বৃহস্পতিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১৯

পোগ্রাম ৩৩০৩

প্রোগ্রাম ৩৩০৩

শঙখ শুভ্র নায়ক



শম্ভুনাথ পট্টনায়কের বয়স এখন আশি। বার্ধক্য তার শরীরে ছাপ ফেললেও মনের মধ্যে ফেলতে পারেনি। আজও তিনি অনায়াসেই তিন মাইল মর্নিং ওয়াক করতে পারেন। জীবনের বেশির ভাগ সময়টা বিদেশে কাটিয়েছেন। অবসরের পরে চলে এসেছিলেন রিমঝিম শহরে। গত কুড়িটা বছর এই শহরের মানুষগুলোর সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাটিয়ে দিলেন। যখন দেশের মানুষ বিদেশে যাওয়ার সুযোগ পেলে বিদেশেই বাকি জীবনটা কাটানোর মনস্থ করে নেয়, তখন শম্ভুনাথ বাবুর দেশে ফিরে আসার পিছনে একটা বিশেষ কারণ ছিল। বিদেশের ঘিঞ্জি পরিবেশ, বিভিন্ন চাপ আর দ্রুত গতির জীবনযাত্রার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে তার স্ত্রী সবিতা ক্রমশ মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন। উনি ভেবেছিলেন দেশে ফিরে এলে যদি সবিতা সুস্থ হয়ে ওঠে। হ্যাঁ, সুস্থ অনেকটা ছিলেন তিনি। কিন্তু একটা সমস্যা কখনোই পিছু ছাড়েনি। মাঝেমাঝেই মাঝরাতে ঘুমের ঘোরে উনি বেরিয়ে যেতেন। ডাক্তারি পরিভাষায় যে রোগটার নাম সোমনামবুলিজম। এজন্য শম্ভুনাথ বাবুকে বেশ সতর্কই থাকতে হত। তবে সমস্যা খুব একটা কখনোই হয়নি। কিন্তু মাস ছয়েক আগে সেই দিনটার কথা শম্ভুনাথ বাবু কখনোই ভুলবেন না। সেদিন তার চোখে কি অভিশাপ লেগেছিল কে জানে? মাঝরাতে এমন ঘুমিয়ে গিয়েছিলেন যে সবিতা কখন বেরিয়ে গেছে টেরই পাননি। পরদিন সকালে সবিতাকে দেখতে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি করা হয়। ততক্ষণে যা বিপদ ঘটার ঘটেই গেছে। সবিতাকে আর জ্যান্ত অবস্থায় পাওয়া যায়নি। শ্মশানের পাশে পাওয়া গিয়েছিল ওর ডেডবডি। কারা যেন ওর উপর অত্যাচার করে ওকে মেরে ফেলেছিল। বেশ কিছু দিন থানা পুলিশ দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন উনি। কোনো লাভ হয়নি। বরং ফোনে দু'চারবার হুমকি জুটেছিল, "এই বুড়ো বেশি ছটফট করলে তোকেও বউয়ের কাছে পাঠিয়ে দেব। চুপচাপ থাক, কোনো ঝামেলা হবেনা।"
দৌড়াতে দৌড়াতে একসময় উনিও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। বুঝে গিয়েছিলেন দোষীরা ধরা পড়বেনা। নিষ্ক্রিয় ভাবে ঘরের মধ্যে বসে পড়েছিলেন। তবে শুধু চুপচাপ হয়তো ছিলেন না, ভিতরে ভিতরে কিছু একটা প্ল্যান কষছিলেন। মনেমনে ঠিক করে নিয়েছিলেন মরার আগে সবিতার খুনিদের যেভাবে হোক শাস্তি দিয়ে যাবেন। কিন্তু কিভাবে? তাই বুঝে উঠতে পারছিলেন না। রুমের বাইরে বসে হতাশ ভাবে বাগানটার দিকে তাকিয়েছিলেন উনি, হঠাৎ শুক্লা বলল, "বাবু চা..."
শুক্লা তার একমাত্র কাজের মেয়ে। গত কুড়ি বছর ধরে তার সঙ্গী। বিদেশ থেকে আসার সময় শুক্লাকে সঙ্গে করে এনেছিলেন। গত কুড়ি বছরে ওর বয়স একটুও বাড়েনি, বরং কমেছে। আজকাল এত সাজগোজ করে যে দেখলে ষোড়শী বলে মনেহয়। ওর চরিত্রেরও যে একটু সমস্যা আছে সেকথা শম্ভুনাথ বাবু জানেন। হয়তো এজন্য উনি নিজেও কিছুটা দায়ি। তবে শুক্লা আছে বলে আজকাল তার একলা লাগেনা। ওর সঙ্গে গল্প করে উনি বেশ খানিকটা সময় কাটিয়ে দিতে পারেন। শুক্লাকে দেখে একটা প্ল্যান তাঁর মনের মধ্যে ঝিলিক দিল। প্রোগ্রাম ৩৩০৩। কোম্পানিতে থাকার সময় এই প্রোগ্রামটা তিনি আবিষ্কার করেছিলেন, কিন্তু কখনো টেস্ট করেননি, আজ একবার টেস্ট করে দেখতে ইচ্ছে হল।

শম্ভুনাথ বাবুর কাজের মেয়ে শুক্লাকে নিয়ে আশেপাশের লোকের ফিসফিসের শেষ নেই। ভারী স্তন আর নিতম্ব নিয়ে ও যখন পাড়া দিয়ে হেঁটে যায় তখন সকলে চোখ টেরিয়ে ওর দিকে তাকায়। সবচেয়ে বেশি ফিসফিস হয় ওর বয়স নিয়ে। লোকে বলে, "বুড়ো কি সার্ভিস দিচ্ছে কে জানে? একটুও বয়স বাড়তে দেয়নি মেয়েটার।"
ওকে দেখে আশেপাশের অনেকেরই জিভে জল ঝরে। কিন্তু শুক্লার দেমাক দেখে বেশিরভাগই এগিয়ে এসে প্রপোজ করার সাহস পায়না। তবে কয়েকজন আছে যাদের প্রপোজ করার কোনো দরকার নেই। গত কয়েকদিন ধরে ওদের মধ্যেই শুক্লাকে নিয়ে ফিসফিস শোনা যাচ্ছিল।

আকাশের কোণায় ঘেয়ো কুকুরের মতো সাদা চাঁদ বিষণ্ণ বদনে তাকিয়েছিল নিচের দিকে। শিলাই নদীর চরে নিশিচরের শ্মশানে আড্ডা দিচ্ছিল রাকা, টাফি আর মদনা। সামনে নামানো ছিল লাল তরলের বোতল। রামচন্দ্র ঝাঁঝিয়ে দিচ্ছিল ওদের গলা থেকে বুক, বুক থেকে পেট। আর তারপর পেট ছাড়িয়ে মাথা সমেত সর্বাঙ্গ। মদনা মূলত ভোলেবাবার ভক্ত হলে মাঝেমাঝে রামচন্দ্রের পুজোতে ওর সমস্যা ছিলনা। ওদের চোখে যখন আবছা আবছা গ্রহণ লেগেছে, তখনই রাকা বলে উঠল, "মালটার বয়স কত হবে বলে তোর মনেহয়?"
মদনা বলল, "কোন মালটার কথা বলছিস?"
রাকা বলল, "শম্ভুবাবুর বাড়িতে যে মালটা কাজ করে। উফ! পাছা দুলিয়ে যখন হাঁটে তখন যেন ঠং ঠং শব্দ হয়। শুনলে বুকের ভিতরে জ্বালা ধরে যায় মাইরি।"
টাফি বলল, "দেখে তো মনেহয় কুড়ি বাইশ, তবে পঁয়ত্রিশের কম বয়স হবেনা। বুকগুলো দেখেছিস, যেন কচি কুমড়ো। হাত পড়েনি মনেহয়।"
মদনা বলল, "হঠাৎ ওই কাজের মেয়েটাকে নিয়ে পড়লি কেন?"
রাকা খিকখিক করে হেসে উঠল। বলল, "কচি খোকা। এখোনো মায়ের দুদু খাও।"
ওর সাথে হেসে উঠল টাফিও। হাসির দমকে খানিকটা থুতু ছিটকে বেরিয়ে এল। মদনা বলল, "তোরা কি....?"
উত্তেজনায় টাফি বলে উঠল, "ও ইয়েস ইয়েস...!"
মদনা একটু কুঁকড়ে গেল, "এটা কি উচিৎ হবে?"
রাকা বলল, "কোনো রিস্ক নেই। নিশ্চিন্তে করা যাবে। আজ রাতের খোরাকটা জম্পেশ ভাবে জুটে যাবে।"
টাফি বলল, "কচি মাংস। ঢুকবেও বেশ ভাল। সে মাসে যে বুড়িটাকে তুলে এনেছিলাম, সেটাকে না পারছিলাম খেতে না পারছিলাম ফেলতে। একেবারে অরুচিকর।"
মদনার বুড়িটার ব্যাপারে মনেপড়ল। ষাট পঁয়ষট্টির মতো বয়স হবে। মেন্টাল পেসেন্ট। সম্ভবত ঘর খোলা পেয়ে মাঝরাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। ওরা তুলে এনে সেটাকে নিয়েই ফূর্তি করেছিল। বলল, "তোরা তো ফূর্তি করতে গিয়ে বুড়িটাকে মেরেই ফেললি।"
টাফি বলল, "ছাড় ওটার ব্যাপারে আর মনে করাসনা। রক্তারক্তি ব্যাপার হয়েছিল। মনেপড়লে গা ঘিনঘিন করে।"
রাকার চোখ ঢুলুঢুলু। বলল, "চল, আর সময় নষ্ট না করে মালটাকে চেখে আসি।"
টাফি বলল, "এখানেই কি তুলে আনবি?"
রাকা বলল, "করার জন্য বুড়োর ঘরের চেয়ে সেফ প্লেশ আর আছে নাকি? বুড়ো বাধা দিতে এই ড্যাগার দিয়ে ওর পেটে একটা আলতো খোঁচা মেরে চুপ করিয়ে দেব।"
রাকার হাতে একটা চকচকে ভোজালি। টাফি মাথা নাড়ল। এতক্ষণ ধরে উত্তেজক কথাবার্তা শুনে মদনারও গা গরম হয়ে উঠেছে। বলল, "বলছিস, যখন চল তবে..."

গাছের পাতায় শনশনে হাওয়া বইছে। নদী থেকে ভেসে আসছে ছলাৎছলাৎ শব্দ। চালা থেকে ওরা উঠে দাঁড়াল। চিতা বাঘের মতো চুপিসারে শহরের মধ্যে প্রবেশ করল। তিন নম্বর গলির কাছে এসে শম্ভুনাথ বাবুর ঘরের দরজায় বেশ কয়েকবার ধাক্কা মারতেই ভিতর থেকে শুক্লা বেরিয়ে এল। রিনরিনে গলায় জিজ্ঞেস করল, "এত রাতে কাকে চাই?" 
রাকা বলল, "তোমাকেই চাই সোনা। আজ রাতে আমরা তোমার সাথে ফূর্তি করতে এসেছি।"
শুক্লা ভ্যাবাচ্যাকা খেল। বলল, "মানে...?"
হাতের ভোজালিটা শুক্লার পেটে ঠেকিয়ে রাকা বলল, "বেশি কথা না বলে চুপচাপ ঘরে চল, নয়তো তোকে চিরকালের জন্য চুপ করিয়ে দেব।"
ভয়ে ভয়ে পিছিয়ে এল শুক্লা। বলল, "বাবুরা আমাকে মেরোনা। তোমরা যা বলবে আমি করব।"
শুক্লাকে ঠেলে ওরা একটা ঘরের ভিতরে ঢুকল। দরজা বন্ধ করে টাফি বলল, "তাড়াতাড়ি কাপড় খোল। যা করার করে তাড়াতাড়ি চলে যাই..."
রাকা ওর কাপড় খুলতে শুরু করতেই শুক্লা ছটফট করতে লাগল। মদনা চেপে ধরল ওর মুখ। ভয়ে একেবারে কুঁকড়ে গিয়েছে শুক্লা। কাপড় খোলা শেষ হতেই ওরা তিনজনে পাঁজাকোলা করে ওকে বিছানায় নিয়ে চলল। যেতে যেতে রাকা বলল, "কি ভারি...?"
টাফি বলল, "কি খায় কে জানে? মেয়েছেলের এত ওজন হয় কিভাবে?"
মদনা বলল, "গায়ে গতরে কি কম আছে?"
রাকা মাথা বলল, "এটাকে করে উদোম জুত হবে মাইরি।"
ওরা শুক্লাকে বিছানায় এনে শোয়াল। আকাশের চাঁদ ফিকে হয়ে এসেছে। শ্মশানের কোণায় বেশ কয়েকটা শেয়াল একটানা কেঁদে চলেছে। টাফি বলল, "আর অপেক্ষা সহ্য হচ্ছেনা। পা দুটো ফাঁক কর, ঢোকাই..."
রাকা আর মদনা ওর দুটো পা ধরে দুদিকে ফাঁক করল। চোখ বুজে শুয়ে আছে শুক্লা। কোনো হেলদোল নেই। রাকা বলল, "এই মেয়ে চোখ খোল।"
তবুও শুক্লার কোনো হেলদোল নেই দেখে মদনা বলল, "ভয়ে কি জ্ঞান হারাল নাকি?"
রাকা বলল, "দাঁড়া জ্ঞান ফেরাই..."
টাফি বলল, "দরকার নেই। করতে করতে জ্ঞান ফিরে যাবে।"
রাকা মাথা নাড়ল। বলল, "না, মেয়েছেলে একটু চিৎকার চেঁচামেচি না করলে করে ঠিক জুত হয়না।"
মদনা বলল, "দেখিস, আগেরটার মতো একেও মেরে ফেলিসনা।"
খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসল রাকা। পা দিয়ে শুক্লার পেটে একটা লাথ মারল। "থ্রি থ্রি জিরো থ্রি পোগ্রাম স্টার্ট," বলে উঠে শুক্লা চোখ খুলল। চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে তিনহাত পিছিয়ে এল রাকা। কি বীভৎস চোখ শুক্লার। লাল টুকটুকে। যেন ভাটার মতো জ্বলছে। টাফি বলল, "ওটা কি?"
মদনা বলল, "এ মানুষ নয়। নির্ঘাত..."
রাকা বলল, "ভূ...ভূ...ভূত..."
মদনা বলল, "পালা পালা...."
ওরা পালাবার চেষ্টা করল। পারলনা। তার আগেই দুটো হাত ওদের পিছন থেকে পেঁচিয়ে ধরল। রিনরিনে স্বরে বলে উঠল, "আমাকে ফেলে যাচ্ছিস কোথায়? করে যা..."

সকালে গোলাপ গাছে জল দিচ্ছিলেন শম্ভুনাথ বাবু। হঠাৎ পাশের পাড়ার বিনয় বাবু বলে উঠলেন, "ও মশাই, দিনে দিনে দেশের কি অবস্থা হচ্ছে দেখছেন?"
একটু কেশে উঠে শম্ভুনাথ বাবু বললেন, "কি অবস্থা হচ্ছে?"
বিনয় বাবু অবাক হলেন। বললেন, "আপনি শোনেননি? কাল রাতে নিশিচরের শ্মশানে তিনখানা ডেডবডি পাওয়া গেছে। তিনটাই নাকি জেল খাটা আসামী। উফ! কী বীভৎস ভাবে মারা হয়েছে ওদের। সারা শরীরের মাংস খুবলে নিয়ে পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলা হয়েছে। লোকে বলছে, এটা নাকি মানুষের কাজ হতেই পারেনা..."
আলতো মাথা নেড়ে গাছে জল দিতে শুরু করলেন শম্ভুনাথ বাবু। পিছন থেকে শুক্লা বলল, "বাবু, চা দেব?"
দু'দিকে মাথা নেড়ে শম্ভুনাথ বললেন, "আর একটু পরে দিও।"
চেয়ারে বসে উদীয়মান সূর্যের দিকে তাকালেন উনি। ওই খুনগুলো যে মানুষের কাজ নয় সে উনি খুব ভাল করেই জানেন। প্রায় দশ বছর পরিশ্রম করার পরে তিলেতিলে শুক্লাকে গড়ে তুলেছিলেন জাপানের বিখ্যাত রোবোটিক্স ইঞ্জিনিয়ার শম্ভুনাথ পট্টনায়ক। এমন এক রোবট যাকে বাইরে থেকে দেখে কোনো ভাবেই রোবট বলে চেনা সম্ভব নয়। আর এই শুক্লার ম্যামরিতে সেট করেছিলেন প্রোগ্রাম ৩৩০৩। এমন এক প্রোগ্রাম যে প্রোগ্রামে শুক্লাকে কেউ রেপ করার চেষ্টা করলেই শুক্লা ভয়ানক হয়ে উঠে কনভিক্টদের খুন করে ফেলবে। সকালের সূর্য ধীরেধীরে মাথায় উপরে উঠে আসছে। সেদিকে তাকিয়ে বললেন, "সবিতা আজ তোমার মৃত্যুর প্রতিশোধ পূর্ণ হল। এবারে আমি নিশ্চিন্তে মরতে পারব।"

(সমাপ্ত)
©All rights reserved to sankha subhra nayak

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন