ধারাগোল রহস্য
শঙখ শুভ্র নায়ক
"পায়ে ধরে সাধা
রা নাহি দেয় রাধা
শেষে দিল রা,
পাগোল ছাড়ো পা।" ডিকের কথা শেষ হওয়ার আগেই শুভ বলল, "ধারাগোল।"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "হ্যাঁ, আর আমরা এখন যে জায়গাটায় যাচ্ছি সেই জায়গাটার নাম ঘূর্ণনপুর। ঘূর্ণনপুরের জমিদার বাড়ির বর্তমান মালিক তপেন্দ্র সিংহচৌধূরি গতকাল আমাকে ফোন করেছেন দেখা করার জন্য।"
শুভ বলল, "ব্যাপার কি? কোনো জটিল কেস?"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "জটিল তো বটেই, তবে জটিলের চেয়ে বেশি অদ্ভুত। চল। জমিদার বাবুর মুখেই সব শুনবি।"
শুভ মাথা নাড়ল। কথা হচ্ছিল ডিকের গাড়িতে বসে। আজ সকালেই হুট করে এসে শুভকে গাড়িতে তুলে নিয়েছে ডিকে। কোথায় যাচ্ছে সেটুকু পর্যন্ত বলেনি, অবশেষে অনেক জিজ্ঞেস করার পরে ওই কথাটুকু বলল। শুভ বুঝল ডিকেকে আর ঘাঁটানো ঠিক হবেনা। সে যখন গম্ভীর মুডে থাকে তখন কোনো কথাই ওর কানে ঢোকেনা। গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল শুভ। মেদিনীপুর থেকে গড়বেতা পেরিয়ে গাড়িটা এখন একটা ফাঁকা রাস্তা ধরে ছুটে চলেছে। রাস্তার দুপাশে কচি ধানের ক্ষেত হাওয়ার তিরতির করে কাঁপছে। আকাশে চক্কর কাটছে এক ঝাঁক সাদা পায়রা।
চুপচাপ বসে থাকতে বিরক্ত লাগছিল শুভর, তাই ইন্টারনেট থেকে উইকিমিডিয়া ঘেঁটে ঘূর্ণনপুরের ইতিহাস জানার চেষ্টা করছিল সে। উইকিমিডিয়া তে ঘূর্ণনপুরের ইতিহাস সেভাবে নেই, যেটুকু পাওয়া গেল, তা এই- বিষ্ণুপুর রাজবংশের সঙ্গে কোনো আত্মীয়তা সূত্রে ঘূর্ণনপুরের এই অঞ্চলটা পেয়েছিলেন সিংহচৌধূরি বংশের রাজারা। জায়গাটা দেখে ভাল লাগায় ওখানে তাদের বন বাংলো স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে রাজা সৌম্যদর্শন সিংহচৌধূরি এখানেই নিজের রাজপ্রাসাদ তৈরি করে থাকতে শুরু করেন। রাজা সৌমদর্শনকে ভ্রাম্যমাণ রাজা বলা হত। ওনার শখ ছিল সারা পৃথিবীতে ঘুরেঘুরে অদ্ভুত অদ্ভুত প্রানীদের সংগ্রহ করা। ওনার মৃত্যুও হয়েছিল অদ্ভুত ভাবে। পিরানহার কামড়ে উনি মারা গিয়েছিলেন। আমাজন থেকে এই পিরানহাদের সংগ্রহ করে এনেছিলেন সৌমদর্শন বাবু। ভারতীয় পরিবেশ বা জলে পিরানহারা বাঁচতে পারেনা, তাই জাহাজে করে আমাজন নদীর জল আর মাটি আনিয়ে একটা পুকুরই তৈরি করে ফেলেছিলেন। একদিন সকালে ওই পুকুরেই তাঁর ডেডবডি পাওয়া যায়। পিরানহারা খুবলে খেয়েছিল তাঁর শরীর।
ঘূর্ণনপুর ঢুকতে ঢুকতে প্রায় বিকেল হয়ে গেল। ওদের গাড়ির আওয়াজ পেতেই ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন রাজা তপেন্দ্র নারায়ন। যদিও রাজকীয় কোনো জৌলুশ তার নেই। দেখলে আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার প্রার্থক্য বোঝা যায়না। রাজবাড়ির সেই আগের চেহারাও আর নেই। পুরানো বাড়ি ভেঙ্গে নতুন বাড়ি তৈরি হয়েছে। তবে এটা যে একসময় রাজবাড়ি ছিল, ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বড়বড় থাম আর খিলানগুলোই তার পরিচয় দেয়। গেট দিয়ে ঢুকে ওরা দেউড়িতে গাড়ি থামাল। গাড়ি থেকে নেমে আসতেই তপেন্দ্রবাবু বললেন, "আমার ফোন পেয়ে যে আপনারা সুদূর মেদিনীপুর থেকে এই ঘূর্ণনপুরে ছুটে আসবেন আমি সত্যিই ভাবিনি।"
ডিকে বলল, "আমারও অনেকদিন থেকে এখানে আসার ইচ্ছেছিল। শুনেছি, আপনাদের রাজবাড়ির সংগ্রহ শালায় অনেক দুঃস্প্রাপ্য পুরানো পুঁথি রয়েছে, ইচ্ছেছিল ওগুলোকে একবার চোখের দেখা দেখার।আপনার ফোন পেতে আমার এই ইচ্ছেটাও পূরণ হয়ে যাবে।"
তপেন্দ্রবাবু মাথা নাড়লেন। বললেন, "আপনি ঠিকই শুনেছেন। আমাদের বংশের তৃতীয় রাজা হরসুন্দরের পুঁথি সংগ্রহের বাতিক ছিল। উনিই এই লাইব্রেরিটা বানিয়েছিল। আমার এসবের নেশা নেই, তাই পুঁথিগুলো আমি ঘাঁটিনি, তবে লোকে বলে আমাদের সংগ্রহ শালায় নাকি শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের সম্পূর্ণ খন্ড রয়েছে, আর ইন্ডিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে।"
অবাকভাবে মাথা নাড়ল ডিকে। বলল, "আপনাকে আমার খোঁজ কে দিল?"
তপেন্দ্রবাবু বললেন, "আমার ছেলে অর্নব। ওই সোসাল মিডিয়ায় আপনাকে নিয়ে লেখা গল্পগুলো পড়েছিল, তারপর কোথা থেকে আপনার ফোন নম্বর জোগাড় করে এনে দিল। বলল, আমার এই বিপদে আপনিই আমাকে সঠিক দিশা দেখাতে পারেন।"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "কিন্তু বিপদটা কি তাই তো আপনি আমাদের বলেননি।"
তপেন্দ্রবাবু বললেন, "বিপদ আমাদের নয়, বিপদ আমার পোষ্যদের। আপনার ঘরে চলুন, রেস্ট নিন। রাতে খাওয়ার টেবিলে বসে সব আপনাদের খুলে বলব।"
দোতলার একটা রুমে ওদের থাকার ব্যবস্থা হল। ঘরটা সম্ভবত আগেকার দিনে নাচ মহল ছিল। বিশাল ঘরখানা। নতুন করে তৈরি করা হলেও ঘরের বেশ কিছু জিনিস আগের মতোই রাখা রয়েছে। মাথার উপরে ঝুলছে বিশাল এক ঝাড়বাতি। দেওয়ালে ঝোলানো আছে বেশ কিছু তৈলচিত্র। একটা অদ্ভুত প্রাচীনতার গন্ধ যেন গোটা ঘরময় ছড়িয়ে রয়েছে। এই বাড়িতে চাকর বাকর মিলিয়ে মোট তিনজন। বুড়ো চাকর হরিশ। সেই এই বাড়ির রান্নাবান্নার কাজগুলো করে। গাড়ির ড্রাইভার নিতাই আর সাগি নামে একটা চাকরানি ওর আসল নাম স্বাগতা। সে এই বাড়ির বাগানের মালি। স্বাগতাকে একঝলক দেখে ডিকে বলল, "এই মেয়েটাকে আমি আগে কোথাও যেন দেখেছি।"
শুভ বলল, "কোথায় দেখেছ?"
ডিকে বলল, "কোনো একটা হোটেলে। ঠিক মনেকরতে পারছিনা।"
রাত ন'টার দিকে খাওয়ার ডাক এল। এক তলায় ডাইনিংরুম। ডাইনিং রুমটা বেশ ডেকোরেশন করা। এখানেও অয়েলপেইন্টিং এর অভাব নেই। ডিনার টেবিলে বসে ডিকে বলল, "আমার প্রতি যদি আপনার মহৎ কোনো দৃষ্টি থাকে তাহলে সেটা এক্ষুনিই ঝেড়ে ফেলতে অনুরোধ করব। আমি ফেলুদা, বোমকেশের মতো রিরাট বড় কিছু গোয়েন্দা নই। আমি একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। আমার প্রধান কাজ লোকের বউ, মেয়ে, স্বামীর উপরে নজরদারি করা। কারুর মেয়ে অন্য কোনো ছেলের সঙ্গে পালিয়ে গেলে খুঁজে এনে দেওয়া, এমন কি কখনো কখনো হারানো কুকুর বেড়ালকেও খুঁজে এনে দিতে হয়। জিগালো রহস্য, হুঙ্গা রহস্য, ভূতুড়ে কেসের মতো দু'একটা বড় কেস আমার হাতে এসেছে ঠিকই, নাহলে বাকি সব কেসই প্রায় ছোটখাটো, তাই আপনার কি পোষ্য হারিয়েছে আপনি আমাকে নিঃসঙ্কোচে বলতে পারেন, আমি খুঁজে বার করার চেষ্টা করব।"
তপেন্দ্রবাবু মাথা নাড়লেন। বললেন, "আমার পোষ্যরা কুকুর বেড়ালের মতো এত সাধারণ কিছু নয়। এব্যাপারে আমি এক্ষুণি আপনাকে বেশি কিছু বলতে পারছিনা। আপনি আটার নাম শুনেছেন?"
শুভ ভ্যাবাচ্যাকা খেল। ভদ্রলোক পোষ্যদের কথা বলে এখন আবার আটার গল্পে কোথা থেকে এলেন? তবে কি ভদ্রলোকের কিচেন থেকে আটা চুরি গেছে? শুভর দিকে তাকিয়ে তপেন্দ্র বাবু বললেন, "হ্যাঁ, তুমি ঠিকই ভাবছ ছোকরা। আমার সংগ্রহে বেশ কিছু আটা ছিল, তারাই চুরি গেছে।"
ডিকে গম্ভীর হল। বলল, "আচ্ছা, আমি খোঁজার চেষ্টা করব।"
ডিনার সেরে উঠে আসার সময় দেখল তপেন্দ্র বাবু মুচকি মুচকি হাসছেন।
রুমে ফিরে এসে উত্তেজিত ভাবে শুভ বলল, "আমাদের কি এভাবে অপমান করার জন্য এতদূর থেকে ডেকে আনা হয়েছে? কুকুর-বেড়াল খোঁজার ব্যাপারটা তবু মানা যায়। কোথায় ভদ্রলোকের আটা চুরি গেছে, সেজন্য ডিটেকটিভ লাগিয়েছেন? রাঁধুনিকে চেপে ধরলেই তো পারেন।"
মজা করে ডিকে বলল, "ভুল লোককে চেপে ধরলে যদি সে কাজ ছেড়ে পালিয়ে যায়। এখন বাজারে কাজের লোকের যা অভাব। তাই হয়তো সঠিক চোরকে খুঁজে বার করার জন্য আমাদের ডেকেছেন।"
শুভ বলল, "সামান্য আটার জন্য ডিটেকটিভ ডাকার কি দরকার? দোকানে গিয়ে কিনে নিলেই তো পারেন। উনি জানেন তো তুমি এখন আর দয়া দাক্ষিণ্যে কাজ করোনা। যেকোনো কেসে খরচ খরচা বাদে তোমার বাঁধা রেট পঁচিশহাজার টাকা।"
ডিকে বলল, "হয়তো আটা গুলো খুব দামি। দেখলিনা ভদ্রলোক বললেন আটাগুলো ওনার সংগ্রহে ছিল। হয়তো প্রাচীন যুগের আটা। বাবর কিম্বা আকবর হয়তো ওই আটারই রুটি খেতেন।"
ডিকেও তারসঙ্গে ইয়ার্কি করছে দেখে শুভ চুপ করে গেল। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্রেকফাস্ট টেবিলে দেখা হল তপেন্দ্র বাবুর সঙ্গে। ডিকে বলল, "আমি শুনেছিলাম, সৌমদর্শন বাবুর অদ্ভুত পশুপ্রানী সংগ্রহের বাতিক ছিল শুনেছি, কিন্তু উনি যে আটাও সংগ্রহ করেছিলেন এ আমার জানা ছিলনা।"
তপেন্দ্র বাবু বললেন, "হ্যাঁ, অনেক সময় অনেক ক্রিপটিড সংগ্রহ করলেও তাদের নাম প্রকাশ্যে আনা যায়না। কিছু কিছু প্রানী তো এতটাই সেন্সিটিভ হয় যে ওদেরকে স্পর্শ করলেও ওদের মৃত্যু ঘটতে পারে। আবার কিছু প্রাণী বেশ ভয়ানক। আর ওই ক্রিপটিড সংগ্রহ করতে গিয়েই এই আটার সন্ধান উনি পান।"
শুভ বলল, "আটা গুলো কি বিদেশ থেকে আনা?"
তপেন্দ্র বাবু বললেন, "হ্যাঁ, প্রায় চার পাঁচশো বছর এরা আমাদের বাড়িতে আছে।"
শুভ বলল, "কিন্তু ক্রিপটিডদের সঙ্গে আটার কি সম্পর্ক?"
ডিকে বলল, "সম্পর্ক আছে, আটাও যদি একপ্রকারের ক্রিপটিডের নাম হয় তাহলে সম্পর্ক থাকাটাই স্বাভাবিক।"
শুভর চোখ কপালে উঠে গেল। বলল, "আটা কোনো খাবার আটা নয়, এরা এক প্রকারের প্রাণী?"
তপেন্দ্র বাবু মাথা নাড়লেন। বললেন, "হ্যাঁ, প্রাণী, তবে সাধারণ কোনো প্রাণী নয়। এরাও এক প্রকারের মানুষ।"
শুভ ভ্যাবাচ্যাকা খেল। আর একটু হলেই খাবার খেতে গিয়ে খাবি খাচ্ছিল আর কী। বলল, "মানুষ! আপনি মানুষদের সংগ্রহ করে রেখেছিলেন?"
তপেন্দ্র বাবু বললেন, "ব্যাপারটা খুব গোপনীয় তাই কাল রাতে আপনাদের বলিনি। আটাকামা মরুভূমিতে গিয়ে এই আটাদের সন্ধান পান সৌমদর্শন। এরা একধরনের হিউম্যানয়েড। যাদেরকে আটাকামা হিউম্যানয়েড নামে ডাকা হয় সংক্ষেপে আটা। আমাদের যেমন বিবর্তন ঘটেছে শিম্পাঞ্জি জাতের বানর থেকে এদের বিবর্তন ঘটেছে মার্মোসেট জাতের বানর থেকে, তাই এদের আকার খুবই ছোট। বড়জোর ছ'ইঞ্চি। আটাকামা মরুভূমির নিচে একটা বিশাল হ্রদ রয়েছে, সেখানেই ওদের বসবাস। মাটির তলায় থাকে বলে এদের কেউ দেখতে পায়না। আর এরা সাধারণত রাতে বার হয়। সৌমদর্শন দুর্ভাগ্যবশতই এদের খুঁজে পান। তারপর এদের কয়েকজনকে নিয়ে বাড়িতে চলে আসেন। শুনেছি, সৌমদর্শনের মৃত্যুর পিছনে নাকি এরাই দায়ি। এরাই কোনোভাবে ওনাকে জলে ফেলে দেয়। যদিও কোনোদিন ব্যাপারটা প্রকাশ্যে আনা হয়নি। যাইহোক, প্রায় পাঁচশো বছর আমাদের বাড়িতে থাকার দরুন এদেরও বিবর্তন হয়েছে। এরাও এখন মানুষের মতো কথা বলতে পারে।"
ডিকে বলল, "কিন্তু ওদের রেখেছিলেন কোথায়?"
তপেন্দ্রবাবু বললেন, "এই বাড়ির নিচে একটা সুড়ঙ্গ আছে, সুড়ঙ্গটার অন্যমুখ গিয়ে খুলছে একটা ঝিলে। ওখানেই ওদের বসবাস। এখন ওদের সংখ্যা প্রায় দেড়শো জন। কিন্তু ক'দিন আগে গুনতে গিয়ে দেখলাম, ওদের মধ্যে দু'তিনজন মিসিং।"
ডিকে বলল, "ওদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, ওই দু'তিনজন কোথায় গিয়েছে?"
তপেন্দ্র বাবু বললেন, "হ্যাঁ, জিজ্ঞেস করেছিলাম, কিন্তু ওরা কিছু বলতে পারলনা। ওদের খাদ্য হচ্ছে পিঁপড়ে। ওদের দু'তিনজন পিঁপড়ে শিকার করতে বেরিয়েছিল, কোথাও নাকি ভাল পিঁপড়ের খোঁজ পেয়েছিল ওরা, সেখান থেকেই ওরা নিখোঁজ হয়ে যায়।"
ডিকে মাথা নাড়ল। তপেন্দ্র বাবু বললেন, "চলুন, ব্রেকফাস্ট সেরে আমি আপনাদের ওদের কাছে নিয়ে যাচ্ছি।"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "দশ বছর আগে আটাকামা হিউম্যানয়েডের স্কেলিটন খুঁজে পাওয়ার পর থেকেই আমার খুব ইচ্ছেছিল যদি ওদের কখনো চোখের দেখা দেখতে পাই। আজ সেই স্বপ্ন হয়তো পূরণ হবে।"
ব্রেকফাস্ট শেষ করে তপেন্দ্রবাবুর পিছনে পিছনে এগিয়ে যেতে যেতে ডিকে বলল, "আপনার ছেলেকে দেখছিনা?"
তপেন্দ্রবাবু বললেন, "ও বাইরে চাকুরি করে, কালে আকালে বাড়ি আসে। আমার সঙ্গে ফোনেই বেশি কথা হয়। এখন ভিডিও কলিং এসে যাওয়া কোনো সমস্যাই আর হয়না।"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "আচ্ছা, আপনার বাড়িতে যে এসব জিনিস আছে, সেটা কে কে জানে?"
তপেন্দ্রবাবু বললেন, "আমার পূর্বপুরুষেরা নিশ্চই জানতেন, তবে এখনের কেউ জানেনা। আমিও জানতাম না, কয়েকদিন আগে বাড়ির কাজ করাতে গিয়ে হঠাৎ একটা গুপ্ত কক্ষের সন্ধান পাই, সেই গুপ্ত কক্ষে খোঁজ করতে গিয়ে এই ব্যাপারগুলো সামনে আসে।"
তপেন্দ্রবাবুর পিছনে পিছনে ওরা রাজবাড়ির অন্দরমহলে পৌঁছাল। এই জায়গাটাতে কোনো প্লাস্টার করা হয়নি, একেবারে আগের মতোই রাখা হয়েছে। দু'একজায়গায় দেওয়ালে ফাটল বেয়ে শিকড় বেরিয়ে এসেছে। কোথাও কোথাও গজিয়েছে জংলি ঘাঁস। ডিকে বলল, "এখানে প্লাস্টার করেননি কেন?"
তপেন্দ্রবাবু বললেন, "এখানেই তো সেই গুপ্ত কক্ষ রয়েছে, প্লাস্টার করাতে গেলে পাছে লোক জানাজানি হয়ে যায়, সেই ভয়ে…"
ডিকে বলল, "মিস্ত্রিরা কিছু সন্দেহ করেনি তো?"
তপেন্দ্রবাবু বললেন, "ওদের তো যতটুকু কাজ দেওয়া হবে ততটুকুই করবে, তবে রাজমিস্ত্রি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল এই জায়গাটাতে কাজ করাচ্ছেন না কেন? আমি কথাটা এড়িয়ে গেছি।"
ডিকে মাথা নাড়ল। সামনে একটা বড়োসড়ো নগ্ন নারীমূর্তি রয়েছে। উন্নত গ্রিবা, উত্থিত স্তন আর ভাঁজ হওয়া নিতম্ব। দুটো পা কে পেঁচিয়ে ধরে এক অদ্ভুত কামনার প্রতীক হয়ে মূর্তিটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। তপেন্দ্রবাবু গিয়ে সেই নারীমূর্তিটাকে ধরে একপাঁক ঘোরাতেই ঘড়ঘড় শব্দে দেওয়ালটার খানিকটা অংশ ফাঁক হয়ে গেল। ভিতরে দেখা গেল একটা সিঁড়ির ধাপ ক্রমশ নিচের দিকে নেমে গিয়েছে। সিঁড়ি বেয়ে ওরা নিচে নেমে গেল। ভিতরটা অন্ধকার ঘুটঘুটে। কিছুই দেখা যাচ্ছিলনা। পকেট থেকে মোবাইলটা বার করল ডিকে। ফ্ল্যাশ জ্বালাবার আগেই তপেন্দ্র বাবু বললেন, "আলো জ্বালাবেন না, আলো জ্বালালেই ওরা ভয় পেয়ে লুকিয়ে পড়বে। একটু অপেক্ষা করুন। অন্ধকারে চোখ সয়ে গেলেই সব কিছু দেখতে পাবেন।"
ডিকে মাথা নাড়ল। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরে ধীরেধীরে অন্ধকারে চোখ সয়ে আসতে ওরা দেখতে পেল, দূরে কোথা থেকে একটুকরো আলোক রশ্মি ভেসে আসছে। খুব ক্ষীণ আলো। তপেন্দ্র বাবু বললেন, "ওই আলো লক্ষ্য করেই আমাদের আগাতে হবে।"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "চলুন।"
দ্বিতীয় পর্ব
অন্ধকার রাস্তা। দুপাশের দেওয়াল বেশ স্যাঁতস্যাঁতে। পদেপদে পিছলে পড়ার ভয়। শুভর পায়ের উপর দিয়ে মাঝেমাঝেই সড়সড় করে কি যেন পেরিয়ে যাচ্ছিল, তপেন্দ্র বাবুকে সেকথা বলতেই বললেন, "সাপ কিম্বা বিছে হবে, গায়ে পা না দিলে কোনো চিন্তা নেই।"
এমন নিরীহ ভাবে কথাটা বললেন, যেন ওগুলো কোনো ব্যাপারই নয়। কিন্তু শুভর বুকের ভিতরটা ধড়াস ধড়াস করে উঠল। হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে ওরা একটা জলা জায়গায় এসে পৌঁছাল। এখানে মাটির তলায় একটা ছোট্ট ঝিল রয়েছে। ঝিরঝির করে উপর থেকে জল নেমে আসছে। কোনো এক ফাটল দিয়ে আলোও এসে ঢুকছে, তাই জায়গাটা খানিকটা আলোকিত। দু'একজায়গায় ঝোপঝাড়ও গজিয়েছে। তপেন্দ্র বাবু বললেন, "এটাই সেই জায়গা। এখানেই আটারা বাস করে।"
শুভ বলল, "কিন্তু আমরা কাউকে দেখতে পাচ্ছিনা তো?"
একটা অদ্ভুত তীক্ষ গলায় তপেন্দ্র বাবু হাঁক দিলেন, "সু_স্বা_গ_ত_ম।"
ঠিক তখন একটা ঝোঁপের আড়াল থেকে কাঠবেড়ালির মতো কোনো প্রানী মাথা বার করল। আস্তে আস্তে আরো একটা অবশেষে ঝোঁপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল কয়েকশো ছোট্ট ছোট্ট মানুষ, যাদের আমরা লিলিপুট বলে জানি। এদের মুখের গঠন মানুষের চেয়ে আলাদা হলেও এদের মানুষই বলা যায়। কারন এরাও মানুষের মতোই দুপায়ে হাঁটে। গায়ে পোশাকও পরে এবং দলবদ্ধভাবে বাস করে। তপেন্দ্র বাবু বললেন, "এই দেখুন, আমাকে দেখে ওরা বেশ খুশি হয়েছে। এমনিতে ওরা ভীষণ শান্ত এবং ভীতু। কিন্তু যদি ওদের উপরে কোনো অন্যায় করা হয় ওরা ক্ষিপ্রও হয়ে উঠতে পারে।"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "আচ্ছা, এদের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে?"
তপেন্দ্র বাবু বললেন, "হ্যাঁ, কেন যাবেনা? তবে আমি যেভাবে বললাম, ওইভাবে কথা বলতে হবে। সাধারণ ভাবে আমাদের গলার আওয়াজের যে কম্পাঙ্ক সেই কম্পাঙ্কের শব্দ ওরা শুনতে পায়না। ওই কারনে গলার আওয়াজ তীক্ষ্ণ করতে হয়।"
ডিকে মাথা নাড়ল। একটা লিলিপুটের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল সে। লিলিপুট টা ওকে দেখে লুকিয়ে পড়ল। আরো একটা লিলিপুটকে ধরার চেষ্টা করতে সেটাও লুকিয়ে পড়ল। অবশেষে দু'তিনবার চেষ্টা করার পরে একটা লিলিপুট ওর হাতে এল। এটা একটা মেয়ে লিলিপুট। কি সুন্দর বাদামি রঙের চুল, আর কি মিষ্টি দেখতে! মনেহচ্ছিল যেন একটা বার্বি ডল। লিলিপুটটা ওর হাতে কামড় বসাবার চেষ্টা করছিল। গলার আওয়াজ তীক্ষ্ণ করে ডিকে বলল, "আমি তোমার ক্ষতি করতে আসিনি। তোমাকে দেখে আমার খুব পছন্দ হয়েছে, আমাকে বিয়ে করবে?"
লিলিপুট মেয়েটা অবাক হয়ে একবার ডিকের দিকে তাকাল, তারপর সত্যি সত্যিই ডিকের হাতে একটা কামড় বসিয়ে দিল। পিছন থেকে ফিকফিক করে হেসে শুভ বলল, "তোমার জোক্সটা বোধহয় ওর ঠিকঠাক পছন্দ হলনা।"
লিটিপুটটাকে মাটিতে নামিয়ে রেখে মুখটাকে নিচে নামিয়ে আনল শুভ। এবারে সে বেশ কয়েকটা লিলিপুটের মুখোমুখি। সাবধান করে শুভ বলল, "দেখবে সাবধানে, ওরা তোমার নাকে কামড় বসিয়ে না দেয়।"
ডিকে হাসল। তারপর একখানা মোটাসোটা লিটিপুটের দিকে তাকিয়ে বলল, "আমি তোমাদের সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি।"
চিঁ চিঁ করে মোটা লিলিপুটটা বলল, "আমাদের তিনজন নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছে, তাই আমরা খুব ভয়ে আছি।"
ওদের গলার আওয়াজ বেশ মৃদু আর তীক্ষ্ণ। শুনে বুঝতে ডিকেকে বেশ কষ্ট করতে হল। বলল, "আমি তোমাদের সাহায্য করার জন্যই এখানে এসেছি। ওই তিনজন কিভাবে নিরুদ্দেশ হয়েছে বলতে পারবে?"
লিলিপুটটা বলল, "ক'দিন আগে ওরা শিকার করতে বেরিয়ে ছিল। এখানে বেশ কিছু নতুন শিকার এসেছিল। কিন্তু শিকারে গিয়ে ওরা আর ফিরে আসেনি।"
পিছন থেকে তপেন্দ্র বাবু বললেন, "ওদের খাদ্য মূলত লাল পিঁপড়ে আর তার ডিম। যাদের আমরা নালসো পিঁপড়ে বলে জানি। দেখলেন না, এতক্ষণ আমরা হেঁটে এলাম, কোথাও কোনো পিঁপড়ে আমাদের কামড়ায়নি।"
ডিকে মাথা নাড়ল। লিলিপুটদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "ওরা কোনদিকে গিয়েছিল বলবে?"
লিলিপুটটা মাথা নাড়ল। সামনেদিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, "ওইদিকে…"
লিলিপুটদের সামনে থেকে সরে এসে ডিকে। তপেন্দ্রবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, "এবারে আলো জ্বালাতে পারি? কথা তো হয়ে গিয়েছে।"
তপেন্দ্র বাবু বললেন, "হ্যাঁ, নিশ্চই।"
ফ্ল্যাশলাইট জ্বালাল ডিকে। গুহার মেঝে ধরে খুঁজতে খুঁজতে বেশ খানিকটা আসার পরে একজায়গায় এসে থমকে গেল। শুভ বলল, "কিছু খুঁজে পেলে?"
সাদা সাদা কিছু দানা তুলে শুভর হাতে দিল ডিকে। বলল, "এগুলো কি চিনতে পারছিস?"
শুভ বলল, "কি এগুলো? দেখে তো চিনির দানার মতো লাগছে।"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "হ্যাঁ, এগুলো চিনির দানাই। রিতিমতো প্ল্যান করে লিলিপুট গুলোকে চুরি করা হয়েছে। মেঝেতে চিনির দানা ছড়িয়ে দিয়ে পিঁপড়েদের এখানে ডেকে আনা হয়েছে, আর তাতে লিলিপুট গুলো প্রলুব্ধ হয়ে যখনই এখানে এসেছে, তখনই ফাঁদে পড়ে গিয়েছে।"
শুভর চোখ কপালে উঠে গেল। বলল, "কিন্তু এটা তো অনেক সময়ের কাজ।"
ডিকে বলল, "হ্যাঁ, অনেক সময়ের ব্যাপার। বাইরের কেউ একাজ করেনি। ঘরেরই কেউ এই কাজে যুক্ত আছে।" তপেন্দ্র বাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, "আপনার কাউকে সন্দেহ হয়?"
তপেন্দ্র বাবু বললেন, "এই বাড়িতে লোক বলতে তো আমরা দু'জন, আমি আর আমার ছেলে আর তিনখানা কাজের লোক। আমার ছেলে বাইরে থাকে, কিছুদিন আগে বাড়ি এসেছিল ঠিকই তবে ওর এসব বিষয় নিয়ে কোনো ইন্টারেস্ট নেই।"
ডিকে বলল, "রিসেন্ট আপনার বাড়িতে এমন কেউ এসেছিল, যাকে আপনি সন্দেহ করতে পারেন। আপনার মনেহয়েছে, এই লোকটা চুরি করতে পারে।"
তপেন্দ্র বাবু বললেন, "না, রিসেন্ট সেভাবে কেউ… হ্যাঁ, দিন সাতেক আগে একটা রিপ্রেজেন্টেটিভ এসেছিল। কোনো সাবান কোম্পানি থেকে, বেশ বোঝাচ্ছিল ওদের প্রোডাক্ট নেওয়ার জন্য, আমি মানা করে দিলাম, তারপর সে বেরিয়ে গেল, কিছুক্ষণ পরে বাইরে বেরিয়ে দেখি আমাদের বাগানের মালি সাগির সঙ্গে ও গল্প করছে। আমাকে দেখেই ঘাবড়ে গিয়ে চলে গেল।"
ডিকে বলল, "আচ্ছা, তবে এরমধ্যে অস্বাভাবিক কিছু নাও থাকতে পারে, হয়তো ও আপনাদের মালিকে আগে থেকেই চিনত, তাই গল্প করছিল।"
তপেন্দ্র বাবু মাথা নাড়লেন। গুহা থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে আসতে হঠাৎ কিছু একটা চকচকে জিনিস পেতেই সেটাকে কুড়িয়ে পকেটে পুরল ডিকে। জিনিসটা কি জানা চলত, কিন্তু শুভ কোনো প্রশ্ন করলনা। ওর মনেহল, ডিকে জিনিসটাকে লুকাতে চাইল, কারন কথা ঘোরানোর জন্য সে বলল, "আচ্ছা, কোন কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভ কিছু বলেছিল লোকটা?"
তপেন্দ্র বাবু বললেন, "হ্যাঁ, সম্ভবত ব্লুমেরি সাবান কোম্পানি।"
ডিকে বলল, "আচ্ছা, আমি খোঁজ নিচ্ছি।"
রুমে ফিরে আসার পরে শুভ বলল, "কোনো ক্লু পেলে মনেহচ্ছে?"
ডিকে বলল, "হ্যাঁ, ক্লু একটা পেয়েছি, কিন্তু তদন্ত করতে হবে। আমার তো মনেহচ্ছে 'ডালমে কুচ কালা হে'।"
শুভ বলল, "ব্যাপারটা কি একটু খুলে যদি বলো?"
ডিকে বলল, "অন্যকিছু না, বিকেলের দিকে আমাদের ব্লুমেরি কোম্পানির অফিসে গিয়ে খোঁজ নিতে হবে, ওখান থেকে কেউ এখানে এসেছিল কীনা।"
শুভ বলল, "আমার তো মনেহয়, ওই লোকটাই চোর। কোনোভাবে মালিকে হাত করে নিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়েছে।"
ডিকে বলল, "এভাবে অন্ধকারে মশা মারলে হবেনা, ব্যাপারটা এত ছোটখাটো ব্যাপার কিছু নয়। অনেকগুলো ব্যাপার আমার মাথার মধ্যে ঘুরছে।"
শুভ বলল, "কি রকম?"
ডিকে বলল, "এক, চোর কিভাবে জানল এখানে লিলিপুট রয়েছে, যেখানে তপেন্দ্র বাবু নিজেই জানতেন না ব্যাপারটা। দুই, সে কিভাবে জানল লিলিপুটদের এই গুপ্ত কক্ষে রাখা হয়েছে, যে কক্ষের খবর তপেন্দ্র বাবুও জানতেন না, তিন, সে কিভাবে জানল এই লিলিপুটরা পিঁপড়ে শিকার করে খায়? এত সহজ কেস নয়।"
শুভ মাথা চুলকাল। বলল, "হ্যাঁ, আমি এত ভেবে দেখিনি। আচ্ছা, তপেন্দ্র বাবুকে জিজ্ঞেস করলে হয়না উনি এই ব্যাপারগুলো কাউকে বলেছেন কিনা, অনেকেরই তো অনেক দুর্বলতা থাকে, যাদের কাছে তারা সব কথা খুলে বলে।"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "মনেহয়না উনি এত কাঁচা কাজ করবেন। উনি নিজেও জানেন এসব কথা কাউকে বলা মানে যেচে নিজের বিপদ ডেকে আনা।"
শুভ বলল, "তাহলে চোর কিভাবে জানল?"
ডিকে বলল, "ওটাই তো আমাদের খুঁজে বার করতে হবে।"
ঘূর্ণনপুরের কাছেই লক্ষ্মীসাগর একটা ছোটখাটো বাজারের মতো এলাকা। এখানেই রয়েছে ব্লুমেরি সাবান কোম্পানির একখানা অফিস। সেদিন বিকেলে ওরা অফিসে গিয়ে ঢুঁ মারল। বাঁকুড়া সার্কেলের ব্লুমেরি সাবানের সেলস ডিপার্টমেন্টের হেড প্রদ্যোত বাবু এই অফিসের বস। বললেন, "বলুন আমি কিভাবে আপনাদের সাহায্য করতে পারি?"
ডিকে বলল, "আমি একটা ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে প্রাইভেটলি তদন্ত করতে এখানে এসেছি। আমি জানতে চাই, দিন সাতেক আগে আপনাদের অফিস থেকে কেউ কি ঘূর্ণনপুর গ্রামে গিয়েছিল?"
প্রদ্যোত বাবু বললেন, "কি ব্যাপার বলুন তো?"
ডিকে বলল, "ব্যাপারটা একটু প্রাইভেট, তাই সব কিছু আপনাকে খুলে বলতে পারছিনা, আপনি শুধু এই ইনফরমেশনটা দিয়ে হেল্প করলে খুব উপকৃত হব।"
প্রদ্যোত বাবু মাথা নাড়লেন। কম্পিউটার চেক করে বললেন, "হ্যাঁ, দিন সাতেক আগে অনির্বাণ আমাদের এখান থেকে ঘূর্ণনপুরে গিয়েছিল।"
ডিকে বলল, "এই অনির্বানের সম্পর্কে আমি কিছু জানতে চাই।"
প্রদ্যোত বাবু বললেন, "অনির্বানের বাড়ি দিল্লিতে। এই রিসেন্টলি মাস ছয়েক হল ও এখানে জয়েন করেছে। হেড অফিস থেকে ওকে জয়েন করার নির্দেশ এসেছিল। আমার একটু অবাক লেগেছিল ব্যাপারটা। কারন আমাদের ওয়েস্ট বেঙ্গল সার্কেলের যেকোনো ব্রাঞ্চে রিপ্রেজেন্টেটিভদের জয়েনিং কোলকাতা থেকে হয়। স্পেশাল ওকেশন ছাড়া দিল্লি থেকে কোনো রিপ্রেজেন্টেটিভ এখানে আসেনা।"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "সাহায্য করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনি যদি অনির্বাণ বাবুর দিল্লির এড্রেসটা দিতেন তাহলে খুব উপকৃত হতাম।"
প্রদ্যোত বাবু বললেন, "কিন্তু এগুলো তো প্রাইভেট জিনিস কাউকে দেওয়া হয়না।"
ডিকে একটু কনফিডেন্স দেখিয়েই বলল, "চিন্তা নেই আমরা এড্রেস বার করে নিতে পারব, কিন্তু একটা বড়োসড়ো ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ঘটতে চলেছে, এরসঙ্গে ইন্টারপোল জড়িত, আপনি যদি সাহায্য না করতে চান, তাহলে হয়তো আপনিও এতে ফেঁসে যাবেন।"
প্রদ্যোত বাবু ঘাবড়ে গেলেন। বললেন, "দেখুন আমরা ছাপোষা মানুষ। এসব ক্রাইম ট্রাইমের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই, আপনি যেভাবে চান যেমনটি চান, আমি সেভাবেই আপনাকে সাহায্য করতে রাজি আছি।"
ডিকে বলল, "আচ্ছা, তাহলে অনির্বাণ বাবুর এখানের এড্রেস আর দিল্লির এড্রেসটা দিন। আর একটা কথা পুরো ব্যাপারটা যেন গোপন থাকে।"
প্রদ্যোত বাবু মাথা নাড়লেন। অর্নিবাণ বাবুর এড্রেস দিয়ে বললেন, "দেখবেন স্যার, আমার যেন কোনো ক্ষতি নাহয়।"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "আপনি আমাদের দেখছেন আর আমি আপনাকে দেখবনা? নিশ্চই দেখব।"
ওরা যখন রুমে ফিরে এল তখন প্রায় সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। রুমে ঢুকেই রোহিত কে ফোন করল ডিকে। রোহিত ওর দিল্লির এক বন্ধু। পেশায় সেও প্রাইভেট ডিটেকটিভ। আসলে প্রাইভেট ডিটেকটিভদের মধ্যে একটা পারষ্পরিক যোগাযোগ বা সহযোগিতা রাখতেই হয়। কখন কোন কেসে কার হেল্প লাগে বলা তো যায়না। রোহিত বলল, "আচ্ছা, আমি খোঁজ নিচ্ছি।"
রাতের দিকে ফোন করে রোহিত জানাল ওই ঠিকানায় অনির্বাণ নামে কেউ থাকেনা। শুভ বলল, "তাহলে? আমি আগেই সন্দেহ করেছিলাম, এই অনির্বাণই চোর। পুরো ঘটনাটা ওই ঘটিয়েছে।"
ডিকে বলল, "হ্যাঁ, তুই একটু অনির্বাণের দিকে নজর রাখ, আমি ততক্ষণ এদিকের কেসটা দেখি।"
শুভ মাথা নাড়ল। বলল, "আমি কাল থেকেই কাজে লেগে পড়ছি।"
সেদিন রাতে ডিনার সেরে শুভ শুয়ে পড়েছিল। ডিকে তখনও শোয়নি। আড়চোখে শুভ দেখছিল, কিছু ব্যাপার নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছে ডিকে। দেখতে দেখতে কখন সে ঘুমিয়ে পড়েছিল বুঝতেই পারেনি। মাঝরাতে হঠাৎ ওর ঘুম ভেঙে গেল। ডিকের বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখল বিছানায় ডিকে নেই। এত রাতে ও কোথায় গেল? ভাবল একবার উঠে গিয়ে রাজমহলের ভিতরে এক চক্কর লাগিয়ে আসে, পরক্ষণেই মনেহল, কি দরকার? ডিকে হয়তো কোনো কাজে গেছে ওকে দেখলে বিরক্ত হতে পারে। কিন্তু অনেকক্ষণ কেটে গেলেও ডিকে ফিরছেনা দেখে ওর বুকটা ধুকপুক করতে লাগল। ডিকের কোনো বিপদ আপদ হল নাতো? বিছানা থেকে সে উঠেই পড়ছিল, হঠাৎ ডিকে ফিরে এল। শুভ বলল, "কোথায় গিয়েছিলে?"
ডিকে বলল, "ইঁদুর খুঁজতে।"
শুভ ভ্যাবাচ্যাকা খেল। বলল, "মানে?"
ডিকে বলল, "এই ঘরের মধ্যে যেসব ইঁদুরের গর্তগুলো আছে সেগুলোই খুঁজে দেখছিলাম।"
শুভ বলল, "কিছু পেলে?"
ডিকে বলল, "একটা গর্তের ভিতরে একটা নক্সা পেয়েছি। নক্সাটা কিসের বুঝতে পারছিনা। এটা সমাধান করলে বেশ কিছু রহস্য উদ্ধার হতে পারে।"
শুভ বলল, "কিসের নক্সা। কই দেখি কাগজটা?"
ডিকে বলল, "কাগজে আঁকা নক্সা নয়, গর্তের ভিতরের দেওয়ালে আঁকা। আমি মোবাইলে ছবি তুলেছি।"
শুভ বলল, "আচ্ছা, ছবিগুলোই দেখাও।"
মোবাইল ক্যামেরার গ্যালারিটা খুলল ডিকে। গর্তের ভিতরের ছবি পরিষ্কারভাবে আসেনি। তবু যেটুকু বুঝতে পারল, তাতে মনেহল, চারকোনা বেশ বড়োবড়ো সাইজের বিল্ডিং এর নক্সা আঁকা হয়েছে। আঁকার হাত অপটু, তাই বিল্ডিংগুলো ত্যাড়াব্যাঁকা হয়ে গিয়েছে। শুভ বলল, "এই নক্সাটার অর্থ কি? এত বিল্ডিং কোথায় আছে? আর তুমি কিভাবে বুঝলে গর্তের ভিতরে এরকম নক্সা আঁকা রইবে?"
ডিকে বলল, "দেখ, চোর কিছু চুরি করলে তার প্রথম টার্গেট থাকে, সেই জায়গাটা থেকে পালিয়ে যাওয়ার। কিন্তু এই কেসে দেখছি আমরা যতজন কে সন্দেহ করছি, তারা সকলেই আছে, এবং বহাল তবিয়তেই আছে। এর দুটো অর্থ হতে পারে, এক, চোর বড়ো কিছু করতে চাইছে, আর দুই, চোর যা চাইছে তা এখোনো পায়নি।"
শুভ বলল, "আমার তো মনেহচ্ছে চোর বড় কিছু করতে চাইছে।"
ডিকে বলল, "হ্যাঁ, আমারও প্রাথমিক ভাবে তাই মনেহয়েছিল, কিন্তু এখন আপাতত এটাই মনেহচ্ছে চোর যা চুরি করতে চেয়েছিল, তা এখোনো পায়নি।"
শুভ বলল, "মানে? তুমি বলতে চাইছ লিলিপুটগুলোকে চোর চুরি করতে পারেনি?"
ডিকে বলল, "এটাও হতে পারে, আবার এটাও হতে পারে, চোর যতগুলো লিলিপুট চুরি করেছিল, তাদের সবাইকে নিয়ে যেতে পারেনি, কেউ না কেউ পালিয়েছে। পাছে সে তার নাম আর পাঁচজনকে বলে দেয় তাই সে এখোনো তাকে খুঁজছে। আর এই নক্সাটা সম্ভবত তারই আঁকা। সে যেখানে লুকিয়ে আছে, সেই জায়গার ঠিকানা যাতে ওর সঙ্গীরা খুঁজে বার করতে পারে, তাই নক্সাখানা এঁকেছে।"
শুভ বলল, "কিন্তু এত বিল্ডিং এই বাড়িতে কোথায় রয়েছে?"
ডিকে বলল, "এগুলোর একটাও বিল্ডিং নয়। তুই নিজেকে একজন লিলিপুট হিসাবে কল্পনা কর, তারপর ভাব তুই এমন একটা জায়গায় ঢুকেছিস, যেখানে এত বিশাল বিশাল বিল্ডিং দেখতে পাচ্ছিস, জায়গাটা কোথায় হতে পারে?"
কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করার পরে শুভ বলল, "লাইব্রেরি!"
উত্তেজনাবশত একটু জোরেই কথাটা সে বলে ফেলেছিল, বলার পরেই মনেহল, দরজার পিছন থেকে কে যেন সরে গেল। সেদিকে ডিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, "আমাদের এক্ষুণি রাজবাড়ির সংগ্রহশালায় যেতে হবে। চোর লিলিপুটকে খুঁজে বার করার আগেই আমাদের ওকে খুঁজে বার করতে হবে।"
ডিকে মাথা নাড়ল। ভোর হয়ে এসেছে। শুভকে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসার পরেই দেখল তপেন্দ্র বাবু উঠে পড়েছেন। ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন, "এত ভোরে কোথায় চললেন?"
ডিকে বলল, "চললেন নয়, আমাদের এক্ষুনি সংগ্রহশালায় যেতে হবে। আপনিও চলুন আমার সঙ্গে। খুব তাড়াতাড়ি…"
সংগ্রহশালার চাবি নিয়ে ফিরে এলেন তপেন্দ্র বাবু। বললেন, "চলুন।"
রাজবাড়ির প্রায় গায়ে গায়েই লাগোয়া রাজবাড়ির সংগ্রহশালা। সংগ্রহশালার ভিতরটা অনেকটা গোলকধাঁধার মতো। একটার পর একটা দরজা পেরিয়ে ওরা পুঁথি সংগ্রহশালায় এসে পৌঁছাল। ভিতরে ঢুকেই তীক্ষ্ণ কন্ঠে ডিকে বলে উঠল, "সু_স্বা_গ_ত_ম।"
একবার, আরো একবার, তৃতীয় বার বলার পরেই হঠাৎ একখানা পুঁথির ফাঁক থেকে একটা ছোট্ট মুখ উঁকি মারল। ওর কাছে এগিয়ে গিয়ে ডিকে বলল, "তোমার কোনো ভয় নেই, তুমি নিশ্চিন্তে বেরিয়ে আসতে পারো।"
এবারে লোকটা পুরোপুরি ভাবে বেরিয়ে এল। ডিকে ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। লিলিপুটটা তখনও ভয়ে কাঁপছে। ডিকে বলল, "তোমার কোনো ভয় নেই, তুমি আমার হাতে চড়ে বসো। তোমাকে তোমার সঙ্গীদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যই আমি এসেছি।"
লিলিপুটটা এবার নিশ্চিন্ত ভাবে ডিকের হাতে চড়ে বসল। লিলিপুটটাকে নিয়ে রুমে ফিরে আসতে আসতে ডিকে বলল, "ধারাগোল রহস্যের প্রথম ব্যারিকেড আমরা টপকে গেলাম।"
তৃতীয় পর্ব
সকাল হয়ে গিয়েছে। বাইরে থেকে আসা লালাভ আলোয় ঘর ভেসে যাচ্ছে। রুমে বসে লিলিপুটটার সঙ্গে কথাবার্তা বলছিল ডিকে। পাশে বসেছিলেন তপেন্দ্র বাবু আর শুভ। লিলিপুটটার দিকে তাকিয়ে ডিকে জিজ্ঞেস করল, "কিভাবে তোমরা ওই গুহার ভিতর থেকে বেরিয়ে এলে? তোমাদের কে চুরি করেছিল?"
লিলিপুটটা বলল, "কে চুরি করেছিল বলতে পারবনা। আমরা শিকার করতে গিয়েছিলাম, হঠাৎ কেন যে ঘুমিয়ে পড়লাম কে জানে?"
ডিকে বলল, "তারপর?"
লিলিপুটটা বলল, "আমার যখন ঘুম ভাঙল, তখন দেখলাম আমার সঙ্গীদের একটা বিশাল চারকোনা ঘরের ভিতরে ঢোকানো হচ্ছে, আমি একটু ফাঁকা পেতেই ঘরটা থেকে বেরিয়ে এসে, একটা গর্তের ভিতরে লুকিয়ে পড়লাম।"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "আচ্ছা, তারপর কি দেখলে?"
লিলিপুটটা একটু দম নিয়ে বলল, "তারপর দেখলাম, সে ঘরটাতে চাবি দিয়ে চাবিটা লুকিয়ে রাখল। আর আমাকে খুঁজতে লাগল।"
ডিকে মাথা নাড়ল। শুভর দিকে তাকিয়ে বলল, "কিছু বুঝতে পারলি?"
শুভ বলল, "হ্যাঁ, ওদের ঘুমের অষুধ দিয়ে অজ্ঞান করে একটা বাক্সের ভিতরে পুরে রাখা হয়েছে।"
"একদম ঠিক," ডিকে বলল। লিলিপুটটার দিকে তাকিয়ে বলল, "আচ্ছা, যে ঘরটাতে তোমার সঙ্গীদের লুকিয়ে রাখা হয়েছে, সেই ঘরটাতে আমাদের নিয়ে যেতে পারবে?"
লিলিপুটটা বলল, "না, এভাবে পারবনা, তবে আমি যেরকম বিভিন্ন গর্ত দিয়ে বেরিয়ে এসেছি, ওরকম গর্তের মধ্য দিয়ে হলে নিয়ে যেতে পারি।"
ফস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল ডিকে। বলল, "তুমি গর্তের ভিতর দিয়ে যেতে পারলেও আমরা তো পারবনা।"
লিলিপুটটা বলল, "কিন্তু যদি ঘরের চাবিটা দেন, তাহলে কিন্তু আমি আমার সঙ্গীদের ঘর থেকে বার করে আনতে পারব।"
ডিকে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, "চাবিটা উনি কোথায় লুকিয়েছেন তুমি দেখেছ তো?"
লিলিপুট বলল, "হ্যাঁ দেখেছি। আর চাবিটা চুরি করার চেষ্টা করেছি কয়েকবার, কিন্তু পারিনি।
ডিকে বলল, "আচ্ছা, তাহলে বলো, চাবিটা কোথায় আছে।"
লিলিপুটটা বলল, "এই ঘরের ভিতরে কোথাও একটা স্যাঁতসেঁতে গুহা আছে, গুহাটা কিন্তু নড়াচড়া করে। সেই গুহার বাইরে ঝরনা আছে। মাঝে মাঝেমাঝে ঝিরঝির করে জল পড়ে। গুহার বাইরে জঙ্গল আছে। আর সেই জঙ্গলে অনেক ঘাসও আছে।"
শুভ বলল, "কিন্তু এই ডেসক্রিপশন থেকে আমরা কিভাবে জায়গাটার লোকেশন বার করব।"
ডিকে বলল, "লোকেশন বার করতে হবেনা, লোকেশন আমি পেয়ে গেছি।"
শুভ ভ্যাবাচ্যাকা খেল। বলল, "কিভাবে?"
ডিকে বলল, "প্রথম দিন আমি এখানে এসে কিছু কুড়িয়ে ছিলাম তোর মনে আছে?"
শুভ বলল, "হ্যাঁ, গুহার ভিতরে তুমি কিছু কুড়িয়ে পেয়েছিলে, কিন্তু আমাদের দেখাওনি।"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "ওটা একটা কানের দুল। আর কানে দুল সাধারণত কারা পরে?"
মাথা চুলকে শুভ বলল, "তারমানে তোমার অনুমান কোনো মেয়ে এই চুরি গুলোর সঙ্গে জড়িত?"
ডিকে বলল, "এখন আর অনুমান নয়, এখন আমি নিশ্চিত, এই রাজবাড়ির মালি সাগি এই চুরিগুলোর সঙ্গে জড়িত। আর ওকে কোথায় দেখেছিলাম, সেটাও আমার মনেপড়েছে, দিল্লিতে কোনো একটা হোটেলে ও আগে কলগার্লের কাজ করত।"
শুভ বলল, "মাইগড! তারমানে ও ওই চাবিটা বাগানের কোনো গর্তের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে। ঘাস, জঙ্গল, ঝরনা তো বাগানেই আছে।"
একটা রহস্যময় হাসি হেসে ডিকে বলল, "দেখা যাক। তুই কিন্তু অনির্বাণের দিকে নজর রাখিস। কারন সাগি এই কেসের একটা বড়ে মাত্র। মূল মাথা কিন্তু অন্যকেউ।"
শুভ মাথা নাড়ল। সেদিন সারাটা দিন টোটো করে অনির্বাণ কে ফলো করল শুভ। অনির্বাণের পিছনে পিছনে গোটা শহর চষে ফেলল, কিন্তু সন্দেহ করার মতো কিছুই পেলনা। সন্ধ্যেতে অনির্বাণ এসে ওদের অফিসে ঢোকার পরে ওকে ফলো করা বন্ধ করে রাজবাড়িতে ফিরে এল সে। গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকতে গিয়েই একটা জোর ধাক্কা খেল। বাগানে দাঁড়িয়ে হো হো করে গল্প করছে ডিকে। চাপা গলায় কিসব রেট নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে কি…? ওর মাথাটা দুম করে আগুনের মতো গরম হয়ে গেল।
বেশ কিছুক্ষণ পরে ডিকে রুমে ফিরে আসতেই শুভ বলল, "ওই মেয়েটার সঙ্গে তুমি ওরকম হাহা করে গল্প করছিলে কেন? তুমি জানো ও আমাদের প্রধান সাসপেক্ট, তা সত্বেও?"
ডিকে বলল, "সাসপেক্টদের পেট থেকে কথা বার করতে গেলে মাঝেমাঝে ওরকম ছলনার আশ্রয় নিতে হয়।"
শুভ বলল, "কিন্তু তোমাদের কথা বার্তা শুনে তো মনেহলনা, তুমি ওর পেট থেকে কথা বার করার চেষ্টা করছ। তুমি ওর সঙ্গে কিসব রেট নিয়ে আলোচনা করছিলে?"
ডিকে বলল, "হ্যাঁ, আমি ওর কাছে জানতে চাইছিলাম ওর সঙ্গে সেক্স করতে গেলে ওকে কতটাকা দিতে হবে। ও বলল, আগে পাঁচশো টাকা নিত, তখন ওর টাকার অভাব ছিল, তাই পাঁচশো টাকাতেই রাজি হয়ে যেত, তবে শীঘ্রি মধ্যেই ওর কাছে বেশ ভাল এমাউন্টের টাকা আসতে চলেছে, তাই এবার থেকে হাজার টাকার কমে কাউকে দেবেনা। আমি দরাদরি করে সাতশো টাকায় রাজী করালাম।"
চোখ গোলগোল করে শুভ বলল, "তুমি কি এখন ওর সঙ্গে সেক্স করতে যাবে নাকি?"
ডিকে বলল, "কিচ্ছু করার নেই। রেট ফিক্স হয়ে গেছে যেতেই হবে।"
কি যেন বলার চেষ্টা করছিল শুভ, তার আগেই দেখল বাক্সখুলে লিলিপুটটাকে বার করে ডিকে নিজের পকেটে পুরে নিল। শুভ বলল, "তুমি সেক্স করতে যাচ্ছ যাও, ওকে কেন সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছ?"
ডিকে বলল, "প্রোয়োজন আছে বলেই নিয়ে যাচ্ছি।"
রুম থেকে বেরিয়ে এল ডিকে। লিলিপুটটাকে মুখের কাছে তুলে এনে বলল, "যা বলেছি মনে আছে তো?"
লিলিপুটটা মাথা নাড়ল। লিলিপুটটাকে পকেটে পুরে সাগির রুমে গিয়ে উপস্থিত হল ডিকে। রুমের ভিতরে পায়চারি করছিল সাগি। ওর গায়ে একটা চুড়িদার। সামনেটা ওড়না দিয়ে ঢাকা। গোল ধরনের মুখ। মুখে বেশ চড়া মেকাপ বসানো। ঠোঁটে মোটা করে লিপস্টিক। চুলগুলো খোলা। খুব সেক্সি লাগছিল ওকে। ডিকের দিকে তাকিয়ে বলল, "এসো এসো। আমিও অনেকদিন নিরামিশ আছি। আজ তোমাকে পেলাম।"
ডিকে বলল, "ভাগ্যিস তোমাকে আমি চিনতে পেরেছিলাম, নাহলে রাজবাড়িতে সেক্স করার স্বপ্ন আমার কখনোই পূরণ হতনা।"
সাগি বলল, "নাগর আমার! মুখ দেখে তো তোমাকে কচি খোচা লাগে, তোমার পেটে এত কুবুদ্ধি আছি আমি কিন্তু সত্যিই বুঝতে পারিনি।"
ডিকে বলল, "কথাবার্তা ছাড়ো, এখন কাজ শুরু করো। আমি আর অপেক্ষা করতে পারছিনা।"
সাগি বলল, "উফ! নাগরের আর তর সয়না, কোথা থেকে শুরু করব বলো? আগে ব্লোজোব...?"
ডিকে বলল, "তোমাকে কিচ্ছু করতে হবেনা, তুমি স্রেপ নিজেকে আমার হাতে ছেড়ে দাও, বাকিটা আমি দেখছি।"
সাগি বলল, "ওমা! এতো এক্সপার্ট দেখছি।"
বলে নিজের ওড়নাটা টেবিলে নামিয়ে রাখল সাগি। সাগির দু'খানা বিশাল সাইজের স্তন ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকতে লাগল। যেন ডিসকন্ট্রোল হয়ে উঠেছে, এভাবেই সাগিকে জড়িয়ে ধরল ডিকে। ওর ঠোঁটে চুমু খেল, ওর বুকে হাত রাখল এবং হাতের শক্ত তালু দিয়ে স্তন দুটোকে পেশাই করতে লাগল। ব্যাথা পেয়ে সাগি বলল, "আ! এত জোরে, লাগে যে!"
ডিকে বলল, "লাগুক। আজ আমি সব সুদেআসলে উশুল করব।"
"নাগর আমার ওস্তাদ", বলে নিচের দিক থেকে ধরে চুড়িদারটাকে টেনে খুলে ফেলল সাগি। ওর ব্রার ভিতরে হাত ঢোকাল ডিকে। ওর স্তনের বোঁটাগুলোকে নিয়ে নিয়ে খেলা করতে লাগল। সাগি বলল, "উফ! কি লাগছে!"
ডিকে বলল, "ভাল লাগছে?"
সাগি বলল, "দারুন লাগছে!"
সাগিকে ঠেলে বিছানায় নিয়ে গিয়ে শোয়াল ডিকে। ওর ব্রা খুলে স্তনের বোঁটায় মুখ লাগাল। সাগি বলল, "মাগো, হালত খারাপ হয়ে গেল।"
ডিকে হাসল। তারপর ওর হাত দিয়ে সাগির মাংসল পেটে কয়েকবার হাত বুলিয়েই নিচের দিকে নেমে ওর প্যান্টের ডোর খুলে ফেলল। ডিকের হাতটাকে ধরে নিজের প্যান্টির মধ্যে ঢুকিয়ে নিল সাগি। ডিকে ওর তলপেটের ঘন নরম লোমগুলোতে কয়েকবার হাত বুলিয়ে ধীরে ধীরে হাতটাকে নিচে নামিয়ে এনে, হাতের দুটো আঙুল চালিয়ে দিল সাগির যোনির মধ্যে। "ও উফ!" করে উঠে ডিকে কে জড়িয়ে ধরল সাগি। ডিকে ততক্ষণে ফিঙ্গারিং শুরু করে দিয়েছে। ডিকের হাতটাকে জোর করে নিজের তলপেটে চেপে ধরে সাগি বলল, "ওমা! আমি পাগল হয়ে যাব।"
ডিকে বলল, "আমি তো সেটাই চাই।"
ডিকে ফিঙ্গারিং চালিয়ে গেল যতক্ষণ পর্যন্ত না সাগি সম্পূর্ণ ডিসকন্ট্রোল হয়। অবশেষে সাগি যখন সম্পূর্ন ডিসকন্ট্রোল হল, ওর যোনিদ্বার ভিজে উঠতে লাগল, তখন সে ওর চুড়িদার প্যান্ট আর প্যান্টি টেনে খুলে ফেলল। এই মুহূর্তে সম্পূর্ন নগ্ন অবস্থায় বিছানায় শুয়ে রয়েছে সাগি। চোখ দুটো বন্ধ। যেন আধোঘুমে সে ঘুমিয়ে রয়েছে। দুটো ঠোঁটকে বারবার কামড়ে উঠছে এক অনাবিল আনন্দের আশ্লেষে। নিজের জামা খুলে ফেলল ডিকে। প্যান্টটাকে অর্ধেক খুলে সাগির শরীরের উপরে শুয়ে পড়ল। নিজের লোমশ বুক দিয়ে সাগির স্তন গুলো পেষাই করতে লাগল। ডিকেকে জোর করে জড়িয়ে ধরে ঘুমঘোর গলায় সাগি বলল, "ওমা গো! আ! ঢোকাও, আর পারছিনা।"
হাতটাকে নিচের দিকে নামিয়ে আনল ডিকে। যেন নিজের পুরুষাঙ্গটাকে ওর যোনীর নরম পাপড়ির ভিতরে ঢোকাচ্ছে, এমনভাবেই পকেট থেকে লিলিপুটটাকে বার করে আনল। লিলিপুটটা হাতড়ে হাঁতড়ে গিয়ে সাগির পিচ্ছিল যোনির ভিতরে ঢুকে পড়ল। "উ উফ!" করে উঠে সাগি বলল, "তোমারটা কি মোটা আর কি বড়ো। পুরো ভিতর পর্যন্ত ঢুকে পড়ছে।"
সাগিকে চেপে বিছানার উপরে ধরে রেখে ডিকে বলল, "আমার ওটার সবাই প্রশংসা করে।"
ডিকের সারা মুখে চুমু খেতে খেতে ঠ্যাঙ দুটোকে তুলে ডিকের কোমরটাকে জড়িয়ে ধরল সাগি। ওর চোখ এক একবার উল্টে যেতে লাগল। নিজের হাত দিয়ে প্রানপণে সাগির স্তন দুটোকে পেশাই করতে লাগল ডিকে। হঠাৎ সাগি ব্যাথা পেয়ে একবার চিৎকার করে উঠল। বলল, "মাগো, যেন একেবারে ভিতরে গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছে, একটু বাইরে বার করো সোনা, আর নিতে পারছিনা।"
সাগির ঠোঁটে চুমু খেতে খেতে ডিকে বলল, "আর দু'মিনিট প্লিজ একটু ওয়েট করো।"
মিনিট দুই পরে "মা গো মা, আ! আ! আ!", করে হঠাৎ জোর করে ডিকে কে জড়িয়ে ধরল সাগি। ওর যোনি থেকে ছিটকে কতকটা তরল পদার্থ বেরিয়ে এল। সাগিকে একই অবস্থায় চেপে ধরে রেখে নিচের দিকে তাকাল ডিকে। দেখতে পেল, লিলিপুটটা ভিতর থেকে বেরিয়ে এসেছে। ওর সারা গা জবজবে ভেজা। সাদা তরলের মাঝে সে যেন খাবি খাচ্ছে, আর ওর হাতে জ্বলজ্বল করছে টি এর মতো দেখতে একটা চাবি। চাবিটা এমন ভাবেই বানানো যে সেটাকে গর্ভ নিরোদক কপার টি হিসাবেও ব্যবহার করা যায়, আর ওই কারনেই চাবিটাকে এত সহজে যোনির ভিতরে লুকিয়ে রাখতে পেরেছিল সাগি। চোখ বুজে লিলিপুটটাকে একবার সিগন্যাল দিতেই সে চাবিটাকে নিয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়ল। ঘরের কোনায় একটা ছোট্ট সাদা রঙের বাক্স রয়েছে, চাবিটাকে টানতে টানতে ওই বাক্সটার দিকে এগিয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ ওইভাবে সাগিকে জড়িয়ে ধরে রেখে আদর করল ডিকে। যখন দেখল লিলিপুটটা ওর সঙ্গীদের বাক্স থেকে বার করে গর্তের ভিতরে ঢুকে পড়েছে, তখন সাগিকে ছেড়ে দিল। সাগি বলল, "সত্যি, তুমি আমাকে যে পরিমাণ তৃপ্তি দিলে আজ পর্যন্ত কেউ আমাকে দেয়নি। সবাই নিজের কথাই ভেবেছে, আমার স্যাটিসফ্যাকশনের কথা আজ পর্যন্ত কেউ চিন্তাও করেনি।"
ডিকে বলল, "আমি স্বার্থপর নই, যে কেবল নিজের কথাই ভাবব।"
সাগি বলল, "কিন্তু তোমার তো এখোনো হলনা, আমি বরং তোমাকে একটু ব্লোজোব করে দিই।"
প্যান্টে চেন লাগাতে লাগাতে ডিকে বলল, "আরে না না, আমারও হয়ে গিয়েছে। আজ তোমার সঙ্গে আমিও যথেষ্ট তৃপ্তি পেয়েছি।"
সাগি মাথা নাড়ল। পকেট থেকে টাকা বার করে সাগির হাতে দিয়ে ফিরে আসার সময় ডিকে ভাবল, আজ সেকেন্ড ব্যারিকেডটাও সে টপকে গেল।
রুমে ফিরে আসার পরে দেখল তিনটে লিলিপুট ওর দরজার আড়ালে লুকিয়ে আছে। ওদেরকে হাতে তুলে নিয়ে রুমের ভিতরে থাকা একটা টেবিলের উপরে নামাল ডিকে। অবাক ভাবে শুভ বলল, "কিভাবে এই লিলিপুটদের উদ্ধার করলে? চাবি কোথায় পেলে?"
ডিকে বলল, "নড়াচড়া করা গুহার মধ্যে?"
শুভ ভ্যাবাচ্যাকা খেল। বলল, "মানে?"
বাক্সের চাবিটা দেখিয়ে বলল, "এটা কি চিনতে পারছিস?"
শুভ বলল, "কি এটা?"
ডিকে বলল, "এটা হচ্ছে কপার টি। প্রেগন্যান্সি রোধ করার জন্য এটা ইউজ করা হয়, কিন্তু এই কপার টি টা স্পেশাল ভাবে বানানো। যাতে এটাকে চাবি হিসাবেও ইউজ করা যায়। তুই লিলিপুটের কথাটা তলিয়ে ভাবিসনি, তাহলেই বুঝতে পারতি। এমন একটা গুহা যেগুহা নড়াচড়া করে, গুহার বাইরে ঝরনা আছে যেখানে ঝিরঝির করে জল পড়ে, আর গুহার বাইরে জঙ্গল আছে, যেখানে ঘাস আছে। কি হতে পারে জায়গাটা?"
শুভর চোখ কপালে উঠে গেল। বলল, "ও মাই গড! লিলিপুটটা ভ্যাজিনার কথা বলছিল? আমি সত্যিই ভেবে দেখিনি।"
ডিকে বলল, "যাক! লিলিপুটদের তো উদ্ধার হল, কিন্তু ওদের নেক্সট প্ল্যান কি সেটা জানা দরকার," তারপর উদ্ধার করে আনা লিলিপুটদের দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলল, "আচ্ছা, তোমরা তো অনেকদিন ওই রুমে বন্দি অবস্থায় ছিলে, তোমরা কি কিছু শুনেছ? মেয়েটা কি বলছিল?"
লিলিপুটদের একজন বলল, "আমরা তো মানুষের কথা পরিষ্কার বুঝতে পারিনা, তবে মেয়েটা আজকে কাকে যেন হল্যা হল্যা করে পায়ের দুন না কি যেন বলছিল? আর বলছিল, এজ রুত হলমলা।"
শুভর দিকে তাকিয়ে ডিকে বলল, "কিছু বুঝতে পারলি?"
শুভ মাথা নাড়ল। বলল, "না, হল্যা কি পায়ের দুনটাই বা কি আর হলমলা টাই কি?"
ডিকে বলল, "হল্যাটা হল হ্যালো, মানে সাগি কারুর সঙ্গে ফোনে কথা বলছিল। পায়ের দুন মানে যার সঙ্গে কথা বলছিল, তার নাম পায়ের দুন দিয়ে কিছু হবে, আর এজ রুত হলমলা টা হল, আজ রাতে হামলা।"
শুভর বুকটা ধড়াস করে উঠল। বলল, "তারমানে আজ রাতে ওরা রাজবাড়িতে হামলা চালাবে?"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "আমাদেরও প্রস্তুত থাকতে হবে।"
শুভ বলল, "কিন্তু ওরা কতজন আসবে আমাদের তো জানা নেই। আমরা যে দু'জন। কিভাবে ওদের আটকাব?"
ডিকে বলল, "না, দু'জন দিয়ে হবেনা। লোক বাড়াতে হবে।"
বলেই সে মেদিনীপুর কোতোয়ালির ওসি সমীর বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করল ডিকে। এর আগে বেশ কয়েকটা কেসে সে ওনাকে হেল্প করেছে, তাই ওর বিশ্বাস ছিল এই কেসে উনি ওকে হেল্প করবেন, হলও তাই। সমীর বাবু বললেন, "ঘূর্ণনপুর গ্রাম যে থানার আন্ডারে, সেই থানার ওসি আমার বন্ধু। আমরা ব্যাচমেট ছিলাম, আমি ওকে ফোন করে তোমার ব্যাপারে বলছি। তোমার কোনো প্রবলেমই হবেনা।"
কয়েক মিনিটের মধ্যেই সিমলাপাল থানা থেকে রজত বাবুর ফোন এল। রজত বাবু বললেন, "আরে বলেন কি মশাই? রাজবাড়িতে হামলা হবে আর আমরা ফোর্স পাঠাবনা? রাজা তপেন্দ্র সিংহচৌধূরি এই এলাকার সবচেয়ে বিশিষ্ট লোক। উনি একবার ফোন করে ডাকলেই আমাদের পুরো থানা ওনার প্রোটেকশনের জন্য চলে যাবে।"
ডিকে বলল, "পুরো থানার প্রোটেকশন দরকার নেই, আপনারা সাদা পোশাকের কিছু পুলিশ পাঠান। হামলাকারিদের ধরা সবচেয়ে বেশি জরুরি।"
রজত বাবু বললেন, "চিন্তা করবেন না, একঘন্টার মধ্যে রাজবাড়ির বাইরে ফোর্স রেডি থাকবে, আমি নিজে ওই ফোর্সের দায়িত্বে থাকব। আপনি সিগন্যাল দিলেই…"
ডিকে বলল, "আচ্ছা, দেরি করবেন না।"
ফোন কেটে দিল ডিকে। শুভ বলল, "আমরা কি তপেন্দ্র বাবুকে এই ব্যাপারগুলো জানাব?"
ডিকে বলল, "না, উনি বুড়ো মানুষ বেকার দুশ্চিন্তা করবেন। আমরাই এই ব্যাপারগুলো সামলে নেব।"
শুভ মাথা নাড়ল।
এগারোটার পর থেকে রাজবাড়ির বাগানে বসে অপেক্ষা করছিল শুভ। সন্ধ্যে থেকে অনেকঘটনা ঘটে গিয়েছে। তপেন্দ্রবাবু শুয়ে পড়ার পরে শুভকে বাগানে বসিয়ে রেখে রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছে ডিকে। ওকে একটা মোবাইল নম্বর দিয়ে গিয়েছে, বলে গিয়েছে, সময় এলে এই নাম্বারে কল করতে। ইতিমধ্যে রাজবাড়ির বাইরে একটা ট্রাক এসে থেমেছে। ট্রাকটার ক্যারিয়ার ঢাকা দেওয়া। সম্ভবত ওখানেই অপেক্ষা করছে সাদা পোশাকের পুলিশেরা। এখন রাত বারোটা বাজে। গোটা রাজবাড়ি থমথম করছে। ঝিঁঝিঁর ডাক ছাড়া কিচ্ছু শোনা যাচ্ছেনা। ঝোঁপের ভিতরে নট নড়ন চড়ন অবস্থায় বসেছিল শুভ। ওর গা ছমছম করছিল। নাকের উপরে একটা জোনাকি এসে বসেছে। পিছনে মশারাও হুলবর্ষন শুরু করেছে। বসে থাকতে ওর বেশ বিরক্ত লাগছিল। এখোনো ডিকে কেন ফিরছেনা কে জানে? বেশ খানিকক্ষণ একটানা বসে থাকার পরে হঠাৎ কাউকে বাগানের দিকে এগিয়ে আসতে দেখল। ঝনঝন চুড়ির শব্দ শুনে বুঝল এটা সাগি। বাগানের এক কোনায় দাঁড়িয়ে সাগি ফোনটা হাতে তুলে নিল। ডিসপ্লে লাইট দেখে মনেহল ও কাউকে ফোন করছে। ওপাশে কেউ ফোন ধরতেই সাগি বলল, "রাস্তা ক্লিয়ার আছে, ঢুকে পড়ো।"
ওপাশে কেউ কিছু বলল। তার উত্তরে সাগি বলল, "টিকটিকিরা কেউ রুমে নেই দেখে এলাম। সম্ভবত ওরা কোথাও বেরিয়েছে। হাতসাফাই করার এটাই সুযোগ…"
তার বেশ কিছুক্ষণ পরে বাগানের একটা কোনা থেকে তিনচারটা আবছা আলো এগিয়ে এল রাজবাড়ির দিকে। আর অপেক্ষা করতে পারলনা শুভ। সে মোবাইলের কল বোতাম টিপে দিল। রিং হয়েছে কি হয়নি। হঠাৎ বেশ কয়েকটা জোরালো আলো জ্বলে উঠল রাজবাড়ির আনাচ কানাচ থেকে। লোকগুলো ততক্ষণে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যে যেদিকে পারল দৌড় লাগাল। ঝোঁপের ভিতরে আর বসে রইতে পারলনা শুভ। সে গিয়ে সাগির চুড়িদার খানা চেপে ধরল। এক ঝটকায় নিজের চুড়িদার খানা খুলে ফেলে ব্রা পরেই ছুটতে লাগল সাগি। কিন্তু বেশিদূর যেতে হলনা। তার আগেই একজন মহিলা কনস্টেবল ওকে ধরে ফেললেন। বেশ কিচ্ছুক্ষণ ধরে একটা চাপা হৈ হুল্লোড়ের পরে পুলিশেরা সব অপরাধীদের ধরে এনে রাজবাড়িতে জড়ো করল। এতক্ষণ শুভ ভাবছিল, সে বোধহয় একাই ঝোঁপের ভিতরে বসে আছে, কিন্তু ঝোঁপের ভিতরে যে এতজন পুলিশ অফিসারও এমবুশ করে বসে আছেন, সে মোটেই বুঝতে পারেনি।
হৈ হুল্লোড় থেমে গিয়েছে। রাজবাড়ির দেউড়িতে সকলে একে একে এসে জড়ো হয়েছে। রাজবাড়ির সব চাকর বাকর, তাছাড়া তপেন্দ্র বাবুও ঘুম থেকে উঠে এসেছেন। পুলিশি ঘেরাটোপের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে রাজবাড়িতে ডাকাতি করতে আসা আরো বিশেষ ভাবে বলতে গেলে, রাজবাড়িতে লিলিপুটদের চুরি করতে আসা অপরাধীরা। ওদের মধ্যে অনির্বাণ আর সাগিকে তো শুভ চেনে, বাকিদের দেখে ছোটখাটো চোর বলেই মনে হল। ওদের দিকে তাকিয়ে জেরা করার ভঙ্গিতে রজত বাবু বললেন, "কে তোদের লিডার?"
অনির্বাণ বলল, "আমাদের লিডার ছোটখাটো কেউ নয়, আর তাকে আপনারা ধরতেও পারবেন না স্যার। সে এতক্ষণে আপনাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছে।"
হঠাৎ পিছন থেকে ডিকের গলার আওয়াজ পেল শুভ। ডিকে বলল, "কে বলল, ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে? ডিকে যেখানে আছে সেখানে অপরাধীরা পার পায়না।"
বলে একটা লোককে হিড়হিড় করে টানতে টানতে রাজবাড়ির ভিতরে নিয়ে আসতে লাগল। লোকটার সারা মুখ ফেটে গিয়ে রক্ত ঝরছে। সম্ভবত ডিকের সঙ্গে জোর টক্কর হয়েছে লোকটার। ডিকের মার যে একবার খায় তার সারাজীবনের মতো খাওয়ার শখ মিটে যায়। লোকটাকে দেউড়ির মেঝেতে আছড়ে ফেলে, শুভর দিকে তাকিয়ে ডিকে বলল, "লোকটাকে চিনতে পারলি?"
শুভ বলল, "প্রদ্যোত বাবু…?"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "হ্যাঁ, প্রদ্যোত বাবু ছদ্মনামে থাকা এই ব্যক্তি একজন ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল, এরনাম প্রদ্যুম্ন সিনহা, যার নাম লিলিপুটরা পায়ের দুন শুনেছিল।"
হাঁ করে রজত বাবু বললেন, "এই সেই প্রদ্যুম্ন সিনহা, যে ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল? ড্রাগস, নারীপাচার, জমির দখলদারি, পশু প্রানীদের চোরা চালান এমন কোনো কাজ নেই, যেখানে ও যুক্ত নেই। কয়েকমাস আগে ফ্রান্সের রিসার্চারদের কাছ থেকে কিসব গোপন তথ্যও চুরি করেছিল।"
ডিকে মাথা নাড়ল। বলল, "হ্যাঁ, ফ্রান্সের রিসার্চারদের কাছ থেকেই আটাকামা ডেসার্টের আটাদের ব্যপারে সব তথ্য চুরি করেছিল প্রদ্যুম্ন। ওখানেই কোথাও উল্লেখ ছিল, তপেন্দ্র বাবুদের পূর্বপুরুষ আটকামা ডেসার্টে কিছু একটা অদ্ভুত প্রাণীর সন্ধান পান, তাই ব্যাপারটা তদন্ত করার জন্য সে দিল্লিতে এসে সাগির সঙ্গে যোগাযোগ করে, তারপর ওদের সঙ্গে যোগ দেয় এই অনির্বান। ওরা তিনজনে এখানে এসে ব্লুমেরি সাবান কোম্পানির নামে অফিস খুলে বসে। আর স্থানীয় কয়েকজন চোর ছ্যাঁচড়ের সাহায্যে এই প্রাণীগুলোকে চুরির চেষ্টা চালায়। ওদের উদ্দেশ্য ছিল এই প্রাণীগুলোকে নিয়ে গিয়ে বিদেশে বিক্রি করা, কিন্তু ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে এদের কি দাম হবে ওরা জানতনা, তাই স্পেশিম্যান প্রথমে দু'তিনটাকে চুরি করে, তাদের ভিডিও বানিয়ে ইন্টারনেটে বার্গেনিং শুরু করে, তারপর যখন ইন্টারনাল বাজারে চড়া দাম পায় তখন এই প্রাণীগুলোকে পুরোপুরিই চুরি করার চেষ্টা করে। আজ আমরা যদি না থাকতাম, তাহলে হয়তো এই ঘূর্ণনপুর থেকে এই লিলিপুটরা পুরো সাফ হয়ে যেত।"
শুভ বলল, "কিন্তু তুমি কিভাবে এসব তথ্য পেলে?"
ডিকে বলল, "এই ব্যাপারে রোহিত আমাকে খুব সাহায্য করেছে। ও যখন অনির্বাণের ঠিকানা পেলনা, তখন আমি ব্লুমেরি সাবান কোম্পানিতে খোঁজ নিতে বললাম, ওদের এখানে কোনো অফিস আছে কীনা, ব্লুমেরি কোম্পানি থেকে জানাল, ওয়েস্টবেঙ্গলে কোলকাতা ছাড়া ওদের কোনো অফিস নেই, তখন আমি আমার মোবাইলের গোপন ক্যামেরায় তোলা অনির্বান, সাগি আর প্রদ্যোত বাবুর ছবি রোহিতকে পাঠালাম, অনির্বান আর সাগির খবর দিতে পারল রোহিত। ওরা কয়েকদিন আগে কোনো একটা চুরির কেসে জড়িয়ে পড়ে দিল্লি থেকে ফেরার হয়ে যায়। কিন্তু প্রদ্যোত বাবুর খোঁজ সে দিতে পারলনা। আমিও প্রথমে ভেবেছিলাম, প্রদ্যোত বাবু নিরপরাধ কিন্তু আমার মাথায় ঘুরছিল এরা আটাকামা হিউম্যানয়েডসের ব্যাপারে এত তথ্য জানল কিভাবে? তখনই মনেপড়ল কয়েকদিন আগে ফ্রান্সের রিসার্চারদের কাছ থেকে কিছু তথ্য চুরি গিয়েছিল, ব্যাপারটা নিয়ে সামান্য একটু হৈচৈ হলেও যতটা সম্ভব ধামা চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তারপর ফ্রান্স এম্বেসিতে প্রদ্যোত বাবুর ছবি পাঠাতেই প্রদ্যোত বাবুর পরিচয় আমার সামনে এল। অবশেষে ইন্টারপোলের অফিসার মিস্টার বিজয়কে জানাতেই উনি ইন্টারনেট থেকে প্রদ্যুম্নর ওয়েবসাইট হ্যাক করে আমাকে পুরো তথ্য পাঠালেন। বুঝতে পারলাম, শহর থেকে বহুদূরে এই ঘূর্ণনপুরে বসে প্রদ্যুম্ন কি রাসলীলা শুরু করেছে?"
শুভ বলল, "এই কেসে তুমিও রাসলিলা কম করোনি, সাগির সঙ্গে যেভাবে তুমি…? আমি তো ভাবলাম তুমি হয়তো..."
ডিকে হাসল। তপেন্দ্র বাবু বললেন, "আপনি যে আমার কতবড় উপকার করলেন আপনি ভাবতে পারবেন না, আপনি তো একে রাজবাড়িতে চুরির চেষ্টা আটকে দিলেন, আর তারসঙ্গে এই প্রাণীদের বাঁচিয়েদিলেন যারা এত বছর আমার বাড়িতে আশ্রিত, কী বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেব বুঝতে পারছিনা।"
ডিকে বলল, "ধন্যবাদ দেওয়ার কি দরকার, এ তো আমার কর্তব্য।"
রুমে গিয়ে চেকবুক নিয়ে ফিরে এলেন তপেন্দ্র বাবু। চেকবুক থেকে পঁচিশ হাজার টাকার একটা চেক কেটে ডিকের দিকের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, "এই নিন আপনার পারিশ্রমিক।"
চেকটা হাতে নিয়ে ডিকে বলল, "আমার আর একটা আবদার রয়েছে, যদি আমাকে একবার আপনার পাঠাগার থেকে পুরানো পুঁথিগুলো বিশেষত শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ছিন্ন অংশটুকু পড়তে দিতেন, তাহলে খুব খুশি হতাম।"
তপেন্দ্রবাবু খুশি হয়ে বললেন, "নিশ্চই, এ তো আমার পরম সৌভাগ্য।"
(সমাপ্ত)
©All rights reserved to sankha subhra nayak

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন