট?"
"আমরা খবর পেয়েছি রাজ সিনহার সঙ্গে আপনার বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক ছিল।"
"দেখুন আপনি আমার পার্সোনাল ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করছেন।"
"আমরা অনুমান করছি, আপনাদের সম্পর্কের মাঝে অংশুমান বাবু কাঁটা হয়ে উঠেছিলেন, তাই আপনি আর রাজ সিনহা মিলে ওনাকে পথ থেকে সরিয়ে দেবার প্ল্যান করেন। অংশুমান বাবুর কললিস্টে লাস্ট কল কিন্তু আপনাকেই করা হয়েছে।"
"দেখুন রাজের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কথাটা মিথ্যে নয়। রাজ আমার ক্লাস মেট ছিল, ওর সঙ্গে আমার প্রেম ছিল, বিয়ের পরে রাজের সঙ্গে আমার রিলেশন ভেঙ্গে যায়। গত বছর আমি আবার রাজকে ফেসবুকে খুঁজে পাই। অংশুমান আমাকে টাইম দিতে পারতনা, তাই রাজ আমার কাছাকাছি এসে যায়, ওর সঙ্গে আমার বেশ কয়েকবার ফিজিক্যাল রিলেশনও হয়েছে, কিন্তু তার জন্য আমার অংশুমান কে খুন করার দরকার পড়তনা। অংশুমান আমার বেস্টফ্রেন্ড ছিল। আমি ওর গার্লফ্রেন্ড লিজার ব্যাপারে যেমন সব কিছুই জানি ও আমার বয়ফ্রেন্ড রাজের ব্যাপারে সব কিছুই জানে, আমরা কেউ কাউকে এসব নিয়ে বাধা দিইনি।"
"আচ্ছা বুঝলাম, এখন আসি। পরে দরকার পড়লে আবার আপনার যোগাযোগ করব। আচ্ছা, রাজের ঠিকানাটা দিতে পারবেন?"
"দেখুন কিছু না জেনে এসব ব্যাপারে রাজ জড়াক আমি তা চাইনা। আর রাজের ঠিকানায় গেলে আপনি সম্ভবত ওকে পাবেন না, ও দিন সাত আগে এই শহর ছেড়ে চলে গেছে। আমি নিজে ওকে ফ্লাইটে চাপিয়ে দিয়ে এসেছি।"
"ও আচ্ছা, সরি ফর ডিস্টার্ব ইউ। তবে মনে রাখবেন আপনার কথা যদি মিথ্যে প্রমানিত হয়..."
"হুম, সেটা হবেনা। আমার জীবনে গোপন কিছু নেই, আপনারা বরং খুনি গাড়িটাকে খোঁজার চেষ্টা করুন।"
"আচ্ছা, থ্যাঙ্ক ইউ।"
.......

"হ্যালো রাজ?"
"হ্যা, রুমা বলো? অংশুমান দা কেমন আছে?"
"আপাতত অবস্থা স্থিতিশীল। এই মাত্র পুলিশ এসেছিল। তোমার সঙ্গে আমার রিলেশন নিয়ে জিজ্ঞেস করছিল।"
"তুমি বলে দাওনি তো যে আমার সঙ্গে তোমার রিলেশন ছিল।"
"বোকার মতো কথা বোলোনা, আমি কিছু গোপন করার চেষ্টা করলেই আমাদের উপরে ওদের সন্দেহ হত, তখন অযথা পুলিশ তোমাকে হ্যারাস করত। যাইহোক যা বলছিলাম, পুলিশ যদি তোমাকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে কিছু গোপন কোরোনা।"
"আচ্ছা করবনা। তুমি সাবধানে থেকো, আর অংশুমান দা জ্ঞান ফিরলে খবর দিও।"
"আচ্ছা, টা টা।"
"হুম, টা টা।"

....
রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অংশুমান বলল, "উফ! পথের যে কোনো শেষ নেই।"
কার্টার বললেন, "না মশাই পথের কোনো শেষ নেই, পথ মেশে পথের গভীরে। চলুন ওই গাছ তলাটায় গিয়ে একটু আরাম করে বসি।"
অংশুমান বলল, "বসলে তো লেট হয়ে যাবে। আর আপনার অদ্ভুত প্রানীদেরও তো এখোনো পর্যন্ত কোনো দেখা পেলাম না।"
জিমি বললেন, "নিশ্চই পাবেন, অপেক্ষা করুন।"
ওরা দু'জনে গাছের তলায় গিয়ে বসল। গাছটার বিশাল বিশাল ঝুরি ডোগা থেকে মাটি পর্যন্ত নেমে গিয়েছে। জিমি বললেন, "এবারে সামনে দিকে তাকান।"
সামনে তাকিয়ে অংশুমান যা দেখল তাতে ওর গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। এতক্ষণ ধরে ওরা একটা বিশাল সাপের পিঠের উপর দিয়ে হেঁটে আসছিল, সামনেই সাপটা তার অন্ধকার হা মুখ বার করে বসে আছে। জিমি বললেন, "আর একটু এগুলেই আমরা সাপের মুখে পড়ে যেতাম। এখান থেকে এগিয়ে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই।"
অংশুমান বলল, "এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা আছে। হেঁটে যাওয়া হয়তো যাবেনা কিন্তু উড়ে উড়ে ওই জায়গাটা পেরিয়ে যাওয়া যাবে।"
জিমি অবাক হলেন, "উড়ে উড়ে? হাউ ইট ইজ পসিবল?"
অংশুমান বলল, "এই গাছটার দুটো ঝুরি ধরে পাশের খাদে লাফ দিন। চলুন দু'জনে একসঙ্গে করি।"
ওরা দু'জনে গাছের ঝুরি ধরে খানিকটা ছুটে এসে পাশের খাদে লাফদিল। ওদের চাপে গাছটা খানিকটা বেঁকে গেল, তারপর ওদের আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে ঝুরি সমেত সোজা হওয়ার চেষ্টা করল। শূন্যে পৌঁছে অংশুমান বলল, "ঝুরি ছেড়ে দিন জিমি, নাহলে আমাদের আবার আগের জায়গায় ফেরত আসতে হবে।"
ওরা ঝুরি ছেড়ে দিল। আর বিশাল সাপেটার মুখ টপকে একটা বিশাল গুঁড়ির উপরে এসে পড়ল। পিছনে তাকিয়ে অংশুমান বুঝল দুটো পাহাড়ের মাঝের খাদটার মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করছে এই গুঁড়িটা। জিমি বলল, "নিচে দেখুন কি ভয়ংকর!"
নিচের দিকে তাকাল অংশুমান। খাদের নিচে প্রাগৈতিহাসিক যুগের বিশাল বিশাল সাইজের কাঁকড়াবিছে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বলল, "নিচে তাকাবেন না, সোজা দাঁড়িয়ে হাঁটতে থাকুন।"
জিমির পা কাঁপতে লাগল। বললেন, "এখন আমরা যেটার উপরে হাঁটছি সেটাও যে একটা বিশাল সাইজের সাপ বুঝতে পারছেন তো?"
অংশুমান বলল, "তা বুঝতে পারছি, তবে আমরা সম্ভবত সাপটার লেজের দিকে হাঁটছি। দেখছেন না গুঁড়িটা ক্রমশ সরু হয়ে আসছে।"
জিমি বললেন, "কিন্তু সাপটা যদি হঠাৎ নড়ে ওঠে আমাদের কি অবস্থা হবে সেটা ভাবতেই তো আমার গায়ের রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছে।"
অংশুমান বলল, "ভয় পেয়ে কাঁপবেন না বেশি, তাহলেই হবে সাবধানে ধিরে সুস্থে এগিয়ে চলুন।"
শেষের দিকে গুঁড়িটা এত সরু হয়ে গিয়েছে যে হেঁটে সেটা পার হওয়া প্রায় অসম্ভব। ভয়ার্ত গলায় জিমি বললেন, "সম্ভবত আমাদের ফিরে যেতে হবে, এরপর যাওয়ার কোনো উপায় নেই।"
অংশুমান বলল, "এখান থেকে লাফ দিন।"
জিমি বললেন, "আপনি কি পাগল হলেন? এখান থেকে ওপাশের দূরত্ব মিনিমাম পনেরো ফুট। আমি স্কুলেও কোনোদিন এত লম্বা হাইজাম্প মারিনি।"
অংশুমান বলল, "দুর্বল হবেন না। নিজের আত্মার শক্তিতে বিশ্বাস করুন। নিশ্চই পারবেন। চোখ বুজে শ্বাস নিন এবং লাফ দিন।"
জিমি লাফ দিলেন ওর পিছনে পিছনেই লাফ দিল অংশুমান। শূন্যে ভাসমান অবস্থায় জিমির হাত ধরল সে, তখনই দেখতে পেল বাজ পাখির মতো একটা বিশাল সাইজের পাখি পিছন থেকে উড়তে উড়তে ওদের দিকেই এগিয়ে আসছে।

ভয়ার্ত গলায় জিমি বললেন, "আর তো বাঁচার কোনো উপায় আছে বলে মনে হচ্ছেনা।"
অংশুমান বলল, "উপায় আছে।"
পাখিটা কাছাকাছি আসতেই জিমিকে ধাক্কা মারল অংশুমান। জিমি আর অংশুমান দুদিকে খানিকটা করে সরে গেল। পাখিটার মুখটা পেরিয়ে যেতেই অংশুমান চিৎকার করে বলল, "পাখির ডানাটা ধরে ফেলুন।"
জিমি চিৎকার করল, "কি পাগলের মতো কথা বলছেন?"
অংশুমান বলল, "নিচের দিকে তাকালেই গোটাটা বুঝতে পারবেন।"
নিচের দিকে তাকালেন জিমি। নিচে বিশাল বিশাল সাইজের অজস্র ব্যাঙ তাদের লক লকে জিভ আকাশের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভয়ে পাখির একটা ডানা ধরে ফেললেন জিমি। অংশুমান অন্য ডানাটা ধরে পাখিটার পিঠে চেপে পড়ল। ডানা ধরে উড়তে উড়তে জিমি বললেন, "উফ! বলিহারি আপনার সাহস। আপনিই পারবেন এই ট্র‍্যাপ থেকে বেরিয়ে আসতে।"
অংশুমান বলল, "পারব কীনা জানিনা, কিন্তু চেষ্টা করতে আপত্তি কী?"
বেশ খানিকটা যাওয়ার পরে পাখিটা মাটির দিকে নামতে শুরু করল। অংশুমান দেখল নিচে একটা বিশাল ঘাসের বন রয়েছে, তারপাশে রয়েছে একটা ঝিল। পাখিটা ওই ঝিলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অংশুমান বলল, "পাখিটা ঝিল পর্যন্ত যাওয়ার আগেই নিচে লাফ দিন। ঝিলের চারপাশে বিশাল বিশাল কুমির আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে।"
জিমি বললেন, "ঘাস বনটা মোটেই কিছু সেফ জায়গা নয়, তাকিয়ে দেখুন ওখানে বিরাট বিরাট সিংহরা অপেক্ষা করে আছে।"
পাখিটা উড়তে উড়তে একটা গাছের কাছাকাছি আসতেই অংশুমান বলল, "এই গাছের ডাল ধরে ঝুলে পড়ুন, তাহলে সিংহের হাত থেকে রক্ষে পাওয়া যাবে।"
জিমি বললেন, "গাছটা মোটেই কিছু সুবিধের নয়, এক্ষুনি পাখিটার পিঠ থেকে নিচে লাফ দিন নাহলে মরবেন।"
জিমি পাখিটার ডানা ছেড়ে দিয়েছে। আর ভাবনাচিন্তা না করে পাখিটার পিঠ থেকে নিচে লাফ দিল অংশুমান, তখনই দেখতে পেল গাছটার দুটো লতা এসে পাখিটাকে জড়িয়ে ধরল, তারপর পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে পাখিটাকে ছিবড়ে বানিয়ে নিচে আছড়ে ফেলল। নিচে আছড়ে পড়ে জিমি বললেন, "আমারও কিছু কিছু আইডিয়া মাঝে মাঝে কাজে লাগে।"
অংশুমান বলল, "আর ভাবনা চিন্তার সময় নেই, এক্ষুনি গাছটার দিকে দৌড় লাগান নাহলে আমাদের সিংহের মুখে পড়তে হবে।"
জিমি চমকে উঠলেন, "গাছটার দিকে দৌড়াব?  কি বলছেন আপনি?"
অংশুমান বলল, "যা বলছি করুন।"
ওরা গাছটার দিকে দৌড়াতে লাগল। তখনই দেখতে পেল আট দশটা সিংহ ওদের তেড়ে আসছে। গাছটার কাছাকাছি আসতেই অংশুমান বলল, "যতটা সম্ভব গড়াগড়ি দিয়ে গাছটা পার হয়ে যান। যতটা সম্ভব মাটির সঙ্গে চিপকে থাকুন। খবরদার ওপরে ওঠার চেষ্টা করবেন না।"
ওরা গড়াগড়ি দিয়ে গাছের তলাটা পেরিয়ে যেতেই সিংহগুলোকে গাছটা তার লতা দিয়ে পেঁচিয়ে ধরল। কড়মড় করে কয়েকটা হাঁড় ভাঙ্গার শব্দ পেল অংশুমান। কিছুদূর গিয়ে গা ঝেড়ে সে উঠে দাঁড়াল। জিমিকেও হাত ধরে টেনে উপরে তুলল। জিমি বললেন, "খুব বাঁচা বেঁচে গেছি।"
অংশুমান বলল, "আমার মনেহয় সত্যিই বেঁচে গেছি।"
সামনে তাকাতেই দেখতে পেল ওদের সামনে একটা বিশাল দরজা রয়েছে, তার সামনে থেকে আলো এসে ভিতরে ঢুকছে। দরজাটার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে অংশুমান বলল, "যদি বেঁচে উঠি আমাকে মনে রাখবেন তো?"
জিমি বললেন, "নিশ্চই রাখব। কিন্তু বেঁচে ওঠার পরে এই ঘটনাগুলো মনে থাকবে তো?"
হা হা হা করে হেসে উঠল অংশুমান। বলল, "দেখা যাক।"

......

"ডাক্তার বাবু পেসেন্টের জ্ঞান ফিরছে।"
"ওয়াও! খুব ভাল খবর। পেসেন্ট কি বিড়বিড় করছে একটু শুনুন তো কান পেতে।"
"হ্যা ডাক্তার বাবু। পেসেন্ট কিছু একটা নাম্বার বলছে, ডব্লিউ বি থ্রি ফোর ট্রিপল ফাইভ..."
"নম্বরটা নোট করুন। এক্ষুনি, কুইক।"
"হ্যাঁ করে নিয়েছি।"
"আচ্ছা, ওকে।"

.....

"হ্যালো কোতোয়ালি থানা?"
"হ্যাঁ বলছি।"
"আমি সি এম আই হাসপাতাল থেকে বলছি। পেসেন্ট অংশুমান মুখার্জীর এই মাত্র জ্ঞান ফিরেছে। উনি একটা নাম্বার দিয়েছেন, নাম্বারটা নোট করুন, আই থিঙ্ক এটাই সেই ট্রাকের নাম্বার যেটা ওনাকে ধাক্কা মেরেছে।"
"ওকে। আমরা এক্ষুনি ট্রাকটাকে খুঁজে বার করার চেষ্টা করছি।"

.....
"হ্যালো, রুমা মুখার্জী বলছেন?"
"হ্যাঁ বলছি কে বলছেন জানতে পারি?"
"আমি কোতোয়ালি থানা থেকে বলছি। আপনার হাজবেন্ডকে যে ট্রাকটা ধাক্কা মেরেছিল তার খোঁজ আমরা পেয়েছি।"
"হোয়াট? কিছু জানতে পেরেছেন?"
"হ্যাঁ সব কিছুই জানতে পেরেছি। পালাবার চেষ্টা করবেন না। আপনার ফোনের টাওয়ার লোকেশন ট্রাক করে আপনার প্রেমিক রাজ সিনহা কেও আমরা এরেস্ট করেছি। আপনার ঘরের বাইরে আমাদের কনস্টেবলরা ওয়েট করছেন আপনি নিচে নেমে আসুন।"

.....

"অংশুমান বাবু ভাল আছেন?"
"হ্যাঁ এখন মোটামুটি সুস্থ। ইস! সেদিন ফোনে এতটাই ডুবে গিয়েছিলাম যে পিছনে ট্রাকটা আসছে মোটেই খেয়াল করিনি। আপনাদের অজস্র ধন্যবাদ ডাক্তার বাবু। স্বাক্ষ্যাত মৃত্যুর হাত থেকে আপনারা আমাকে ফিরিয়ে এনেছেন।"
"হুম অংশুমান বাবু আপনাকে একটা খারাপ খবর দেওয়ার আছে।"
"খারাপ খবর! কি?"
"আপনি আপনার স্ত্রী'র বয়ফ্রেন্ড রাজ সিনহাকে চিনতেন?"
"হ্যাঁ চিনতাম। বিয়ের রাতেই ও আমাকে বলেছিল রাজ নামে ওর একজন প্রেমিক আছে তাই আমার সঙ্গে স্বাভাবিক বিয়ের সম্পর্ক করা ওর পক্ষে সম্ভব নয়। আমি ব্যাপারটা মেনে নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম বিয়ের আগে এরকম সম্পর্ক অনেকেরই থাকে, আমি যদি ওকে ওর বয়ফ্রেন্ডের চেয়েও বেশি ভালবাসা দিতে পারি ও হয়তো ওর বয়ফ্রেন্ডকে ভুলে গিয়ে আমাকে আপন করে নেবে।"
"বিয়ের পরেও আপনার স্ত্রী'র সঙ্গে রাজ সিনহার রিলেশন ছিল এটা জানতেন?"
"হ্যাঁ শুনেছিলাম। আসলে আমি ব্যাবসার কাজে বিজি রইতাম, সব সময় ওকে সময় দিতে পারতাম না, তাই ও কি করছে না করছে খোঁজ রাখা সম্ভব হতনা। কিন্তু লাস্ট কয়েকমাস আমি নিজেকে বদলে ফেলেছিলাম। ওর খোঁজ খবর রাখার চেষ্টা করতাম, ওকে এনিভার্সারিতে ডায়মন্ড নেকলেস গিফট করার কথা ভেবেছিলাম। তাছাড়া আমাদের একটা বাচ্চা নেওয়ারও প্ল্যান ছিল।"
"ও আচ্ছা, আপনার এতটা কেয়ার ফুল হওয়াই তাহলে আপনার স্ত্রীকে ডেঞ্জারাস করে তুলেছিল। ওই ট্রাক ড্রাইভারকে আপনার স্ত্রীই আপনাকে খুন করার সুপারি দেয়। ওর প্ল্যান ছিল আপনাকে খুন করে আপনার মৃত্যুটাকে এক্সিডেন্ট বলে প্রমান করা এবং আপনার সম্পত্তির মালকিন হয়ে রাজ সিনহাকে বিয়ে করা। কিন্তু দুর্ভাগ্য আপনি বেঁচে যান। আপনার বলা ট্রাকের নাম্বার ধরে পুলিশ ট্রাক ড্রাইভারকে এরেস্ট করে। যদিও নাম্বার প্লেট টা ভুয়ো ছিল। কিন্তু পুলিশ বিশেষ সূত্র ধরে ওই ভুয়ো নাম্বার প্লেট তৈরির কারখানায় পৌঁছে ট্রাক ড্রাইভারের পরিচয় জানতে পারে।"
"হে ভগবান! শেষ পর্যন্ত রুমা আমাকে খুন করার চেষ্টা করল। পুলিশ কি ওদের এরেস্ট করেছে?"
"হ্যাঁ পুলিশ রাজ সিনহাকে এরেস্ট করেছে। কিন্তু আই এম সরি টু সে ওরা আপনার স্ত্রী'র নাগাল পায়নি। এরেস্ট হওয়ার আগেই ও সুইসাইড করেছে..."
"ও মাই গড...."
"কাঁদবেন না অংশুমান বাবু। যা হয়েছে তাকে নিয়তির খেলা হিসাবে ধরে নিন। বাই দ্যা ওয়ে, আপনার সঙ্গে দেখা করবে বলে লিজা নামে একটি মেয়ে অনেকক্ষণ ওয়েট করছে।"
"হ্যাঁ পাঠিয়ে দিন। ও আমার পি এ।"

.....
"ভাল আছেন স্যার।"
"হ্যাঁ ভাল আছি। রুমার ঘটনাটা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল।"
"হ্যাঁ আমারও খারাপ লাগল। উনি এমন করবেন ভাবতে পারিনি। অবশ্য যার মনে এত সন্দেহ সে এরচেয়ে ভাল আর কী বা করতে পারে।"
"সন্দেহ। কি বলছ তুমি?"
"উনি আমাকে আপনার গার্লফ্রেন্ড ভাবতেন। একদিন ফোন করে গালাগালিও দিয়েছিলেন।"
"ও মাই গড। এসব কথা তো আগে বলোনি।"
"স্যার, এই চাকরিটার জন্য আমার ফ্যামেলি চলে। আমি পারতাম না আপনাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির জন্য আমার চাকরিটা শেষ হয়ে যাক, তাই সব অপমান হজম করে নিয়েছিলাম।"
"আচ্ছা, তুমি এখন বাড়ি যাও। আমার জন্য তোমাকে অনেক কলঙ্কের বোঝা বইতে হয়েছে। আর যাতে না হয় সেই ব্যবস্থা আমি করব।"

......

অংশুমান দা চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। বললেন, "কফি খাবে?"
বললাম, "আচ্ছা, বলুন তবে।"
ট্রেনে যেতে যেতে একদিন অংশুমান দা'র সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। মোবাইলে কি প্যাডে আমাকে বাংলা টাইপ করতে দেখে বলেছিলেন, "কি লিখছ?"
বলেছিলাম, "গল্প লিখছি। আমরা ভ্যাগাবণ্ড রাইটার। সময় পেলে টুকিটাকি কিছু লিখে ব্লগে পোষ্ট করি। সামান্য কিছু পাঠক আছে ওরাই পড়ে। কেউ বাহবা দেয়, কেউ গালি দেয়। সব মিলিয়ে চলে যায়।"
অংশুমান দা হেসেছিলেন। বলেছিলেন, "যদি গল্পের প্লট চাও তো আমার বাড়িতে একবার এসো, আমার জীবনটা গল্পের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।"
বলেছিলাম, "আচ্ছা দাদা নিশ্চই যাব।"

সেই সূত্রেই আজ আমার অংশুমান দা'র বাড়িতে আসা। জিজ্ঞেস করলাম, "আচ্ছা দাদা কোমায় আচ্ছন্ন অবস্থায় আপনি যেগুলো দেখেছিলেন সেগুলো কি কেবলই কল্পনা আই মিন স্বপ্ন নাকি এর মধ্যে বাস্তবতা কিছু আছে?"
অংশুমান দা বললেন, "আমি এতদিন কেবল স্বপ্ন হিসাবেই এগুলোকে ভাবতাম, কিন্তু কয়েকদিন আগে জিমি কার্টার নামে এক ভদ্রলোকের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এসেছে আমার ফেসবুক প্রোফাইলে। প্রোফাইল সার্চ করে জানতে পারলাম ভদ্রলোক নাকি বাইশ বছর কোমায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। আমি ভদ্রলোক কে জিজ্ঞেস করেছিলাম ডু ইউ নো মি? তার উত্তরে উনি কি বললেন জানো? উনি নাকি আমার নামটা স্বপ্নে পেয়েছেন। এরপর আর সন্দেহ থাকা উচিৎ নয়।"
কথা বলতেই এক ভদ্রমহিলা আমাদের কফি দিয়ে গেলেন। জিজ্ঞেস করলাম, "তারপর লিজার কি হল? ওনাকে কাজে রেখেছিলেন নাকি কাজ থেকে বার করে দিয়েছিলেন?"
অংশুমান দা হাসলেন। বললেন, "হ্যাঁ, কাজ থেকে বার করে দিয়েছিলাম। কারন ওর আর কাজ করার দরকার ছিলনা। এই মাত্র যে মেয়েটা আমাদের কফি দিয়ে গেল ওই লিজা, এখন আমার স্ত্রী।"
হাতে একখানা টাটকা গল্পের প্লট নিয়ে আমি অংশুমান দার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। আমার মনটা এখোনো খচ খচ করছে। নিজেকে বিজ্ঞান মনষ্ক বলে গর্ব করি, কিন্তু অংশুমান দা'র গল্পটা সেই বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করল। আমি জানিনা এজিনিস বিশ্বাসের যোগ্য কীনা, আপনারাই তার বিচার করুন।

(সমাপ্ত)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন